আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
একদা রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সামনে গোশ্ত আনা হল এবং তাঁকে সামনের রান পরিবেশন করা হল। তিনি এটা পছন্দ করতেন। তিনি তার থেকে কামড়ে খেলেন। এরপর বললেন, আমি হব ক্বিয়ামাতের দিন মানবকুলের নেতা। তোমাদের কি জানা আছে তা কেন? ক্বিয়ামাতের দিন আগের ও পরের সকল মানুষ এমন এক ময়দানে জমায়েত হবে, যেখানে একজন আহ্বানকারীর আহ্বান সকলে শুনতে পাবে এবং সকলেই এক সঙ্গে দৃষ্টিগোচর করবে। সূর্য নিকটে এসে যাবে। মানুষ এমনি কষ্ট-ক্লেশের সম্মুখীন হবে যা অসহনীয় ও অসহ্যকর হয়ে পড়বে। তখন লোকেরা বলবে, তোমরা কী বিপদের সম্মুখীন হয়েছ, তা কি দেখতে পাচ্ছ না? তোমরা কি এমন কাউকে খুঁজে বের করবে না, যিনি তোমাদের রবের কাছে তোমাদের জন্য সুপারিশকারী হবেন? কেউ কেউ অন্যদের বলবে যে, আদামের কাছে চল। তখন সকলে তার কাছে এসে তাঁকে বলবে, আপনি আবুল বাশার । আল্লাহ্ তা‘আলা আপনাকে নিজ হস্ত দ্বারা সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর রূহ আপনার মধ্যে ফুঁকে দিয়েছেন এবং মালায়িকাহ্কে হুকুম দিলে তাঁরা আপনাকে সাজদাহ করেন। আপনি আপনার রবের নিকট আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কিসের মধ্যে আছি? আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কী অবস্থায় পৌঁছেছি। তখন আদাম (‘আ.) বলবেন, আজ আমার রব এত রাগানি¦ত হয়েছেন যার আগেও কোনদিন এরূপ রাগানি¦ত হননি আর পরেও এরূপ রাগানি¦ত হবেন না। তিনি আমাকে একটি গাছের নিকট যেতে নিষেধ করেছিলেন, কিন্তু আমি অমান্য করেছি, নফ্সী, নফ্সী, নফ্সী, (আমি নিজেই সুপারিশ প্রার্থী) তোমরা অন্যের কাছে যাও, তোমরা নূহ (‘আ.)-এর কাছে যাও। তখন সকলে নূহ্ (‘আ.)-এর কাছে এসে বলবে, হে নূহ্ (‘আ.)! নিশ্চয়ই আপনি পৃথিবীর মানুষের প্রতি প্রথম রসূল। আর আল্লাহ্ তা‘আলা আপনাকে পরম কৃতজ্ঞ বান্দা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সুতরাং আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না যে, আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি বলবেন, আমার রব আজ এত ভীষণ রাগানি¦ত যে, আগেও এমন রাগানি¦ত হননি আর পরে কখনো এমন রাগানি¦ত হবেন না। আমার একটি গ্রহণযোগ্য দু‘আ ছিল, যা আমি আমার কওমের ব্যাপারে করে ফেলেছি, (এখন) নফ্সী, নফ্সী, নফ্সী। তোমরা অন্যের কাছে যাও- যাও তোমরা ইব্রাহীম (‘আ.)-এর কাছে। তখন তারা ইব্রাহীম (‘আ.)-এর কাছে এসে বলবে, হে ইব্রাহীম (‘আ.)! আপনি আল্লাহ্র নাবী এবং পৃথিবীর মানুষের মধ্যে আপনি আল্লাহ্র বন্ধু । আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি তাদের বলবেন, আমার রব আজ ভীষণ রাগানি¦ত, যার আগেও কোন দিন এরূপ রাগানি¦ত হননি, আর পরেও কোনদিন এরূপ রাগানি¦ত হবেন না। আর আমি তো তিনটি মিথ্যা বলে ফেলেছিলাম। রাবী আবূ হাইয়ান তাঁর বর্ণনায় এগুলোর উল্লেখ করেছেন- (এখন) নফ্সী, নফ্সী, নফ্সী, তোমরা অন্যের কাছে যাও- যাও মূসার কাছে। তারা মূসার কাছে এসে বলবে, হে মূসা (‘আ.)! আপনি আল্লাহ্র রসূল। আল্লাহ্ আপনাকে রিসালাতের সম্মান দিয়েছেন এবং আপনার সঙ্গে কথা বলে সমস্ত মানবকূলের উপর মর্যাদা দান করেছেন। আপনি আপনার রবের কাছে আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না আমরা কিসের মধ্যে আছি? তিনি বললেন, আজ আমার রব ভীষণ রাগানি¦ত আছেন, এরূপ রাগানি¦ত আগেও হননি এবং পরেও এরূপ রাগানি¦ত হবেন না। আর আমি তো এক ব্যক্তিকে হত্যা করে ফেলেছিলাম, যাকে হত্যা করার জন্য আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়নি। এখন নফ্সী, নফ্সী, নফ্সী। তোমরা অন্যের কাছে যাও- যাও ঈসা (‘আ.)-এর কাছে। তখন তারা ঈসা (‘আ.)-এর কাছে এসে বলবে, হে ঈসা (‘আ.)