📄 মু’জিজা নং- ৩৩: সূর্য ও চন্দ্রের কক্ষপথে পরিভ্রমণ
তিনিই (আল্লাহ তাআলা) সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র। প্রত্যেকেই (নভোমন্ডলীয় বস্তুসমূহ) আপন আপন কক্ষপথে ঘূর্ণায়মান। (আম্বিয়া, ২১ : ৩৩)
সূর্যের জন্য অনুমতি নেই যে তা চন্দ্রকে অতিক্রম করে যাবে। আর না রাত আগে চলে দিনের। তারা প্রত্যেকেই (নিজ নিজ) কক্ষপথে সন্তরণ করে। (ইয়াসিন, ৩৬ : ৪০)
এসব আয়াতে যে আরবি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা হল ফালাক (فَلَكٍ)। কুরআনের অধিকাংশ অনুবাদক এই শব্দের অনুবাদ করেছেন ‘কক্ষপথ’ (ইংরেজিতে Orbit)। স্মর্তব্য যে, মহাশূন্যে অবস্থানরত বস্তুসমূহ সাম্প্রতিককালে আবিষ্কৃত হয়েছে টেলিস্কোপ বা দূরবীক্ষণ যন্ত্রের কল্যাণে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ষষ্ঠ শতাব্দীতে আরবদের কোনো দূরবীক্ষণ যন্ত্র ছিল না। তথাপি একটি সম্পূর্ণ নতুন ধারণা, সূর্য ও চন্দ্রের কক্ষপথে পরিভ্রমণ, যা কি-না কুরআন মাজিদে বিদ্যমান রয়েছে। এটি কুরআন মাজিদের অন্য একটি মু’জিজা যে, তা গ্রহ-নক্ষত্রের বৃত্তাকার কক্ষপথে পরিভ্রমণের বর্ণনা দিয়েছে, মানুষ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সহায়তায় তা আবিষ্কার করার বহু পূর্বে।
📄 মু’জিজা নং- ৩৪: সন্তরণের ভঙ্গিতে গ্রহ-নক্ষত্রের পরিভ্রমণ
উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহে সূর্য ও চন্দ্রের কক্ষপথীয় পরিভ্রমণের বর্ণনা দিতে যে আরবি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা হল ‘সাবাহা’ (سَبَحَ)। আরবিতে তা এমন গতিকে নির্দেশ করে যা নিজে নিজে হয়ে থাকে। অধিকাংশ কুরআনের অনুবাদক তার অনুবাদ করেছেন সাঁতার কাটা (ইংরেজিতে Swiming)। সূর্য ও চন্দ্রের এবং অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রের গতির এই ধারণাটি সাম্প্রতিক মহাকাশ বিজ্ঞানের তথ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটা অভাবনীয় যে, একজন আরবি ব্যক্তি শত শত বছর আগে, বিশ্বের সবচেয়ে পশ্চাৎপদ অংশে বসে বিশ্বস্রষ্টার কাছে থেকে কোনো আসমানি নির্দেশনা ছাড়া গ্রহ-নক্ষত্রের পরিভ্রমণের বর্ণনার ক্ষেত্রে 'سَبَحَ' -এর মত এমন একটি সুনির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করতে পারেন।
📄 মু’জিজা নং- ৩৫: সূর্য ও চন্দ্রের পাশাপাশি অন্যান্য গ্রহ-নক্ষত্রের পরিভ্রমণ
ইতঃপূর্বে উল্লিখিত আয়াতসমূহে কুরআন মাজিদ বর্ণনা করেছে যে, সূর্য ও চন্দ্র পরিভ্রমণরত অবস্থায় রয়েছে। তবে লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, যদি এই পরিভ্রমণ চন্দ্র ও সূর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ হত তবে কুরআন মাজিদ তার বর্ণনা এই বলে দিত যে, ‘উভয়েই ঘূর্ণায়মান’। পক্ষান্তরে, এক্ষেত্রে কুরআন মাজিদ যে আরবি শব্দ ব্যবহার করেছে তা হল ‘কুল্লুন’ (كُلٌّ)। যার অর্থ, সকলেই ঘূর্ণায়মান।
পূর্বকার তাফসিরবিদগণ এই ‘কুল্লুন’ শব্দের অর্থ পরিপূর্ণভাবে অনুধাবন করতে পারেন নি। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি আবিষ্কার করেছেন, মহাবিশ্বে সূর্য ও চন্দ্রের পাশে আরও কিছু গ্রহ-উপগ্রহ রয়েছে। এবং সেসব গ্রহ-উপগ্রহ পরিভ্রমণ অবস্থায় রয়েছে। কুরআন মাজিদ এই সত্যের স্বীকৃতি দিয়েছে বহু বছর পূর্বে। আরও লক্ষ্যণীয় বিষয় হল, প্রত্যেক বস্তুই স্ব-স্ব কক্ষপথে সন্তরণ করে। এমনকি সাম্প্রতিক গবেষণায় এও জানা যায়, কেবল গ্রহ-নক্ষত্রগুলিই নয় বরং তাদের কক্ষপথগুলিও সন্তরণ করে। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত তিনি আর কে হতে পারেন যিনি এমন সুনির্দিষ্ট জ্ঞান কুরআন মাজিদে সরবরাহ করেছেন?
