📄 মু’জিজা : ৭৫: কুরআন মাজিদের পরিভাষা ‘কাদ্দারাহু’
মানুষ ধ্বংস হোক, সে কতই না অকৃতজ্ঞ! তিনি (আল্লাহ) তাকে কোন বস্তু থেকে সৃষ্টি করেছেন? ‘নুতফা’ থেকে তিনি তাকে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর (‘ফা’) তিনি ‘কাদ্দারাহু’ (তাকে সুগঠিত করেছেন)। (আবাসা, ৮০ : ১৭-১৯)
একটি নতুন মানব দেহ সৃষ্টির সূচনা হয় একটি জাইগোট গঠনের মাধ্যমে। এটি ২৩ জোড়া ক্রোমোজোম ও প্রায় ৪মিলিয়ন ভিন্ন ভিন্ন জিন দ্বারা গঠিত। প্রত্যেক ক্রোমোজোমেরই নির্দিষ্ট সেটের জিন রয়েছে, যা নবজাতকের সুপ্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ বহন করে। পুরুষ ও মহিলার জিন বিনিময় যা, পারস্পরিক alleles pair নামে পরিচিত। প্রতিটি জিনেরই একটি পরিমাণগত কিংবা গুণগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যখন জিনের পারস্পরিক জোড়া বিনিময় হয় তখন নবজাতকের বৈশিষ্ট্য গঠন হয়। যদি জিনের মধ্যে কোনো গুণগত বৈশিষ্ট্য থাকে, প্রবল বৈশিষ্ট্যটি দুর্বল বৈশিষ্ট্যটিকে পরাস্ত করে এবং কেবল প্রবল বৈশিষ্ট্যই নবজাতকের দেহে দেখা যায়। যদি জিনটির কোনো পরিমাণগত বৈশিষ্ট্য থাকে, পুরুষ ও মহিলার জিন পরস্পর মিশ্রিত হয়ে মধ্যবর্তী চরিত্র বৈশিষ্ট্যের সৃষ্টি করে। এভাবে কার্যক্রমের একটি জটিল প্রক্রিয়া পরিচালিত হয়, যা নবজাতকের মধ্যে সকল প্রকার চরিত্রবৈশিষ্ট্য গঠন ও প্রকাশ ঘটায়। উল্লেখ্য যে, ভ্রূণতত্ত্ববিদরা ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত একটি প্রজনন পরিকল্পনার ধারণার বর্ণনা দিতে পারে নি। এটি কুরআন মাজিদের একটি মু’জিজা যে, তা এই ঘটনা বর্ণনার জন্য ‘কাদ্দারাহু’ শব্দ ব্যবহার করেছে। ‘কাদ্দারাহু’ শব্দটি মূল শব্দ ‘কাদারা’ থেকে উদ্ভূত। যার অর্থ পরিকল্পনা প্রণয়ন বা কার্যক্রম বিন্যস্ত করা। কুরআন মাজিদ এভাবে জিনের প্রকাশ ও চরিত্র-বৈশিষ্ট্য গঠনের বিষয় বহুপূর্বে সপ্তম শতাব্দীতে সুদৃঢ়ভাবে বর্ণনা করেছে। পক্ষান্তরে ভ্রূণবিশারদরা তা আবিষ্কার করেছে বিংশ শতাব্দীতে। আরও উল্লেখ্য যে, এই গঠন-প্রক্রিয়া হয় খুব দ্রুত এবং তা allelic জিন বহনকারী বিনিময়কৃত ক্রোমোজোমগুলির পাশাপাশি অবস্থানের সঙ্গে সঙ্গে সংঘটিত হয়। কুরআন মাজিদ ‘ফা’ অব্যয় ব্যবহারের মাধ্যমে এই বিষয়টির যথাযথ বর্ণনা প্রদান করেছে, যা অব্যবহিত পরম্পরাগত পরিবর্তন নির্দেশ করে।
📄 মু’জিজা : ৭৬: কুরআনি পরিভাষা ‘হারছ’
তোমাদের স্ত্রী তোমাদের ‘হারছ’ (শস্যক্ষেত্র)। সুতরাং তোমরা তোমাদের শস্যক্ষেত্রে গমন কর, যখন এবং যেভাবে চাও। (বাকারা, ০২ : ২২৩)
এই আয়াতগুলি মানব বিকাশের বৈজ্ঞানিক সত্যকে সুন্দরভাবে বর্ণনা করে; কিভাবে একটি জীবনের বীজ একজন পরিপূর্ণ মানুষরূপে বিকশিত হয়। উপরে বর্ণিত উপ-পর্যায়গুলি শেষ হওয়ার পর জাইগোটটি জরায়ু নালী থেকে জরায়ুতে স্থানান্তরিত হয় এবং তা জরায়ুর দেয়াল স্থাপিত হয়, যেমনটি বীজ মাটির ভেতর বপন করা হয়। এটিই ‘নুতফা’র সর্বশেষ পর্যায়। কুরআন মাজিদ ‘হারছ’ শব্দ দ্বারা এটিকে নির্দেশ করে। আভিধানিক অর্থে ‘হারছ’ শব্দটি মাটি চাষ করা বুঝায়। এখানে তার সঙ্গে সাদৃশ্য হল, জরায়ুর দেয়াল মাটিসদৃশ। আর জাইগোট সেই বীজের মত যা তাতে বপন করা হয়েছে। অধিকন্তু বীজ যেমনটি মাটি থেকে পুষ্টি আহরণ করে এবং একটি চারাগাছে পরিণত হয়, তেমনিভাবে জাইগোট জরায়ুর ভেতর দিয়ে পুষ্টি আহরণ করে এবং একজন মানুষের আকৃতি লাভ করে।
