📄 মু’জিজা নং- ৫৬: আঙ্গুল ছাফের বিশেষত্ব
মানুষ কি মনে করে যে, আমি (আল্লাহ) তাঁর অস্থিসমূহ একত্রিত করব না? কেবল এই নয়, আমি তাঁর আঙ্গুলের ডগা (আঙ্গুলের ছাপ) পর্যন্ত সন্নিবেশিত করতে সক্ষম। (কিয়ামা, ০৩ : ০৪)
১৮৮০ সালে ইংল্যান্ডে স্যার ফ্রান্সিস গোল্ট আবিষ্কার করেন, পৃথিবীতে এমন কোনো ব্যক্তি পাওয়া যাবে না যার আঙ্গুলের ছাপ অন্য কোনো ব্যক্তির সাথে হুবহু মিলে যাবে। তখন থেকেই দুষ্কৃতকারীদের শনাক্ত করার ক্ষেত্রে আঙ্গুলের ছাপ বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া হিসেবে সমাদৃত হয়ে আসছে। এ-কারণেই বিভিন্ন দেশ যেমন, রাশিয়া তাঁর দেশের সকল নাগরিকের আঙ্গুলের ছাপ সংরক্ষণ করে থাকে। দুই ব্যক্তির আঙ্গুলের ছাপের পার্থক্য এতই আপেক্ষিক ও সূক্ষ্ম যে, কেবল অভিজ্ঞ ব্যক্তিই উপযুক্ত যন্ত্রপাতির মাধ্যমে তা শনাক্ত করতে পারে। এটি কুরআন মাজিদের অপর এক মু’জিজা যে তা এই বাস্তবতার বর্ণনা দিয়েছে মানুষ তা ধারণা করারও বহু আগে।
📄 মু’জিজা-৫৭: চামড়ায় সংবেদনশীল স্নায়ুকোষের অস্তিত্ব
এতে সন্দেহ নেই যে, আমার নিদর্শনসমূহের প্রতি যেসব লোক অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করবে আমি তাদেরকে আগুনে নিক্ষেপ করব। তাদের চামড়াগুলো যখন জ্বলে পুড়ে যাবে, তখন আবার আমি তা পাল্টে দেব অন্য চামড়া দিয়ে, যাতে তারা আজাব আস্বাদন করতে থাকে। নিশ্চয় আল্লাহ মহা পরাক্রমশালী, হেকমতের অধিকারী। (নিসা, ০৪ : ৫৬)
এই আয়াত বলে, আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের অধিবাসীদের চামড়া পাল্টে দেবেন যেন তারা বারবার আগুনের শাস্তি আস্বাদন করতে পারে। আর এ থেকে বুঝা যায়, শাস্তি আস্বাদন ও অনুভব চামড়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। মানব শরীর বিশ্লেষকরা সম্প্রতি দেখিয়েছেন, ব্যথার অনুভূতি গ্রাহক (স্নায়ু) চামড়ার সঙ্গেই সন্নিবেশিত। ফলে আংশিক চামড়া পুড়ে যাওয়া বেশি যন্ত্রণাদায়ক হয়ে থাকে, যেহেতু গভীর চামড়ার গ্রাহকসমূহ (স্নায়ুসমূহ) তখনো অক্ষত থাকে। পক্ষান্তরে সম্পূর্ণ চামড়া পুড়ে যাওয়াটা যন্ত্রণাহীন হয়ে থাকে। কেননা তা গ্রাহক স্নায়ুগুলোকেও ধ্বংস করে দেয়। এটি কুরআন মাজিদের একটি সমুজ্জ্বল মু’জিজা যে, তা চামড়া সংক্রান্ত এত সূক্ষ্ম শরীর তত্ত্বেরও বর্ণনা দেয়। যখন তা বলে, ‘তাদের চামড়াগুলো যখন জ্বলে পুড়ে যাবে, তখন আবার আমি তা পাল্টে দেব অন্য চামড়া দিয়ে, যাতে তারা আজাব আস্বাদন করতে থাকে।’
থাইল্যান্ড চিয়াংমাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শরীরতত্ত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ‘তাগাতাত তাজাসেন’ (Tagatat Tajasen) প্রথম দিকে একথা বিশ্বাস করতেন না যে, কুরআন মাজিদে এ বিষয়টি উল্লিখিত হয়েছে। পরবর্তীতে তিনি কুরআন মাজিদের এই আয়াতটি যাচাই করেন। তিনি কুরআন মাজিদের বৈজ্ঞানিক যথার্থতা দেখে এত বেশি প্রভাবিত হন যে, সৌদি আরবের রিয়াদে অনুষ্ঠিত অষ্টম মেডিকেল কনফারেন্সের একটি সাধারণ অধিবেশনে তিনি ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দেন।
📄 মু’জিজা-৫৮: সংবেদনশীল স্নায়ু ও অন্ত্র
