‘আবদুল্লাহ ইব্নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
আবূ সুফিয়ান ইব্নু হরব তাকে বলেছেন, রাজা হিরাক্লিয়াস একদা তাঁর নিকট লোক প্রেরণ করলেন। তিনি তখন ব্যবসা উপলক্ষে কুরাইশদের কাফেলায় সিরিয়ায় ছিলেন। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সে সময় আবূ সুফিয়ান ও কুরাইশদের সঙ্গে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সন্ধিতে আবদ্ধ ছিলেন। আবূ সুফিয়ান তার সাথী সহ হিরাক্লিয়াসের নিকট আসলেন এবং দোভাষীকে ডাকলেন। অতঃপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘এই যে ব্যক্তি নিজেকে নবী বলে দাবী করে-তোমাদের মাঝে বংশের দিক হতে তাঁর সবচেয়ে নিকটাত্মীয় কে’? আবূ সুফিয়ান বলেন, ‘আমি বললাম, বংশের দিক দিয়ে আমিই তাঁর নিকটাত্মীয়’। তিনি বললেন, ‘তাঁকে আমার অতি নিকটে আন এবং তাঁর সাথীদেরকেও তার পেছনে বসিয়ে দাও’। অতঃপর তাঁর দোভাষীকে বললেন, ‘তাদের বলে দাও, আমি এর নিকট সে ব্যক্তি সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করব, যদি সে আমার নিকট মিথ্যা বলে, তখন সঙ্গে সঙ্গে তোমরা তাকে মিথ্যুক বলবে। আবূ সুফিয়ান বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমার যদি এ লজ্জা না থাকত যে, তারা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে প্রচার করবে, তবে আমি অবশ্যই তাঁর সম্পর্কে মিথ্যা বলতাম’। অতঃপর তিনি তাঁর সম্পর্কে আমাকে সর্বপ্রথম যে প্রশ্ন করেন তা হলো, ‘বংশমর্যাদার দিক দিয়ে তোমাদের মধ্যে সে কিরূপ?’ আমি বললাম, ‘তিনি আমাদের মধ্যে খুব সম্ভ্রান্ত বংশের’। তিনি বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে এর পূর্বে আর কখনো কি কেউ এরূপ কথা বলেছে?’ আমি বললাম, ‘না’। তিনি বললেন, ‘তাঁর পূর্বপুরুষের মধ্যে কেউ কি বাদশাহ ছিলেন?’ আমি বললাম, ‘না’। তিনি বললেন, ‘সম্ভ্রান্ত মর্যাদাবান শ্রেণীর লোকেরা তাঁর অনুসরণ করে, নাকি দুর্বল লোকেরা?’ আমি বললাম, ‘দুর্বল লোকেরা’। তিনি বললেন, ‘তাদের সংখ্যা কি বাড়ছে, না কমছে?’ আমি বললাম, ‘তারা বেড়েই চলছে’। তিনি বললেন, ‘তাঁর ধর্মে ঢুকে কেউ কি অসন্তুষ্ট হয়ে তা ত্যাগ করে?’ আমি বললাম, ‘না’। তিনি বললেন, ‘তাঁর দাবীর পূর্বে তোমরা কি কখনো তাঁকে মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছ?’ আমি বললাম, ‘না’। তিনি বললেন, ‘তিনি কি সন্ধি ভঙ্গ করেন?’ আমি বললাম, ‘না’। তবে আমরা তাঁর সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট সময়ের সন্ধিতে আবদ্ধ আছি। জানি না এর মধ্যে তিনি কি করবেন’। আবূ সুফিয়ান বলেন, ‘এ কথাটি ব্যতীত নিজের পক্ষ হতে আর কোন কথা যোগ করার সু্যোগই আমি পাইনি’। তিনি বললেন, ‘তোমরা তাঁর সঙ্গে কখনো যুদ্ধ করেছ কি?’ আমি বললাম, ‘হ্যাঁ’। তিনি বললেন, ‘তাঁর সঙ্গে তোমাদের যুদ্ধের পরিণাম কি হয়েছে?’ আমি বললাম, ‘তাঁর ও আমাদের মধ্যে যুদ্ধের ফলাফল কুপের বালতির ন্যায়’। কখনো তাঁর পক্ষে যায়, আবার কখনো আমাদের পক্ষে আসে’। তিনি বললেন, ‘তিনি তোমাদের কিসের আদেশ দেন?’ আমি বললাম, ‘তিনি বলেনঃ তোমরা এক আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাঁর সঙ্গে কোন কিছুর অংশীদার সাব্যস্ত করো না এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা যা বলে তা ত্যাগ কর। আর তিনি আমাদের সালাত আদায়ের, সত্য বলার, চারিত্রিক নিষ্কলুষতার এবং আত্মীয়দের সঙ্গে সদাচরণ করার নির্দেশ দেন’। অতঃপর তিনি দোভাষীকে বললেন, ‘তুমি তাকে বল, আমি তোমার নিকট তাঁর বংশ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি। তুমি তার জবাবে উল্লেখ করেছ যে, তিনি তোমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত বংশের। প্রকৃতপক্ষে রসূলগণকে তাঁদের কওমের উচ্চ বংশেই পাঠানো হয়ে থাকে। তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, এ কথা তোমাদের মধ্যে ইতিপূর্বে আর কেউ বলেছে কিনা? তুমি বলেছ, ‘না’। তাই আমি বলছি, পূর্বে যদি কেউ এরূপ বলত, তবে আমি অবশ্যই বলতাম, ইনি এমন এক ব্যক্তি, যিনি তাঁর পুর্বসূরীর কথারই অনুসরণ করছেন। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে কোন বাদশাহ ছিলেন কিনা? তুমি তার জবাবে বলেছ, ‘না’। তাই আমি বলছি যে, তাঁর পূর্বপুরুষের মধ্যে যদি কোন বাদশাহ থাকতেন, তবে আমি বলতাম, ইনি এমন এক ব্যক্তি যিনি তাঁর বাপ-দাদার বাদশাহী ফিরে পেতে চান। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি-এর পূর্বে কখনো তোমরা তাঁকে মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছ কিনা? তুমি বলেছ, ‘না’। এতে আমি বুঝলাম, এমনটি হতে পারে না যে, কেউ মানুষের ব্যাপারে মিথ্যা পরিত্যাগ করবে আর আল্লাহর ব্যাপারে মিথ্যা বলবে। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, সম্ভ্রান্ত লোক তাঁর অনুসরণ করে, না সাধারণ লোক? তুমি বলেছ, সাধারণ লোকই তাঁর অনুসরণ করে। আর বাস্তবেও এই শ্রেনীর লোকেরাই হন রসূলগণের অনুসারী। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তারা সংখ্যায় বাড়ছে না কমছে? তুমি বলেছ, বাড়ছে। প্রকৃতপক্ষে ঈমানে পূর্ণতা লাভ করা পর্যন্ত এ রকমই হয়ে থাকে। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তাঁর দীনে প্রবেশ করে কেউ কি অসন্তুষ্ট হয়ে তা ত্যাগ করে? তুমি বলেছ, ‘না’। ঈমানের স্নিগ্ধতা অন্তরের সঙ্গে মিশে গেলে ঈমান এরূপই হয়। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তিনি সন্ধি ভঙ্গ করেন কিনা? তুমি বলেছ, ‘না’। প্রকৃতপক্ষে রসূলগণ এরূপই, সন্ধি ভঙ্গ করেন না। আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি, তিনি তোমাদের কিসের আদেশ দেন? তুমি বলেছ, তিনি তোমাদের এক আল্লাহর বন্দেগী করা ও তাঁর সঙ্গে অন্য কিছুর অংশীদার স্থাপন না করার নির্দেশ দেন। তিনি তোমাদের নিষেধ করেন মূর্তিপূজা করতে আর তোমাদের আদেশ করেন সালাত আদায় করতে, সত্য বলতে ও সচ্চরিত্র থাকতে। তুমি যা বলেছ তা যদি সত্যি হয়, তবে শীঘ্রই তিনি আমার দু’পায়ের নীচের জায়গার অধিকারী হবেন। আমি নিশ্চিত জানতাম, তাঁর আবির্ভাব হবে; কিন্তু তিনি যে তোমাদের মধ্য হতে হবেন, এ কথা ভাবতে পারিনি। যদি জানতাম, আমি তাঁর নিকট পৌছতে পারব, তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য আমি যে কোন কষ্ট সহ্য করে নিতাম। আর আমি যদি তাঁর নিকট