📄 মু’জিজা : ৬০: মানব অণ্ডকোষ গঠনের স্থান
অতএব মানুষের চিন্তা করে দেখা উচিত, তাকে কী থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে? তাকে সৃষ্টি করা হয়েছে দ্রুতবেগে নির্গত পানি থেকে। যা বের হয় মেরুদণ্ড ও বুকের হাড়ের মধ্য থেকে। নিশ্চয় তিনি (আল্লাহ) তাকে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। যেদিন গোপন বিষয় প্রকাশ করা হবে। (তারিক, ৮৬ : ০৫-০৯)
কুরআন মাজিদের পূর্বেকার ভাষ্যকারগণ এসব আয়াতের বিষয়বস্তু পূর্ণরূপে অনুধাবন করতে পারেন নি। এখন এটি ভালভাবে জ্ঞাত যে, gonad বা প্রজননগ্রন্থি সেখানেই প্রকাশ পায় যেখানে Loins (কোমরের সর্বনিম্নাংশ) পূর্ণতা প্রাপ্ত হয়।
এটি এখন ভালভাবে জ্ঞাত যে, ভ্রূণ বেড়ে ওঠার সময় যেখানে কোমর (Loins) তৈরি হয় সেখানেই প্রজননগ্রন্থি (gonads) তৈরি হয়। ভ্রূণের মধ্যে Genital ridges নামক অংশটি চার সপ্তাহ বয়সে (ভ্রূণের) মধ্য লাইনের দুইদিকে Mesonephros ও dorsal mesentery-এর মাঝখানে তৈরি হয়। সপ্তম কিংবা অষ্টম সপ্তাহে প্রজননগ্রন্থি স্ত্রী কিংবা পুংলিঙ্গে বিভক্ত হয়। প্রজননগ্রন্থি তখন ক্রমাগত নিচের দিকে নামতে থাকে। স্ত্রী প্রজননগ্রন্থি তথা ovaries (ডিম্বাশয়) কোমরের ভেতরেই থেমে যায়। পক্ষান্তরে পুং প্রজননগ্রন্থি আগ পর্যন্ত আরও নিচের দিকে নামতে থাকে; অবশেষে তা Inguinal canal দিয়ে শরীরের বাইরে এসে অন্ড থলিতে প্রবেশ করে। যা হোক, মূত্র উৎপাদন পদ্ধতি, রক্ত সঞ্চালন পদ্ধতি, লসিক নিঃস্বরণ পদ্ধতি, এমনকি যা পূর্ণ বয়স্ক মানুষের শরীরে বিদ্যমান থাকে কুরআন মাজিদে উল্লিখিত দু’টি স্থান (মেরুদণ্ড ও পাঁজর)-কে সংযুক্ত করে। অধিকন্তু, অণ্ডকোষের রক্তনালী (ধমনি) abdominal orta নামক পেটের ভেতরের সর্ববৃহৎ রক্তনালী, যা দ্বিতীয় lumber vertebra এর সমান্তরালে অবস্থিত থেকে উৎপন্ন হয়। আবার ডানদিকের দূষিত রক্তগুলো শিরা দিয়ে পেটের অন্তঃস্থ বৃহৎ শিরা-‘interior vena cava’য় গিয়ে পতিত হয়। অন্যদিকে বাম দিকের অণ্ডকোষ থেকে দূষিত রক্তগুলো বাম পাশের কিডনি হয়ে পূর্বে উল্লিখিত শিরায় গিয়ে পতিত হয়। উপরোক্ত স্থানগুলো কুরআন মাজিদে উল্লিখিত স্থান নির্দেশ করে। ভ্রূণ বিজ্ঞানীরা সাম্প্রতিককালে এই সূক্ষ্ম উপাত্তগুলো আবিষ্কার করেছেন, যেগুলো হাজার বছর আগে কুরআন মাজিদে উল্লিখিত হয়েছে। (শেষ প্যারাটি অনুবাদে সাহায্য করেছেন ডা. আবুল মঞ্জুর (রাসেল) এমবিবিএস, এফআরসিএস (প্রশিক্ষণরত) মিডফোর্ট, ঢাকা)
📄 মু’জিজা : ৬১ : লিঙ্গ নির্ধারণে পুরুষের ভূমিকা
আর তিনিই (আল্লাহ) সৃষ্টি করেন- পুরুষ ও নারী। শুক্রবিন্দু থেকে যখন তা নিক্ষিপ্ত হয়। (নাজম, ৫৩ : ৪৫-৪৬)
অতঃপর তিনি (আল্লাহ) তা থেকে সৃষ্টি করেন উভয় লিঙ্গ, পুরুষ ও নারী। তিনি (আল্লাহ) কি মৃতদের জীবিত করতে সক্ষম নন? (কিয়ামাহ, ৭৫ : ৩৯-৪০)
