📄 মু’জিজা নং- ২৫: ভূ-গর্ভস্থ তৈলস¤পদের গঠন
আপনি আপনার মহান পালনকর্তার নামের মহিমা বর্ণনা করুন। যিনি সৃষ্টি করেছেন (সবকিছু) এবং সুবিন্যস্ত করেছেন। এবং যিনি সুপরিমিত করেছেন ও পথ প্রদর্শন করেছেন। আর যিনি উৎপন্ন করেছেন তৃণ-লতা। অতঃপর তাকে পরিণত করেছেন কাল ‘গুছা’। (আল-আলাক, ৮৭ : ০১-০৫)
অধিকাংশ অনুবাদের ক্ষেত্রে কুরআন মাজিদের শব্দ ‘গুছা’ غُثَاءً -এর জন্য খড়কুটা বা আবর্জনা (ইংরেজিতে stubble) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যে ব্যক্তি ভূতত্ত্ববিদ্যা সম্পর্কে ধারণা রাখে, সত্বরই সে জানতে পারবে, এই আয়াতটি তৈলজাত সম্পদ গঠনের রহস্যের বর্ণনা দেয়। ভূতত্ত্ববিদদের ধারণা মতে, পৃথিবীতে সর্বপ্রথম উদ্ভিদ ছিল প্রকাণ্ড পর্ণাঙ্গ ও সামুদ্রিক শৈবাল। যদি এ সকল তৃণশ্রেণী যেমনটি ছিল তেমনটি বিদ্যমান থাকত, তবে আবহাওয়ায় অক্সিজেনের পরিমাণ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যেত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বায়ুমন্ডলে আগুন ধরে যেত। উল্লিখিত আয়াতটি এ কথারই ব্যাখ্যা প্রদান করে : ‘আপনার পালনকর্তা প্রত্যেক বস্তুকে তৈরি করেছেন সুপরিমিতভাবে।’ এভাবে প্রকাণ্ড পর্ণাঙ্গ ও শৈবালদাম পরবর্তীতে প্রবল ভূতাত্ত্বিক আলোড়নের মাধ্যমে মাটির নিচে চলে যায় এবং বিশেষ রাসায়নিক লঘুকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তেলে পরিণত হয়।
বর্তমানে এটা জ্ঞাত বিষয় যে, তৈলজাত খনিজ পদার্থগুলি প্রধানত গঠিত হয়েছিল বিভিন্ন জাতের ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এ সকল পর্ণাঙ্গ ও শৈবালের বিগলন ও পচনের মাধ্যমে, যা শিলাস্তরের ফাঁকে আটকে পড়ে। বর্তমানে একথাও আমাদের অজানা নয় যে, তৈলজাত পদার্থ কৃষ্ণ তরল পদার্থের রূপে ভূগর্ভস্থ নদীতে প্রবাহিত হয়। এই ভূ-অভ্যন্তরীণ প্রবাহকে বর্ণনা করার জন্য ‘বন্যার পানি’ই সবচেয়ে পরিষ্কার অভিব্যক্তি। এ কারণে এই আয়াত তৈলনদীর প্রবাহেরও বর্ণনা দেয়, যাকে ভূতত্ত্ববিদ্যার পরিভাষায় ‘oil migration’ বলা হয়।
📄 মু’জিজা নং- ২৬: বৃষ্টির মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রাণের জাগরণ
আর (আল্লাহ) যিনি আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করেন পরিমিত পরিমাণে। অতঃপর আমি (আল্লাহ) তা দ্বারা পুনরুজ্জীবিত করি মৃত ভূভাগকে। তেমনিভাবেই তোমরা উত্থিত হবে। (যুখরুফ, ৪৩ : ১১)
আর আমি তৈরি করেছি পানি থেকে প্রাণবন্ত সবকিছুকে। এরপরেও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না? (আম্বিয়া, ২১ : ৩০)
সজীব বস্তুর মৌলিক রাসায়নিক উপাদান হল হাইড্রোজেনের সেতুবন্ধন, যাকে বলা হয় ‘হাইড্রোজেন বন্ড’। এই হাইড্রোজেন কেবল পানির আয়োনাইজেশনের মাধ্যমেই প্রতিস্থাপিত হতে পারে। এ কারণেই প্রাণের জন্য পানি অপরিহার্য। একটি পানিশূন্য বস্তু জমাট কঙ্কালের মত, যদিও তা তার জেনেটিক কোডসহ DNA সংরক্ষণ করে থাকে। এটি প্রয়োজন পরিমাণ হাইড্রোজেন আয়ন গ্রহণ করা ব্যতীত না পুনরুৎপাদন করতে পারে, আর না পারে ক্রিয়াশীল হতে। যখন পানি পৌঁছে এবং হাইড্রোজেন আয়ন প্রদান করে, তখন প্রাণের জেনেটিক কোড সক্রিয় হয়। এটি ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে অতি সাধারণ ঘটনা। প্রায় ১০০ বছর পূর্বে এ তথ্য আবিষ্কৃত হয় যে, বিভিন্ন ধরনের প্রাণ সত্তা দ্বারা মাটি গঠিত। প্রায় চল্লিশ বছর পূর্বে আবিষ্কৃত হয়, মাটির ৮০ ভাগ ব্যাকটেরিয়া দ্বারা গঠিত। তারা বৃষ্টির পানি পাওয়া মাত্রই প্রয়োজন পরিমাণ হাইড্রোজেন আয়ন গ্রহণ করে এবং বিভিন্ন পুনরুৎপাদনশীল কর্মতৎপরতা শুরু করে। বৃষ্টির পানি এভাবে মৃত ভূমিতে পুনরুজ্জীবন নিয়ে আসে। বিজ্ঞানীরা যা আবিষ্কার করেছেন