থাকতাম তবে অবশ্যই তাঁর দু’খানা পা ধৌত করে দিতাম। অতঃপর তিনি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সেই পত্রখানি আনার নির্দেশ দিলেন, যা তিনি দিহ্ইয়াতুল কালবী (রাঃ)-কে দিয়ে বসরার শাসকের মাধ্যমে হিরাক্লিয়াসের নিকট প্রেরণ করেছিলেন। তিনি তা পড়লেন। তাতে (লেখা) ছিলঃ বিসমিল্লা-হির রহমা-নির রহীম (পরম করুণাময় দয়ালু আল্লাহর নামে)। আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পক্ষ হতে রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের প্রতি। -শান্তি (বর্ষিত হোক) তার প্রতি, যে হিদায়াতের অনুসরণ করে। তারপর আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি। ইসলাম গ্রহণ করুন, শান্তিতে থাকবেন। আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ প্রতিদান দান করবেন। আর যদি মুখ ফিরিয়ে নেন, তবে সকল প্রজার পাপই আপনার উপর বর্তাবে। “হে আহলে কিতাব! এসো সে কথায় যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে এক ও অভিন্ন। তা হল, আমরা যেন আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করি, কোন কিছুকেই যেন তাঁর শরীক সাব্যস্ত না করি এবং আমাদের কেউ যেন কাউকে পালনকর্তারূপে গ্রহণ না করে আল্লাহকে ত্যাগ করে। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে তোমরা বল, “তোমরা সাক্ষী থাক, আমারা তো মুসলিম”। (সূরা আল-‘ইমরান ৩/৬৪) আবূ সুফিয়ান বলেন, ‘হিরাক্লিয়াস যখন তাঁর বক্তব্য শেষ করলেন এবং পত্র পাঠও শেষ করলেন, তখন সেখানে হট্টগোল শুরু হয়ে গেল, চীৎকার ও হৈ-হল্লা চরমে পৌছল এবং আমাদেরকে বের করে দেয়া হলো। আমাদেরকে বের করে দিলে আমি আমার সাথীদের বললাম, আবূ কাবশার [১] ছেলের বিষয় তো শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, বনূ আসফার (রোম)-এর বাদশাহও তাকে ভয় পাচ্ছে! তখন থেকে আমি বিশ্বাস রাখতাম, তিনি শীঘ্রই জয়ী হবেন। অবশেষে আল্লাহ তা’আলা আমাকে ইসলাম গ্রহণের তাওফীক দান করলেন। ইব্ন নাতূর ছিলেন জেরুযালেমের শাসনকর্তা এবং হিরাক্লিয়াসের বন্ধু ও সিরিয়ার খৃস্টানদের পাদ্রী। তিনি বলেন, হিরাক্লিয়াস যখন জেরুজালেম আসেন, তখন একদা তাঁকে অত্যন্ত মলিন দেখাচ্ছিল। তাঁর একজন বিশিষ্ট সহচর বলল, ‘আমরা আপনার চেহারা আজ এত মলিন দেখছি, ইব্নু নাতূর বলেন, হিরাক্লিয়াস ছিলেন জ্যোতির্বিদ, জ্যোতির্বিদ্যায় তাঁর দক্ষতা ছিল। তারা জিজ্ঞেস করলে তিনি তাদের বললেন, ‘আজ রাতে আমি তারকারাজির দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলাম, খতনাকারীদের বাদশাহ আবির্ভূত হয়েছেন। বর্তমান যুগে কোন্ জাতি খাতনা করে’? তারা বলল, ‘ইয়াহূদ জাতি ব্যতীত কেউ খাতনা করে না। কিন্তু তাদের ব্যাপারে আপনি মোটেও চিন্তিত হবেন না। আপনার রাজ্যের শহরগুলোতে লিখে পাঠান, তারা যেন সেখানকার সকল ইয়াহূদীকে কতল করে ফেলে’। তারা যখন এ ব্যাপারে ব্যতিব্যস্ত ছিল, তখন হিরাক্লিয়াসের নিকট জনৈক ব্যক্তিকে হাযির করা হলো, যাকে গাস্সানের শাসনকর্তা পাঠিয়েছিল। সে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে খবর দিচ্ছিল। হিরাক্লিয়াস তার কাছ থেকে খবর জেনে নিয়ে বললেন, ‘তোমরা একে নিয়ে গিয়ে দেখ, তার খাতনা হয়েছে কি-না’। তারা তাকে নিয়ে গিয়ে দেখে এসে সংবাদ দিল, তার খতনা হয়েছে। হিরাক্লিয়াস তাকে আরবদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে জওয়াব দিল, ‘তারা খাতনা করে’। অতঃপর হিরাক্লিয়াস তাদের বললেন, ইনি [আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)] এ উম্মতের বাদশাহ। তিনি আবির্ভূত হয়েছেন’। আতঃপর হিরাক্লিয়াস রোমে তাঁর বন্ধুর নিকট লিখলেন। তিনি জ্ঞানে তাঁর সমকক্ষ ছিলেন। পরে হিরাক্লিয়াস হিমস চলে গেলেন। হিমসে থাকতেই তাঁর নিকট তাঁর বন্ধুর চিঠি এলো, যা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আবির্ভাব এবং তিনিই যে প্রকৃত নবী, এ ব্যাপারে হিরাক্লিয়াসের মতকে সমর্থন করছিল। তারপর হিরাক্লিয়াস তাঁর হিমসের প্রাসাদে রোমের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ডাকলেন এবং প্রাসাদের সকল দরজা বন্ধ করার আদেশ দিলে দরজা বন্ধ করা হলো। অতঃপর তিনি সম্মুখে এসে বললেন, হে রোমের অধিবাসী! তোমরা কি মঙ্গল, হিদায়াত এবং তোমাদের রাষ্ট্রের স্থায়িত্ব চাও? তাহলে এই নবীর বায়’আত গ্রহণ কর’। এ কথা শুনে তারা বন্য গাধার ন্যায় দ্রুত নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে দরজার দিকে ছুটল, কিন্তু তারা তা বন্ধ দেখতে পেল। হিরাক্লিয়াস যখন তাদের অনীহা লক্ষ্য করলেন এবং তাদের ঈমান থেকে নিরাশ হয়ে গেলেন, তখন বললেন, ‘ওদের আমার নিকট ফিরিয়ে আন’। তিনি বললেন, ‘আমি একটু পূর্বে যে কথা বলেছি, তা দিয়ে তোমরা তোমাদের দ্বীনের উপর কতটুকু অটল, কেবল তার পরীক্ষা করছিলাম। এখন তা দেখে নিলাম’। একথা শুনে তারা তাঁকে সাজদাহ করল এবং তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট হলো। এটাই ছিল হিরাক্লিয়াসের সর্বশেষ অবস্থা। আবূ ‘আবদুল্লাহ [বুখারী (রহঃ)] বলেন, সালিহ ইব্নু কায়সান (রহঃ) , ইউনুস (রহঃ) ও মা’মার (রহঃ) এ হাদীস যুহরী (রহঃ) থেকে রিওয়ায়াত করেছেন। (৫১, ২৬৮১, ২৮০৪, ২৯৪১, ২৯৭৮, ৩১৭৪, ৪৫৫৩, ৫৯৮০, ৬২৬০, ৭১৯৬, ৭৫৪১ দ্রষ্টব্য) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৬, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ৬)
আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে কতিপয় লোক তাঁকে জিজ্ঞেস করে বলল, হে আল্লাহর রসূল! কিয়ামাত দিবসে আমরা কি আমাদের প্রতিপালককে দেখতে পাবো? রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ হ্যাঁ! তিনি আরো বললেনঃ দুপুরে মেঘমুক্ত আকাশে সূর্য দেখতে কি তোমাদের কষ্ট হয়? চন্দ্রের চৌদ্দ তারিখে মেঘমুক্ত অবস্থায় চন্দ্র দেখতে কি তোমাদের কষ্ট হয়? সকলে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! তা হয় না। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ ঠিক তদ্রূপ কিয়ামাত দিবসে তোমাদের বারাকাতময় মহামহিম প্রতিপালককে দেখতে কোনই কষ্ট অনুভব হবে না যেমন চন্দ্র ও সূর্য দেখতে কষ্ট অনুভব কর না। সে দিন এক ঘোষণাকারী ঘোষণা দিবে, ‘যে যার উপাসনা করতো সে আজ তার অনুসরণ করুক।’ তখন আল্লাহ ব্যতীত তারা অন্য দেব-দেবী ও মূর্তিপূজার বেদীর উপাসনা করত তাদের কেউ অবশিষ্ট থাকবে না; সকলেই জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে। সৎ হোক বা অসৎ যারা আল্লাহর ‘ইবাদাত করত তারাই কেবল অবশিষ্ট থাকবে এবং কিতাবীদের (যারা দেব-দেবী ও বেদীর উপাসক ছিল না তারাও বাকী থাকবে)। এরপর ইয়াহূদীদেরকে ডেকে জিজ্ঞাসা করা হবে, তোমরা কার ‘ইবাদাত করতে? তারা বলবে, আল্লাহর পুত্র ‘উযায়র-এর। তাদেরকে বলা হবে মিথ্যা বলছো। আল্লাহ কোন স্ত্রী বা সন্তান গ্রহণ করেননি। তোমরা কি চাও? তারা বলবে, হে আল্লাহ! আমাদের খুবই পিপাসা পেয়েছে। আমাদের পিপাসা নিবারণ করুন। প্রার্থনা শুনে তাদেরকে ইঙ্গিত করে মরীচিকাময় জাহান্নামের দিকে জমায়েত করা হবে। সেখানে আগুনের লেলিহান শিখা যেন পানির ঢেউ খেলবে। এর একাংশ আরেক অংশকে গ্রাস করতে থাকবে। তারা এতে ঝাঁপিয়ে পড়বে। এরপর খৃস্টানদেরকে ডাকা হবে, বলা হবে, তোমরা কার ‘ইবাদাত করতে? তারা বলবে, আল্লাহর পুত্র মাসীহ-এর (‘ঈসার) উপাসনা করতাম। বলা হবে, মিথ্যা বলছ। আল্লাহ কোন স্ত্রী বা সন্তান গ্রহণ করেননি। জিজ্ঞেস করা হবে, এখন কি চাও? তারা বলবে, হে আমাদের রব! আমাদের দারুণ পিপাসা পেয়েছে, আমাদের পিপাসা নিবারণ করুন। তখন তাদেরকেও পানির ঘাটে যাবার ইঙ্গিত করে জাহান্নামের দিকে হাকিয়ে নিয়ে জমায়েত করা হবে। এটিকে মরীচিকার ন্যায় মনে হবে। সেখানে আগুনের লেলিহান শিখা যেন পানির ঢেউ খেলবে। এর একাংশ অপর অংশকে গ্রাস করে নিবে। তারা তখন জাহান্নামে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকবে। শেষে সৎ হোক বা অসৎ এক আল্লাহর উপাসক ব্যতীত আর কেউ (ময়দানে) অবশিষ্ট থাকবে না। তখন আল্লাহ তা’আলা পরিচিত আকৃতিতে তাদের নিকট আসবেন। বলবেন, সবাই তাদের স্ব স্ব উপাস্যের অনুসরণ করে চলে গেছে, আর তোমরা কার অপেক্ষা করছ? তারা বলবে, হে আমাদের প্রভু! যেখানে আমরা বেশী মুখাপেক্ষী ছিলাম সে দুনিয়াতেই আমরা অপরাপর মানুষ থেকে পৃথক থেকেছি এবং তাদের সঙ্গী হইনি। তখন আল্লাহ বলবেন, আমিই তো তোমাদের প্রভু। মু’মিনরা বলবে, “আমরা তোমার থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি” আল্লাহর সঙ্গে আমরা কিছুই শারীক করি না। এ কথা তারা দুই বা তিনবার বলবে। এমন কি কেউ কেউ অবাধ্যতা প্রদর্শনেও অবতীর্ণ হয়ে যাবে। আল্লাহ বলবেন, আচ্ছা, তোমাদের নিকট এমন কোন নিদর্শন আছে যদ্বারা তাঁকে তোমরা চিনতে পার? তারা বলবে অবশ্যই আছে। এরপর পায়ের ‘সাক’ (গোছা) উন্মোচিত হবে। তখন পৃথিবীতে যারা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে আল্লাহর উদ্দেশ্যে সাজদাহ্ করত, সে মূহুর্তে তাদেরকে আল্লাহ সাজদাহ্ করার অনুমতি দিবেন এবং তারা সবাই সাজদাহ্বনত হয়ে পড়বে। আর যে কারো ভয়-ভীতি কিংবা লোক দেখানোর জন্য সাজদাহ্ করতো তার মেরুদণ্ড শক্ত ও অনমনীয় করে দেয়া হবে। যখনই তারা সাজদাহ্ করতে ইচ্ছা করবে তখনই তারা চিত হয়ে পড়ে যাবে। অতঃপর তারা তাদের মাথা উঠাবে এবং তিনি তাঁর আসলরূপে আবির্ভূত হবেন। অতঃপর বলবেন, আমি তোমাদের রব, তারা বলবে, হ্যাঁ! আপনি আমাদের রব। তারপর জাহান্নামের উপর “জাস্র” (পুল) স্থাপন করা হবে। শাফা’আতেরও অনুমতি দেয়া হবে। মানুষ বলতে থাকবে, হে আল্লাহ! আমাদের নিরাপত্তা দিন, আমাদের নিরাপত্তা দিন। জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ! “জাস্র” কী? রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ এটি এমন স্থান যেখানে পা পিছলে যায়। সেখানে আছে নানা প্রকারের লৌহ শলাকা ও কাঁটা, দেখতে নাজ্দের সা’দান বৃক্ষের কাঁটার ন্যায়। মু’মিনগণের কেউ তো এ পথ চোখের পলকের গতিতে, কেউ বিদ্যুৎ গতিতে, কেউ বায়ুর গতিতে, কেউ উত্তম অশ্ব গতিতে, কেউ উষ্ট্রের গতিতে অতিক্রম করবে। কেউ তো অক্ষত অবস্থায় নাযাত পাবে, আর কেউ তো হবে ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় নাযাতপ্রাপ্ত। আর কতককে কাঁটাবিদ্ধ অবস্থায় জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। অবশেষে মু’মিনগণ জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করবে। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ সে সত্তার কসম! যাঁর হাতে আমার প্রাণ, ঐ দিন মু’মিনগণ তাদের ঐ সব ভাইদের স্বার্থে আল্লাহর সাথে এত অধিক বিতর্কে লিপ্ত হবে যারা জাহান্নামে রয়ে গেছে যে, তোমাদের পার্থিব অধিকারের ক্ষেত্রেও এমন বিতর্কে লিপ্ত হয়ো না। তারা বলবে, হে রব! এরা তো আমাদের সাথেই সিয়াম, সলাত আদায় করত, হাজ্জ করত। তখন তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হবে যে, যাও, তোমাদের পরিচিতদের উদ্ধার করে আন। উল্লেখ্য এরা জাহান্নামে পতিত হলেও মুখমণ্ডল ‘আযাব থেকে রক্ষিত থাকবে। (তাই তাদেরকে চিনতে কোন অসুবিধা হবে না।) মু’মিনগণ জাহান্নাম হতে এক বিরাট দলকে উদ্ধার করে আনবে। এদের অবস্থা এমন হবে যে, কারোর তো পায়ের নলা পর্যন্ত, আবার কারো হাঁটু পর্যন্ত দেহ আগুন ছাই করে দিবে। উদ্ধার শেষ করে মু’মিনগণ বলবে, হে রব! যাদের সম্পর্কে আপনি নির্দেশ প্রদান করেছিলেন, তাদের মাঝে আর কেউ অবশিষ্ট নেই। আল্লাহ বলবেন, পুনরায় যাও, যার অন্তরে এক দীনার পরিমাণও ঈমান অবশিষ্ট পাবে তাকেও উদ্ধার করে আন। তখন তারা আরো একদলকে উদ্ধার করে এনে বলবে, হে রব! অনুমতিপ্রাপ্তদের কাউকেও রেখে আসিনি। আল্লাহ বলবেন : আবার যাও, যার অন্তরে অর্ধ দীনার পরিমাণও ঈমান অবশিষ্ট পাবে তাকেও বের করে আন। তখন আবার এক বিরাট দলকে উদ্ধার করে এনে তারা বলবে, হে রব! যাদের আপনি উদ্ধার করতে বলেছিলেন তাদের কাউকে ছেড়ে আসিনি। আল্লাহ বলবেন : আবার যাও, যার অন্তরে অণু পরিমাণও ঈমান বিদ্যমান, তাকেও উদ্ধার করে আন। তখন আবারও এক বিরাট দলকে উদ্ধার করে এনে তারা বলবে, হে রব! যাদের কথা বলেছিলেন তাদের কাউকেও রেখে আসিনি। সহাবা আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) বলেন, তোমরা যদি এ হাদীসের ব্যাপারে আমাকে সত্যবাদী মনে না কর তবে এর সমর্থনে নিম্নোক্ত আয়াতটি যদি চাও তবে তিলাওয়াত করতে পার : “আল্লাহ অণু পরিমাণও যুল্ম করেন না এবং অণু পরিমাণ নেক কাজ হলেও আল্লাহ তা দ্বিগুণ করে দেন এবং তাঁর নিকট হতে মহাপুরস্কার প্রদান করেন”— (সূরাহ আন্ নিসা ৪ : ৪০)। এরপর আল্লাহ তা’আলা বলবেন : ফেরেশতারা সুপারিশ করলেন, নাবীগণও সুপারিশ করলেন এবং মু’মিনরাও সুপারিশ করেছে, কেবলমাত্র আরহামুর রাহিমীন-পরম দয়াময়ই রয়ে গেছেন। এরপর তিনি জাহান্নাম থেকে এক মুঠো তুলে আনবেন, ফলে এমন একদল লোক মুক্তি পাবে যারা কখনো কোন সৎকর্ম করেনি এবং আগুনে জ্বলে লাল হয়ে গেছে। পরে তাদেরকে জান্নাতের প্রবেশ মুখের ‘নাহরুল হায়াতে’ ফেলে দেয়া হবে। তারা এতে এমনভাবে সতেজ হয়ে উঠবে, যেমনভাবে শস্য অঙ্কুর স্রোতবাহিত পানি ভেজা উর্বর জমিতে সতেজ হয়ে উঠে। (রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ) তোমরা কি কোন বৃক্ষ কিংবা পাথরের আড়াল কোন শস্যদানা অঙ্কুরিত হতে দেখনি? যেগুলো সূর্য কিরণের মাঝে থাকে সেগুলো হলদে ও সবুজ রূপ ধারণ করে আর যেগুলো ছায়াযুক্ত স্থানে থাকে সেগুলো সাদা হয়ে যায়। সহাবাগণ বললেনঃ হে আল্লাহর রসূল! মনে হয় আপনি যেন গ্রামাঞ্চলে পশু চরিয়েছেন। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ এরপর তারা নহর থেকে মুক্তার ন্যায় ঝকঝকে অবস্থায় উঠে আসবে এবং তাদের গ্রীবাদেশে মোহরাঙ্কিত থাকবে যা দেখে জান্নাতীগণ তাদের চিনতে পারবেন। এরা হর ‘উতাকাউল্লাহ’-আল্লাহর পক্ষ থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত। আল্লাহ তা’আলা সৎ ‘আমাল ব্যতীতই তাদেরকে জান্নাতে দাখিল করবেন। এরপর আল্লাহ তাদেরকে লক্ষ্য করে বলবেন : যাও, জান্নাতে প্রবেশ কর। আর যা কিছু দেখছ সব কিছু তোমাদেরই। তারা বলবে, হে রব! আপনি আমাদেরকে এত দিয়েছেন যা সৃষ্টজগতের কাউকে দেননি। আল্লাহ বলবেন : তোমাদের জন্য আমার নিকট এর চেয়েও উত্তম বস্তু আছে। তারা বলবে, কী সে উত্তম বস্তু? আল্লাহ বলবেন : সে হলো আমার সন্তুষ্টি। এরপর আর কখনো তোমাদের উপর অসন্তুষ্ট হবো না। ইমাম মুসলিম (রহঃ) বলেনঃ শাফা’আত সম্পর্কীয় এ হাদীসটি আমি ‘ঈসা ইবনু হাম্মাদ যুগবাতুর মিসরী-এর নিকট পাঠ করতে বললাম, আপনি লায়স ইবনু সা’দ থেকে নিজে এ হাদীসটি শুনেছেন? আমি কি আপনার পক্ষ থেকে এ হাদীসটি বর্ণনা করতে পারি? তিনি উত্তর করলেন, হ্যাঁ! এরপর আমি ‘ঈসা ইবনু হাম্মাদকে হাদীসটি এ সূত্রে শুনিয়েছি যে, ‘ঈসা ইবনু হাম্মাদ (রহঃ) আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ)-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমরা রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বললাম, হে আল্লাহর রসূল! আমরা কি আমাদের প্রভুকে দেখতে পাবো? রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উত্তর করলেন : মেঘমুক্ত আকাশে সূর্য দেখতে ভীড়ের কারণে তোমাদের কি কোন অসুবিধা হয়? আমরা বললাম, না .....। এভাবে হাদীসটির শেষ পর্যন্ত তুলে ধরলাম। এ হাদীসটি হাফিয ইবনু মাইসারাহ্ বর্ণিত হাদিসেরই অনুরূপ। তিনি (আরবী) এ অংশটুকুর পর (আরবী) অর্থাৎ তাদের বলা হবে : তোমাদের জন্য রয়েছে যা তোমরা দেখছ। আবূ সা’ঈদ আল খুদরী (রাঃ) বলেন, আমার কাছে রিওয়ায়াতে পৌঁছেছে যে, ‘জাস্র’ (পুল) চুল অপেক্ষা অধিক সূক্ষ্ম ও তরবারি অপেক্ষা অধিক তীক্ষ্ণ। তাছাড়া লায়সের হাদীসে (আরবী) বাক্যটির পরবর্তী অংশগুলো উল্লেখ নেই। (ই.ফা. ৩৫১; ই.সে. ৩৬২)
রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একবার তাঁর কাছে বসে কাঁধের গোশ্ত খেলেন, তারপর সলাত আদায় করলেন কিন্তু ওযূ করলেন না। (ই.ফা. ৬৮২, ই.সে. ৬৯৭)
ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
আবূ সুফ্ইয়ান (রাঃ) তাঁকে সামনা-সামনি খবর দিয়েছেন, আমি তথায় (শাম দেশে) যাত্রা করলাম। যখন আমার মধ্যে এবং রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মধ্যে (হুদাইবিয়ার) সন্ধির সময়কাল কার্যকর ছিল (ষষ্ঠ হিজরীতে)। যখন আমি শাম দেশে উপস্থিত হলাম, তখন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রেরিত একটা পত্র হিরাক্ল (হিরাক্লিয়াস) বাদশাহ্র নিকট পৌঁছল। দিহ্ইয়াতুল কালবী (রাঃ) (দূত) এ পত্র নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি সে পত্র বসরার এক নেতাকে প্রদান করেন। এরপর বসরার সে নেতা, হিরাক্ল বাদশাহ্র নিকট পত্রটি হস্তান্তর করেন। তখন হিরাক্ল বাদশাহ বললেন, এখানে ঐ লোকটির (মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর) সম্প্রদায়ের কোন লোক আছে কি, যিনি নিজেকে নবী বলে দাবী করছেন? তারা বলল, হ্যাঁ। তখন কুরায়শের এক দল লোকের মধ্যে আমাকেও ডাকা হল। এরপর আমরা হিরাক্ল বাদশাহর দরবারে প্রবেশ করলাম। আমাদেরকে তার সম্মুখেই বসান হল। তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, যিনি নবী দাবী করছেন তাঁর সাথে আত্মীয়তার দিক দিয়ে তোমাদের মধ্যে কে অধিক নিকটবর্তী? তখন আবূ সুফ্ইয়ান বললেন, আমি। তখন তারা আমাকে বাদশাহর সামনেই বসালেন এবং আমার সঙ্গীদেরকে আমার পিছনে বসালেন। এরপর তিনি তাঁর দোভাষীকে ডাকলেন এবং তাকে বললেন, “আপনি তাদেরকে আমার পক্ষ হতে বলে দিন যে, আমি তাঁকে (আবূ সুফ্ইয়ানকে) ঐ লোকটি সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করব নবী বলে যিনি দাবী করছেন। যদি তিনি (আবূ সুফ্ইয়ান) আমার নিকট মিথ্যা কথা বলেন, তবে আপনারাও তাকে মিথ্যাবাদী বলে ঘোষণা দেবেন। তখন আবূ সুফ্ইয়ান বললেন, আল্লাহর শপথ! যদি আমার এ ভয় না হত যে, মিথ্যা বললে তা আমার বরাতে বর্ণিত হতে থাকবে তবে নিশ্চয়ই (তাঁর সম্পর্কে) মিথ্যা কথা বলতাম। অতঃপর বাদশাহ তাঁর দোভাষীকে বললেন, আপনি তাঁকে (আবূ সুফ্ইয়ানকে) জিজ্ঞেস করুন, আপনাদের মাঝে ঐ লোকটির বংশ পরিচয় কেমন? আমি প্রতি উত্তরে বললাম, তিনি আমাদের মাঝে সম্ভ্রান্ত বংশীয়। এরপর জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর পূর্ব পুরুষদের মধ্যে কেউ কি কখনও বাদশাহ ছিলেন? আমি বললাম, না। এরপর জিজ্ঞেস করলেন, আপনারা কি কখনও তাঁকে এ কথা বলার পূর্বে, যা তিনি বলেছেন, মিথ্যা বলার অভিযোগ করেছেন? আমি বললাম, না। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন,সমাজের কোন শ্রেনীর লোক তাঁর অনুসরণ করে? সম্ভ্রান্ত প্রভাবশালীরা, না দুর্বলেরা? আমি বললাম, সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা নয়; বরং দুর্বল শ্রেনীর লোকেরা। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর অনুগামীর সংখ্যা কি বৃদ্ধি পাচ্ছে, না কমছে? আমি বললাম, কমছে না, বরং দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, যেসব লোক তাঁর ধর্মে দীক্ষিত হচ্ছে তারা কি পরবর্তীতে তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে সে ধর্ম থেকে ফিরে আসছে? আমি বললাম, না। এরপর তিনি বললেন, আপনারা কি কখনও তাঁর সাথে কোন যুদ্ধ করেছেন? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনাদের এবং তাঁর মাঝে সংঘটিত যুদ্ধের ফলাফল কিরূপ? আমি বললাম, আমাদের এবং তাঁর মাঝে যুদ্ধের অবস্থা পালাবদল হচ্ছে। কখনও তিনি বিজয়ী হন এবং কখনও বা আমরা বিজয়ী হই। সম্রাট হিরাক্ল আবার জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কি কখনও সন্ধির শর্ত ভঙ্গ করেছেন? আমি বললাম, না। কিন্তু আমরা বর্তমানে তাঁর সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা পর্যন্ত সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ আছি। আমরা জানি না যে, পরিশেষে তিনি তাতে কী করেন। আবূ সুফ্ইয়ান বললেন, আল্লাহর শপথ! প্রশ্ন উত্তরে আমার পক্ষ হতে এ কথাটি ছাড়া অন্য কোন অতিরিক্ত কথা সংযোগ করা সম্ভব হয়নি। এরপর সম্রাট হিরাক্ল বললেন, (আপনাদের দেশে) তাঁর নবূওয়াত দাবীর পূর্বে কি কোন ব্যক্তি কখনো এরূপ দাবী করেছে? আমি বললাম, না। এরপর সম্রাট হিরাক্ল তাঁর দোভাষীকে বললেন, আপনি তাঁকে (আবূ সুফ্ইয়ানকে) বলে দিন যে, আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তাঁর (মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর) বংশ পরিচয় সম্পর্কে। আপনি তখন উত্তর দিয়েছিলেন যে, তিনি সম্ভ্রান্ত বংশীয়। এমনিভাবে রসূলগণ স্বীয় সম্প্রদায়ের উত্তম বংশে প্রেরিত হয়ে থাকেন। এরপরে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তাঁর পিতৃপুরুষদের মধ্যে কি কেউ বাদশাহ ছিলেন? আপনি এর উত্তরে বলেছিলেন, না। আমি এ কথা বলেছিলাম এ কারণে যে, যদি তাঁর পিতৃপুরুষদের মধ্যে কেউ বাদশাহ থাকতেন, তবে আমি মনে করতাম যে, হয়ত বা তিনি তাঁর পিতৃপুরুষদের রাজ্য পুনরুদ্ধার করতে চান। তারপর আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, তাঁর অনুসারীগণ কি সমাজের দুর্বল শ্রেনীর লোক, না সম্ভ্রান্ত শ্রেণীর লোক? আপনি উত্তরে বলেছিলেন, দুর্বল শ্রেনীর লোক তাঁর অনুসারী হয়ে থাকে। এরপর আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, যে তিনি (নুবূওয়াতের) যে কথা বলেছেন এর পূর্বে কি আপনারা তাঁকে কখনও মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন? প্রতি উত্তরে আপনি বলেছিলেন যে ,না। এতে আমি বুঝতে পারলাম, যে ব্যক্তি জাগতিক ব্যাপারে মিথ্যা বলেন না, তিনি কি কারণে আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করতে যাবেন? এরপর আমি আপনাকে প্রশ্ন করেছিলাম যে, কোন ব্যক্তি কি তাঁর ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর তাঁর প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে তাঁর ধর্ম পরিত্যাগ করেছে? আপনি উত্তরে বলেছিলেন, না। ঈমানের প্রকৃত অবস্থা এটাই। যখন অন্তরের অন্তঃস্থলে একবার তা প্রবেশ করে তখন সেখানেই স্থায়ীভাবে অবস্থান করে। এরপর আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, তাঁর অনুগামীদের সংখ্যা কি দিন দিন বাড়ছে, না কমছে? প্রতি উত্তরে আপনি বলেছিলেন, তারা সংখ্যায় বৃদ্ধি পাচ্ছে। এটাই হল ঈমানের প্রকৃর অবস্থা। তা বৃদ্ধি পেতে পেতে অবশেষে পূর্ণত্ব লাভ করে। এরপর আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনারা কি তাঁর সাথে কোন যুদ্ধ করেছেন? উত্তরে আপনি বলেছেন যে, হ্যাঁ, আপনারা তাঁর সাথে যুদ্ধ করেছেন। তবে আপনাদের মাঝে ও তাঁর মাঝে যুদ্ধের অবস্থা হল পালাবদলের মত। কখনও তিনি বিজয়ী হন, আবার কখনও আপনারা বিজয়ী হন। এভাবে রসূলগনকে পরীক্ষার সম্মুখীন করা হয়। পরিণামে তাঁরাই বিজয়ী হয়ে থাকেন। এরপর আমি আপনাকে প্রশ্ন করেছিলাম, তিনি কি কখনও কোন সন্ধির চুক্তিভঙ্গ করেছেন? প্রতি উত্তরে আপনি বলছেন, তিনি কোন চুক্তিভঙ্গ করেননি! এভাবে রসূলগণ কখনও চুক্তি ভঙ্গ করেন না। আর আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, তাঁর এ কথা (নুবূওয়াতের কথা) বলার পূর্বে কি কোন ব্যক্তি অনুরূপ কথা বলেছেন? আপনি বলেছিলেন যে, না। আমি তা এ কারণে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, যদি তাঁর পূর্বে কেউ এরূপ দাবী করে থাকতো, তবে আমি মনে করতাম যে, সে ব্যক্তি তার পূর্বে যে কথা বলা হয়েছে তার অনুকরণ করেছে। রাবী বলেন, এরপর হিরাক্ল জিজ্ঞেস করলেন, তিনি আমাদেরকে সলাত আদায় করতে, যাকাত দিতে, নিকট আত্মীয় ও হকদার ব্যক্তিদের প্রতি সদ্ব্যবহার করতে এবং অবৈধ ও অসৌজন্যমূলক কাজ থেকে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়ে থাকেন। বাদশাহ হিরাক্ল বললেন, তিনি আপনাদেরকে কী কাজের নির্দেশ দিয়ে থাকেন? আমি তাকে বললাম আপনি তাঁর সম্পর্কে যা বললেন তাঁর অবস্থা যদি ঠিক তাই হয় তবে তিনি অবশ্যই নাবী। আমি জানতাম যে, একজন নাবীর আবির্ভাব ঘটবে। কিন্তু আমি ধারণা করিনি যে, তিনি আপনাদের থেকে হবেন। যদি আমি জানতাম যে, আমি তাঁর নিকট নির্বিঘ্নে পৌঁছতে পারবো তবে নিশ্চয়ই আমি তাঁর মুবারক পদদ্বয় ধুয়ে দিতাম। (জেনে রেখো) নিশ্চয়ই তাঁর রাজত্ব আমার দু’পায়ের নীচ পর্যন্ত পৌঁছবে। এরপর তিনি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর চিঠিটি তলব করেলন এবং তা পাঠ করলেন। এতে ছিল- “বিস্মিল্লা-হির রহ্মান-নির রহীম! এটা মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর পক্ষ হতে রোমের মহান ব্যাক্তি হিরাক্ল-এর প্রতি। শান্তি ধারা সে ব্যক্তির উপর, যিনি সঠিক পথ অনুসরণ করেন। অতঃপর, নিশ্চয়ই আমি আপনাকে ইসলামের আহবান জানাচ্ছি। ইসলাম গ্রহন করুন, নিরাপত্তা লাভ করুন। আপনি মুসলিম হোন, আল্লাহ আপনাকে দ্বিগুণ পুরস্কার দান করবেন। আর যদি আপনি (ইসলাম থেকে) মুখ ফিরিয়ে নেন, তবে নিশ্চয়ই প্রজাদের অপরাধ আপনার উপর আরোপিত হবে। “হে আহলে কিতাব! তোমরা এসো সে কথায়, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই; যেন আমরা আল্লাহ ব্যাতীত অন্য কারও ‘ইবাদাত না করি, কোন কিছুকেই তাঁর শরীক না করি...তবে বল, তোমরা সাক্ষী থাক আমরা মুসলিম” পর্যন্ত। এরপর তিনি পত্র পাঠ শেষ করলে তাঁর নিকটে শোরগোল এবং অযথা কথাবার্তা হতে লাগল। এদিকে আমাদেরকে বেরিয়ে আসার নির্দেশ দেয়া হল। আমরা বেরিয়ে এলাম। আবূ সুফ্ইয়ান বলেন, আমরা যখন বেরিয়ে এলাম তখন আমি আমার সঙ্গীদের বললাম, আবূ কাবশার [৩৮] পুত্রের মর্যাদা অনেক বেড়ে গেছে। রোমীয়দের বাদশাহ্ও তাঁকে ভয় করছে। তিনি আরও বলেন, সেদিন থেকে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) –এর ব্যাপারে আমার দৃঢ় প্রত্যয় হল যে, নিশ্চয়ই তিনি বিজয়ী হবেন। অবশেষে আল্লাহ্ তা’আলা আমার অন্তরে ইসলাম প্রবেশ করিয়ে দিলেন। (ই.ফা. ৪৪৫৬, ই.সে. ৪৪৫৮)
‘আবদুল্লাহ ইবনু রাবাহ (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
তিনি বলেন, আমরা ভ্রমণ করে মু’আবিয়াহ ইবনু আবূ সুফইয়ান (রাঃ)–এর নিকট গেলাম। আমাদের মধ্যে তখন আবূ হুরায়রা (রাঃ) –ও ছিলেন। প্রত্যেকেই একদিন তাঁর সাথীর জন্য খানা তৈরী করতেন। একদিন আমার পালা আসল। তখন আমি বললাম, হে আবূ হুরায়রা! আজতো আমার পালা। অতএব সকলেই আমার বাসস্থানে এলেন, তখনও খানা রান্না করা শেষ হয়নি। তখন আমি বললাম, হে আবূ হুরায়রা! আপনি যদি আমাদেরকে খানা তৈরীর পূর্ব পর্যন্ত রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর কোন হাদীস বর্ণনা করতেন! (তবে ভাল হতো) অতএব তিনি বললেন, আমরা মাক্কাহ বিজয়ের দিন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) –এর সঙ্গে ছিলাম। তখন খালিদ ইবনু ওয়ালীদ (রাঃ)–কে ডানদিকের বাহিনীর এবং যুবায়র (রাঃ)–কে বাম দিকের বাহিনীর নেতৃত্ব প্রদান করলেন। আবূ ‘উবাইদাহ (রাঃ)–কে পদাতিক বাহিনীর সর্বাধিনায়ক নিযুক্ত করলেন প্রান্তর অতিক্রম করার জন্য। এরপর তিনি বললেন, হে আবূ হুরায়রা! আনসারদেরকে আমার কাছে আসার জন্য আহ্বান কর। অতএব আমি তাদেরকে আহ্বান করলাম। এরপর তাঁরা দ্রুত আসলেন। তখন তিনি বললেন, হে আনসার সম্প্রদায়! তোমরা কুরায়শদের বিভিন্ন গোত্রের বিরাট জমায়েত কি দেখতে পাচ্ছ, তারা সবাই বলল হ্যাঁ। অতএব তিনি বললেন, আগামীকাল যখন তোমরা (যুদ্ধক্ষেত্রে) তাদের মুকাবিলা করবে তখন তাদেরকে সম্পূর্ণ নির্মূল করে দেবে। তারপর তাঁর ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে ইঙ্গিতে বললেনঃ তাদেরকে সমূলে বিনষ্ট করে দেবে। তারপর বললেনঃ আমার সাথে তোমাদের একসাথে হওয়ার জায়গা সাফা পাহাড়। বর্ণনাকারী বলেন, সেদিন যে কোন বিধর্মী আনসারদের লক্ষ্যস্থলে পড়েছে, তাকেই তারা নির্মূল করেছে। এরপরে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাফা পাহাড়ের উপর আরোহণ করলেন। তখন আনসারগণ তথায় উপনীত হয়ে সাফা পাহাড় ঘিরে ফেললো। ইত্যবসরে আবূ সুফইয়ান এলেন এবং বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! কুরায়শদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। আজ থেকে আর কোন কুরায়শের অস্তিত্ব থাকবে না। এরপর রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, যে ব্যক্তি আবূ সুফইয়ানের বাড়িতে প্রবেশ করবে সে নিরাপত্তা পাবে। যে অস্ত্র ফেলে দিবে সেও নিরাপদ এবং যে স্বীয় গৃহের দরজা বন্ধ করে রাখবে সেও নিরাপত্তা পাবে। তখন আনসারগণ বলাবলি করছিল যে, এ লোকটিকে (রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে) স্বীয় গোত্রের ভালোবাসা এবং স্বদেশের অনুরাগে পেয়ে বসেছে। এমতাবস্থায় রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)–এর উপর ওয়াহী নাযিল হলো। এরপর তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমরাই কি বলেছিলে যে, “এ লোকটিকে (মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে) স্বীয় গোত্রের ভালোবাসা এবং স্বদেশের অনুরাগে পেয়ে বসেছে।” সাবধান! তোমরা কি জান আমার নাম কী? এ কথাটি তিনি তিনবার বলেছেন। আমি হলাম মুহাম্মাদ, আল্লাহর বান্দা এবং তাঁর রসূল। আমি আল্লাহর নির্দেশেই তোমাদের কাছে হিজরত করেছি। আমার জীবন ও মরণ তোমাদের জীবন ও মরণের সাথে সম্পৃক্ত। তখন তাঁরা বলল, আল্লাহর শপথ! আমরা এ কথা বলেছিলাম আল্লাহ্ ও তাঁর রসূলের প্রতি দুর্বলতার কারণে। (যেন তিনি আমাদেরকে ছেড়ে না যান।) নিশ্চয়ই আল্লাহ্ ও তাঁর রসূল তোমাদের সত্য বলে গ্রহণ করেছেন এবং তোমাদের ওজর কবুল করেছেন। (ই.ফা. ৪৪৭৩, ই.সে. ৪৪৭৫)
আবূ যার (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
তিনি বলেন, আমরা আমাদের গিফার সম্প্রদায় হতে বের হলাম। তারা হারাম মাসগুলোকে হালাল হিসেবে গ্রহণ করত। আমি আমার ভাই উনায়স এবং আমাদের মা সহ বের হলাম এবং আমাদের এক মামার নিকট গেলাম। মামা আমাদের অনেক সসম্মানে গ্রহণ করলেন এবং আমাদের সঙ্গে ভদ্রতাসূচক আচরণ করলেন। এতে তাঁর সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরা আমাদের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ হল। তারা বলল, তুমি যখন তোমার পরিবার হতে দূরে থাকে তখন উনায়স তোমার অনুপস্থিতিতে তাদের নিকট আসা-যাওয়া করে। তারপর আমাদের মামা আসলেন এবং তাঁকে যা বলা হয়েছে তিনি তা আমাদের কাছে বলে দিলেন। তখন আমি বললাম, আপনি আমাদের সঙ্গে অতীতে যে সদ্ব্যবহার করেছেন তাকে নিঃশেষ করে দিলেন। তারপর আপনার সাথে আমাদের এক থাকার কোন সুযোগ নেই। অতঃপর আমরা আমাদের উটগুলোকে সন্নিকটে আনলাম এবং তাদের উপর আরোহিত হলাম। তখন আমাদের মামা তাঁর বস্ত্র দ্বারা নিজেকে আবৃত করে কাঁদতে শুরু করলেন। আমরা রওনা হয়ে মক্কার নিকটবর্তী অবতরণ করলাম। উনায়স আমাদের পশুগুলো এবং সে পরিমাণ পশুর মাঝে বাজি ধরল। এরপর তারা উভয়ে এক গণকের নিকট গেল। গণক উনায়সকে শ্রেষ্ঠ বলে রায় দিল। তারপর উনায়স আমাদের উটগুলো এবং তার সমসংখ্যক উট নিয়ে আমাদের কাছ থেকে প্রত্যাবর্তন করল। আবূ যার (রাঃ) বললেন, হে ভ্রাতুষ্পত্র! আমি রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে দেখা করার তিন বছর আগে সলাত আদায় করেছি। আমি (রাবী) বললাম, কার জন্যে? তিনি বললেন, আল্লাহর জন্যে। আমি (রাবী) বললাম, কোন্ দিকে মুখ ফিরাতেন? তিনি বললেন, আমার মহান আল্লাহ যেদিকে আমার মুখ ফিরিয়ে দিতেন সেদিকে মুখ ফিরাতাম। আমি ‘ইশার সলাত আদায় করতে করতে রাতের শেষাংশে ঘুমের ঘোরে ঢলে পড়তাম, যতক্ষণ না সূর্যের কিরণ এসে আমার উপর পড়ত। তারপর উনায়স (রাঃ) বললেন, মক্কায় আমার একটু দরকার আছে। সুতরাং আপনি আমার সংসার দেখাশুনা করবেন। তারপর উনায়স (রাঃ) চলে গেল এবং মাক্কায় পৌঁছলো এবং সে দেরীতে আমার নিকট প্রত্যাবর্তন করল। আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, তুমি কী করলে? সে বলল, আমি মাক্কায় কতিপয় জনৈক লোকের দেখা পেয়েছি যিনি আপনার দ্বীনের উপর অবিচল। তিনি মনে করেন যে, আল্লাহ তাঁকে (রসূল