📄 মু’জিজা-১৪ : একক বস্তুরূপে মহাবিশ্বের উদ্ভব
কাফিররা কি দেখে না যে, আকাশ ও পৃথিবী ছিল একত্রে সংলগ্ন (একটি টুকরার মত), অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করলাম। (আম্বিয়া, ২১ : ৩০)
এই আয়াতে সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাআলা এমন একটি রহস্যের বর্ণনা দিয়েছেন যা বহু শতাব্দী পর্যন্ত বড় বড় প্রকৃতি বিজ্ঞানী ও মহাকাশ বিজ্ঞানীদের অগোচরে ছিল। কুরআন মাজিদ এই আয়াতে মহাবিশ্ব সৃষ্টির রহস্যকে ব্যক্ত করেছে দু’টি বিশেষ শব্দ ব্যবহার করে : ‘ফাতাক্ব’ ও ‘রাতাক্ব’। আরবি ভাষায় ‘রাতাক্ব’ শব্দের অর্থ হল বস্তুর বিভাজন ও ভাঙনের প্রক্রিয়া এবং ‘রাতাক্ব’ শব্দের অর্থ হল, একটি সমজাতীয় ক্ষেত্রে কিছু পদার্থকে একত্রিতভাবে বাঁধা ও গ্রথিত করা। যাহোক, আয়াতে বলা হয়েছে, মহাকাশ ও পৃথিবী প্রথমে একত্রে সংলগ্ন ছিল এবং পরবর্তীতে সেগুলি পৃথক হয়ে যায়।
মহাকাশ বিজ্ঞানের সাম্প্রতিক গবেষণা, বিশেষত মহাবিশ্ব সৃষ্টি সম্পর্কিত Big Bang তত্ত্ব কুরআন মাজিদের এই বর্ণনাকে সমর্থন করে। Big Bang তত্ত্বটি সর্বপ্রথম ১৯৫০ সালে রাল্ফ আলফার, হ্যানস বিথ ও জর্জ গ্যাস্মো কর্তৃক প্রস্তাবিত হয়। এই তত্ত্বানুসারে, গোড়াতে এই মহাবিশ্ব বস্তু ও শক্তির একটি অতি ঘন পিন্ডের আকৃতিতে একক ইউনিটরূপে কেন্দ্রীভূত ছিল। প্রায় পনের বিলিয়ন বছর পূর্বে একটি বিস্ফোরণ সংঘটিত হয়। যখন কেবল ১০-৩২ সেকেন্ডের মধ্যে মহাবিশ্ব তার পূর্ব আয়তনের ১০ থেকে ৩০ কিংবা তারও অধিক গুণ বেশি প্রসারিত হয়। এই আকস্মিক মহা-বিস্ফোরণের ফলে বস্তু ও শক্তির অতি ঘন পিন্ডটি টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ে, যা ভিন্ন ভিন্ন গতিতে ও ভিন্ন ভিন্ন দিকে ঘুরতে থাকে। অবশেষে বর্তমান মহাকাশের (মহাবিশ্বের) রূপ পরিগ্রহ করে। কুরআন মাজিদের এই আয়াতটি এ কথারই বর্ণনা দেয়- ‘আকাশ ও পৃথিবী ছিল একত্রে সংলগ্ন, অতঃপর আমি উভয়কে পৃথক করলাম।’
📄 মু’জিজা-১৫: আদি পিণ্ড বিভাজন ও বিক্ষেপণে সময় উপাদান
নিশ্চয় আমি (আল্লাহ) প্রত্যেক বস্তু সৃষ্টি করেছি পরিমিতরূপে, আমার কাজ তো এক মুহূর্তে, চোখের পলকের মত। (ক্বামর, ৫৪ : ৪৯-৫০)
উপরোক্ত আয়াতের বর্ণনার অনুরূপ, বিজ্ঞানীরা মনে করে, আদি পিণ্ড বিভাজন ও বিক্ষেপণে সময় লেগেছিল ১/১০-৩২ সেকেন্ডেরও কম। এই আয়াত বলে আল্লাহ তাআলার আদেশ, চোখের পলকের মত। অন্যকথায় বলা যায়, আমাদের বর্তমান মহাবিশ্ব গঠনে সময় লেগেছিল শূন্য সেকেন্ডের একটি ক্ষুদ্রতম ভগ্নাংশ। ১৯৭৭ সালে বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়েছিল এই আবিষ্কারের জন্য। অথচ কুরআন মাজিদ রহস্যের জট উন্মোচন করেছে বহু শতাব্দী পূর্বে।
📄 মু’জিজা-১৬: একাধিক বিশ্বের উপস্থিতি
সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি সকল বিশ্বের প্রতিপালক। (ফাতিহা, ০১ : ০১)
