📄 মু’জিজা-২১: মহাশূন্য বিজয়
‘হে জিন ও মানবকুল, নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের প্রান্ত অতিক্রম করা যদি তোমাদের সাধ্যে কুলায় তবে অতিক্রম কর। তবে (আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে) ক্ষমতা ব্যতিরেকে তোমরা তা অতিক্রম করতে পারবে না। (রহমান, ৫৫ : ৩৩)
এই আয়াতের প্রকৃত অনুবাদ বুঝার জন্য কিছু ব্যাখ্যার প্রয়োজন। বাংলা ভাষায় ‘যদি’ (ইংরেজিতে if) শব্দটি এমন একটি শর্ত নির্দেশ করে যা, হয়তো সম্ভব কিংবা অসম্ভব ---। আরবি ভাষায় ‘যদি’ বুঝানোর জন্য একাধিক শব্দ ব্যবহৃত হয়। যখন ‘লাও’ (لَوْ) শব্দ ব্যবহৃত হয়, তা এমন একটি শর্ত নির্দেশ করে যা অসম্ভব। আর যখন ‘ইন’ (إِن) শব্দ ব্যবহৃত হয়, তা এমন একটি শর্ত নির্দেশ করে, যা সম্ভব। উপরিউক্ত আয়াতে কুরআন মাজিদ (إِن) ‘ইন’ শব্দ ব্যবহার করেছে। ‘লাও’ (لَوْ) শব্দ ব্যবহার করে নি। অতএব কুরআন মাজিদ ইঙ্গিত করছে, এক্ষেত্রে সম্ভাব্যতা বিদ্যমান রয়েছে যে, মানুষ একদিন নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের স্তরসমূহ ভেদ করতে পারবে। আরও লক্ষণীয় যে, নিম্ন লিখিত আয়াতেও মহাশূন্য ভেদ করার কথা উল্লেখ করে। কিন্তু তাতে ‘লাও’ (لَوْ) ব্যবহৃত হয়েছে—
‘আর যদি আমি ওদের সামনে আকাশের কোনো দরজাও খুলে দিই, আর তারা তাতে দিনভর আরোহণও করতে থাকে, তবুও তারা একথাই বলবে, আমাদের দৃষ্টির বিভ্রাট ঘটানো হয়েছে, না- বরং আমরা যাদুগ্রস্ত হয়ে পড়েছি।’ (হিজর, ১৫ : ১৪-১৫)
এই আয়াতটিতে মক্কার কাফিরদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে এবং বলা হয়েছে, এমনকি যদি তারা নভোমন্ডল ভেদ করতেও সক্ষম হয়, তারা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর বাণীকে বিশ্বাস করবে না। এই আয়াতে যে শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তা হচ্ছে ‘লাও’ (لَوْ) যা এমন সম্ভাবনার কথা বলে, যা বাস্তবায়িত হওয়ার নয়। ইতিহাস দেখিয়েছে, মক্কার কাফিররা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অসংখ্য মু’জিজা প্রত্যক্ষ করেছে। তথাপি তারা তিনি যে বার্তা নিয়ে এসেছিলেন তাতে বিশ্বাস স্থাপন করে নি।
ইতঃপূর্বে উদ্ধৃত আয়াত সম্পর্কে আরও একটি বিষয় লক্ষ করার আছে। তাতে আরবি শব্দ ‘তানফুযু’ (تَنفُذُوا) ব্যবহৃত হয়েছে, যার ক্রিয়ামূল হল ‘নাফাযা’ (نَفَذَ) যার পরে আরবি শব্দ ‘মিন’ (مِن) এসেছে। আরবি অভিধান অনুসারে এই বাকরীতির অর্থ হল, ‘সোজা অতিক্রম করা এবং একটি বস্তুর একদিকে প্রবেশ করে অন্যদিকে বেরিয়ে আসা। অতএব এটি নির্দেশ করে একটি গভীর অনুগমন এবং একটি বস্তুর অপরপ্রান্ত দিয়ে নির্গমন। এটি হুবহু তা-ই, যে অভিজ্ঞতা বর্তমানে মহাশূন্য বিজয়ের ক্ষেত্রে মানুষ লাভ করেছে। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি একটি বস্তু ছেড়ে দেয় এবং তা মহাশূন্যে তার বাহিরে নির্গমন করে। এভাবে কুরআন মাজিদ মহাশূন্য বিজয়ের বিস্ময়কর ঘটনা বর্ণনার ক্ষেত্রে সর্বাধিক উপযুক্ত শব্দ ব্যবহার করেছে। অধিকন্তু এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিকতথ্য, সর্বাধিক উপযুক্ত শব্দে, চৌদ্দশ বছরেরও পূর্বে এমন একজন নিরক্ষর মানুষের নিছক কল্পনা বলে আরোপিত হতে পারে না, যিনি তাঁর পুরো জীবন কাটিয়েছেন একটি মরুময় এলাকায়।
