📘 160_muziza_of_quran > 📄 মু’জিজা : ১ থেকে ১২ পর্যন্ত

📄 মু’জিজা : ১ থেকে ১২ পর্যন্ত


যদি আমরা কেবল কুরআন মাজিদের ভাষা‍কেই বিবেচনায় আনি এবং সাধারণ বোধ, বিচার-বুদ্ধি ও যুক্তির নিরিখে তা পর্যালোচনা করি তবে আমাদের একথা স্বীকার না করে উপায় থাকে না যে, কোনো মানুষ এধরনের নিখুঁত ও অনুপম ভাষা রচনা করতে পারে না। অধিকন্তু আমাদের স্মরণ রাখা উচিত, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম লিখতে-পড়তে জানতেন না। বাস্তবতা হল, এমনকি তিনি নিজের নামটি পর্যন্ত স্বাক্ষর করতে জানতেন না। তাঁর চারপাশে কোনো শিক্ষিত শ্রেণীও ছিল না। তাছাড়া আরব উপদ্বীপের বাইরে তিনি তেমন সফরও করেন নি, যেখানে তিনি ভাষার ওপর পান্ডিত্য অর্জন করতে পারেন। তথাপি কুরআন মাজিদের ভাষা এক অনুপম বিস্ময় এবং তা নিজেই একটি মিরাকল বা মু’জিজা। সরল যুক্তি ও সাধারণ বোধসম্পন্ন ব্যক্তিমাত্রই এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে, হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআন মাজিদের গ্রন্থকার বা রচয়িতা হতে পারেন না। বরং এটি এমন একটি গ্রন্থ যা তাঁর প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞাতা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে। নিম্নে যা পেশ করা হল তা আল কুরআনের ভাষাগত মু’জিজাসমূহের সামান্য নমুনামাত্র।

মু’জিজা-০১
যে সময় কুরআন অবতীর্ণ হচ্ছিল, তৎকালীন আরবি গদ্য ও পদ্য সাহিত্য সমসাময়িক আরব পরিবেশ, সংস্কৃতি, প্রথা ও ইতিহাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। এভাবে অধিকাংশ আরবি সাহিত্য গড়ে উঠেছিল উট, ঘোড়া, নারী, গোত্রপতি, গোত্রীয় সংঘাত ও গোত্রীয় ইতিহাস ইত্যাদি বিষয়ের বিবরণ কিংবা প্রশংসার ওপর ভিত্তি করে। যা হোক, কুরআন মাজিদ এমন কোনো কিছুর বিবরণ দেয় না, যা তৎকালীন আরবীয় পরিবেশ, সংস্কৃতি, ইতিহাস ইত্যাদির প্রতিফলন বলে বিবেচিত হতে পারে। তাছাড়া কুরআন মাজিদ বিভিন্ন বিষয় ও ঘটনার বর্ণনার ক্ষেত্রে তার নিজস্ব বিশেষ শব্দ ও পরিভাষা ব্যবহার করেছে। এসব শব্দ ও পরিভাষার অধিকাংশই তৎকালীন সমসাময়িক লেখকদের জানা ছিল না। যেমন, কুরআন মাজিদ তার অধ্যায় বর্ণনার ক্ষেত্রে সুরা এবং তার চরণ বুঝানোর জন্য ‘আয়াত’ শব্দ ব্যবহার করেছে। অথচ তৎপূর্বেকার আরবি বইসমূহে অধ্যায় বুঝানোর জন্য ‘কাসিদা’ এবং চরণ বুঝানোর জন্য ‘বায়ত’ পরিভাষা ব্যবহৃত হত।

মু’জিজা-০২
আরবি কবিতা ও গদ্য যখন কোনো বিষয় বা ঘটনার বর্ণনা দেয়, প্রায়ই তাতে এমন অতিরঞ্জনের আশ্রয় নেয়া হয় যে, প্রকৃত ঘটনা‍ই প্রচ্ছন্ন ও অস্পষ্ট হয়ে যায়। এটি আরবি ভাষার একটি সহজাত প্রবণতা। তবে কুরআন মাজিদের ভাষা কোনো কিছুকেই অতিরঞ্জিত আকারে ব্যক্ত করে না। বস্তুত কুরআন মাজিদের ভাষা এই বিচারে অনুপম যে, তা আরবি ভাষার স্বাভাবিক রীতি ও সহজাত প্রবণতার অনুসরণ করে না।