এটি কুরআন মাজিদের প্রথম সুরার প্রথম আয়াত। চৌদ্দশত বছর পূর্বে মানুষের মন, পৃথিবী, সৌর জগত কিংবা ছায়াপথসমূহ সম্পর্কে কোনো ধরনের স্বচ্ছ ধারণা করতে অক্ষম ছিল। এমতাবস্থায় কুরআন মাজিদের সর্বপ্রথম আয়াত বলে যে, আল্লাহ তাআলা সকল বিশ্বের অধিপতি, যা পৃথিবী ব্যতীত আরও একাধিক বিশ্বের উপস্থিতির সাক্ষ্য বহন করে। বস্তুত ‘সকল বিশ্বের অধিপতি’ কথাটি কুরআন মাজিদে সর্বমোট ৭৩ বার দেখা যায়। যেমন : সুরা ও আয়াত নং ২: ১৩১; ৬: ৪৫,৭১; ২৬: ১৬; ৩২: ০২; ৪১: ০৯; ৪৩: ৪৬; ৬৯: ৪৩ ইত্যাদি। বর্তমানে মানব সমাজ এ ব্যাপারে সম্যক অবহিত যে, পৃথিবী ছাড়া আরও গ্রহ রয়েছে। এই বিষয়টি জানা গেছে কেবল টেলিস্কোপ আবিষ্কার ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক উৎকর্ষ সাধনের মাধ্যমে। অথচ সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা তাঁর প্রিয়নবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর এই জ্ঞান অবতীর্ণ করেছেন মানুষ টেলিস্কোপ ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি আবিষ্কারের অনেক পূর্বে।
📄 মু’জিজা-১৭: বিংশ শতাব্দীর একটি বিস্ময়কর আবিষ্কার
কুরআন মাজিদ তিন প্রকারের সৃষ্টির কথা বারবার উল্লেখ করেছে : যেসব বিষয় বা বস্তু নভোমন্ডলে রয়েছে, যেসব বস্তু ভূমন্ডলে রয়েছে এবং যেসব বস্তু নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের মাঝখানে রয়েছে।
আমি নভোমন্ডল, ভূমন্ডল এবং এতদুভয়ের মাঝখানে যা কিছু আছে তা যথার্থভাবেই সৃষ্টি করেছি। (হিজর, ১৫ : ৮৫)
নভোমন্ডলে, ভূমন্ডলে, এতদুভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে এবং সিক্ত ভূগর্ভে যা আছে তা তাঁরই। (ত্বাহা, ২০ : ০৬)
নভোমন্ডল, ভূমন্ডল ও এতদুভয়ের মাঝে যা আছে, তা আমি ক্রীড়াচ্ছলে সৃষ্টি করিনি। (আম্বিয়া, ২১ : ১৬)
কুরআন মাজিদের আরও কিছু আয়াত সেসব বস্তুর নির্দেশ করে যা আল্লাহ তাআলা নভোমন্ডল ও ভূমন্ডলের মাঝখানে সৃষ্টি করেছেন। যেমন : ২৫:৫৯; ৩২:০৪; ৪৩:৮৫; ৪৪:০৭, ৩৮; ৪৬:০৩; ৫০:৩৮; এবং ৭৮:৩৭।
মহাকাশ বিজ্ঞান সংক্রান্ত আমাদের সাম্প্রতিক জ্ঞানের ভিত্তিতে আমরা বর্তমানে কুরআন মাজিদে বারংবার উল্লিখিত এসব বিষয়ের ব্যাখ্যার একটি পর্যায়ে রয়েছি। বৈজ্ঞানিকগণ সাম্প্রতিক সময়ে মহাশূন্যে ছায়াপথ বহির্ভূত বস্তুর উপস্থিতি আবিষ্কার করেছে। আমাদের মহাবিশ্বের মৌলিক গঠন প্রক্রিয়ায় সংযুক্তি ও একীভূত হওয়ার পর বিভাজন ও বিক্ষেপণের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। যেমনটি ইতঃপূর্বে বর্ণিত হয়েছে, কুরআন মাজিদ মহাবিশ্বের গঠন প্রক্রিয়ার বর্ণনা দিয়েছে সর্বাধিক উপযুক্ত আরবি শব্দ ‘ফাতাক্ব’ (বিভাজন) ও ‘রাতাক্ব’ (সংযুক্তি)- এর মাধ্যমে। ‘রাতাক্ব’ (সংযুক্তি)- এর প্রাথমিক প্রক্রিয়ার সময় কিছু টুকরো মহাশূন্যের বাইরে থেকে গিয়েছিল। এগুলিকেই বর্তমানে আন্তঃছায়াপথীয় বস্তু বলা হয়। মহাকাশ বিজ্ঞানীরা অতি সম্প্রতি সেসসবের উপস্থিতি শনাক্ত করতে পেরেছে। পক্ষান্তরে কুরআন মাজিদ এসব বিক্ষিপ্ত টুকরার উপস্থিতির স্বীকৃতি দিয়েছে বহু শতাব্দী পূর্বে।