এই আয়াতগুলো সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে যে, নবজাত শিশুর লিঙ্গ নির্ধারিত হয় পুরুষের মাধ্যমে। এটি সাধারণ জ্ঞাত বিষয় যে, শুক্রবিন্দু হল সেই তরল পদার্থ যা যৌনক্রিয়ার সময় পুরুষ থেকে দ্রুতবেগে নির্গত হয়। কিন্তু মহিলাদের ক্ষেত্রে এমন প্রকৃতির বীর্যপাত হয় না। পুরুষের শুক্রাণু X কিংবা Yক্রোমোজম বহন করে। পক্ষান্তরে মহিলাদের ডিম্বাণু দু’টি অভিন্ন XX ক্রোমোজম বহন করে। যদি পুরুষের শুক্রাণুর X ক্রোমোজমের সঙ্গে মহিলা X ক্রোমোজমের মিলন ঘটে তবে তা একজোড়া ‘XX’ক্রোমোজম গঠন করে, যা পরিণতিতে একটি মেয়ে শিশুর আকৃতি তৈরি করে। পক্ষান্তরে যদি পুরুষের শুক্রাণুর Yক্রোমোজমের সঙ্গে মহিলার ডিম্বাণুর X ক্রোমোজমের মিলন ঘটে তবে তা একজোড়া XY ক্রোমোজমের আকৃতি তৈরি করে। অবশেষে যা একটি পুরুষ শিশুর আকৃতি তৈরি কর। অতএব নবজাত শিশুর লিঙ্গ সর্বদা পুরুষের শুক্রাণু দ্বারা নির্ধারিত হয়। কুরআন মাজিদ এই বিষয়টিকে সবেগে নির্গত পানি (Ejaculation) কথার দ্বারা ব্যক্ত করেছে, যা কেবল পুরুষের ক্ষেত্রেই ঘটে থাকে।
📄 মু’জিজা : ৬২: শ্রবণেন্দ্রিয়ের রহস্য
বল, আসমান ও জমিন থেকে কে তোমাদের রিযক দেন? অথবা কে তোমাদের শ্রবণ ও দৃষ্টিসমূহের মালিক? (ইউনুস, ১০ : ৩১)
আর যে বিষয় তোমার জানা নাই তাঁর অনুসরণ কর না। নিশ্চয় কান, চোখ ও অন্তকরণ এদের প্রতিটির ব্যাপারে সে জিজ্ঞাসিত হবে। (ইসরা, ১৭ : ৩৬)
আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি মিশ্র শুক্রবিন্দু থেকে, আমি তাকে পরীক্ষা করব, ফলে আমি তাকে বানিয়েছি শ্রবণ ও দৃষ্টি শক্তিসম্পন্ন। (ইনসান, ৭৬ : ০২)
উল্লেখ্য যে, এসব আয়াত ও অন্যান্য আয়াতে যেখানেই কুরআন মাজিদে শ্রবণ, দর্শন ও অন্তকরণের উল্লেখ উল্লেখ হয়েছে, শ্রবণেন্দ্রিয়কে অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি একটি জ্ঞাত বিষয় যে, মানুষের জ্ঞান অর্জনের বিষয়টি অন্যান্য অঙ্গের তুলনায় শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের ওপর বহুলাংশে নির্ভরশীল। একজন শিশু অন্ধ হয়ে জন্ম নিলে তাকে অনেক বিপত্তির সম্মুখীন হতে হয়। কিন্তু অল্প আয়াসেই সে বিভিন্ন বিষয়ে জানতে পারে। পক্ষান্তরে, যে শিশু বধির হয়ে জন্ম নেয়, যে কোনো বস্তু সম্পর্কে জানতে তাঁর অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। কুরআন মাজিদ এভাবে অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের ওপর শ্রবণেন্দ্রিয়ের গুরুত্ব তুলে ধরেছে। অধিকন্তু আরও উল্লেখ থাকে যে, ভ্রূণে শ্রবণেন্দ্রিয় বিকশিত হয় গর্ভধারণের কেবল বাইশদিনের মধ্যেই এবং গর্ভধারণের চতুর্থ মাসে তা পুরোপুরি কাজ করতে শুরু করে। তখন ভ্রূণ মায়ের পাকস্থলীর গুড়গুড় শব্দ শুনতে পায় এবং সে শব্দও শুনতে পায় যা সে (মা) আহার ও পান করার সময় সৃষ্টি করে। এমন কি মায়ের চারপাশের শব্দও ভ্রূণটি শুনতে পায়। এভাবে শ্রবণেন্দ্রিয় বিকশিত হয় এবং জীবনের অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের অনেক আগেই একজন নবজাতকের মধ্যে তা কাজ করতে শুরু করে। কুরআন মাজিদ মানুষের অন্যান্য অঙ্গের পূর্বে শ্রবণেন্দ্রিয়ের কথা উল্লেখ করার পেছনে এটিকে একটি কারণ বলা যেতে পারে। রাসুলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুন্নাতও এই বিষয়টিকে সমর্থন করে। তাঁর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সুন্নত আমাদেরকে শিক্ষা দেয়, যখনই কোনো নতুন শিশু জন্মগ্রহণ করে আমরা যেন তাঁর উভয় কানে আযান ও ইকামাতের বাক্যগুলি বলে শুনাই।
এটি অত্যন্ত লক্ষ্যণীয় বিষয় যে, কুরআন মাজিদ শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের ক্ষেত্রে সর্বদা এক বচনের শব্দ (সামআ) ব্যবহার করেছে, পক্ষান্তরে দর্শন ইন্দ্রিয়ের জন্য বহুবচনের শব্দ (বাসারা) ব্যবহার করেছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রেইনে যে ভিজ্যুয়েল সেন্টার (দর্শন কেন্দ্র) রয়েছে যাকে Occipital lobe বলা হয়, তা দুইটি সমজাতীয় অংশে বিভক্ত। পক্ষান্তরে, হিয়ারিং সেন্টার (শ্রবণ কেন্দ্র) হচ্ছে একটি। কুরআন মাজিদের এ ধরনের সুনির্দিষ্ট শব্দ চয়ন তাঁর অন্য একটি মু’জিজা।
📄 মু’জিজা : ৬৩: মানব অঙ্গ বিকাশের ক্রমধারা
আপনি বলুন, (হে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তোমরা আমাকে বলত দেখি, যদি আল্লাহ তোমাদের শ্রবণ ও দৃষ্টিসমূহ কেড়ে নেন এবং তোমাদের অন্তরসমূহে মোহর এঁটে দেন, কে আছে ইলাহ, আল্লাহ ছাড়া, যে তোমাদের এগুলো নিয়ে আসবে? দেখ আমি কিভাবে বিভিন্নরূপে নিদর্শনসমূহ বর্ণনা করি, তারপরও তারা এড়িয়ে চলে। (আনআম, ০৬ : ৪৬)
আর আল্লাহ তোমাদেরকে বের করেছেন তোমাদের মাতৃগর্ভ থেকে এমতাবস্থায় যে, তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন শ্রবণশক্তি, চক্ষু ও অন্তর। যাতে তোমরা শুকরিয়া আদায় কর। (নাহল, ১৬ : ৭৮)
আর তিনিই তোমাদের জন্য কান, চোখসমূহ ও অন্তরসমূহ সৃষ্টি করেছেন; তোমরা কমই (আল্লাহর) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। (মুমিনূন, ২৩ : ৭৮)
এই আয়াতগুলি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কথা বলে, যা আল্লাহ তাআলা মানব জাতিকে প্রদান করেছেন। উল্লেখ্য যে, কুরআন মাজিদ এসব অঙ্গ বর্ণনার ক্ষেত্রে সর্বদা একটি ক্রমধারা অনুসরণ করে। প্রথমে তা শ্রবণ ইন্দ্রিয়ের কথা বলে, অতঃপর দর্শন ইন্দ্রিয়, তারপর অনুভূতি ও বোধশক্তি। একজন সাধারণ পাঠকের দৃষ্টিতে তাতে কোনো তাৎপর্য ধরা নাও পড়তে পারে। একজন ভ্রূণতত্ত্ববিদ ড. কিথ মুর এই ক্রমধারাটি লক্ষ্য করেন। ইসলামিক মেডিকেল এসোসিয়েশনের সাময়িকীতে একটি প্রবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন, ভ্রূণগত বিকাশের ক্ষেত্রে সর্বপ্রথম শ্রবণেন্দ্রিয়ের অভ্যন্তরীণ Primordia (প্রাথমিক উপাদান) দৃষ্টিগোচর হয়, তারপর দর্শন ইন্দ্রিয়ের Primordia অতঃপর ব্রেইনের Primordia, অনুভূতি ও বোধশক্তির কেন্দ্র। সকল প্রশংসা সেই আল্লাহ তাআলার জন্য যিনি আমাদেরকে এমন শাশ্বত ও চিরন্তন জ্ঞান ও বিস্ময়কর গ্রন্থ দান করেছেন।