📄 মু’জিজা : ৬১ : লিঙ্গ নির্ধারণে পুরুষের ভূমিকা
আর তিনিই (আল্লাহ) সৃষ্টি করেন- পুরুষ ও নারী। শুক্রবিন্দু থেকে যখন তা নিক্ষিপ্ত হয়। (নাজম, ৫৩ : ৪৫-৪৬)
অতঃপর তিনি (আল্লাহ) তা থেকে সৃষ্টি করেন উভয় লিঙ্গ, পুরুষ ও নারী। তিনি (আল্লাহ) কি মৃতদের জীবিত করতে সক্ষম নন? (কিয়ামাহ, ৭৫ : ৩৯-৪০)
এই আয়াতগুলো সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে যে, নবজাত শিশুর লিঙ্গ নির্ধারিত হয় পুরুষের মাধ্যমে। এটি সাধারণ জ্ঞাত বিষয় যে, শুক্রবিন্দু হল সেই তরল পদার্থ যা যৌনক্রিয়ার সময় পুরুষ থেকে দ্রুতবেগে নির্গত হয়। কিন্তু মহিলাদের ক্ষেত্রে এমন প্রকৃতির বীর্যপাত হয় না। পুরুষের শুক্রাণু X কিংবা Yক্রোমোজম বহন করে। পক্ষান্তরে মহিলাদের ডিম্বাণু দু’টি অভিন্ন XX ক্রোমোজম বহন করে। যদি পুরুষের শুক্রাণুর X ক্রোমোজমের সঙ্গে মহিলা X ক্রোমোজমের মিলন ঘটে তবে তা একজোড়া ‘XX’ক্রোমোজম গঠন করে, যা পরিণতিতে একটি মেয়ে শিশুর আকৃতি তৈরি করে। পক্ষান্তরে যদি পুরুষের শুক্রাণুর Yক্রোমোজমের সঙ্গে মহিলার ডিম্বাণুর X ক্রোমোজমের মিলন ঘটে তবে তা একজোড়া XY ক্রোমোজমের আকৃতি তৈরি করে। অবশেষে যা একটি পুরুষ শিশুর আকৃতি তৈরি কর। অতএব নবজাত শিশুর লিঙ্গ সর্বদা পুরুষের শুক্রাণু দ্বারা নির্ধারিত হয়। কুরআন মাজিদ এই বিষয়টিকে সবেগে নির্গত পানি (Ejaculation) কথার দ্বারা ব্যক্ত করেছে, যা কেবল পুরুষের ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে।
📄 মু’জিজা : ৬২: শ্রবণেন্দ্রিয়ের রহস্য
বল, আসমান ও জমিন থেকে কে তোমাদের রিযক দেন? অথবা কে তোমাদের শ্রবণ ও দৃষ্টিসমূহের মালিক? (ইউনুস, ১০ : ৩১)
আর যে বিষয় তোমার জানা নাই তাঁর অনুসরণ কর না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তকরণ এদের প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে। (ইসরা, ১৭ : ৩৬)
আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিশ্র শুক্রবিন্দু থেকে, আমি তাকে পরীক্ষা করব, ফলে আমি তাকে বানিয়েছি শ্রবণ ও দৃষ্টি শক্তিসম্পন্ন। (ইনসান, ৭৬ : ০২)
উল্লেখ্য যে, এসব আয়াত ও অন্যান্য আয়াতে যেখানেই কুরআন মাজিদে শ্রবণ, দর্শন ও অন্তকরণের উল্লেখ উল্লেখ হয়েছে, শ্রবণেন্দ্রিয়কে অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি একটি জ্ঞাত বিষয় যে, মানুষের জ্ঞান অর্জনের বিষয়টি অন্যান্য অঙ্গের তুলনায় শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। একজন শিশু অন্ধ হয়ে জন্ম নিলে তাকে অনেক বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু অল্প আয়াসেই সে বিভিন্ন বিষয়ে জানতে পারে। পক্ষান্তরে, যে শিশু বধির হয়ে জন্ম নেয়, যে কোনো বস্তু সম্পর্কে জানতে তাঁর অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। কুরআন মাজিদ এভাবে অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের ওপর শ্রবণেন্দ্রিয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। অধিকন্তু আরও উল্লেখ থাকে যে, ভ্রূণে শ্রবণেন্দ্রিয় বিকশিত হয় গর্ভধারণের কেবল বাইশদিনের মধ্যেই এবং গর্ভধারণের চতুর্থ মাসে তা পুরোপুরি কাজ করতে শুরু করে। তখন ভ্রূণ মায়ের পাকস্থলীর গুড়গুড় শব্দ শুনতে পায় এবং সে শব্দও শুনতে পায় যা সে (মা) আহার ও পান করার সময় সৃষ্টি করে। এমন কি মায়ের চারপাশের শব্দও ভ্রূণটি শুনতে পায়। এভাবে শ্রবণেন্দ্রিয় বিকশিত হয় এবং জীবনের অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের অনেক আগেই একজন নবজাতকের মধ্যে তা কাজ করতে শুরু করে। কুরআন মাজিদ মানুষের অন্যান্য অঙ্গের পূর্বে শ্রবণেন্দ্রিয়ের কথা উল্লেখ করার পেছনে এটিকে একটি কারণ বলা যেতে পারে। রাসুলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুন্নাতও এই বিষয়টিকে সমর্থন করে। তাঁর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুন্নত আমাদেরকে শিক্ষা দেয়, যখনই কোনো নতুন শিশু জন্মগ্রহণ করে আমরা যেন তাঁর উভয় কানে আযান ও ইকামাতের বাক্যগুলি বলে শুনাই।
