📄 মু’জিজা নং- ৩৫: সূর্য ও চন্দ্রের পাশাপাশি অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রের পরিভ্রমণ
ইতঃপূর্বে উল্লিখিত আয়াতসমূহে কুরআন মাজিদ বর্ণনা করেছে যে, সূর্য ও চন্দ্র পরিভ্রমণরত অবস্থায় রয়েছে। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, যদি এই পরিভ্রমণ চন্দ্র ও সূর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ হত তবে কুরআন মাজিদ তার বর্ণনা এই বলে দিত যে, ‘উভয়েই ঘূর্ণায়মান’। পক্ষান্তরে, এক্ষেত্রে কুরআন মাজিদ যে আরবি শব্দ ব্যবহার করেছে তা হল ‘কুল্লুন’ (كُلٌّ)। যার অর্থ, সকলেই ঘূর্ণায়মান।
পূর্বকার তাফসিরবিদগণ এই ‘কুল্লুন’ শব্দের অর্থ পরিপূর্ণভাবে অনুধাবন করতে পারেন নি। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আবিষ্কার করেছেন, মহাবিশ্বে সূর্য ও চন্দ্রের পাশে আরও কিছু গ্রহ-উপগ্রহ রয়েছে। এবং সেসব গ্রহ-উপগ্রহ পরিভ্রমণ অবস্থায় রয়েছে। কুরআন মাজিদ এই সত্যের স্বীকৃতি দিয়েছে বহু বছর পূর্বে। আরও লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, প্রত্যেক বস্তুই স্ব-স্ব কক্ষপথে সন্তরণ করে। এমনকি সাম্প্রতিক গবেষণায় এও জানা যায়, কেবল গ্রহ-নক্ষত্রগুলিই নয় বরং তাদের কক্ষপথগুলিও সন্তরণ করে। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত তিনি আর কে হতে পারেন যিনি এমন সুনির্দিষ্ট জ্ঞান কুরআন মাজিদে সরবরাহ করেছেন?
📄 মু’জিজা নং- ৩৬: অন্যান্য গ্রহের জন্য চন্দ্র ও সূর্য
তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র। প্রত্যেকে (মহাকাশীয় বস্তুসমূহ) আপন আপন কক্ষপথে সন্তরণশীল। (আম্বিয়া, ২১ : ৩৩)
তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে দিবস, রজনী, সূর্য ও চন্দ্র। তোমরা সূর্যকে সিজদা কর না, চন্দ্রকেও না; আল্লাহকে সিজদা কর যিনি এগুলি সৃষ্টি করেছেন। (ফুসসিলাত, ৪১ : ৩৭)
তোমরা কি লক্ষ কর না যে, আল্লাহ কিভাবে সপ্ত আকাশ সৃষ্টি করেছেন, একটির ওপর একটি এবং সেখানে চন্দ্রকে রেখেছেন আলোকরূপে এবং সূর্যকে রেখেছেন (উজ্জ্বল) প্রদীপরূপে। (নূহ, ৭১ : ১৫-১৬)
ইংরেজি ও বাংলা ব্যাকরণে দুধরনের সর্বনাম ও ক্রিয়া ব্যবহৃত হয়— একবচন ও বহুবচন। পক্ষান্তরে আরবি ব্যাকরণে একটি তৃতীয় রূপের সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ ব্যবহৃত হয়, যা কেবল ‘দুই’ নির্দেশ করে। এই দ্বি-বচনের রূপটি বহুবচনের রূপ থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। (বহুবচন) যা ব্যবহৃত হয় দুইয়ের অধিক সংখ্যা নির্দেশ করার জন্য। যারা আরবি ভাষার সঙ্গে পরিচিত তারা স্বীকার করবেন যে, উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহে সূর্য ও চন্দ্রের জন্য যে ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম পদ ব্যবহৃত হয়েছে তা দ্বি-বচনের রূপ নয়, বরং বহুবচনের রূপ। কুরআন মাজিদ এভাবে ইঙ্গিত করে যে, মহাকাশে সূর্য ও চন্দ্রের সংখ্যা কেবল দু’টি নয়, বরং অনেক। মহাকাশ বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা দেখিয়েছে যে, এমন অনেক গ্রহ রয়েছে যাদের আছে একাধিক চন্দ্র (উপগ্রহ)। এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, মহাকাশে আরও অনেক গ্রহজগত রয়েছে। এবং এ সকল জগতেও তাদের নিজস্ব সূর্য ও চন্দ্র রয়েছে। এটি কুরআন মাজিদের আরও একটি মু’জিজা যে, তা সূর্য ও চন্দ্রের গতি বর্ণনার জন্য সর্বনাম ও ক্রিয়ার ক্ষেত্রে দ্বি-বচনের শব্দ ব্যবহার করে নি। বরং বহুবচনের শব্দ ব্যবহার করেছে। প্রকৃতির সাম্প্রতিক আবিষ্কার ও গবেষণা যার সাক্ষ্য বহন করে।