মু’জিজা-০৩
সকল কবিতা ও কাব্যধর্মী লেখার ক্ষেত্রে এটি একটি বাস্তবতা যে, তার অল্প কিছু বাকরীতি কিংবা চরণ, শব্দ ও প্রবাদ-প্রবচনের বিচারে অন্যগুলির তুলনায় মানসম্পন্ন হয়ে থাকে। কুরআন মাজিদ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কাব্যধর্মী ভাষায় অবতীর্ণ হয়েছে। এতদসত্ত্বেও তার সকল আয়াত ও সুরা সমভাবে সবাক, সুন্দর ও হৃদয়গ্রাহী। এমন সুন্দর, অনুপম রচনাশৈলী ও ভাষার স্বচ্ছन्द গতিসম্পন্ন ৬,৬৩৬ আয়াতের একটি গ্রন্থ রচনা করা কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়।

মু’জিজা-০৪
যদি একটি নির্দিষ্ট ধারণা কিংবা ঘটনাকে একই গ্রন্থে বারবার উল্লেখ করা হয়, ভাষা সাধারণত শ্রুতিকটু ও একঘেয়ে হয়ে পড়ে এবং এতে তার সৌন্দর্যও হারিয়ে যায়। এটি কুরআন মাজিদেরই একমাত্র বৈশিষ্ট্য যে, বহু ধারণা ও ঘটনাকে পুনঃপুনঃ বর্ণনা করার পরও কুরআনিক ভাষা তার সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ রেখেছে। কিছু বিষয় যেমন : আল্লাহ তাআলার একত্ববাদ, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়াত, কিয়ামত দিবস, মুমিনের গুণাবলি, নামাজ, দান-দখিনা ইত্যাদি কুরআন মাজিদের অধিক পুনরাবৃত্ত বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। যাহোক কেহ এসব বিষয়ের বর্ণনার ক্ষেত্রে শব্দ ও বাকরীতির ন্যূনতম একঘেয়েমিও অনুভব করে না। পক্ষান্তরে এসব বিষয়ের প্রতিটি বিবরণ শব্দ চয়ন ও ভাষার সৌন্দর্যের বিচারে অনুপম ও স্বতন্ত্র। আমরা তাতে কোনো ধরনের শব্দ কিংবা বাকরীতির দ্বিরুক্তি লক্ষ করি না। এমনকি যদিও কুরআন মাজিদ একই ঘটনা কিংবা ধারণার পূণবর্ণনা দেয়।

মু’জিজা-০৫
কুরআন মাজিদে আলোচিত অধিকাংশ বিষয়ই আকাইদ বা বিশ্বাস, নীতি-নৈতিকতা, ব্যক্তিগত আচরণ, সামাজিক বাধ্যবাধকতা, নৈতিক বিষয় ও মানবিক ইতিহাস ইত্যাদির সঙ্গে সম্পর্কিত। এ পর্যন্ত কোনো মানুষই এ ধরনের বিষয়ের ওপর কাব্যগ্রন্থ রচনা করে নি। পক্ষান্তরেব কুরআন মাজিদ এ ধরনের বিষয়ের আলোচনা পেশ করেছে এমন কাব্যধর্মী ভাষায় যা তার ছন্দে, সৌকর্যে ও রচনাশৈলীতে অতুলনীয়।

মু’জিজা-০৬
একজন (মানুষ) লেখক সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট বিষয় কিংবা কিছু পারস্পরিক সম্পর্কিত বিষয় সম্পর্কে জ্ঞানগত নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। যেমন - কেহ ইতিহাস কিংবা অর্থনীতি কিংবা দর্শন কিংবা পদার্থ বিদ্যা কিংবা নীতিশাস্ত্র ইত্যাদি বিষয়ে লিখতে পারে। বহুসংখ্যক পরস্পর সম্পর্কিত নয় এমন বিভিন্ন জ্ঞানশাস্ত্রের ওপর যুগপৎভাবে কলম ধরা ভাষার সমান স্বচ্ছन्द গতিধারা অক্ষুণ্ণ রেখে ও জ্ঞানের পূর্ণতার মাধ্যমে- কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এমনকি একজন সাধারণ পাঠকও দেখতে পারে, কুরআন মাজিদ ইতিহাস, দর্শন, অর্থনীতি, আকাইদ, সামাজিক বিধান, বিজ্ঞান ইত্যাদি বহুসংখ্যক বিষয়ে আলোচনা করেছে, ভাষার সমান স্বচ্ছन्द গতিধারা ও জ্ঞানগভীরতার সঙ্গে। তাছাড়া জ্ঞানের যে শাখা সম্পর্কেই কুরআন মাজিদ যা কিছু বর্ণনা দিয়েছে তা চিরন্তন সত্য হিসেবে সদা প্রমাণিত। কুরআন মাজিদের কোনো সাধারণ বিবরণের ক্ষেত্রেও কখনও কোনো ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া যায় নি। এমন সুনিপুণ ও নিশ্চিত জ্ঞানের ভিত্তিতে কোনো মানুষই এমন একটি সমন্বিত গ্রন্থ রচনা করে নি, করতে পারে না।

