📘 160_muziza_of_quran > 📄 মু’জিজাÑ২২: পৃথিবীর ডিম্বাকার কিংবা বর্তমান আকারের আকৃতি

📄 মু’জিজাÑ২২: পৃথিবীর ডিম্বাকার কিংবা বর্তমান আকারের আকৃতি


‘অতঃপর তিনি (আল্লাহ) পৃথিবীকে দান করেছেন ডিম্ব আকৃতি।’ (নাযিয়াত, ৭৯ : ৩০)

এই আয়াতে যে আরবি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা হল ‘দাহাহা’ ' دَحَاهَا '। পুরনো অনুবাদগুলিতে এই আয়াতের অর্থ রয়েছে- ‘অতঃপর তিনি পৃথিবীকে বিছিয়ে দিয়েছেন।’ যেহেতু তারা পৃথিবীর আকৃতি-প্রকৃতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না তাই তারা দাহাহা (دَحَاهَا) শব্দটি‍কে ‘দাহবুন’ (دَحْوٌ) এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছিলেন এবং তার অর্থ করেছিলেন ‘প্রসারিত করা বা বিছিয়ে দেওয়া।’ ‘দাহা’ শব্দের প্রকৃত অর্থ ‘উটপাখির ডিম’। নিম্নে তার কিছু সাধিত শব্দ দেওয়া হল—
= আল-উদহিয়্যু (الأُدْحِيُّ) : উটপাখির ডিম।
= আল-উদহুয়্যাতু (الأُدْحُوَّةُ) : উটপাখির ডিমের স্থান।
= তাদাহহিয়ান (تَدَحِّيًا) : গর্তের মধ্যে একটি পাথর পতিত হওয়া।

আয়াতটি এভাবে পৃথিবীর গোলাকৃতি হওয়ার কথা পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর উত্তর-দক্ষিণের ব্যাসের তুলনায় নিরক্ষীয় ব্যাসের আপেক্ষিক পার্থক্য এটিকে একটি বর্তুল আকৃতি কিংবা ডিম্ব আকৃতি দান করেছে। আরও পরিষ্কারভাবে বলতে গেলে, পৃথিবীর প্রকৃত আকৃতি গঠনে এই আকৃতিটি কিছুটা বিকৃত হয়েছে, যাকে বলা হয় 'Geoid', যা একটি নাশপাতির অনুরূপ। পৃথিবীর নিরক্ষীয় ব্যাসার্ধ হল ৬৩৭৮ কিলোমিটার, যেখানে তার মেরু অঞ্চলীয় ব্যাসার্ধ হল ৬৩৫৬ কিলোমিটার।

এই আয়াত থেকে একথাও বুঝা যায়, আদিকালে পৃথিবী এই আকৃতির ছিল না। পরবর্তীতেই এই আকৃতি প্রাপ্ত হয়। মহাকাশ বিজ্ঞানে পৃথিবীর বর্তমান আকার সম্পর্কে দুটি মতবাদ রয়েছে। প্রথম মতানুসারে, পৃথিবী ছিল সূর্য থেকে ছিটকে পড়া একটি টুকরো। দ্বিতীয় মতানুসারে, সূর্য ও পৃথিবী উভয়টিই একটি নীহারিকা থেকে গঠিত হয়েছে। উভয় মতই স্বীকার করে, প্রথম যখন পৃথিবী সৃষ্টি হয় তখন তাঁর বর্তমান আকার ছিল না। পরবর্তী সময়েই এটি ডিম্বাকার লাভ করেছে। এই আয়াতটি উভয় মতের সঙ্গে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এই আয়াতের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এটি সুরা ‘আন নাযিয়াত’ এরই একটি অংশ, যাকে 'Extractors' বা উৎপাটনকারীগণ শব্দে ভাষান্তরিত করা যেতে পারে। এই সুরায় সৃষ্টি সম্পর্কিত আরও কিছু রহস্য বর্ণিত হয়েছে। ২৮ থেকে ৩২ নং আয়াত পর্যন্ত আছে পৃথিবী সৃষ্টি সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত তথ্য।

