📄 মু’জিজা নং- ২৩: বিচার দিবসে পৃথিবীর স্বরূপ
যেদিন পরিবর্তিত করা হবে এই পৃথিবীকে অন্য পৃথিবীতে এবং আসমানসমূহকে (অনুরূপভাবে) এবং লোকেরা একক, পরাক্রমশালী আল্লাহর সামনে পেশ হবে। (ইবরাহিম, ১৪ : ১৮)
যখন পৃথিবী (-এর আকৃতি) সম্প্রসারিত করা হবে এবং তা নিক্ষেপ করবে তার গর্ভস্থিত সবকিছু আর তা হয়ে যাবে শূন্যগর্ভ। (ইনশিক্বাক, ৮৪ : ০৩-০৪)
প্রথম আয়াতে যে আরবি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা হল ‘মুদ্দাত’ (مُدَّت) যার অর্থ করা যেতে পারে : প্রসারিত, সমতল বা চ্যাপ্টাকৃৎ, কিংবা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে চওড়াকৃৎ। এই আয়াত বলে, বিচার দিবসে পৃথিবী হয়ে যাবে সমতল। অন্য কথায় এই আয়াত থেকে বুঝা যায়, বর্তমানে পৃথিবী সমতল অবস্থায় নেই। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময়কাল হতে পারে ৬০৯ থেকে ৬২২ ঈসায়ি সালের মধ্যে। সে সময় একথা সার্বজনীনভাবে বিশ্বাস করা হত যে, পৃথিবী সমতল। প্রায় এক হাজার বছর পর পঞ্চদশ শতাব্দীতে কোপার্নিকাস এই তথ্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেন যে, পৃথিবী আমাদের গ্রহজগতের কেন্দ্রবিন্দু নয়। পরবর্তী সময়ে গ্যালিলিও গ্যালিলি কোপার্নিকাসের তথ্যকে সমর্থন করে ঘোষণা দেন যে, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে পরিভ্রমণ করে এবং তা সমতল নয়; বরং গোলাকার। কুরআন মাজিদে এই বাস্তবতা অবতীর্ণ হয়েছে বহু শতাব্দী পূর্বে। পৃথিবী তার গোলাকৃতির কারণে, কখনো তার সমগ্র অংশে একই সময়ে দিন হয় না। তার যে অংশ সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে তাতে দিন হয় এবং তার বিপরীত অংশে হয় রাত। পক্ষান্তরে, বিচার দিবসে একই সময়ে সারা পৃথিবীতে দিন থাকবে। এটি তখনই সম্ভব যখন পৃথিবীর আকৃতি গোলাকার থেকে সমতলে পরিবর্তিত হবে। এটা হুবহু তা-ই যা উপরে উদ্ধৃত দ্বিতীয় আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। যদি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে কুরআন রচনা করে থাকেন, তবে তিনি কিভাবে এ ধরনের জটিল প্রাকৃতিক রহস্য উদ্ঘাটনে সক্ষম হলেন?