হিসেবে) পাঠিয়েছেন। আমি [আবূ যার (রাঃ)] বললাম, ব্যক্তিরা তাঁর ব্যাপারে কী বলে। সে বলল, তারা তাঁকে কবি, জ্যোতিষী ও যাদুকর বলে। উনায়স (রাঃ) নিজেও একজন কবি ছিল। উনায়স (রাঃ) বলল, আমি বহু গণকের কথা শুনেছি; কিন্তু সে লোকের কথা গণকের মতো নয়। আমি তাঁর বাক্যকে কবিদের রচনার সাথে মিলিয়ে দেখেছি; কিন্তু কোন কবির ভাষার সঙ্গে তার কোন সামঞ্জস্য নেই। আল্লাহর শপথ! নিশ্চয়ই তিনি সত্যবাদী এবং ওরা মিথ্যাবদী। তিনি বললেন, আমি বললাম, তুমি আমার সংসার খোঁজ-খবর রাখবে এবং আমি গিয়ে একটু দেখে নেই। তিনি বললেন, আমি মক্কায় আসলাম এবং তাদের এক জীর্ণ লোককে উদ্দেশ্য করে বললাম, সে লোক কোথায়, যাকে তোমরা সাবী (বিধর্মী) বলে ডাক? সে আমার দিকে ইঙ্গিত করল এবং বলল, এ-ই সাবী। এরপর মক্কা পর্বতের ব্যক্তিরা ঢেলা ও হাড়সহ আমার উপর চড়াও হলো, এমনকি আমি অজ্ঞান হয়ে লুটে পড়লাম। তিনি বললেন, যখন আমি উঠলাম তখন লাল মূর্তির (অর্থাৎ- রক্তের ঢল) অবস্থায় উঠলাম। তিনি বলেন, তারপর আমি যমযম কূপের নিকট এসে আমার রক্ত ধুয়ে নিলাম। তারপর তার পানি পান করলাম। হে ভ্রাতুষ্পুত্র! আমি সেখানে ত্রিশ রাত-দিন অবস্থান করেছিলাম। সে সময় যমযমের পানি ব্যতীত আমার নিকট কোন খাবার ছিল না। এরপর আমি এমন মোটা হয়ে গেলাম যে, আমার পেটের চামড়ায় ভাঁজ পড়ে গেল। আমি আমার অন্তরে ক্ষুধার যাতনা বুঝতে পারিনি। তিনি বললেন, ইতোমধ্যে মাক্কাবাসীরা যখন এক উজ্জ্বল গভীর রাতে ঘুমিয়ে পড়ল, তখন কেউ বাইতুল্লাহ্র তাওয়াফ করছিল না। সে সময় তাদের মধ্য থেকে দু’জন মহিলা ইসাফা ও নায়িলাকে ডাকছিল। তিনি বলরেন, তারা তাওয়াফ করতে করতে আমার নিকট এসে উপস্থিত হল। আমি বললাম, তাদের একজনকে অপরজনের সঙ্গে বিবাহে আবদ্ধ কর। তিনি বললেন, তবুও তারা তাদের কথা হতে বিচ্ছিন্ন হলো না। তিনি বলেন, তারা আবার আমার সামনে দিয়ে আসলো। আমি অধৈর্য হয়ে বললাম, গুপ্তাঙ্গ কাষ্ঠের ন্যায়। এখানে আমি ইশারা ইঙ্গিত না করে স্পষ্টভাবেই বললাম। এতে তারা অভিসম্পাত করতে করতে ফিরে চলল আর বলতে লাগল, যদি এখানে আমাদের লোকদের মাঝে কেউ থাকত (তাহলে এ দুষ্টকে উপযুক্ত শাস্তি দিত)! পথিমধ্যে উভয় নারীর সাথে রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও আবূ বকর (রাঃ)-এর দেখা হলো। তখন তাঁরা উভয়ে উঁচুভূমি থেকে নীচে নামছিলেন। তিনি তাদের দু’জনকেই প্রশ্ন করলেন, কী হয়েছে তোমাদের? তাঁরা বলল, কা‘বাহ্ ও তার পর্দার মধ্যস্থলে এ বিধর্মী আছে। তিনি প্রশ্ন করলেন, সে তোমাদের কী বলেছে? তারা বলল, সে এমন কথা বলেছে যাতে মুখ ভরে যায় (মুখে বলা ঠিক না)। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এসে তাঁর সাথীসহ হাজ্রে আসওয়াদ চুম্বন করলেন এবং বাইতুল্লাহ্’র তাওয়াফ করে সলাত আদায় করলেন। যখন তিনি তাঁর সলাত আদায় শেষ করলেন তখন আবূ যার (রাঃ) বললেন, আমি প্রথম লোক, যে তাঁকে ইসলামী শার’ঈ নিয়মে সালাম জানিয়ে বললাম, আস্সালামু ‘আলাইকা ইয়া রসূলুল্লাহ্! (আপনার প্রতি সালাম ও শান্তি বর্ষিত হোক)। অতঃপর তিনি জানতে চাইলেন, তুমি কে? তিনি বললেন, আমি গিফার সম্প্রদায়ের ব্যক্তি। তিনি বললেন, তারপর তিনি তাঁর হাত ঝুকালেন এবং তাঁর হাতের আঙ্গুলগুলো কপালে রাখলেন। আমি ধারণা করলাম, গিফার সম্প্রদায়ের প্রতি আমার সম্পর্ককে তিনি পছন্দ করছেন না। তারপর আমি তাঁর হাত ধরতে চাইলাম। তাঁর সাথী আমাকে বাধা দিলেন। তিনি তাঁকে আমার তুলনায় বহু বেশী ভাল জানতেন। অতঃপর তিনি মাথা তুলে দেখলেন এবং আমাকে প্রশ্ন করলেন, তুমি কতদিন যাবৎ এখানে অবস্থান করছ? আমি বললাম, আমি এখানে ত্রিশটি রাত্রদিন যাবৎ আছি। তিনি বললেন, তোমাকে কে খাদ্য দিত? আমি বললাম, যমযম কূপের পানি ব্যতীত আমার জন্য অন্য কোন খাদ্য ছিল না। এ পানি পান করেই আমি স্থূলদেহী হয়ে গেছি, এমনকি আমার পেটের চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে এবং আমি কক্ষনো ক্ষুধার কোন দুর্বলতা বুঝতে পারিনি। তিনি বললেন, এ পানি অতিশয় বারাকাতময় ও প্রাচুর্যময় এবং তা অন্যান্য খাবারের মতো তা পেট পূর্ণ করে দেয়। তারপর আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ইয়া রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! তাকে আজ রাতের খাবার খাওয়ানোর জন্য আমাকে অনুমতি দিন। এরপর রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও আবূ বকর (রাঃ) রওনা হলেন এবং আমিও তাঁদের সঙ্গে চললাম। আবূ বকর (রাঃ) একটি দরজা খুললেন এবং আমাদের জন্য তিনি মুষ্টি ভরে তায়িফের কিশ্মিশ্ খেতে দিলেন। এটাই ছিল আমার প্রথম খাদ্য যা সেখানে আমি খেলাম। সেখানে যতক্ষণ থাকার তা থাকলাম। তারপর আমি রসূলুল্লা (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আসলাম। তিনি বললেন, আমাকে খেজুর সমৃদ্ধ একটি দেশের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে। আমার ধারণ সেটি ইয়াস্রিব (মাদীনার পুরনো নাম) ব্যতীত অন্য কোন জায়গা নয়। এরপর রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃতুমি কি আমার পক্ষ থেকে তোমার সম্প্রদায়ের নিকট আমার আহ্বান পৌঁছিয়ে দিবে? হয়ত তোমার ওয়াসীলায় আল্লাহ তাদের কল্যাণ দান করবেন এবং এদের হিদায়াতের জন্য তোমাকে পুরস্কৃত করবেন। তারপর আমি উনায়সের নিকট প্রত্যাবর্তন করলাম। সে বলল, আপনি কী করেছেন? আমি বললাম, আমি অবশ্যই ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং বিশ্বাস স্থাপন করেছি। সে (উনায়স) বলল, আপনার দ্বীন সম্পর্কে আমার কোন অভিযোগ নেই। আমিও ইসলাম কবূল করেছি এবং ঈমান এনেছি। তারপর আমরা দু’জনে মায়ের নিকট আসলাম। তিনি বললেন, তোমাদের দ্বীনের ব্যাপারে আমার কোন অভিযোগ নেই। আমিও ইসলাম কবূল করলাম এবং ঈমান আনলাম। তারপর আমরা আরোহিত হয়ে আমাদের গিফার সম্প্রদায়ের নিকট আসলাম। তাদের অর্ধেক লোক ইসলাম কবূল করল এবং ঈমা ইবনু রাহাযাহ্ গিফারী তাঁদের ইমামাত করেন। তিনি ছিলেন তাঁদের নেতা। তাদের বাকী অর্ধেক বলল, যখন রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাদীনায় আসবেন তখন আমরা ইসলাম কবূল করব। তারপরে রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাদীনাতে আসলেন এবং তাঁদের (গিফার সম্প্রদায়ের) অবশিষ্ট অর্ধেক ব্যক্তি ইসলামে দীক্ষিত হলো। এরপর আসলাম সম্প্রদায়ের লোকেরা আসলো। তারা বলল, হে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের ভাইয়েরা (মিত্ররা) যেভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছেন আমরাও তাঁদের ন্যায় ইসলাম গ্রহণ করলাম। এভাবে তাঁরাও ইসলামে দীক্ষিত হলো। অতঃপর রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃগিফার সম্প্রদায়কে আল্লাহ তা‘আলা মাফ করুন এবং আসলাম গোত্রকে আল্লাহ তা‘আলা নিরাপত্তা প্রদান করুন। (ই. ফা. ৬১৩৫, ই. সে. ৬১৭৮)