📄 মু’জিজাÑ২২: পৃথিবীর ডিম্বাকার কিংবা বর্তমান আকারের আকৃতি
‘অতঃপর তিনি (আল্লাহ) পৃথিবীকে দান করেছেন ডিম্ব আকৃতি।’ (নাযিয়াত, ৭৯ : ৩০)
এই আয়াতে যে আরবি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা হল ‘দাহাহা’ ' دَحَاهَا '। পুরনো অনুবাদগুলিতে এই আয়াতের অর্থ রয়েছে- ‘অতঃপর তিনি পৃথিবীকে বিছিয়ে দিয়েছেন।’ যেহেতু তারা পৃথিবীর আকৃতি-প্রকৃতি সম্পর্কে অবগত ছিলেন না তাই তারা দাহাহা (دَحَاهَا) শব্দটিকে ‘দাহবুন’ (دَحْوٌ) এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছিলেন এবং তার অর্থ করেছিলেন ‘প্রসারিত করা বা বিছিয়ে দেওয়া।’ ‘দাহা’ শব্দের প্রকৃত অর্থ ‘উটপাখির ডিম’। নিম্নে তার কিছু সাধিত শব্দ দেওয়া হল—
= আল-উদহিয়্যু (الأُدْحِيُّ) : উটপাখির ডিম।
= আল-উদহুয়্যাতু (الأُدْحُوَّةُ) : উটপাখির ডিমের স্থান।
= তাদাহহিয়ান (تَدَحِّيًا) : গর্তের মধ্যে একটি পাথর পতিত হওয়া।
আয়াতটি এভাবে পৃথিবীর গোলাকৃতি হওয়ার কথা পরিষ্কারভাবে নির্দেশ করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর উত্তর-দক্ষিণের ব্যাসের তুলনায় নিরক্ষীয় ব্যাসের আপেক্ষিক পার্থক্য এটিকে একটি বর্তুল আকৃতি কিংবা ডিম্ব আকৃতি দান করেছে। আরও পরিষ্কারভাবে বলতে গেলে, পৃথিবীর প্রকৃত আকৃতি গঠনে এই আকৃতিটি কিছুটা বিকৃত হয়েছে, যাকে বলা হয় 'Geoid', যা একটি নাশপাতির অনুরূপ। পৃথিবীর নিরক্ষীয় ব্যাসার্ধ হল ৬৩৭৮ কিলোমিটার, যেখানে তার মেরু অঞ্চলীয় ব্যাসার্ধ হল ৬৩৫৬ কিলোমিটার।
এই আয়াত থেকে একথাও বুঝা যায়, আদিকালে পৃথিবী এই আকৃতির ছিল না। পরবর্তীতেই এই আকৃতি প্রাপ্ত হয়। মহাকাশ বিজ্ঞানে পৃথিবীর বর্তমান আকার সম্পর্কে দুটি মতবাদ রয়েছে। প্রথম মতানুসারে, পৃথিবী ছিল সূর্য থেকে ছিটকে পড়া একটি টুকরো। দ্বিতীয় মতানুসারে, সূর্য ও পৃথিবী উভয়টিই একটি নীহারিকা থেকে গঠিত হয়েছে। উভয় মতই স্বীকার করে, প্রথম যখন পৃথিবী সৃষ্টি হয় তখন তাঁর বর্তমান আকার ছিল না। পরবর্তী সময়েই এটি ডিম্বাকার লাভ করেছে। এই আয়াতটি উভয় মতের সঙ্গে পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এই আয়াতের অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এটি সুরা ‘আন নাযিয়াত’ এরই একটি অংশ, যাকে 'Extractors' বা উৎপাটনকারীগণ শব্দে ভাষান্তরিত করা যেতে পারে। এই সুরায় সৃষ্টি সম্পর্কিত আরও কিছু রহস্য বর্ণিত হয়েছে। ২৮ থেকে ৩২ নং আয়াত পর্যন্ত আছে পৃথিবী সৃষ্টি সম্পর্কিত সংক্ষিপ্ত তথ্য।
৩১ নং আয়াতে আছে, ‘আর তিনি তা থেকে নির্গত করেছেন পানি ও চারণভূমি।’ অন্য কথায়, এই আয়াত বলে, পৃথিবী তাঁর ডিম্ব আকৃতি লাভ করার পর তাতে পানি প্রদান করা হয়েছিল। ফলে তা পৃথিবীর প্রথম শ্রেণীর উদ্ভিদ, যেমন- তৃণ বা ঘাস উৎপন্ন করেছিল। আধুনিককালের ভূতত্ত্ববিদরাও এখন এ কথা বিশ্বাস করেন যে, পৃথিবী বর্তুলাকৃতি লাভ করার পর বারিমন্ডল গঠিত হয়। সৃষ্টি হয় সাগর-মহাসাগর। অতঃপর ক্রমান্বয়ে উদ্ভিদরাজি উদ্গত হয়।
৩২ নং আয়াতে আছে, ‘আর পর্বতমালা, তিনি স্থাপন করেছেন সুদৃঢ়ভাবে।’
মহাবিশ্ব সৃষ্টির যে ক্রম পর্যায় কুরআন মাজিদে বর্ণিত হয়েছে ভূতত্ত্বসংক্রান্ত অধুনা ধারণাসমূহ তার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত।
📄 মু’জিজা নং- ২৩: বিচার দিবসে পৃথিবীর স্বরূপ