মু’জিজা-০৭
একটি মানব‍রচিত গ্রন্থ সেই জ্ঞানেরই প্রতিনিধিত্ব করে যা একজন লেখকের জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় ও স্থানে সুলভ হয়। মানুষের জ্ঞানের পরিধি নিত্যপ্রসার লাভ করছে। এজন্য মানব‍রচিত প্রত্যেকটি বই-ই কিছুদিন পর অচল হয়ে যায়। একটি সময়সীমা পার হয়ে যাওয়ার পর একটি বইয়ে গ্রন্থিত জ্ঞান হয়তো মিথ্যা প্রমাণিত হয় কিংবা তা অসম্পূর্ণ বলে বিবেচিত হয়। মানবজাতিকে কুরআন মাজিদ প্রদান করা হয়েছে সাড়ে চৌদ্দশত বছর পূর্বে। এই সময়ের মধ্যে মানুষের জ্ঞানে বহু পরিবর্তন ও উন্নতি সাধিত হয়েছে। যাহোক এটি একটি বাস্তবতা যে, কুরআন মাজিদের একটি একক শব্দ, প্রবাদ-প্রবচন, বাক্য কিংবা বিষয়বস্তুকে সংস্কার কিংবা পুনর্লিখনের প্রয়োজন পড়ে নি। তাছাড়া কুরআন মাজিদ প্রকৃতি ও মানুষের সুন্দরতম রহস্য সম্পর্কেও আলোচনা করেছে। এটিও একটি বাস্তব সত্য যে, বিগত চৌদ্দশ বছরের অধিককালে বিভিন্ন আবিষ্কার-উদ্ভাবন এবং বিজ্ঞানের নিরিখে কোনো সাধারণ অমিল কিংবা তারতম্য খুঁজে পাওয়া যায় নি। উল্লেখ থাকে যে, বর্তমান পর্যন্ত বাইবেলের বহুসংখ্যক সংস্করণ সাধিত হয়েছে। তথাপি বর্তমানেও তার মধ্যে বিজ্ঞানের সঙ্গে বহু সাংঘর্ষিক বিষয় রয়েছে।

মু’জিজা-০৮
একজন সফল লেখক সর্বদা পাঠকের রুচি-বৈচিত্র্যের ভিত্তিতে নিজের লেখার স্টাইল ও ভাষা পরিবর্তন করে থাকেন। যা একজন তরুণের মনে আবেদন সৃষ্টি করে, একজন বৃদ্ধলোকের মনে সৃষ্টি করে না। তেমনিভাবে যা একজন মূর্খ ব্যক্তির মনে আবেদন সৃষ্টি করে, একজন শিক্ষিত লোকের মনে আবেদন সৃষ্টি করে না। তাছাড়া জ্ঞান ও বুদ্ধিমত্তার বিচারেও সমাজে নানা স্তরের মানুষ রয়েছে। এসব লোক ভিন্ন ভিন্ন ধাঁচের লেখার মাধ্যমে আলোড়িত হয়ে থাকে। যেমন, একজন সুখীমানুষ যা পড়তে ভালবাসে তা একজন অসুখী মানুষ যা পড়তে ভালবাসে তা থেকে ভিন্ন। কিছু লোক কবিতা পড়তে ভালবাসে, অন্যরা ভালবাসে গদ্য পড়তে। অন্য কিছু লোক সাদামাটা ভাষা পড়তে ভালবাসে, পক্ষান্তরে অন্যকিছু লোক ভালবাসে গুরুগম্ভীর ধাঁচের লেখা পড়তে। কোনো ব্যক্তিই এমন কোনো গ্রন্থ রচনা করেনি যা মানব সমাজের সকল বিভাগ, বয়স, শিক্ষার মান ও বিভিন্ন রুচির মানুষের মনে আবেদন সৃষ্টি করতে পারে। তাদেরকে আলোড়িত ও অনুপ্রাণিত করতে পারে। কুরআন মাজিদই একমাত্র গ্রন্থ যা মানব সমাজের সকল পর্যায় ও ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর মানুষের প্রয়োজন সার্বজনীনভাবে পূরণ করেছে। একটি বিপুল সংখ্যক মানুষকে সম্বোধন ও তাদের অন্তরাত্মায় আবেদন সৃষ্টি করা এবং তাদেরকে নিরাপত্তা ও শান্তি প্রদান করার এই অতুলনীয় যোগ্যতা কুরআন মাজিদের ভাষার একটি বিশেষ ‘মিরাকল’ বা মু’জিজা।

