📄 মু’জিজা : ৬৯: ভ্রূণ বিকাশের তিনটি প্রধান পর্যায়
আর অবশ্যই আমি (আল্লাহ) মানুষকে মাটির নির্যাস থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর (ছুম্মা) আমি তাকে শুক্ররূপে (নুতফা) সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি। তারপর (ছুম্মা) আমি ‘নুতফা’ কে ‘আলাকা’য় (রক্তপিন্ড) পরিণত করি (খালাকনা)। অতঃপর (ফা) আমি আলাকাকে ‘মুদ্গা’য় (গোশতপিন্ডে) পরিণত করি। অতঃপর (ফা) মুদ্গাকে ‘ইযামে’ (হাড়ে) পরিণত করি। অতঃপর (ফা) ‘ইযাম’ কে ‘লাহম’ (মাংসপেশী) দ্বারা আবৃত করি। তারপর (ছুম্মা) আমি ‘আনশা’নাহু’ (তাকে গড়ে তুলি) অন্য এক সৃষ্টিরূপে। অতএব সর্বোত্তম স্রষ্টা আল্লাহ কত বরকতময়! (মুমিনূন, ২৩ : ১২-১৪)
উল্লেখেয্য যে, এই আয়াতে কুরআন মাজিদ দু’টি ভিন্ন संयोजक অব্যয় তথা ‘ফা’ ও ‘ছুম্মা’ ব্যবহার করেছে। অধিকাংশ অনুবাদের ক্ষেত্রে উভয়টির একই অর্থ করা হয়েছে। অথচ পূর্বে যেমনটি উল্লিখিত হয়েছে ‘ফা’ অব্যয়টি অব্যবহিত পরে অর্থ বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। পক্ষান্তরে ‘ছুম্মা’ অব্যয়টি ব্যবহৃত হয় বিলম্বিত পরম্পরা বুঝানোর জন্য। কুরআন মাজিদ উপরোক্ত আয়াতে ‘ছুম্মা’ অব্যয়টি কেবল তিনবার ব্যবহার করেছে। যা নির্দেশ করে, ভ্রূণের বিকাশের ক্ষেত্রে তিনটি স্বতন্ত্র পর্যায় রয়েছে। ভ্রূণবিজ্ঞানীগণ ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে এই বিষয়টি আবিষ্কার করেছেন কেবল কয়েক বছর পূর্বে। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কে হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর বহু শতাব্দী পূর্বে এমন সূক্ষ্ম ও সুনির্দিষ্ট তথ্য অবতীর্ণ করতে পারেন?
কুরআন মাজিদ ভ্রূণ বিকাশের স্তরগুলিকে নির্দেশ করার জন্য তিনটি সুনির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করেছে। সেগুলি নিম্নে তুলে ধরা হল :
১. ‘নুতফা’ : এটি বিকাশের প্রথম ধাপকে নির্দেশ করে এবং এই ধাপটি পুরুষ ও নারীর বীর্য মিলন থেকে মায়ের জরায়ুতে জাইগোট সৃষ্টি হওয়া পর্যন্ত পুরো বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। এ ধাপে আন্তঃকোষীয় জাইগোট বিভাজিত হওয়া শুরু করে এবং একটি অধিকতর জটিল রূপ ধারণ করে।
২. ‘খালাক্বনা বা তাখলিক : এটি ভ্রূণ বিকাশের দ্বিতীয় ধাপ। এটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সৃষ্টির স্তর। যা শুরু হয় তৃতীয় সপ্তাহ থেকে এবং শেষ হয় গর্ভধারণের অষ্টম সপ্তাহে। এই ধাপে কোষ বিভাজন আরও ত্বরান্বিত হয় এবং মানব অঙ্গসমূহ ও বিভিন্ন তন্ত্রের পার্থক্য পরিষ্কার হয়।
৩. ‘আনশা’না বা নাশআ : এটি ভ্রূণবিকাশের তৃতীয় ও সর্বশেষ স্তর। এই ধাপে দ্রুত কোষ বিভাজন, পৃথকীকরণ ও বৃদ্ধি সাধন একটি সুনির্দিষ্ট মানব আকৃতি গঠন করে, যাকে বলা হয় ভ্রূণ। ধাপটি শুরু হয় গর্ভধারণের নবম সপ্তাহ থেকে এবং শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।
এসব ধাপের প্রত্যেকটি অঙ্গসংস্থান ও শারীরতাত্ত্বিক বিভিন্ন পরিবর্তনের একটি জটিল প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে অতিবাহিত হয়। এই পরিবর্তনগুলি হয় দ্রুত, কিন্তু একটি থেকে অপরটি অত্যন্ত সুস্পষ্ট। কুরআন মাজিদ এসব উপধাপকে সুনির্দিষ্ট শব্দে ‘ফা’ संयोजक অব্যয় সহকারে বর্ণনা দিয়েছে, যা দ্রুত ও তাৎক্ষণিক পরিবর্তন নির্দেশ করে। আগত পৃষ্ঠাগুলি এ কথা পরিষ্কার করে দিবে যে, ভ্রূণবিকাশের এসব উপধাপ বর্ণনার ক্ষেত্রে কুরআন মাজিদের শব্দসমূহ অধিক ব্যাপক ও যথোপযুক্ত। এভাবে কুরআন মাজিদের প্রতিটি পরিভাষাই একথা ঘোষণা করে যে, মানব ভ্রূণবিদ্যা মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি জীবন্ত মু’জিজা এবং স্বয়ং কুরআন মাজিদের জন্যও তা মু’জিজা।