৩১ নং আয়াতে আছে, ‘আর তিনি তা থেকে নির্গত করেছেন পানি ও চারণভূমি।’ অন্য কথায়, এই আয়াত বলে, পৃথিবী তাঁর ডিম্ব আকৃতি লাভ করার পর তাতে পানি প্রদান করা হয়েছিল। ফলে তা পৃথিবীর প্রথম শ্রেণীর উদ্ভিদ, যেমন- তৃণ বা ঘাস উৎপন্ন করেছিল। আধুনিককালের ভূতত্ত্ববিদরাও এখন এ কথা বিশ্বাস করেন যে, পৃথিবী বর্তুলাকৃতি লাভ করার পর বারি‍মন্ডল গঠিত হয়। সৃষ্টি হয় সাগর-মহাসাগর। অতঃপর ক্রমান্বয়ে উদ্ভিদরাজি উদ্‌গত হয়।
৩২ নং আয়াতে আছে, ‘আর পর্বতমালা, তিনি স্থাপন করেছেন সুদৃঢ়ভাবে।’
মহাবিশ্ব সৃষ্টির যে ক্রম পর্যায় কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে ভূতত্ত্বসংক্রান্ত অধুনা ধারণাসমূহ তার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত।

📘 160_muziza_of_quran > 📄 মু’জিজা নং- ২৩: বিচার দিবসে পৃথিবীর স্বরূপ

📄 মু’জিজা নং- ২৩: বিচার দিবসে পৃথিবীর স্বরূপ


যেদিন পরিবর্তিত করা হবে এই পৃথিবীকে অন্য পৃথিবীতে এবং আসমানসমূহকে (অনুরূপভাবে) এবং লোকেরা একক, পরাক্রমশালী আল্লাহর সামনে পেশ হবে। (ইবরাহিম, ১৪ : ১৮)

যখন পৃথিবী (-এর আকৃতি) সম্প্রসারিত করা হবে এবং তা নিক্ষেপ করবে তার গর্ভস্থিত সবকিছু আর তা হয়ে যাবে শূন্যগর্ভ। (ইনশিক্বাক, ৮৪ : ০৩-০৪)

প্রথম আয়াতে যে আরবি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা হল ‘মুদ্দাত’ (مُدَّت) যার অর্থ করা যেতে পারে : প্রসারিত, সমতল বা চ্যাপ্টাকৃৎ, কিংবা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে চওড়াকৃৎ। এই আয়াত বলে, বিচার দিবসে পৃথিবী হয়ে যাবে সমতল। অন্য কথায় এই আয়াত থেকে বুঝা যায়, বর্তমানে পৃথিবী সমতল অবস্থায় নেই। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময়কাল হতে পারে ৬০৯ থেকে ৬২২ ঈসায়ি সালের মধ্যে। সে সময় একথা সার্বজনীনভাবে বিশ্বাস করা হত যে, পৃথিবী সমতল। প্রায় এক হাজার বছর পর পঞ্চদশ শতাব্দীতে কোপার্নিকাস এই তথ্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেন যে, পৃথিবী আমাদের গ্রহজগতের কেন্দ্রবিন্দু নয়। পরবর্তী সময়ে গ্যালিলিও গ্যালিলি কোপার্নিকাসের তথ্যকে সমর্থন করে ঘোষণা দেন যে, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে পরিভ্রমণ করে এবং তা সমতল নয়; বরং গোলাকার। কুরআন মাজিদে এই বাস্তবতা অবতীর্ণ হয়েছে বহু শতাব্দী পূর্বে। পৃথিবী তার গোলাকৃতির কারণে, কখনো তার সমগ্র অংশে একই সময়ে দিন হয় না। তার যে অংশ সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে তাতে দিন হয় এবং তার বিপরীত অংশে হয় রাত। পক্ষান্তরে, বিচার দিবসে একই সময়ে সারা পৃথিবীতে দিন থাকবে। এটি তখনই সম্ভব যখন পৃথিবীর আকৃতি গোলাকার থেকে সমতলে পরিবর্তিত হবে। এটা হুবহু তা-ই যা উপরে উদ্ধৃত দ্বিতীয় আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। যদি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে কুরআন রচনা করে থাকেন, তবে তিনি কিভাবে এ ধরনের জটিল প্রাকৃতিক রহস্য উদ্‌ঘাটনে সক্ষম হলেন?

📘 160_muziza_of_quran > 📄 মু’জিজা নং- ২৪: ভূমির সংকোচন

📄 মু’জিজা নং- ২৪: ভূমির সংকোচন


তারা কি দেখে না যে, আমি ভূভাগকে তার প্রান্তসীমা থেকে ক্রমান্বয়ে সংকোচিত করে আসছি? আল্লাহ নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশকে পশ্চাতে নিক্ষেপকারী কেহ নেই। তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। (রা’দ, ১৩ : ৪১)