মু’জিজা-০৯
যদি একজন মানুষ বছরের পর বছর লিখা অব্যাহত রাখে, সে তার লেখার স্টাইল, তার ধারণা ও চিন্তা-চেতনার মধ্যে একটি ক্রমশ পরিবর্তন দেখতে পারে। এভাবে কেবল ভাষার মধ্যেই নয়, বরং একজন লেখকের দর্শন ও মতামতের ক্ষেত্রেও সময়ের একটি পর্যায় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সচরাচর পরিবর্তন দেখা যায়। কুরআন মাজিদ হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর ২৩ বছরব্যাপী সময়ের মধ্যে অল্প অল্প করে অবতীর্ণ হয়েছে। যদি হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআন মাজিদের লেখক হতেন, তবে তাঁর প্রথম দিকের লিখনির সঙ্গে পরবর্তী সময়ের লেখনির নিশ্চিত কিছু ভিন্নতা পরিলক্ষিত হত এবং সময়ের পালাবদলের সঙ্গে দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তা-চেতনা প্রকাশের ক্ষেত্রেও পরিবর্তন ও অনৈক্য দেখা দিত। যা হোক বাস্তবতা হল, কুরআন মাজিদের প্রথম দিককার ও পরবর্তী সময়ের অবতীর্ণ আয়াতসমূহের ভাষার মধ্যে কোনো ধরনের পরিবর্তন দৃষ্টিগোচর হয় না। অধিকন্তু প্রথম দিকের ও পরবর্তী সময়ে অবতীর্ণ আয়াতসমূহের ভাষ্য ও দর্শনের ক্ষেত্রেও কোনো তারতম্য দেখা যায় না।

মু’জিজা-১০
একজন (মানব) লেখক প্রায়ই তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশের পরিবর্তিত অবস্থার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। যা পরবর্তীতে তার আবেগ-অনুভূতিকে আলোড়িত করে। আর তা পরবর্তীতে তার লেখার স্টাইল ও স্বরূপে প্রতিফলিত হয়। কবিদের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি অধিক বেশি সত্য। কেননা, কবিতা সর্বদা লেখকের মনন-মেজাজ ও আবেগের প্রতিফলন ঘটায়। উল্লিখিত বাস্তবতার নিরিখে বলা যায়, কুরআন মাজিদ কাব্যধর্মী ভাষায় লিখিত হয়েছে, এ কথা লক্ষ্যণীয় যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর দীর্ঘ ২৩ বছরের মিশনে অনেক ব্যক্তিগত বিপদাপদ ও বিজয়ের মধ্য দিয়ে পথ অতিক্রম করেছেন। তিনি নবুওয়াতের সপ্তম বছরে নিদারুণ কষ্ট ও কঠোরতার সম্মুখীন হন, যখন তিনি ও তাঁর সকল আত্মীয়-পরিজন মক্কা থেকে বহিষ্কৃত হন এবং তিন বছর যাবত জীবনের সবধরনের মৌলিক প্রয়োজন থেকে বঞ্চিত থাকেন। পক্ষান্তরে ৮ম হিজরিতে তিনি একটি গৌরবময় বিজয় উপভোগ করেন। যখন তিনি ১০,০০০ (দশ হাজার) মুসলিম সৈন্যদলের প্রধান হিসেবে মক্কায় প্রবেশ করেন এবং মক্কার সকল আত্মসমর্পণকারী লোককে সদয়ভাবে গ্রহণ করেন। যদি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআন মাজিদের লেখক হতেন তবে তাঁর নবুওয়াতি মিশনের বিভিন্ন পরিস্থিতি ও সময়ে তাঁর ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতিসমূহ কুরআনের ভাষায় প্রতিফলিত হত। কিন্তু বাস্তব সত্য হল, কুরআন মাজিদের স্টাইল কিংবা রচনাশৈলীতে এসবের কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না- মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর জীবনের বিভিন্ন স্তরে যেসব সংঘাত, অত্যাচার, অবিচার, কঠোরতা কিংবা বিজয়ের অভিজ্ঞতা লাভ করেছেন। সব ধরনের পরিবেশগত উত্থান-পতন ও পরিবর্তনের ছোঁয়া থেকে বেঁচে থেকে কুরআন মাজিদের ভাষা এখনও পর্যন্ত স্বমহিমায় অটল-অবিচল।

মু’জিজা-১১
কেবল কুরআন মাজিদের পাঠরীতিও একটি মু’জিজা ধারণ করে আছে। অন্য কোনো বইয়ের ভাষার ক্ষেত্রে তেমনটি দেখা যায় না। বিষয়টি বুঝার সুবিধার্থে একটি সাধারণ দৃষ্টান্ত দেয়া প্রয়োজন। দৃষ্টান্ত হিসেবে আমরা একটি ইংরেজি বইয়ের পঠনকে বিবেচনায় আনি। একটি ইংরেজি বইয়ের একটি পৃষ্ঠা কিছু লোককে দেয়া যাক, যাদের মাতৃভাষা ইংরেজি। কিন্তু তারা ভিন্ন ভিন্ন দেশের অধিবাসী। যেমন : ইংল্যান্ড, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড। তাদের প্রত্যেককে একই বইয়ের একটি পৃষ্ঠা পড়তে দেয়া যাক। দেখা যাবে প্রত্যেক ব্যক্তি পৃষ্ঠাটিকে ভিন্ন ভিন্ন উচ্চারণশৈলীতে পড়ছে। এখন কিছু ক্বারি (যারা কুরআন মাজিদের তেলাওয়াত শিক্ষা করেছেন) নেয়া যাক, যাদের মাতৃভাষা আরবি নয়। যেমন : বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ঘানা, কানাডা, ফিলিপাইন ইত্যাদি। তাদেরকে কুরআন মাজিদের একটি পৃষ্ঠা পাঠ করতে বলা হোক। তাদের মাতৃভাষা আরবি নয় এবং তারা পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের অধিবাসী এতদসত্ত্বেও তাদের প্রত্যেকেই একটি বিশুদ্ধ অভিন্ন উচ্চারণে কুরআন মাজিদ পাঠ করবে। এটি কুরআন মাজিদের অন্য একটি মু’জিজা যে, যেসব লোকের মাতৃভাষা আরবি নয় এবং যারা কুরআন মাজিদের ভাষাও বুঝে না, তারা এটিকে একটি বিশুদ্ধ অভিন্ন রীতিতে, একই উচ্চারণশৈলীতে তেলাওয়াত করে।