📄 মু’জিজা : ৭০: কুরআনি পরিভাষা ‘আল মাউ’দ দাফিক্ব’
আভিধানিকভাবে ‘আল মাউ’দ দাফিক্ব’ কথাটির অর্থ, প্রবলবেগে নির্গমনকারী কিংবা স্বেচ্ছা নির্গমনকারী তরল পদার্থ বা এমন একটি ফোঁটা যা নির্গত হয়েছে। অন্যকথায়, তা এমন তরল পদার্থ নির্গমনকে নির্দেশ করে যা স্বেচ্ছায় নিষ্ক্রান্ত হয়, যা নিজে নিজে চলৎক্ষম। মাইক্রোস্কোপ ব্যবহারে দেখা গেছে, কেবল শুক্রাণুই নয় বরং ডিম্বাণুও চলৎক্ষমতা প্রদর্শন করে। পরিপক্ক শুক্রাণু একটি স্বাধীনভাবে সন্তরণকারী কার্যকরী অঙ্কুর কোষ, যাতে একটি মাথা ও একটি লেজ রয়েছে। লেজ শুক্রাণুতে গতি সঞ্চার করে এবং এটিকে ডিম্বাণুর দিকে গমনে সাহায্য করে।
Fimbrac আঙ্গুল সদৃশ প্রক্ষেপণ যা Infundibulum-এর অংশ, ডিম্বনালীর ফানেল আকৃতির প্রান্ত। সিলিয়া তথা Fimbrac-এর ওপর সূক্ষ্ম অণুবীক্ষণিক চাবুক একই সময়ে ডিম্বকোষকে Infundibulum-এর দিকে চলনে সহযোগিতা করে। শুক্রাণু ও ডিম্বাণু উভয়ের প্রদর্শিত নড়াচড়া ব্যতিরেকে নিষিক্তকরণ সংঘটিত হওয়া সম্ভব নয়। কুরআন মাজিদের শব্দ ‘আল মাউ’দ দাফিক্ব’ এভাবে দ্রুতবেগে নির্গমন, স্বেচ্ছানির্গমন, এবং এই উপধাপের চলাচল সংক্রান্ত ঘটনাগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করে।
📄 মু’জিজা : ৭১: কুরআন মাজিদের শব্দ ‘সুলালা’
তারপর তিনি (আল্লাহ) তাঁর (মানুষের) বংশধর সৃষ্টি করেছেন ‘সুলালা’ (তুচ্ছ পানির নির্যাস) থেকে। (সাজদাহ, ৩২ : ০৮)
আর আমি অবশ্যই মানুষকে ‘সুলালা’ (মাটির নির্যাস) থেকে সৃষ্টি করেছি। তারপর আমি (আল্লাহ) নুতফারূপে সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি। (মুমিনূন, ২৩ : ১২-১৩)
আরবি শব্দ ‘সুলালা’র তিনটি ভিন্ন ভিন্ন অর্থ রয়েছে। এর অর্থ একটি তরলের সাধারণ নির্যাস, স্বল্প পরিমাণ তরল ও একটি মৎস্য সদৃশ কাঠামো। উল্লেখ্য যে, মানুষের শুক্রাণু একটি লম্বা আকৃতির মাছের সঙ্গে সাদৃশ্য রাখে। অধিকন্তু প্রত্যেক বীর্যপাতের সময় ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন শুক্রাণু নির্গত হয়। যা থেকে কেবল ২০০টি শুক্রাণু ৫ মিনিটের মধ্যে নিষিক্তকরণ অঞ্চলে পৌঁছে যায়। সেসব থেকে কেবল একটি শুক্রাণুকেই ডিম্বাণুর সঙ্গে নিষিক্তকরণের জন্য নিংড়ে নেওয়া হয়। অধিকন্তু শুক্রাণুগুলো সামান্য পরিমাণ তরলের রূপ ধারণ করে, যা ৩.৫ থেকে ৫.০ মিলিমিটারের বেশি নয়। অতএব কারণে কুরআনের ‘সুলালা’ শব্দটি কেবল যথার্থ বর্ণনাই প্রদান করে না, বরং এই উপধাপের অঙ্গসংস্থান এবং শারীরতাত্ত্বিক গঠনকেও নির্দেশ করে। আরও উল্লেখ্য যে, কুরআন মাজিদ এই ধাপে কেবল পুরুষের বীর্য সম্পর্কে নির্দেশ করে। আর তাও ভ্রূণবিদ্যার সাম্প্রতিক জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।
📄 মু’জিজা : ৭২: কুরআন মাজিদের পারিভাষিক শব্দ ‘নুতফা’
মানুষ ধ্বংস হোক, সে কতই না অকৃতজ্ঞ! তিনি (আল্লাহ) তাকে কোন বস্তু থেকে সৃষ্টি করেছেন? ‘নুতফা’ (শুক্রবিন্দু) থেকে তিনি (আল্লাহ) তাকে সৃষ্টি করেছেন। (আবাসা, ৮০ : ১৭-১৯)
এই আয়াতগুলো আমাদেরকে মানুষের প্রাথমিক উপাদান সম্পর্কে তথ্যের যোগান দেয় যে, ‘নুতফা’ই হল একটি নবজাত শিশু সৃষ্টির মূল উপাদান। আরবি শব্দ ‘নুতফা’-এর অর্থ হল, একটি ফোঁটা কিংবা অল্প পরিমাণ তরল। বর্তমানে এই বিষয়টি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত যে, ‘নুতফা’ হল পুরুষের শুক্রাণু ও মহিলার ডিম্বাণুর সমন্বয়ে গঠিত স্বল্প পরিমাণ তরল এবং এই তরলটিই নবগঠিত মানবদেহের মূল উপাদান।