যেদিন পরিবর্তিত করা হবে এই পৃথিবীকে অন্য পৃথিবীতে এবং আসমানসমূহকে (অনুরূপভাবে) এবং লোকেরা একক, পরাক্রমশালী আল্লাহর সামনে পেশ হবে। (ইবরাহিম, ১৪ : ১৮)
যখন পৃথিবী (-এর আকৃতি) সম্প্রসারিত করা হবে এবং তা নিক্ষেপ করবে তার গর্ভস্থিত সবকিছু আর তা হয়ে যাবে শূন্যগর্ভ। (ইনশিক্বাক, ৮৪ : ০৩-০৪)
প্রথম আয়াতে যে আরবি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে তা হল ‘মুদ্দাত’ (مُدَّت) যার অর্থ করা যেতে পারে : প্রসারিত, সমতল বা চ্যাপ্টাকৃৎ, কিংবা চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে চওড়াকৃৎ। এই আয়াত বলে, বিচার দিবসে পৃথিবী হয়ে যাবে সমতল। অন্য কথায় এই আয়াত থেকে বুঝা যায়, বর্তমানে পৃথিবী সমতল অবস্থায় নেই। এই আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার সময়কাল হতে পারে ৬০৯ থেকে ৬২২ ঈসায়ি সালের মধ্যে। সে সময় একথা সার্বজনীনভাবে বিশ্বাস করা হত যে, পৃথিবী সমতল। প্রায় এক হাজার বছর পর পঞ্চদশ শতাব্দীতে কোপার্নিকাস এই তথ্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেন যে, পৃথিবী আমাদের গ্রহজগতের কেন্দ্রবিন্দু নয়। পরবর্তী সময়ে গ্যালিলিও গ্যালিলি কোপার্নিকাসের তথ্যকে সমর্থন করে ঘোষণা দেন যে, পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে পরিভ্রমণ করে এবং তা সমতল নয়; বরং গোলাকার। কুরআন মাজিদে এই বাস্তবতা অবতীর্ণ হয়েছে বহু শতাব্দী পূর্বে। পৃথিবী তার গোলাকৃতির কারণে, কখনো তার সমগ্র অংশে একই সময়ে দিন হয় না। তার যে অংশ সূর্যের দিকে মুখ করে থাকে তাতে দিন হয় এবং তার বিপরীত অংশে হয় রাত। পক্ষান্তরে, বিচার দিবসে একই সময়ে সারা পৃথিবীতে দিন থাকবে। এটি তখনই সম্ভব যখন পৃথিবীর আকৃতি গোলাকার থেকে সমতলে পরিবর্তিত হবে। এটা হুবহু তা-ই যা উপরে উদ্ধৃত দ্বিতীয় আয়াতে উল্লিখিত হয়েছে। যদি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে কুরআন রচনা করে থাকেন, তবে তিনি কিভাবে এ ধরনের জটিল প্রাকৃতিক রহস্য উদ্ঘাটনে সক্ষম হলেন?
📄 মু’জিজা নং- ২৪: ভূমির সংকোচন
তারা কি দেখে না যে, আমি ভূভাগকে তার প্রান্তসীমা থেকে ক্রমান্বয়ে সংকোচিত করে আসছি? আল্লাহ নির্দেশ দেন। তাঁর নির্দেশকে পশ্চাতে নিক্ষেপকারী কেহ নেই। তিনি দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। (রা’দ, ১৩ : ৪১)
যেমনটি ইতঃপূর্বে বর্ণিত হয়েছে, পূর্ব যুগের মুসলমানরা এই আয়াতটিকে কুরআন মাজিদের একটি রহস্য হিসেবে গ্রহণ করেছিল। যতদিন তাদের যথাযথ জ্ঞান ছিল না, তারা এই আয়াতের সুনির্দিষ্ট অর্থ প্রদান করতে চেষ্টা করে নি। অধুনা বৈজ্ঞানিক জ্ঞান আজ আমাদেরকে এই আয়াতের অর্থ অনুধাবন করতে ও ব্যাখ্যা দিতে সক্ষম করেছে।
এটি একটি জ্ঞাত বিষয় যে, মেরু অঞ্চলে জমাট বরফের স্তুপগুলি গলতে শুরু করেছে এবং সাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তা পর্যায়ক্রমে আরও ভূভাগকে ঢেকে ফেলছে। আয়াতে উল্লিখিত প্রান্তসীমা হল সমুদ্র উপকূলসমূহ। মেরু অঞ্চলের গলিত বরফের ফলে যতই সমুদ্রের উপকূল পানির নিচে তলিয়ে যাবে, ততই ভূভাগ বা পৃথিবী সংকোচিত হয়ে পড়বে। মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাথীরা চৌদ্দশ বছর পূর্বে আরব উপদ্বীপের মত একটি মরুভূমিতে বসে এই বিস্ময়কর তথ্য নিশ্চয় কল্পনা করতে সক্ষম ছিলেন না।