📄 মু’জিজা নং- ২৪: ভূমির সংকোচন
তারা কি দেখে না যে, আমি ভূভাগকে তার প্রান্তসীমা থেকে ক্রমান্বয়ে সংকোচিত করে আসছি? আল্লাহ নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশকে পশ্চাতে নিক্ষেপকারী কেহ নেই। তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। (রা’দ, ১৩ : ৪১)
যেমনটি ইতঃপূর্বে বর্ণিত হয়েছে, পূর্ব যুগের মুসলমানরা এই আয়াতটিকে কুরআন মাজিদের একটি রহস্য হিসেবে গ্রহণ করেছিল। যতদিন তাদের যথাযথ জ্ঞান ছিল না, তারা এই আয়াতের সুনির্দিষ্ট অর্থ প্রদান করতে চেষ্টা করে নি। অধুনা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আজ আমাদেরকে এই আয়াতের অর্থ অনুধাবন করতে ও ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম করেছে।
এটি একটি জ্ঞাত বিষয় যে, মেরু অঞ্চলে জমাট বরফের স্তুপগুলি গলতে শুরু করেছে এবং সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তা পর্যায়ক্রমে আরও ভূভাগকে ঢেকে ফেলছে। আয়াতে উল্লিখিত প্রান্তসীমা হল সমুদ্র উপকূলসমূহ। মেরু অঞ্চলের গলিত বরফের ফলে যতই সমুদ্রের উপকূল পানির নিচে তলিয়ে যাবে, ততই ভূভাগ বা পৃথিবী সংকোচিত হয়ে পড়বে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাথীরা চৌদ্দশ বছর পূর্বে আরব উপদ্বীপের মত একটি মরুভূমিতে বসে এই বিস্ময়কর তথ্য নিশ্চয় কল্পনা করতে সক্ষম ছিলেন না।
📄 মু’জিজা নং- ২৫: ভূ-গর্ভস্থ তৈলস¤পদের গঠন
আপনি আপনার মহান পালনকর্তার নামের মহিমা বর্ণনা করুন। যিনি সৃষ্টি করেছেন (সবকিছু) এবং সুবিন্যস্ত করেছেন। এবং যিনি সুপরিমিত করেছেন ও পথ প্রদর্শন করেছেন। আর যিনি উৎপন্ন করেছেন তৃণ-লতা। অতঃপর তাকে পরিণত করেছেন কাল ‘গুছা’। (আল-আলাক, ৮৭ : ০১-০৫)
অধিকাংশ অনুবাদের ক্ষেত্রে কুরআন মাজিদের শব্দ ‘গুছা’ غُثَاءً -এর জন্য খড়কুটা বা আবর্জনা (ইংরেজিতে stubble) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যে ব্যক্তি ভূতত্ত্ববিদ্যা সম্পর্কে ধারণা রাখে, সত্বরই সে জানতে পারবে, এই আয়াতটি তৈলজাত সম্পদ গঠনের রহস্যের বর্ণনা দেয়। ভূতত্ত্ববিদদের ধারণা মতে, পৃথিবীতে সর্বপ্রথম উদ্ভিদ ছিল প্রকাণ্ড পর্ণাঙ্গ ও সামুদ্রিক শৈবাল। যদি এ সকল তৃণশ্রেণী যেমনটি ছিল তেমনটি বিদ্যমান থাকত, তবে আবহাওয়ায় অক্সিজেনের পরিমাণ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যেত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বায়ুমন্ডলে আগুন ধরে যেত। উল্লিখিত আয়াতটি এ কথারই ব্যাখ্যা প্রদান করে : ‘আপনার পালনকর্তা প্রত্যেক বস্তুকে তৈরি করেছেন সুপরিমিতভাবে।’ এভাবে প্রকাণ্ড পর্ণাঙ্গ ও শৈবালদাম পরবর্তীতে প্রবল ভূতাত্ত্বিক আলোড়নের মাধ্যমে মাটির নিচে চলে যায় এবং বিশেষ রাসায়নিক লঘুকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তেলে পরিণত হয়।