খোদাভীরুদের যে জান্নাতের ওয়াদা দেওয়া হয়েছে তার দৃষ্টান্ত হল, তাতে আছে নির্মল পানির নহরসমূহ, দুধের নহরসমূহ, যার স্বাদ অপরিবর্তনীয়, পানকারীদের জন্য সুস্বাদু শরাবের নহর এবং পরিশোধিত মধুর নহর। তাতে তাদের জন্য আছে রকমারি ফলমূল ও তাদের পালনকর্তার ক্ষমা। পরহেজগাররা কি তাদের সমান, যারা জাহান্নামে অনন্তকাল থাকবে এবং যাদের পান করতে দেয়া হবে ফুটন্ত পানি, অতঃপর তা তাদের নাড়ি-ভুড়ি (ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে দেবে) কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলবে? (মুহাম্মদ, ৪৭ : ১৫)
অধ্যাপক কিথ মুর তাঁর পাঠ্য বই ‘The Developing Human’- এ এই আয়াতের ব্যাখ্যা দেন এভাবে, ‘অন্ত্র বা নাড়ি-ভুড়ি কর্তনের মাধ্যমে আজাব দেওয়াও আমাদের জ্ঞানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। কেননা অন্ত্রের মধ্যে কোনো সংবেদন বা অনুভূতি নেই। অন্ত্রে উত্তাপগ্রাহী স্নায়ু নেই। এভাবে তা কেবল ফুটন্ত পানিই নয় যা এই আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। এটাও জ্ঞাত বিষয় যে, যদি অন্ত্র ছিদ্র হয়ে যায়, তবে অন্ত্রস্থ পদার্থসমূহ উচ্চ সংবেদনশীল (Peritoneal) গহ্বরের ভেতর দিয়ে নির্গত হবে। তখন Peritoneal গহ্বরে বিদ্যমান দৈহিক স্নায়ুগুলো উদ্দীপিত হবে। এটি মানব শরীরে তীব্রতর ব্যথার অনুভূতি সঞ্চার করবে। এ কারণে কুরআন মাজিদ বলে, ফুটন্ত পানি তাদের অন্ত্র বিদীর্ণ করে দিবে। একথা বলাবাহুল্য যে, নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সময়কালে মানব-শরীর সম্পর্কে এমন সুনির্দিষ্ট জ্ঞান অর্জনে সক্ষম ছিলেন না।
📄 মু’জিজা-৫৯: রজঃস্রাব চক্র
আল্লাহ জানেন প্রত্যেক নারী যা বহন করে (গর্ভধারণ করে) এবং গর্ভাশয় কি পরিমাণ সংকুচিত ও সম্প্রসারিত হয়। এবং তাঁর কাছে প্রত্যেক বস্তুরই একটা পরিমাণ রয়েছে। (রা’দ, ১৩ : ০৮)
রজঃস্রাব হল, প্রতি মাসে একবার একজন মহিলা থেকে রক্ত ও টিস্যুর নির্গমন। কেবল একজন শরীরবিদ্যা বিশারদ কিংবা স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞই বলতে পারে, একজন মহিলার জরায়ুগ্রন্থিতে কী ঘটে থাকে। তারা সম্প্রতি আবিষ্কার করেছে, uterus undergoes এর endometrial স্তর প্রতি মাসচক্রে পরিবর্তিত হয়, যা রজঃস্রাব বা ঋতুচক্রের জন্য দায়ী। ঋতুচক্রের শুরুতে এর পুরুত্ব থাকে ০·৫ মিলিমিটার।
ডিম্বাশয়ে সংগুপ্ত হরমোনের প্রতিক্রিয়ার ফলে endometrial বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় এবং ৫-৬ মিলিমিটারের পুরুত্বে পৌঁছে যায়। যখন এটি তার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে যায় অথচ গর্ভ সঞ্চারিত না হয়, তখন basal layer ত্যাগ করতে পুরো endometrium ঝরে যায়। endometrium- এর পুরুত্বে সংকোচন ও সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া রজঃস্রাবের রক্তপাতের সঙ্গে সংঘটিত হয়। এটি হুবহু তা-ই যা কুরআন মাজিদে বর্ণিত আয়াতে ‘গর্ভাশয়ের সংকোচন ও সম্প্রসারণ’ করার মাধ্যমে বর্ণনা দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত আর কে কুরআন মাজিদে এমন বিস্ময়কর তথ্য সংস্থাপন করতে পারেন?