📄 মু’জিজা : ৬৫: মানুষের উৎস
সে (মানুষ) কি মায়ের গর্ভে বীর্যের শুক্রবিন্দু ছিল না, যা স্খলিত হয়? (কিয়ামাহ, ৭৫ : ৩৭)
বহু বছর পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস ছিল, রজঃস্রাবের রক্তই হল মানব জীবনের উৎস। এমনকি মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কারের পরও অনেক বিজ্ঞানীর মধ্যে এই ধারণা প্রবল ছিল। তাদের বিশ্বাস ছিল, রজঃস্রাবের রক্তে পূর্ণ গঠিত ভ্রূণ বিদ্যমান রয়েছে এবং একটি শিশুর জন্মের ক্ষেত্রে পুরুষের বীর্যের এছাড়া কোনো ভূমিকা নেই যে, তা রজঃস্রাবের রক্তকে গাঢ় হতে সহযোগিতা করে। কুরআন মাজিদ এই আয়াতে পূর্বের বিজ্ঞানীদের বিশ্বাসের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে। পাশাপাশি তা মানুষের উৎস সম্পর্কে এই মর্মে যথার্থ ও সঠিক তথ্য প্রদান করে যে, মানুষের সৃষ্টি হয় শুক্র বিন্দু থেকে।
📄 মু’জিজা : ৬৬: গর্ভধারণের ক্ষেত্রে পুরুষ ও মহিলার ভূমিকা
হে মানুষ, আমি (আল্লাহ) তোমাদেরকে এক নারী ও এক পুরুষ থেকে সৃষ্টি করেছি। (হুজুরাত, ৪৯ : ১৩)
আর তিনি (আল্লাহ) আর তিনিই যুগল সৃষ্টি করেন- পুরুষ ও নারী। (মিশ্রিত) শুক্রবিন্দু থেকে যখন তা নিক্ষিপ্ত হয়। (নাজম, ৫৩ : ৪৫-৪৬)
পূর্বকার একদল বিজ্ঞানীর বিশ্বাস ছিল, পুরুষের নিঃসৃত বীর্য কিংবা স্ত্রীদের রজঃস্রাব একটি নবজাত শিশুর ভ্রূণ গঠনের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে না। তাদের ধারণা ছিল, পুরুষের বীর্যে একটি পূর্ণ আকৃতির মানুষের অস্তিত্ব বিদ্যমান রয়েছে এবং মানুষের বিকাশ তার একটি সাধারণ মৌলিক আকৃতি বড় হওয়া থেকে অধিক নয়, যা গর্ভধারণের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রাক্কালে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়। অন্যরা- যেমনটি পূর্বে উল্লিখিত হয়েছে- বিশ্বাস করতেন, একটি নবজাত শিশুর গঠনে কেবল মহিলারই ভূমিকা রয়েছে এবং পুরুষের বীর্য তার বিকাশের ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা পালন করে না। বিজ্ঞানী লিউয়েন হুক ১৭৭৩ সালে সাধারণ অনুবীক্ষণ যন্ত্র আবিষ্কার করেন। ১৭৭৫ সালে বিজ্ঞানী স্প্যালানজানি (Spallanzani) প্রমাণ করেন, পুরুষের শুক্রাণু এবং মহিলার ডিম্বাণু উভয়টিই একটি নবজাত শিশুর গঠনে সমান ভূমিকা রাখে। বিস্ময়ের ব্যাপার হল, কুরআন মাজিদ এই তথ্যটি উল্লেখ করেছে বহু শতাব্দী পূর্বে।
📄 মু’জিজা : ৬৭: মানব ভ্রূণের পর্যায়সমূহ
তোমাদের কী হল, তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্বের পরোয়া করছ না? অথচ তিনি তোমাদেরকে নানা স্তরে সৃষ্টি করেছেন। (নূহ, ৭১ : ১৩-১৪)
তিনি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভে; এক সৃষ্টির (পর্যায়ের) পর আরেক সৃষ্টি (পর্যায়)। (যুমার, ৩৯ : ০৬)
