📄 মু’জিজা-৮৬: সাগর তরঙ্গ
অথবা (অবিশ্বাসীদের অবস্থা) প্রমত্ত সমুদ্রের বুকে গভীর অন্ধকারের ন্যায়, যাকে উদ্বেলিত করে তরঙ্গের ওপর তরঙ্গ, যার ওপরে আছে ঘন কালো মেঘ। অন্ধকার, একের ওপর এক। যখন সে তার হাত বের করে, তখন তাকে একেবারেই দেখতে পায় না। আল্লাহ যাকে জ্যোতি দেন না তার কোনো জ্যোতিই নেই। (নূর, ২৪ : ৪০)
উল্লেখ্য যে, মক্কা ও মদিনা, যেখানে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জীবনের পুরো সময়টি অতিবাহিত করেছেন, তা সমুদ্রের নিকটবর্তী ছিল না। অধিকন্তু তিনি তাঁর পুরো জীবদ্দশায় কখনো সমুদ্র যাত্রা করেন নি। তথাপি সমুদ্র তরঙ্গ সম্পর্কে তাঁর এই বর্ণনা বাস্তবতার অধিক নিকটবর্তী।
গ্রে মিলার (Gray Miller) তাঁর The Amazing Quran' নামক গ্রন্থে নিম্নলিখিত ছোট ঘটনাটি বর্ণনা করেন, ‘একজন মুসলিম এক সমুদ্র বণিককে কুরআন মাজিদের একটি কপি দেয়। লোকটি ইসলামের ইতিহাস সম্পর্কে কিছুই জানত না। যখন সে কুরআন মাজিদ পাঠ শেষ করল, সে তাঁর মুসলমান বন্ধুকে জিজ্ঞেস করল, ‘এই লোক, (মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি একজন নাবিক ছিলেন? যখন তাঁকে বলা হল, তিনি সবসময় একটি মরুময় এলাকায় বসবাস করতেন এবং সম্ভবত সমগ্র জীবনে তিনি একবারের জন্যও সমুদ্র দেখেন নি। তখন লোকটি সেখানেই কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যায়। সে স্বীকার করল, কুরআন মাজিদের এই বর্ণনা কেবল তিনিই দিতে পারেন যিনি প্রকৃত প্রস্তাবে সামুদ্রিক ঝড় প্রত্যক্ষ করেছেন। অথচ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো তা প্রত্যক্ষ করেন নি।
আরও লক্ষণীয়, এই আয়াতটি একটি গভীর সমুদ্রের অবস্থা বর্ণনা করে, যাতে রয়েছে বড় বড় ঢেউ, অন্য বড় বড় ঢেউয়ের ওপর, একটির ওপর অন্যটি। মানুষ এই বিষয়টি দেখতে পেয়েছে সাবমেরিন আবিষ্কারের পর। সর্বপ্রথম নিউক্লিয়ার সাবমেরিন আবিষ্কৃত হয় ১৯৫৪ সালে। তখনই সর্বপ্রথম গভীর সমুদ্রের তরঙ্গ-রহস্য অবলোকন করা সম্ভব হয়। তখনই জানা যায়, সমুদ্রের উপরিভাগের নিচে যে পানি রয়েছে তা স্থির ও শান্ত নয়। সাগরের নিম্নদেশেও ঢেউ আবিষ্কৃত হয়, যাকে বর্তমানে গভীর সমুদ্রস্রোত নামে অভিহিত করা হয়। যেগুলি একটির ওপর অপরটি প্রবাহিত হয়। প্রায়ই সেগুলি এত উন্মত্ত হয় যে, সাগরের তলদেশের মাটি একস্থান থেকে অন্যস্থানে সরিয়ে নিয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে সমুদ্র তলদেশের এই তথ্য দান করেছেন?
📄 মু’জিজা-৮৭: নদী ও সমুদ্রের পানির মিশ্রণ
তিনিই সমান্তরালে দুই পানির ধারা প্রবাহিত করেছেন। একটি সুস্বাদু ও মিষ্ট আর অপরটি লবণাক্ত ও বিস্বাদযুক্ত। আর তিনি উভয়ের মাঝখানে রেখেছেন একটি অন্তরায়, একটি দুর্ভেদ্য অন্তরায়। (ফুরকান, ২৫ : ৫৩)
এই আয়াতের একটি ব্যাখ্যা হল, কুরআন মাজিদ এখানে সাগরের পানির সঙ্গে নদীর পানির মিশ্রণের বিবরণ দিচ্ছে। উভয় প্রকারের পানি দেখতে একই; কিন্তু নদীর পানি সুমিষ্ট ও সুস্বাদু এবং সমুদ্রের পানি লবণাক্ত ও বিস্বাদ। তাছাড়া কোনো মানুষই এই দুই ধরনের পানির স্রোতের মাঝে এমন সূক্ষ্ম বিভেদরেখা টানতে সক্ষম নয়।
আমাদের আরও স্মরণ রাখতে হবে, পুরো আরব উপদ্বীপে কোনো নদী বলতে নেই। ফলে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এমন ব্যাপার প্রত্যক্ষ করার কোনো ধরনের সুযোগ ঘটে নি। বলাবাহুল্য, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন কোনো বিষয়ে যথাযথ ধারণা বা কল্পনা করতে পারেন না, যা তিনি তাঁর পুরো জীবনে কখনো প্রত্যক্ষ করেন নি। এই আয়াতটি কুরআন মাজিদ প্রকৃতিগতভাবে আসমানি গ্রন্থ হওয়ার এক অনন্য স্মারক।