📄 মু’জিজা : ৭৭: ‘আলাকা’ উপপর্যায়
আর অবশ্যই আমি মানুষকে মাটির নির্যাস থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর (ছুম্মা) আমি তাকে শুক্ররূপে (নুতফা) সংরক্ষিত আধারে (জরায়ুতে) স্থাপন করেছি। পরবর্তীতে (ছুম্মা) নুতফাকে আমি ‘আলাকা’য় (রক্তপিন্ডে) পরিণত করি। (মুমিনূন, ২৩ : ১২-১৪)
এই পর্ব শুরু হয় ১৫ তম দিনে এবং শেষ হয় ২৩/২৪তম দিনে। আরবি ভাষায় ‘আলাকা’ শব্দের তিনটি অর্থ রয়েছে। তা এমন এক বস্তুকে নির্দেশ করে, যা কিছুর সঙ্গে সংযুক্ত কিংবা কিছুর সঙ্গে ঝুলানো। তাঁর আরেক অর্থ জোঁক, যা পানিতে বাস করে এবং অন্যান্য প্রাণীর রক্ত চোষে জীবন ধারণ করে। তাঁর অন্য একটি অর্থ, একটি ঘন রক্তপিন্ড।
ভ্রূণতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে কুরআন মাজিদের শব্দ ‘আলাকা’ এই ধাপের ভ্রূণবিকাশের অঙ্গসংস্থান সংক্রান্ত স্তরকে যথাযথভাবে পরিব্যপ্ত করে। কুরআন মাজিদে ‘আলাকা’ শব্দটি নিম্নলিখিত আরও চারটি স্থানে উল্লিখিত হয়েছে :
হে মানুষ, যদি তোমরা পুনরুত্থানের ব্যাপারে সন্দেহে থাক তবে নিশ্চয় জেনে রেখো, আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর শুক্র থেকে, তারপর ‘আলাকা’ থেকে। (হজ্জ, ২২ : ০৫)
তিনিই (আল্লাহ) তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে তারপর শুক্রবিন্দু থেকে তারপর ‘আলাকা’ থেকে। (গাফির, ৪০ : ৬৭)
মানুষ কি মনে করে যে, তাকে এমনকি ছেড়ে দেয়া হবে? সে কি বীর্যের শুক্রবিন্দু ছিল না, যা স্খলিত হয়? অতঃপর সে আলাকায় পরিণত হয়। তারপর আল্লাহ তাকে সুন্দর আকৃতিতে সৃষ্টি করেছেন এবং সুবিন্যস্ত করেছেন। (কিয়ামা ৭৫ : ৩৬-৩৮)
পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ‘আলাকা’ থেকে। (আলাক, ৯৬ : ০১-০২)
আধুনিক ভ্রূণবিজ্ঞান অনুসারে, ‘নুতফা’ খুব দ্রুত একটি blastocyte- এ পরিণত হয় এবং তা নিজেকে একটি বৃন্তের সহযোগিতায় জরায়ুর বহিঃত্বকে প্রতিস্থাপিত করে, যা পরবর্তীতে umbilical cord-এ রূপান্তরিত হয়। এই প্রতিস্থাপন শুরু হয় ৬ষ্ঠ দিনে এবং দশ দিনের মধ্যে তা সম্পূর্ণ হয়ে যায়। প্রতিস্থাপনের এই প্রক্রিয়া ‘আলাকা’-এর প্রথম অর্থকে নির্দেশ করে, অর্থাৎ কোনো কিছুর সঙ্গে সংযুক্ত কিংবা কোনো কিছুতে ঝুলন্ত। ভ্রূণ তখন তার গোলাকৃতি হারিয়ে ফেলে। এটি দীর্ঘায়িত হয় এবং জোঁকের আকৃতি ধারণ করে। একই সময়ে তা মায়ের রক্ত থেকে তাঁর পুষ্টি আহরণ করতে শুরু করে। অধিকন্তু তা পরবর্তীতে amniotic fluid দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়, ঠিক যেমনটি জোঁক পানি দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকে। কুরআন মাজিদের শব্দ ‘আলাকা’- বিকাশের এই ধাপকে যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করে। ‘আলাকা’-এর তৃতীয় অর্থ তথা রক্তপিন্ডও ভ্রূণের বাহ্যিক আকৃতির সঙ্গে যথাযথভাবে প্রযোজ্য হয়। অতএব ‘আলাকা’ শব্দটি ভ্রূণবিকাশের দ্বিতীয় প্রধান পর্যায় ‘তাখলিক’-এর প্রথম উপধাপ বর্ণনার ক্ষেত্রে অধিক সার্বজনীন ও যথার্থ অভিব্যক্তি।