একদা জানা ছিল, একজন মানুষ বিকশিত হয় পুরুষের শুক্রাণু ও নারীর ডিম্বাণু নিষিক্ত হওয়ার মাধ্যমে। কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিল, একটি সাধারণ জাইগোট কোষ বহুকোশে, সেখান থেকে বহু অঙ্গে এবং তা থেকে বহুতন্ত্র সম্বলিত একজন পরিপূর্ণ মানুষে রূপান্তরিত হওয়া প্রসঙ্গে। যদিও পূর্বেকার বিজ্ঞানীদের মধ্যে নবজাত শিশুর আদি উৎস সম্পর্কে মতের ভিন্নতা রয়েছে, তাদের এই সাধারণ বিশ্বাস ছিল যে, পুরুষের শুক্রাণু কিংবা মহিলার ডিম্বাণুতে একটি পূর্ণ আকৃতির মানুষ বিদ্যমান রয়েছে। অধিকন্তু তারা এই ধারণাও পোষণ করত যে, একটি মানব ভ্রূণের বৃদ্ধি কেবল তার মূল আকৃতির পরিমাণ বাড়ার এক অভিন্ন প্রক্রিয়া। অনেক বিজ্ঞানীর মধ্যে এই ধারণা প্রবল ছিল। পক্ষান্তরে, কুরআন মাজিদ সুস্পষ্টভাবে এই ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে, মানবভ্রূণ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় কিছু পরম্পরাগত পর্যায়ে, যা বর্তমানে ভ্রূণতত্ত্ববিদদের মাধ্যমে একটি পরিপূর্ণ প্রতিষ্ঠিত সত্যের মর্যাদা লাভ করেছে। উল্লেখ্য যে, ভ্রূণ বিকাশের এই পর্যায়ক্রমিক স্তরসমূহের ধারণা সর্বপ্রথম প্রদান করেন Wolf (উলফ) ১৭৫৯ সালে। যা হোক ১৯৪০ সাল পর্যন্ত মানব ভ্রূণ বিকাশের সুনির্দিষ্ট স্তরসমূহ নির্ধারিত হয় নি। কেবল সাম্প্রতিক সময়েই ভ্রূণবিজ্ঞানীগণ ভ্রূণ বিকাশের বিভিন্ন স্তর ও ধাপ নির্ণয় করেছেন। এটি কুরআন মাজিদের একটি সুস্পষ্ট মু’জিজা যে, ভ্রূণবিজ্ঞানীগণ ধারণা করারও বহশত বছর পূর্ব থেকে কুরআন মাজিদে এই তথ্য বিদ্যমান রয়েছে।
📄 মু’জিজা : ৬৮: তিনটি আবরণ দ্বারা ভ্রূণের আচ্ছাদন
তিনি (আল্লাহ) তোমাদেরকে সৃষ্টি করেন তোমাদের মাতৃগর্ভে; বিভিন্ন স্তরে একেপর এক, তিন অন্ধকারের (আবরনের) মধ্যে। তিনিই আল্লাহ, তোমাদের রব ও পালনকর্তা। (যুমার ৩৯ : ০৬)
পূর্বকার ভাষ্যকারগণ ‘অন্ধকারের তিন আচ্ছাদন’-এর ব্যাখ্যা করেছেন— উদরের বেষ্টনী, জরায়ুর দেয়াল ও ভ্রূণের চারপাশে বেষ্টিত ঝিল্লি।
ভ্রূণবিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, এই তিনটি স্তরের প্রত্যেকটি পরবর্তীতে তিনটি পৃথক পৃথক স্তর গঠন করে। উদরের আচ্ছাদন তিনটি স্তর দ্বারা গঠিত : বহিঃস্থ তির্যক মাংসপেশীর আস্তরন, অভ্যন্তরীণ তির্যক মাংসপেশীর আস্তরন ও আড়াআড়ি মাংসপেশীসমূহ। অনুরূপভাবে জরায়ুর দেয়াল তিনটি স্তর দ্বারা গঠিত : Epimetrium, Myometrium ও Endometrium। Myometriumও পরবর্তীতে তিনস্তরের মাংসপেশী দ্বারা গঠিত হয় : Longitudinal স্তর, আটটি মাংসপেশী समेत তারপরবর্তী একটি Interwoven স্তর, অতঃপর একটি বৃত্তাকার মাংসপেশীর স্তর। অধিকন্তু যে কোষ ভ্রূণকে বেষ্টন করে থাকে তাও তিন স্তরে গঠিত। যথা : Amnion, Chorion ও Decidion।
ভ্রূণবিজ্ঞানের কোনো কোনো বইতে বলা হয়েছে, ভ্রূণ চারটি ঝিল্লি দ্বারা পরিবেষ্টিত। তারা Yolk cell ঝিল্লিকে ভ্রূণের চতুর্থ স্তর বলে গণ্য করেন। যা হোক, Yolk cell ঝিল্লির পুষ্টিসংক্রান্ত কোনো কাজ নেই এবং অবশেষে তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। ভ্রূণের চারপাশে অবশেষে তিনটি ঝিল্লিই অবশিষ্ট থাকে। সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টিজীবের রিযিকদাতা আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কার কাছে মানবভ্রূণ বেষ্টিত আস্তরণের মত এমন জটিল ও সূক্ষ্ম বিষয়ের জ্ঞান থাকতে পারে?