কুরআন মাজিদের উপরোক্ত আয়াত বলে, ‘আল্লাহ তাআলা দুইটি সমুদ্রকে সমান্তরালে প্রবাহিত করেছেন....এবং উভয়ের মাঝখানে একটি অন্তরায় রয়েছে।’ বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আবিষ্কার করেছেন, উভয় প্রকারের পানির স্রোতের মধ্যে লবণাক্ততা, ঘনত্ব, ও তাপমাত্রার তারতম্য রয়েছে। তারা এও আবিষ্কার করেছেন, যখন পানি ওপরের স্রোত থেকে নিচের স্রোতে প্রবেশ করে কিংবা বিপরীতক্রমে প্রবাহিত হয়, তখন তৎক্ষণাৎ তার অবস্থা অন্য স্রোতের পানি অনুসরণে বদলে যায়। এভাবে সেখানে দু’ধরনের পানি স্বাধীনভাবে মিশে যায়; কিন্তু উভয় স্ব স্ব বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ণ রাখে। বিজ্ঞানীরা তা আবিষ্কারের শত শত বছর পূর্বে কুরআন মাজিদ এমন একটি জটিল বিষয় শনাক্ত করেছে।
📄 মু’জিজা-৮৮: লুত সম্প্রদায়ের আজাব
যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ লুতের কাছে আগমন করল, তখন তাদের কারণে তিনি বিষণ্ণ হয়ে পড়লেন এবং তাঁর মন তাদের (রক্ষার) ব্যাপারে সংকীর্ণ হয়ে গেল। তারা বলল, ভয় করবেন না এবং দুঃখ করবেন না। আমরা আপনাকে এবং আপনার পরিবার বর্গকে রক্ষা করবই। আপনার স্ত্রী ব্যতীত, সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত থাকবে। আমরা এই জনপদের অধিবাসীদের ওপর আকাশ থেকে আজাব নাজিল করব তাদের পাপাচারের কারণে। আমি (আল্লাহ) তাতে বুদ্ধিমান সম্প্রদায়ের জন্য একটি স্পষ্ট নিদর্শন রেখে দিয়েছি। (আনকাবুত, ২৯ : ৩৩-৩৫)
এই আয়াতসমূহে লুত আলাইহিস সালাম-এর সম্প্রদায়ের ওপর নাজিলকৃত আযাবের উল্লেখ রয়েছে। তারা সমকামিতার মত জঘন্য অপরাধে অভ্যস্ত ছিল। ফলে আল্লাহ তাআলা তাদের জনপদকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করে দেন।
আয়াতগুলিতে স্পষ্ট নিদর্শন বলতে ‘সাদুম’ ও ‘গোমরাহ’ সম্প্রদায়ের জনপদগুলির ধ্বংসাবশেষকে বুঝানো হয়েছে, যা সম্প্রতি মৃত সাগরের কাছে আবিষ্কৃত হয়েছে। ভৌগলিকরা দেখতে পেয়েছেন, অঞ্চলটি প্রচুর পরিমাণে গন্ধে ভর্তি। ফলে সমগ্র অঞ্চলটিতে প্রাণী বা উদ্ভিদ কোনো ধরনের জীবনের অস্তিত্ব নেই। পুরো এলাকা সর্বাঙ্গীন ধ্বংসের একটি নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। এভাবে এটি সকল যুগের মানুষের জন্য আল্লাহর শাস্তির একটি উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে আছে। বলাবাহুল্য, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কখনো অঞ্চলটি পরিদর্শন করেন নি। জনপদগুলির ধ্বংসের তথ্য জানার মত তাঁর কোনো মাধ্যম ছিল।
📄 মু’জিজা-৮৯: সা’দুম ও গোমরাহ সম্প্রদায়ের জনপদ
আপনার প্রাণের কসম (হে নবী,) নিশ্চয় তারা (লুত সম্প্রদায়) আপন নেশায় উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরপাক খাচ্ছিল। অতঃপর সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে একটি বিকট আওয়াজ তাদেরকে পাকড়াও করল। অতঃপর আমি (আল্লাহ) তাদের (সাদুম গোত্রের) জনপদগুলিকে উল্টে দিলাম এবং তাদের ওপর বর্ষণ করলাম পোড়ামাটির পাথর। নিশ্চয় এতে পর্যবেক্ষণকারীদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে। আর নিশ্চয় তা (জনপদগুলি) রাজপথের পাশেই বিদ্যমান। নিশ্চয় এতে ঈমানদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে। (হিজর, ১৫ : ৭২-৭৭)
এই আয়াতগুলিতে কুরআন মাজিদ ধ্বংসপ্রাপ্ত জনপদগুলির অধিক সুনিশ্চিত অবস্থানস্থলের নির্দেশনা প্রদান করে। এতে বর্ণিত হয়েছে সেগুলি রাজপথের পাশে অবস্থিত।
ভৌগলিকরা সম্প্রতি আবিষ্কার করেছে, জনপদগুলি মৃত সাগরের দক্ষিণ পূর্বে, মক্কা থেকে সিরিয়া পর্যন্ত একটি রাজপথের পাশে অবস্থিত। নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, যাঁর ভূগোল সম্পর্কে তেমন কোনো জ্ঞান ছিল না, তথাপি এই আয়াতগুলি এমন এক বাস্তবতার কথা বলে যা কেবল সাম্প্রতিক ভূগোল বিশারদদের দ্বারাই আবিষ্কৃত হয়েছে।