সাম্প্রতিক সময়ে কুরআন মাজিদ তার বর্ণনা দিয়েছে বহু শতাব্দী পূর্বে। ধারণা করা হয়, আদম আলাইহিস সালাম থেকে এ পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রায় দশ বিলিয়ন মানুষ বসবাস করেছে। প্রত্যেক ব্যক্তির জেনেটিক কোডের আকার প্রায় এক মাইক্রন (এক মিলিমিটারের দশ লক্ষ ভাগের একভাগ)। যদি আমরা তাদের সকলের জেনেটিক কোড সংগ্রহ করি, তবে তাতে একটি চায়ের পেয়ালাও পূর্ণ হবে না। এসব জেনেটিক কোড এখনও মাটির নিচে সংরক্ষিত আছে। এটি তেমনি সুনিশ্চিত যে, যখন আল্লাহ তাআলা এক ছিটা বৃষ্টির ফোঁটায় মৃত ভূমিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন, তেমনি তাঁর ক্ষমতা রয়েছে জেনেটিক কোডসমূহকে সাধারণ হাইড্রোজেন বন্ডের যোগান দেয়া। তখন কিয়ামত দিবসে সকল মানুষ জেগে উঠবে। কুরআন মাজিদ তারই বর্ণনা প্রদান করে, ‘তেমনিভাবেই তোমরা পুনরুত্থিত হবে।’
📄 মু’জিজা নং- ২৭: পর্বতমালাার গঠন-কাঠামো ও ভূমিকা
তিনি সৃষ্টি করেছেন আসমানসমূহ কোনো খুঁটি ব্যতীত, যা তোমরা দেখছ। আর তিনি পৃথিবীতে স্থাপন করেছেন সুদৃঢ় পর্বতমালা, পাছে যেন তা তোমাদের নিয়ে ঢলে না পড়ে। (লোকমান, ৩১ : ১০)
আমি কি করিনি ভূমিকে বিছানা এবং পর্বতমালাকে পেরেক? আর আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি জোড়ায় জোড়ায়। (নাবা, ৭৮ : ৬-৮)
সম্প্রতি ভূতত্ত্ববিদরা আবিষ্কার করেছেন, গাছের শিকড়ের মত পর্বতমালার সুদৃঢ় ভিত্তি রয়েছে, যা মাটির সুগভীর পর্যন্ত প্রোথিত। অধিকন্তু তা পৃথিবীর স্থিতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কুরআন মাজিদ এই আয়াতে যে আরবি শব্দ ব্যবহার করেছে তা হল ‘আওতাদ’ (أَوْتَادًا)। আব্দুল্লাহ ইউসুফ আলি এবং ড. মুহসিন খান ইংরেজিতে তার অনুবাদ করেছেন, Peg। ইংরেজি অভিধানগুলি Peg শব্দের অর্থ করতে গিয়ে লিখে— A pin or a nail that is used to bold something or to fasten part of a thing together. (একটি পিন কিংবা পেরেক যা কোনো কিছু ধরে রাখতে বা একটি বস্তুর দুটি অংশকে দৃঢ়ভাবে একত্রে আটকানোর জন্য ব্যবহৃত হয়)। এই আয়াতগুলো থেকে বুঝা যায়, আল্লাহ তাআলা পর্বতমালাকে করেছেন সুবৃহৎ পেরেক সদৃশ, যা মাটির সুগভীরে প্রোথিত এবং এসবের কাজ হল পৃথিবীর স্থিতি প্রতিষ্ঠা করা। এটি হুবহু তা-ই, যা বর্তমানে ভূতত্ত্ববিদরা পর্বতমালার গঠনপ্রকৃতি ও তার ভূমিকা সম্পর্কে আবিষ্কার করেছেন। লক্ষণীয় বিষয় হল, আরব উপদ্বীপে কোনো সুবৃহৎ পর্বত নেই। অধিকন্তু তার অধিকাংশ পর্বতই বালিময়, শিলাবিশিষ্ট নয়। আল্লাহ তাআলা ব্যতীত তিনি আর কে হতে পারেন, যিনি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর কুরআন মাজিদে এই তথ্য অবতীর্ণ করেছেন?
📄 মু’জিজা নং- ২৮: আলোর একমাত্র উৎস হিসেবে সূর্য
আর আমি নির্মাণ করেছি তোমাদের ওপর সুদৃঢ় সপ্ত (আকাশ) এবং স্থাপন করেছি (তন্মধ্যে) একটি উজ্জ্বল প্রদীপ। (নাবা, ৭৮ : ১২-১৩)
তোমরা কি দেখ না যে, আল্লাহ কিভাবে সপ্ত আকাশ সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে এবং তন্মধ্যে চন্দ্রকে স্থাপন করেছেন আলোকরূপে এবং সূর্যকে রেখেছেন প্রদীপরূপে। (নূহ, ৭১ : ১৫-১৬)
এই আয়াতগুলিতে কুরআন মাজিদ সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা দেয় যে, আমাদের সৌরজগতের জন্য সূর্যই একমাত্র আলোর উৎস। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা সম্প্রতি এ সত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন যে, চন্দ্র আলোর উৎস নয়, বরং সূর্যের আলোর প্রতিফলন মাত্র। কুরআন মাজিদ এই সত্যের বর্ণনা দিয়েছে মহাকাশ বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণার মাধ্যমে এই সত্য প্রতিষ্ঠা করার বহু শতাব্দী পূর্বে।