📄 মু’জিজা : ৭৮: ‘মুদ্গা’ উপ-পর্যায়
হে মানুষ, যদি তোমরা পুনরুত্থানের ব্যাপারে সন্দেহে থাক তবে নিশ্চয়ই জেনে রাখ, আমি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছি, তারপর ‘নুতফা’ থেকে, তারপর ‘আলাকা’ থেকে। পরবর্তীতে ‘মুদ্গা মুখাল্লাকা’ (পূর্ণ আকৃতিবিশিষ্ট গোশত) থেকে এবং ‘গয়রি মুখাল্লাকা’ (অপূর্ণ আকৃতিবিশিষ্ট গোশত) থেকে তোমাদের নিকট বিষয়টি সুস্পষ্টরূপে ব্যক্ত করার নিমিত্তে। (হজ্জ, ২২ : ০৫)
‘আলাকা’ উপপর্যায় শেষ হয় ২৪-২৫ দিনের মধ্যে। অতঃপর ভ্রূণটি ২৬-২৭ তম দিনে মুদ্গাতে পরিবর্তিত হয়। আভিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘মুদ্গা’ শব্দের কতিপয় অর্থ রয়েছে। প্রথম অর্থ, ‘দাঁতে চর্বনকৃত কোনো বস্তু’। দ্বিতীয় একটি অর্থ, ‘একটি ছোট পদার্থ’। তৃতীয় অর্থ ‘একটি ছোট গোশতের টুকরা’। ইউসুফ আলি তাঁর তাফসিরে ‘মুদ্গা’ শব্দের তরজমা করেছেন, গোশতের টুকরা। পক্ষান্তরে, মুহাম্মদ আসাদ, মরিস বুকাইলি প্রমুখ তাঁর একটি উন্নততর অনুবাদ গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ ‘একটি চর্বিত টুকরা’।
ভ্রূণবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণায় এই স্তরের ভ্রূণের পরিবর্তনকে কুরআন মাজিদের শব্দ ‘মুদ্গা’র মাধ্যমে বর্ণনা করার যথার্থতা প্রমাণিত হয়েছে। যেহেতু একটি ভ্রূণ জরায়ু থেকে পুষ্টি গ্রহণ করে, তাই তার বৃদ্ধি ঘটে একটি দ্রুত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে। এর কোষগুলো একটি গুটি সদৃশ আকৃতি ধারণ করে এবং মনে হয় তা এমন একটি বস্তু যাতে দাঁতের ছাপ রয়েছে। পরবর্তীতে ভ্রূণটি তার অবস্থান পরিবর্তন করে তাঁর ভরকেন্দ্র পরিবর্তিত হওয়ার কারণে। যা দেখতে চর্বিত টুকরার মত। এ সকল পরিবর্তন ‘মুদ্গা’র প্রথম অর্থের সঙ্গে পুরোপুরি সঙ্গতিপূর্ণ।
এই ধাপে একটি ভ্রূণ থাকে খুবই ছোট। দৈর্ঘ্যে আনুমানিক ১ সেন্টিমিটার। উল্লেখ্য যে, ‘আলাকা’র উল্লিখিত পূর্ববর্তী পর্যায়ে তা একটি ‘মরসেল’-এর সমান আকৃতি লাভ করে না, কেননা তা দৈর্ঘ্যে ৩.৫ মিলিমিটারের বেশি নয়। এটি ‘মুদ্গা’-এর দ্বিতীয় অর্থ তথা একটি ছোট বস্তুকণিকা’-এর সঙ্গে সঙ্গতি রাখে।
‘মুদ্গা’-এর তৃতীয় অর্থ অর্থাৎ, মরসেল সদৃশ এক টুকরো গোশত- তা এই স্তরের ভ্রূণের আকৃতি প্রকৃতির বিচারে প্রযোজ্য। এ কারণে এ স্তরের জন্য কুরআন মাজিদে ব্যবহৃত পরিভাষা ‘মুদ্গা’ শব্দটি ভ্রূণতত্ত্ববিদদের ব্যবহৃত পরিভাষা somite থেকেও অধিক বেশি যথার্থ ও ব্যাপক। এ শব্দটি একটি ভ্রূণের বহিঃস্থ অবস্থার যেমন যথার্থ বর্ণনা প্রদান করে তেমনি এই ধাপের অন্তঃস্থ বিকাশেরও বর্ণনা দেয়। স্মর্তব্য যে, এমনকি বিগত কয়েক বছর পূর্বেও এ বিষয়গুলি মানুষের জানা ছিল না। কুরআন মাজিদ কেবল এই পরিবর্তনগুলির পর্যায়ক্রমই বর্ণনা করে নি; বরং এই পরিবর্তনগুলির ধরন এবং আকৃতিরও বর্ণনা দিয়েছে। নিঃসন্দেহে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এই জ্ঞানের উৎস সর্বজ্ঞাতা ও জ্ঞানময় সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ আসমানি প্রত্যাদেশ বা ওহি।