এটি অত্যন্ত লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, কুরআন মাজিদ শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের ক্ষেত্রে সর্বদা এক বচনের শব্দ (সামআ) ব্যবহার করেছে, পক্ষান্তরে দর্শন ইন্দ্রিয়ের জন্য বহুবচনের শব্দ (বাসারা) ব্যবহার করেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রেইনে যে ভিজ্যুয়েল সেন্টার (দর্শন কেন্দ্র) রয়েছে যাকে Occipital lobe বলা হয়, তা দুইটি সমজাতীয় অংশে বিভক্ত। পক্ষান্তরে, হিয়ারিং সেন্টার (শ্রবণ কেন্দ্র) হচ্ছে একটি। কুরআন মাজিদের এ ধরনের সুনির্দিষ্ট শব্দ চয়ন তাঁর অন্য একটি মু’জিজা।
📄 মু’জিজা : ৬৩: মানব অঙ্গ বিকাশের ক্রমধারা
আপনি বলুন, (হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তোমরা আমাকে বলত দেখি, যদি আল্লাহ তোমাদের শ্রবণ ও দৃষ্টিসমূহ কেড়ে নেন এবং তোমাদের অন্তরসমূহে মোহর এঁটে দেন, কে আছে ইলাহ, আল্লাহ ছাড়া, যে তোমাদের এগুলো নিয়ে আসবে? দেখ আমি কিভাবে বিভিন্নরূপে নিদর্শনসমূহ বর্ণনা করি, তারপরও তারা এড়িয়ে চলে। (আনআম, ০৬ : ৪৬)
আর আল্লাহ তোমাদেরকে বের করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে এমতাবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন শ্রবণশক্তি, চক্ষু ও অন্তর। যাতে তোমরা শুকরিয়া আদায় কর। (নাহল, ১৬ : ৭৮)
আর তিনিই তোমাদের জন্য কান, চোখসমূহ ও অন্তরসমূহ সৃষ্টি করেছেন; তোমরা কমই (আল্লাহর) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। (মুমিনূন, ২৩ : ৭৮)
এই আয়াতগুলি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কথা বলে, যা আল্লাহ তাআলা মানব জাতিকে প্রদান করেছেন। উল্লেখ্য যে, কুরআন মাজিদ এসব অঙ্গ বর্ণনার ক্ষেত্রে সর্বদা একটি ক্রমধারা অনুসরণ করে। প্রথমে তা শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের কথা বলে, অতঃপর দর্শন ইন্দ্রিয়, তারপর অনুভূতি ও বোধশক্তি। একজন সাধারণ পাঠকের দৃষ্টিতে তাতে কোনো তাৎপর্য ধরা নাও পড়তে পারে। একজন ভ্রূণতত্ত্ববিদ ড. কিথ মুর এই ক্রমধারাটি লক্ষ্য করেন। ইসলামিক মেডিকেল এসোসিয়েশনের সাময়িকীতে একটি প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, ভ্রূণগত বিকাশের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম শ্রবণেন্দ্রিয়ের অভ্যন্তরীণ Primordia (প্রাথমিক উপাদান) দৃষ্টিগোচর হয়, তারপর দর্শন ইন্দ্রিয়ের Primordia অতঃপর ব্রেইনের Primordia, অনুভূতি ও বোধশক্তির কেন্দ্র। সকল প্রশংসা সেই আল্লাহ তাআলার জন্য যিনি আমাদেরকে এমন শাশ্বত ও চিরন্তন জ্ঞান ও বিস্ময়কর গ্রন্থ দান করেছেন।
📄 মু’জিজা : ৬৪: মিথ্যা বলার সঙ্গে কপালের সম্পর্ক
কখনো নয়, যদি সে বিরত না হয়, তবে আমি তাকে নাসিয়া (কপালের সম্মুখভাগের চুল) ধরে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাব, মিথ্যাবাদী, পাপিষ্ঠ কপাল। (আলাক, ৯৬ : ১৫-১৬)
এই আয়াতগুলিতে মক্কায় মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ঘোর শত্রু আবু জেহেলের কথা বলা হয়েছে। কুরআন মাজিদ বলে, সে মিথ্যা বলত এবং তাকে এমর্মে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে যে, তাকে ‘নাসিয়া’ ধরে নিয়ে যাওয়া হবে, যার অর্থ হল কপাল। চলুন আমরা মিথ্যা ও কপালের মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে বের করার চেষ্টা করি।