📄 মু’জিজা নং- ৩৬: অন্যান্য গ্রহের জন্য চন্দ্র ও সূর্য
তিনিই সৃষ্টি করেছেন রাত ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র। প্রত্যেকে (মহাকাশীয় বস্তুসমূহ) আপন আপন কক্ষপথে সন্তরণশীল। (আম্বিয়া, ২১ : ৩৩)
তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে দিবস, রজনী, সূর্য ও চন্দ্র। তোমরা সূর্যকে সিজদা কর না, চন্দ্রকেও না; আল্লাহকে সিজদা কর যিনি এগুলি সৃষ্টি করেছেন। (ফুসসিলাত, ৪১ : ৩৭)
তোমরা কি লক্ষ কর না যে, আল্লাহ কিভাবে সপ্ত আকাশ সৃষ্টি করেছেন, একটির ওপর একটি এবং সেখানে চন্দ্রকে রেখেছেন আলোকরূপে এবং সূর্যকে রেখেছেন (উজ্জ্বল) প্রদীপরূপে। (নূহ, ৭১ : ১৫-১৬)
ইংরেজি ও বাংলা ব্যাকরণে দুধরনের সর্বনাম ও ক্রিয়া ব্যবহৃত হয়— একবচন ও বহুবচন। পক্ষান্তরে আরবি ব্যাকরণে একটি তৃতীয় রূপের সর্বনাম ও ক্রিয়াপদ ব্যবহৃত হয়, যা কেবল ‘দুই’ নির্দেশ করে। এই দ্বি-বচনের রূপটি বহুবচনের রূপ থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। (বহুবচন) যা ব্যবহৃত হয় দুইয়ের অধিক সংখ্যা নির্দেশ করার জন্য। যারা আরবি ভাষার সঙ্গে পরিচিত তারা স্বীকার করবেন যে, উপরোল্লিখিত আয়াতসমূহে সূর্য ও চন্দ্রের জন্য যে ক্রিয়াপদ ও সর্বনাম পদ ব্যবহৃত হয়েছে তা দ্বি-বচনের রূপ নয়, বরং বহুবচনের রূপ। কুরআন মাজিদ এভাবে ইঙ্গিত করে যে, মহাকাশে সূর্য ও চন্দ্রের সংখ্যা কেবল দু’টি নয়, বরং অনেক। মহাকাশ বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা দেখিয়েছে যে, এমন অনেক গ্রহ রয়েছে যাদের আছে একাধিক চন্দ্র (উপগ্রহ)। এটাও প্রমাণিত হয়েছে যে, মহাকাশে আরও অনেক গ্রহজগত রয়েছে। এবং এ সকল জগতেও তাদের নিজস্ব সূর্য ও চন্দ্র রয়েছে। এটি কুরআন মাজিদের আরও একটি মু’জিজা যে, তা সূর্য ও চন্দ্রের গতি বর্ণনার জন্য সর্বনাম ও ক্রিয়ার ক্ষেত্রে দ্বি-বচনের শব্দ ব্যবহার করে নি। বরং বহুবচনের শব্দ ব্যবহার করেছে। প্রকৃতির সাম্প্রতিক আবিষ্কার ও গবেষণা যার সাক্ষ্য বহন করে।