মালিক ইবনু আওস ইবনুল হাদাসান (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
তিনি বলেন, একদা দিনের কিছু অংশ অতিবাহিত হওয়ার পর ‘উমার (রাঃ) আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি তার কাছে গিয়ে দেখি, তিনি খেজুরের ছোবরার তৈরি একটি তক্তপোষের উপর বসে আছেন। আমি তার কাছে উপস্থিত হলে তিনি বললেন, হে মালিক! তোমার সম্প্রদায়ের কিছু লোক আমার কাছে এসেছে। আমি কিছু জিনিস তাদেরকে দেয়ার নির্দেশ দিয়েছি। সেগুলো তুমি তাদের মধ্যে বন্টন করে দিবে। আমি বললাম, আপনি যদি আমি ছাড়া অন্য কাউকে বন্টনের দায়িত্ব দিতেন। তিনি বললেন, এটা নাও (বন্টন করো)। খাদেম ইয়ারফা এসে বললো, হে আমীরুল মুমিনীন! ‘উসমান ইবনু ‘আফফান (রাঃ), ‘আব্দুর রহমান ইবনু ‘আওফ (রাঃ), যুবাইর ইবনুল ‘আওয়াম (রাঃ) এবং সা’দ ইবনু আবূ ওয়াক্কাস (রাঃ) আপনার সাক্ষাত প্রার্থী। তিনি বললেন, হ্যাঁ, তাদেরকে আসতে বলো। সুতরাং তারা এলেন। ইয়ারফা আবার এসে বললো, হে আমীরুল মুমিনীন! আল-‘আব্বাস ও ‘আলী (রাঃ) ভিতরে আসার অনুমতি প্রার্থী। তিনি বললেন, হ্যাঁ তাদেরকে আসতে দাও। তারাও প্রবেশ করলেন। আল-‘আব্বাস (রাঃ) বললেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আমার ও ‘আলীর মাঝে ফায়সালা করুন এবং তাদের শান্তির বিধান করুন। মালিক ইবনু আওস (রাঃ) বলেন, আমার মনে হলো; তারা দু’জনে এজন্যই ‘উসমান(রাঃ) ও তার সঙ্গীদের এখানে আগে পাঠিয়েছেন। ‘উমার (রাঃ) বললেন, ধৈর্য ধরো, শান্ত হও। অতঃপর তিনি উপস্থিত লোকদের লক্ষ্য করে বললেন, আমি আপনাদের সেই মহান আল্লাহর শপথ দিচ্ছি, যাঁর নির্দেশে আসমান-যমীন সুপ্রতিষ্ঠিত। আপনাদের কি জানা আছে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “আমরা (নাবীগণ) কোন উত্তরাধিকার রেখে যাই না, আমরা যা রেখে যাই তা সদাক্বাহ গণ্য”? তারা সকলে বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর তিনি ‘আলী ও আল-‘আব্বাসকে বললেন, আপনাদের উভয়কে সেই মহান আল্লাহর শপথ করে জিজ্ঞেস করছি, যাঁর নির্দেশে আসমান-যমীন অস্তিত্বমান! আপনারা কি জানেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “আমাদের (নাবীদের) কোন উত্তরাধীকার নাই, আমারা যা রেখে যাই তা সদাক্বাহ গণ্য”? ‘উমার(রাঃ) বলেন, মহান আল্লাহ রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছেন, যা অন্য কাউকে দেননি। মহান আল্লাহ বলেন, “আর যা কিছু আল্লাহ তাদের (ইহূদীদের) থেকে তাঁর রাসূলের নিকট ফিরিয়ে দিয়েছেন, তার জন্য তোমরা ঘোড়া ও উট পরিচালিত করোনি। বরং আল্লাহ তাঁর রাসূলদেরকে যার উপর ইচ্ছা কর্তৃত্ব দান করেন। আর আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ের উপরই ক্ষমতাবান” (সূরাহ আল-হাশরঃ ৬)। মহান আল্লাহ তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বনু নাযীর গোত্রের সম্পদ ফাই হিসেবে দান করেন। আল্লাহর শপথ! এ সম্পদের ব্যাপারে তিনি তোমাদের উপর কাউকে অগ্রাধিকার দেননি এবং তিনি তোমাদের বাদ দিয়ে অন্য কাউকেও দেননি। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ সম্পদ থেকে তাঁর পরিবারের এক বছরের ভরণপোষণের পরিমাণ নিতেন এবং অবশিষ্ট সম্পদ মুসলিমদের কল্যাণে ব্যয় করতেন। ‘উমার (রাঃ) উপস্থিত লোকদেরকে আবার বললেন, আমি আপনাদেরকে সেই মহান আল্লাহর শপথ দিয়ে জিজ্ঞেস করছি, যাঁর নির্দেশে আসমান-যমীন সুপ্রতিষ্ঠিত! আপনারা কি এসব জানেন? তারা বললেন, হ্যাঁ, অতঃপর তিনি আল-‘আব্বাস ও আলী (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললেন, আমি আপনাদের উভয়কে আল্লাহর শপথ দিয়ে বলছি, যাঁর নির্দেশে আসমান-যমীন সুপ্রতিষ্ঠিত! আপনাদের কি এসব বিষয় জানা আছে? তারা উভয়ে বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর যখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইন্তেকাল করেন, আবূ বকর (রাঃ) বললেন, এখন আমি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রতিনিধি। আপনি এবং ইনি (‘আলী) আবূ বাক্রের (রাঃ) নিকট আসলেন। আপনি আপনার ভ্রাতুষ্পুত্রের পরিত্যক্ত সম্পদে আপনার মীরাস দাবি করলেন এবং ইনি তার শশুরের সম্পদের স্ত্রীর মীরাস দাবি করলেন। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “আমাদের (নাবীদের) কোন ওয়ারিস নাই, আমরা যা রেখে যাই তা সদাক্বাহ হিসাবে গণ্য”। আল্লাহ জানেন, আবূ বাক্র ছিলেন সত্যবাদী, কল্যাণকামী, হেদায়াতপ্রাপ্ত ও সত্যের অনুসারী। তিনি উক্ত সম্পদের মুতাওয়াল্লী হন। পরবর্তীতে আবূ বাকর (রাঃ) মারা গেলে আমি বললাম, আমি রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উত্তরসুরি এবং আবূ বাক্রের (রাঃ) প্রতিনিধি। আল্লাহর ইচ্ছায় আমি এখন এ সম্পদের তত্ত্বাবধায়। আপনি এবং ইনি আমার নিকট এসেছেন। আপনাদেরকে উভয়ের উদ্দেশ্য ও কথা একই। আমি আপনাদের কাছে তা অর্পণ করতে পারি। শর্ত হলো, আপনারা আল্লাহর ওয়াদা মেনে চলবেন এবং এ সম্পদের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অনুসৃত নীতি অনুসরণ করবেন। উক্ত শর্তে সেগুলো আপনারা আমার কাছ থেকে নিয়েছিলেন। পরে আবার আমার নিকট এসেছেন। আপনারা চাচ্ছেন, এখন আমি পূর্বের ফায়সালার বিপরীত ফায়সালা প্রদান করি। আল্লাহর শপথ! ক্বিয়ামাত পর্যন্ত আমি এর বিপরীত করবো না। আপনারা এ দায়িত্ব পালনে অপারগ হলে এর দায়িত্ব আমার উপর ন্যস্ত করুন। আবূ দাউদ (রহঃ) বলেন, আল-‘আব্বাস (রাঃ) ও ‘আলী (রাঃ) এ সম্পত্তির দায়িত্বভার তাদের উভয়ের মধ্যে বন্টন করতে ‘উমারের (রাঃ) নিকট আবেদন করেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর বাণী, “আমরা যা রাখে যাই তাতে উত্তরাধিকার হবে না। বরং তা সদাক্বাহ হিসাবে গণ্য”। এ হাদীস তাদের উভয়ের অজানা ছিল না। বরং তারাও সত্যের অনুসন্ধানী ছিলেন, এজন্যই ‘উমার (রাঃ) বললেন, আমি এ সম্পদ ভাগ করবো না, বরং একে এর পূর্বাবস্থায়ই রাখবো। সহীহঃ মুখতাসার শামায়িল(৩৪১)।