মানুষের মাথার খুলির সম্মুখভাগ Cerebrum (মস্তিষ্কের যে ভাগ স্বেচ্ছাচালিত পেশীর আন্দোলন নিয়ন্ত্রণ করে)- এর সম্মুখপূর্ব অংশ নিয়ে গঠিত। ব্যবচ্ছেদ বিদ্যা বিশারদ ও শরীয়তত্ত্ববিদগণ বলেন, পরিকল্পনার প্ররোচনা ও দূরদৃষ্টি এবং প্রাথমিক আলোড়নের ঘটনা সংঘটিত হয় সম্মুখপূর্ব Cerebrum-এর সম্মুখস্থ (উপরের অংশের) লবের পেছনের অংশে। ডা. শিলি রড তাঁর Essentials of Anatomy and Physiology (Mosby Year book inc,p,112.st Louis 1966) নামক গ্রন্থে লিখেন, পরিকল্পনার প্ররোচনা ও দৃরদৃষ্টি এবং প্রাথমিক গতি সঞ্চারিত হয় সম্মুখস্থ লবের পেছনের অংশে, সম্মুখপূর্ব অংশে। প্ররোচনার ক্ষেত্রে জড়িত থাকার কারণে সম্মুখপূর্ব অংশকে আগ্রাসনের কার্যকরী কেন্দ্র বলেও বিবেচনা করা হয়।
এ থেকে প্রতীয়মান হয়, যখন একজন লোক সত্যকে প্রত্যাখ্যান করে তখন কপালকে মিথ্যাবাদী ও পাপিষ্ঠ বলে আখ্যায়িত করা অধিক উপযুক্ত। কুরআন মাজিদ এটিকে নির্দেশ করে মিথ্যাবাদী, পাপিষ্ঠ ‘নাসিয়া’ বলে। প্রফেসর কিথ মুর-এর মতে, বিজ্ঞানীরা কেবল বিগত ষাট বছরেই এ বিষয়টি আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছে। অথচ আল্লাহ তাআলা কুরআন মাজিদে এই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন শত শত বছর পূর্বে।
এ অধ্যায়ে বর্ণিত মু’জিজাসমূহ এ কথার আরও অধিক সাক্ষ্য বহন করে যে, কুরআন মাজিদ সর্বজ্ঞাতা সৃষ্টিকর্তা, বিশ্ববাসী ও মানব জাতির রিযিকদাতা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ আসমানি গ্রন্থ। না মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আর না সে যুগের মানুষের এই জ্ঞান কিংবা এমন সুযোগ ছিল যে, তারা কুরআন মাজিদে বর্ণিত মানব জীববিজ্ঞান সংক্রান্ত জ্ঞান লাভ করবে। বস্তুত কুরআন মাজিদে মানব জীব বিজ্ঞান সংক্রান্ত যে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান রয়েছে তা মানুষ কেবল সম্প্রতি আবিষ্কার করেছে। এভাবে এটি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি জীবন্ত মু’জিজা যে, তাআলা আল্লাহ তাঁর মাধ্যমে এমন একটি গ্রন্থ, কুরআন মাজিদ মানব জাতিকে দান করেছেন। যাতে মানবিক এমন সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিষয় যেমন, অধিক উচ্চতার শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হওয়া, আঙ্গুলের ছাপের বিশেষত্ব, চামড়ায় সংবেদনশীল স্নায়ুর উপস্থিতি, পাকস্থলীতে সংবেদনশীল স্নায়ুর অনুপস্থিতি, মানববীর্যের গঠন, পুরুষ কর্তৃক লিঙ্গ নির্ধারণ এবং শ্রবণেন্দ্রিয়ের বিশেষত্ব ইত্যাদির বর্ণনা রয়েছে। বিবেক ও চিন্তাশীল ব্যক্তিমাত্রেই কুরআন মাজিদকে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ নির্দেশনা গ্রন্থ বলে স্বীকার করবে, গ্রহণ করবে এবং এর আদেশের সামনে মাথা নত করবে।
‘আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদেরকে মাটি থেকে সৃষ্টি করেছেন, তারপর তোমরা মানুষ হয়ে এখানে-সেখানে ছড়িয়ে পড়েছ। আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মাঝে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে সে, কওমের জন্য যারা চিন্তা করে। আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও তোমাদের বর্ণের ভিন্নতা। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে জ্ঞানীদের জন্য। আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে রাতে ও দিনে তোমাদের নিদ্রা ও তাঁর অনুগ্রহ থেকে তোমাদের (জীবিকা) অন্বেষণ। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা শোনে। আর তাঁর নিদর্শনাবলির মধ্যে রয়েছে, তিনি তোমাদেরকে ভয় ও ভরসা স্বরূপ বিদ্যুৎ দেখান, আর আসমান থেকে পানি বর্ষণ করেন। অতঃপর তা দ্বারা জমিনকে তার মৃত্যুর পর পুনর্জীবিত করেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলি রয়েছে সে কওমের জন্য যারা অনুধাবন করে। (রূম, ৩০ : ২০-২৪)