📄 মু’জিজা নং- ৩৭: পৃথিবীর বার্ষিক গতি
তুমি পর্বতমালাকে দেখে অবিচল মনে কর, অথচ এগুলি চলে মেঘমালার মত। এটা আল্লাহর কারিগরি। যিনি সবকিছুকে করেছেন সুসংহত। (নাহল, ২৭ : ৮৮)
কুরআন মাজিদের এই আয়াতটি মেঘমালার মত পর্বতমালার গতির উল্লেখের মাধ্যমে বর্ণনা দেয় যে, পৃথিবী নিজেও ঘুরে। কথিত আছে, পৃথিবী তাঁর বর্তমান রূপ ও অবস্থা লাভ করেছে আনুমানিক পাঁচ বিলিয়ন বছর পূর্বে। যখন মাহবিশ্বের বয়স ছিল ১০ বিলিয়ন বছর। এর ব্যাস ৮,০০০ মাইল এবং তা সূর্য থেকে ৯৩ মিলিয়ন বা ৯ কোটি ৩০ লক্ষ মাইল দূরে অবস্থিত। এখন এটা প্রমাণিত যে, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে আবর্তিত হয়। বিজ্ঞানীরা এই আবর্তনের গতিও হিসাব করেছেন। পৃথিবী চন্দ্রকে সঙ্গে নিয়ে সূর্যের চারিদিকে আবর্তিত হয় ঘণ্টায় ৬,০০০ মাইল বেগে এবং সূর্যের চারিদিকে একটি আবর্তন সমাপ্ত করতে সময় নেয় প্রায় ৩৬৫ দিন ৬ ঘন্টা, ৪৬ মিনিট ৪৮ সেকেন্ড। এবং বছরে বিভিন্ন ঋতুর পরিবর্তন ঘটায়। যখন কুরআন মাজিদ অবতীর্ণ হয়, তখন বিশ্বাস করা হত, সূর্যই ঘোরে, পৃথিবী স্থির। ষষ্ঠ শতাব্দীতে কোপার্নিকাসই প্রথম বলেন, পৃথিবীও ঘোরে। অথচ কুরআন মাজিদে এই সত্য অবতীর্ণ হয়েছে বিজ্ঞানযুগের অনেক পূর্বে।
📄 মু’জিজা নং- ৩৮: পৃথিবীর আহ্নিক গতি
তিনি রাত দ্বারা দিনকে ঢেকে দেন। প্রত্যেকটি একে অপরকে দ্রুত অনুসরণ করে। (আরাফ, ০৭ : ৫১)
তিনিই (আল্লাহ) রাত দ্বারা দিনকে ঢেকে দেন। নিশ্চয় যে কওম চিন্তা-ভাবনা করে তাদের জন্য এতে নিদর্শনাবলি রয়েছে। (রা’দ, ১৩ : ০৩)
আর রাত তাদের জন্য একটি নিদর্শন। আমি তা থেকে দিনকে সরিয়ে নেই, ফলে তখনই তারা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে যায়। (ইয়াসিন, ৩৬ : ৩৭)
তিনি রাতকে দিনের ওপর এবং দিনকে রাতের ওপর জড়িয়ে দিয়েছেন। (ফাতির, ৩৯ : ০৫)
মহাকাশ বিজ্ঞানীরা এখন জানেন, পৃথিবীর দু’ধরনের গতি রয়েছে। একটি হল সূর্যের চারিদিকে তাঁর বার্ষিক গতি, যা জলবায়ু ও ঋতুর পরিবর্তন ঘটায়। অন্যটি আপন অক্ষে তার আহ্নিক গতি, যা দিন-রাতের পরিবরতন ঘটায়। কুরআন মাজিদ এই উভয় গতিকে স্বতন্ত্র ও পৃথকভাবে উল্লেখ করেছে। সুরা ‘নামল’ এর ৮৮তম আয়াত, যা ইতঃপূর্বে উল্লিখিত হয়েছে, পৃথিবীর বার্ষিক গতি নির্দেশ করে। উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহ দিন-রাতের পরিবর্তনের বর্ণনা দেয়। এভাবে এই আয়াতগুলি পৃথিবীর তার অক্ষ বরাবর আহ্নিক গতির নির্দেশ করে। পৃথিবীর অক্ষ তার সমতল কক্ষপথের দিকে ২৩.৫ ডিগ্রি হেলানো। এই পরিবর্তনের ফলে যখন পৃথিবীর অর্ধেক অংশ সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে, অন্য অংশ থাকে অন্ধকারে। এটি ২৪ ঘন্টার আবর্তনে দিন-রাতের পরিবর্তন নিয়ে আসে। এমন বাস্তব ঘটনায়- যেমনটি কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে- তাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে যারা চিন্তা-ভাবনা করে। অতএব এই বাণীর আলোকে প্রত্যেকের চিন্তা-ভাবনা করে দেখা উচিত যে, কুরআন মাজিদ কি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক সংকলিত, না সর্বজ্ঞ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ।