📄 তাবেঈদের শাসনামল (সাহাবায়ে কিরামের পরবর্তী যুগ) :
সপ্তম শতাব্দীতে আরবি যে পান্ডুলিপি ব্যবহৃত হত, উদাহরণ স্বরূপ- রাসুল সা. ও সাহাবায়ে কেরামের যুগে তা ছিল নিতান্ত মৌলিক প্রতীক সর্বস্ব। যা কেবল শব্দের ব্যঞ্জনবর্ণীয় রূপেই ব্যক্ত হত। কিন্তু তাতে শব্দের পরিষ্কার উচ্চারণ নির্দেশক চিহ্নগুলো ছিল না। ফলে তা কেবল একজন আরবি ভাষায় পারঙ্গম ব্যক্তিই পড়তে পারত। তাবেঈদের সময়ে দুপ্রকার গুরুত্বপূর্ণ চিহ্নের শুরু হয় যা কুরআন মাজিদের অভিন্ন উচ্চারণকে আরও নিশ্চিত করে। পারিভাষিকভাবে এ লোকে ‘নুকতা’ ও ‘হরকত’ বলা হয়। ‘হরকত’ বলা হয় এমন কিছু বিশেষ চিহ্নকে যা স্বরবর্ণকে নির্দেশ করে। আরবিতে এগুলিকে ‘ফাতহা’, ‘কাসরা’ ও ‘যাম্মা’ বলে এবং বাংলায় যের, যবর ও পেশ বলে। ইসলামের প্রাথমিক যুগের লিখন পদ্ধতিতে এগুলি ব্যবহৃত হত না। তাবেঈগণই উসমান রা. কর্তৃক সংকলিত কুরআন মাজিদে এই চিহ্নগুলি সংযুক্ত করে। এভাবে প্রত্যেকটি শব্দ সুস্পষ্টভাবে পড়া যেতে পারে। যেমন, ‘বা’ কে ‘বা’ ‘বি’ ‘বু’ রূপে পড়া যায়। ‘নুকতা’ হল, প্রত্যেক শব্দের সঙ্গে যথোপযুক্ত বিন্দু বা বিন্দুসমূহ সন্নিবেশিত করা। যেমন : ‘বা’ এর নিচে একটি বিন্দু দেয়া হত, এবং ‘ইয়া’-এর নিচে দু’টি বিন্দু দেয়া হত। অনুরূপভাবে ‘তা’ ও ‘ছা’ এর উপরে পর্যায়ক্রমে দু’টি ও তিনটি বিন্দু দেয়া হত। এই স্মরণীয় কাজ সম্পাদিত হয় উমাইয়া যুগের পঞ্চম খলিফা আব্দুল মালিকের আমলে (৬৬-৮৬ হি. মোতাবেক ৬৮৫-৭০৫)। বর্ণিত আছে, কুফার গভর্নর হাজ্জাজ বিন ইউসুফ আরবি ভাষায় সুপন্ডিত দু’জন ব্যক্তি- যাদের নাম ইয়াহইয়া বিন আমের এবং নাসর বিন আসেম- কে এই কাজ সম্পন্ন করার আদেশ দেন। ‘হরকত’ ও ‘নুকতা’র সংযোজন কুরআন তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে একটি পরিপূর্ণ সমতা ও অভিন্নতা নিশ্চিত করে। এমনকি যাদের মাতৃভাষা আরবি নয় তাদের ক্ষেত্রেও। उपरोक्त আলোচনায় থেকে এ কথা প্রতীয়মান হল যে, কুরআন মাজিদ মুমিনদের মাঝে দু’টি ভিন্ন ও স্বতন্ত্র কৌশল ও পদ্ধতিতে বিশ্বস্ততার সঙ্গে সংরক্ষিত ও বর্ণিত হয়ে এসেছে। যথা : বাচনিক ও লিখিত পদ্ধতি। কুরআনের বাচনিক বর্ণনার ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে নি, তবে তার লিখিত বর্ণনার ক্ষেত্রে কিছু উন্নতি বিধান করা হয়েছে। এই উন্নতি বিধান কেবল তার বিষয়বস্তু সংহত করে নি; বরং কুরআন মাজিদের তেলাওয়াতের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ও শাশ্বত ঐক্য ও অভিন্নতা নিয়ে এসেছে। বাস্তবতা হল, বিগত চৌদ্দশ বছরের মধ্যে তার এই বর্ণনার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্রও পরিবর্তন সাধিত হয় নি- যা বর্তমান পৃথিবীতে বিদ্যমান মূল ও আদিগ্রন্থ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে। একই সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানের কতিপয় হাফেজ থেকে কুরআনের তেলাওয়াত শোনার মাধ্যমেও তা নিশ্চিত হওয়া যেতে পারে। এভাবে কুরআন মাজিদ দু’টি স্বতন্ত্র প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ভরযোগ্যতার অভিধা লাভ করেছে। যথা : লিখার মাধ্যমে গ্রন্থরূপে এবং মুখস্থ করার মাধ্যমে বাচনিকভাবে। বস্তুত কুরআন মাজিদই একমাত্র খোদায়ি গ্রন্থ যা নির্ভরযোগ্যতার মানদণ্ডে পরিপূর্ণভাবে উত্তীর্ণ হয়েছে।
📄 কুরআন মাজিদের প্রামাণ্যটা
কুরআন মাজিদের প্রামাণ্যতা প্রতিষ্ঠার জন্য এ কথা প্রমাণ করা আবশ্যক যে, তা আল্লাহ তাআলার বাণী এবং এভাবে একটি আসমানি গ্রন্থের ব্যাপারে একথা বলাবাহুল্য যে, মানুষের কাছে এমন কোনো উপকরণ এবং কৌশল নেই যার মাধ্যমে বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও প্রযুক্তির ভিত্তিতে তা প্রমাণ করা যেতে পারে। যা হোক, সাধারণ বোধ, কার্যকারণ, যুক্তি এবং বুদ্ধিমত্তার ভিত্তিতে কেহ এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। অনুরূপভাবে কুরআনের প্রামাণ্যতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও যে কেহ কিছু ভিন্ন ভিন্ন পন্থা গ্রহণ করতে পারে।