বর্তমানে এটা জ্ঞাত বিষয় যে, তৈলজাত খনিজ পদার্থগুলি প্রধানত গঠিত হয়েছিল বিভিন্ন জাতের ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এ সকল পর্ণাঙ্গ ও শৈবালের বিগলন ও পচনের মাধ্যমে, যা শিলাস্তরের ফাঁকে আটকে পড়ে। বর্তমানে একথাও আমাদের অজানা নয় যে, তৈলজাত পদার্থ কৃষ্ণ তরল পদার্থের রূপে ভূগর্ভস্থ নদীতে প্রবাহিত হয়। এই ভূ-অভ্যন্তরীণ প্রবাহকে বর্ণনা করার জন্য ‘বন্যার পানি’ই সবচেয়ে পরিষ্কার অভিব্যক্তি। এ কারণে এই আয়াত তৈলনদীর প্রবাহেরও বর্ণনা দেয়, যাকে ভূতত্ত্ববিদ্যার পরিভাষায় ‘oil migration’ বলা হয়।
📄 মু’জিজা নং- ২৬: বৃষ্টির মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রাণের জাগরণ
আর (আল্লাহ) যিনি আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করেন পরিমিত পরিমাণে। অতঃপর আমি (আল্লাহ) তা দ্বারা পুনরুজ্জীবিত করি মৃত ভূভাগকে। তেমনিভাবেই তোমরা উত্থিত হবে। (যুখরুফ, ৪৩ : ১১)
আর আমি তৈরি করেছি পানি থেকে প্রাণবন্ত সবকিছুকে। এরপরেও কি তারা বিশ্বাস স্থাপন করবে না? (আম্বিয়া, ২১ : ৩০)
সজীব বস্তুর মৌলিক রাসায়নিক উপাদান হল হাইড্রোজেনের সেতুবন্ধন, যাকে বলা হয় ‘হাইড্রোজেন বন্ড’। এই হাইড্রোজেন কেবল পানির আয়োনাইজেশনের মাধ্যমেই প্রতিস্থাপিত হতে পারে। এ কারণেই প্রাণের জন্য পানি অপরিহার্য। একটি পানিশূন্য বস্তু জমাট কঙ্কালের মত, যদিও তা তার জেনেটিক কোডসহ DNA সংরক্ষণ করে থাকে। এটি প্রয়োজন পরিমাণ হাইড্রোজেন আয়ন গ্রহণ করা ব্যতীত না পুনরুৎপাদন করতে পারে, আর না পারে ক্রিয়াশীল হতে। যখন পানি পৌঁছে এবং হাইড্রোজেন আয়ন প্রদান করে, তখন প্রাণের জেনেটিক কোড সক্রিয় হয়। এটি ব্যাকটেরিয়ার ক্ষেত্রে অতি সাধারণ ঘটনা। প্রায় ১০০ বছর পূর্বে এ তথ্য আবিষ্কৃত হয় যে, বিভিন্ন ধরনের প্রাণ সত্তা দ্বারা মাটি গঠিত। প্রায় চল্লিশ বছর পূর্বে আবিষ্কৃত হয়, মাটির ৮০ ভাগ ব্যাকটেরিয়া দ্বারা গঠিত। তারা বৃষ্টির পানি পাওয়া মাত্রই প্রয়োজন পরিমাণ হাইড্রোজেন আয়ন গ্রহণ করে এবং বিভিন্ন পুনরুৎপাদনশীল কর্মতৎপরতা শুরু করে। বৃষ্টির পানি এভাবে মৃত ভূমিতে পুনরুজ্জীবন নিয়ে আসে। বিজ্ঞানীরা যা আবিষ্কার করেছেন সাম্প্রতিক সময়ে কুরআন মাজিদ তার বর্ণনা দিয়েছে বহু শতাব্দী পূর্বে। ধারণা করা হয়, আদম আলাইহিস সালাম থেকে এ পর্যন্ত পৃথিবীতে প্রায় দশ বিলিয়ন মানুষ বসবাস করেছে। প্রত্যেক ব্যক্তির জেনেটিক কোডের আকার প্রায় এক মাইক্রন (এক মিলিমিটারের দশ লক্ষ ভাগের একভাগ)। যদি আমরা তাদের সকলের জেনেটিক কোড সংগ্রহ করি, তবে তাতে একটি চায়ের পেয়ালাও পূর্ণ হবে না। এসব জেনেটিক কোড এখনও মাটির নিচে সংরক্ষিত আছে। এটি তেমনি সুনিশ্চিত যে, যখন আল্লাহ তাআলা এক ছিটা বৃষ্টির ফোঁটায় মৃত ভূমিকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন, তেমনি তাঁর ক্ষমতা রয়েছে জেনেটিক কোডসমূহকে সাধারণ হাইড্রোজেন বন্ডের যোগান দেয়া। তখন কিয়ামত দিবসে সকল মানুষ জেগে উঠবে। কুরআন মাজিদ তারই বর্ণনা প্রদান করে, ‘তেমনিভাবেই তোমরা পুনরুত্থিত হবে।’