মু’জিজা-১২
কুরআন মাজিদের একটি সমুজ্জ্বল ও অনন্য মু’জিজা হল, তার ভাষা এখনও সজীব। এখনও কুরআন মাজিদ সেই একই ভাষায় পড়া ও বুঝা যায় যে ভাষায় তা আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশ বছর পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছিল। পক্ষান্তরে সে যুগের মানুষের সকল ভাষাতেই পরিবর্তন এসেছে। একথা অনস্বীকার্য যে, একটি সময়ের পালাবদলে বহু শব্দ, বাগধারা ও প্রবাদ-প্রবচন অকেজো হয়ে যায়; শব্দের অর্থ ও তাদের বানানরীতিতে পরিবর্তন আসে এবং প্রত্যেক ভাষার শব্দ ভান্ডারে কিছু নতুন শব্দ সংযোজিত হয়। সর্বোপরি শব্দের ব্যবহার, প্রবাদ বাক্য এবং বাক্যের গঠনশৈলীতেও পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। কুরআন মাজিদের একটি জীবন্ত মু’জিজা চৌদ্দশ বছরের অধিককাল পরেও এই আসমানি কিতাবের না এক শব্দ, প্রবাদ বাক্য কিংবা বাগধারা অব্যবহৃত হয়ে গেছে, আর না তার প্রকৃত অর্থ হারিয়ে গেছে। যদিও আরবি ভাষা স্বাভাবিক গতি পরিবর্তন প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে পথ অতিক্রম করেছে, কুরআনের ভাষা তার সৌন্দর্য ও বাচনভঙ্গির মানদণ্ডে এখনও স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল।
উপরোল্লিখিত বাস্তবতার নিরিখে দু’টি সাধারণ প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে। মানুষ কি এমন একটি সার্বজনীন ভাষা রচনা করতে সক্ষম, যা ১৪০০ (চৌদ্দশ) বছর পর্যন্ত জীবন্ত ও মানুষের বোধগম্য থাকতে পারে? দ্বিতীয় প্রশ্নটি হল, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মত একজন ব্যক্তি যিনি না জানেন পড়তে, না জানেন লিখতে, না জানেন নিজের নামটি পর্যন্ত দস্তখত করতে-কিভাবে তিনি এমন একটি শাশ্বত রচনাশৈলী উপস্থাপন করতে পারেন? উভয় প্রশ্নের উত্তরই খুব সুনিশ্চিত। এমন শাশ্বত ও চিরন্তন ভাষা না কোনো মানুষ লিখেছে, আর না কোনো মানুষ লিখতে সক্ষম? কেবলমাত্র সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞাতা আল্লাহ তাআলারই এ ধরনের চিরন্তন ও সর্বাঙ্গসুন্দর পরিপূর্ণ ভাষা রচনার শক্তি ও ক্ষমতা রয়েছে।
এই আলোচনার প্রেক্ষিতে উপসংহার টানা যায় যে, কুরআনের মতো একটি গ্রন্থ রচনা করা মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পক্ষে মানবীয়ভাবে সম্ভব ছিল না। কুরআন মাজিদের ভাষা এমনসব মিরাকল ও মু’জিজা ধারণ করে যা বিচার বুদ্ধি ও যুক্তির নিরিখে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে না। এসব মু’জিজা এই বাস্তব সত্যকে প্রমাণ করে যে, কুরআন মাজিদ সর্বজ্ঞাতা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অবতীর্ণ আসমানি গ্রন্থ। আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে এমন সমুজ্জ্বল মু’জিজাসমূহ এজন্য রেখেছেন যাতে মানুষ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে এটিকে আসমানি হেদায়েত ও নির্দেশনা হিসেবে গ্রহণ করে এবং এটির নির্দেশনা অনুসারে নিজেদের জীবন গঠন করে।
কুরআন মাজিদে ইরশাদ হয়েছে, ‘বলুন, যদি মানুষ ও জিন জাতি এ মর্মে একতাবদ্ধ হয় যে, তারা কুরআনের মত একটি গ্রন্থ (তৈরি করে) নিয়ে আসবে, তারা কিছুতেই তার মত রচনা করতে সক্ষম হবে না। এমনকি যদিও তারা (এ ব্যাপারে) পরস্পর পরস্পরের সহায়ক হয়।’ (বনি ইসরাইল, ১৭ : ৮৮)
তিনিই তোমার ওপর কিতাব নাজিল করেছেন, তার মধ্যে আছে মুহকাম আয়াতসমূহ। সেগুলো কিতাবের মূল, আর অন্যগুলো মুতাশাবিহ্। ফলে যাদের অন্তরে রয়েছে সত্যবিমুখ প্রবণতা, তারা ফিতনার উদ্দেশ্যে এবং ভুল ব্যাখ্যার অনুসন্ধানে মুতাশাবিহ্ আয়াতগুলোর পেছনে লেগে থাকে। অথচ আল্লাহ ছাড়া কেহ এর ব্যাখ্যা জানে না। আর যারা জ্ঞানে পরিপক্ক, তারা বলে, আমরা এগুলোর প্রতি ঈমান আনলাম, সবগুলো আমাদের রবের পক্ষ থেকে। আর বিবেক সম্পন্নরাই উপদেশ গ্রহণ করে। (আলে ইমরান, ০৩ : ০৭)

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00