যেমনটি ইতঃপূর্বে বর্ণিত হয়েছে, পূর্ব যুগের মুসলমানরা এই আয়াতটিকে কুরআন মাজিদের একটি রহস্য হিসেবে গ্রহণ করেছিল। যতদিন তাদের যথাযথ জ্ঞান ছিল না, তারা এই আয়াতের সুনির্দিষ্ট অর্থ প্রদান করতে চেষ্টা করে নি। অধুনা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আজ আমাদেরকে এই আয়াতের অর্থ অনুধাবন করতে ও ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম করেছে।
এটি একটি জ্ঞাত বিষয় যে, মেরু অঞ্চলে জমাট বরফের স্তুপগুলি গলতে শুরু করেছে এবং সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তা পর্যায়ক্রমে আরও ভূভাগকে ঢেকে ফেলছে। আয়াতে উল্লিখিত প্রান্তসীমা হল সমুদ্র উপকূলসমূহ। মেরু অঞ্চলের গলিত বরফের ফলে যতই সমুদ্রের উপকূল পানির নিচে তলিয়ে যাবে, ততই ভূভাগ বা পৃথিবী সংকোচিত হয়ে পড়বে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাথীরা চৌদ্দশ বছর পূর্বে আরব উপদ্বীপের মত একটি মরুভূমিতে বসে এই বিস্ময়কর তথ্য নিশ্চয় কল্পনা করতে সক্ষম ছিলেন না।

📘 160_muziza_of_quran > 📄 মু’জিজা নং- ২৫: ভূ-গর্ভস্থ তৈলস¤পদের গঠন

📄 মু’জিজা নং- ২৫: ভূ-গর্ভস্থ তৈলস¤পদের গঠন


আপনি আপনার মহান পালনকর্তার নামের মহিমা বর্ণনা করুন। যিনি সৃষ্টি করেছেন (সবকিছু) এবং সুবিন্যস্ত করেছেন। এবং যিনি সুপরিমিত করেছেন ও পথ প্রদর্শন করেছেন। আর যিনি উৎপন্ন করেছেন তৃণ-লতা। অতঃপর তাকে পরিণত করেছেন কাল ‘গুছা’। (আল-আলাক, ৮৭ : ০১-০৫)

অধিকাংশ অনুবাদের ক্ষেত্রে কুরআন মাজিদের শব্দ ‘গুছা’ غُثَاءً -এর জন্য খড়কুটা বা আবর্জনা (ইংরেজিতে stubble) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। যে ব্যক্তি ভূতত্ত্ববিদ্যা সম্পর্কে ধারণা রাখে, সত্বরই সে জানতে পারবে, এই আয়াতটি তৈলজাত সম্পদ গঠনের রহস্যের বর্ণনা দেয়। ভূতত্ত্ববিদদের ধারণা মতে, পৃথিবীতে সর্বপ্রথম উদ্ভিদ ছিল প্রকাণ্ড পর্ণাঙ্গ ও সামুদ্রিক শৈবাল। যদি এ সকল তৃণশ্রেণী যেমনটি ছিল তেমনটি বিদ্যমান থাকত, তবে আবহাওয়ায় অক্সিজেনের পরিমাণ অনিয়ন্ত্রিতভাবে বেড়ে যেত এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বায়ুমন্ডলে আগুন ধরে যেত। উল্লিখিত আয়াতটি এ কথারই ব্যাখ্যা প্রদান করে : ‘আপনার পালনকর্তা প্রত্যেক বস্তুকে তৈরি করেছেন সুপরিমিতভাবে।’ এভাবে প্রকাণ্ড পর্ণাঙ্গ ও শৈবালদাম পরবর্তীতে প্রবল ভূতাত্ত্বিক আলোড়নের মাধ্যমে মাটির নিচে চলে যায় এবং বিশেষ রাসায়নিক লঘুকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তেলে পরিণত হয়।
বর্তমানে এটা জ্ঞাত বিষয় যে, তৈলজাত খনিজ পদার্থগুলি প্রধানত গঠিত হয়েছিল বিভিন্ন জাতের ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণে এ সকল পর্ণাঙ্গ ও শৈবালের বিগলন ও পচনের মাধ্যমে, যা শিলাস্তরের ফাঁকে আটকে পড়ে। বর্তমানে একথাও আমাদের অজানা নয় যে, তৈলজাত পদার্থ কৃষ্ণ তরল পদার্থের রূপে ভূগর্ভস্থ নদীতে প্রবাহিত হয়। এই ভূ-অভ্যন্তরীণ প্রবাহকে বর্ণনা করার জন্য ‘বন্যার পানি’ই সবচেয়ে পরিষ্কার অভিব্যক্তি। এ কারণে এই আয়াত তৈলনদীর প্রবাহেরও বর্ণনা দেয়, যাকে ভূতত্ত্ববিদ্যার পরিভাষায় ‘oil migration’ বলা হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00