! আপনি আল্লাহ্র র রসূল এবং কালিমাহ , যা তিনি মারইয়াম (‘আ.)-এর উপর ঢেলে দিয়েছিলেন। আপনি ‘রূহ’ । আপনি দোলনায় থেকে মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। আজ আপনি আমাদের জন্য সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না, আমরা কিসের মধ্যে আছি? তখন ঈসা (‘আ.) বলবেন, আজ আমার রব এত রাগানি¦ত যে, এর আগে এরূপ রাগানি¦ত হননি এবং এর পরেও এরূপ রাগানি¦ত হবেন না। তিনি নিজের কোন গুনাহ্র কথা বলবেন না। নফ্সী, নফ্সী, নফ্সী, তোমরা অন্য কারও কাছে যাও- যাও মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে। তারা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে এসে বলবে, হে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! আপনি আল্লাহ্র রসূল এবং শেষ নাবী। আল্লাহ্ তা‘আলা আপনার আগের, পরের সকল গুনাহ্ ক্ষমা করে দিয়েছেন। আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের কাছে সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখছেন না আমরা কিসের মধ্যে আছি? তখন আমি আরশের নিচে এসে আমার রবের সামনে সাজদাহ দিয়ে পড়ব। তারপর আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর প্রশংসা ও গুণগানের এমন সুন্দর নিয়ম আমার সামনে খুলে দিবেন, যা এর পূর্বে অন্য কারও জন্য খোলেননি। এরপর বলা হবে, হে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! তোমার মাথা উঠাও। তুমি যা চাও, তোমাকে দেয়া হবে। তুমি সুপারিশ কর, তোমার সুপারিশ কবূল করা হবে। এরপর আমি আমার মাথা উঠিয়ে বলব, হে আমার রব! আমার উম্মত। হে আমার রব! আমার উম্মত। হে আমার রব! আমার উম্মত। তখন বলা হবে, হে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)! আপনার উম্মাতের মধ্যে যাদের কোন হিসাব-নিকাশ হবে না, তাদেরকে জান্নাতের দরজাসমূহের ডান পার্শ্বের দরজা দিয়ে প্রবেশ করিয়ে দিন। এ দরজা ব্যতীত অন্যদের সঙ্গে অন্য দরজায় ও তাদের প্রবেশের অধিকার থাকবে। তারপর তিনি বলবেন, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, সে সত্তার শপথ! জান্নাতের এক দরজার দুই পার্শ্বের মধ্যবর্তী স্থানের প্রশস্ততা যেমন মাক্কাহ ও হামীরের মধ্যবর্তী দূরত্ব, অথবা মক্কা ও বস্রার মাঝে দূরত্বের সমতুল্য। [৩৩৪০] (আ.প্র. ৪৩৫১, ই.ফা. ৪৩৫৩)
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্নিতঃ
আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ আপনার উম্মাত সর্বদা এটা কে সৃষ্টি করল। এ ধরনের প্রশ্ন করতে থাকবে। এমনকি এ প্রশ্নও করবে যে, সকল সৃষ্টিই আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, তা হলে আল্লাহকে সৃষ্টি করল কে? (ই.ফা. ২৫০; ই.সে. ২৫৯)
আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
তিনি বলেন, কোন এক সময় রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে গোশত আনা হলো। তারপর তাঁকে সামনের একটি রান উঠিয়ে দেয়া হলো। তিনি তা খুবই পছন্দ করতেন- আর তিনি তা দাঁত দিয়ে ছিড়ে ছিড়ে খেতে থাকলেন। তারপর তিনি বললেনঃ কিয়ামাত দিবসে আমিই হবো সকল মানুষের নেতা। তোমরা কি জান এর কারণ কি? আল্লাহ্ তা’আলা সেদিন পূর্বেকার ও পরের সকল মানুষকে এক জায়গায় সমবেত করবেন। একজনের আওয়াজই সবার কাছে পৌছে যাবে এবং সবাই একজনের দৃষ্টিসীমার মধ্যে থাকবে। সূর্য তাদের খুব নিকটে এসে যাবে। মানুষ সীমাহীন দুর্ভোগ ও সামর্থ্যের অতীত দুর্ভাবনায় পড়ে যাবে এবং ধৈর্য্যহারা হয়ে পড়বে। তারা পরস্পরকে বলবে, তোমরা কি এ দুঃসহ বিপদ দেখতে পাচ্ছ না? তোমাদের প্রভুর নিকট তোমাদের জন্য সুপারিশ করতে পারে এরূপ কাউকে খুঁজে দেখছ না কেন? লোকেরা একে অপরকে বলবে, তোমাদের উচিত আদম (আ:)-এর কাছে যাওয়া। অতএব, তারা আদম (আ:)-এর নিকট গিয়ে বলবে, আপনি তো মানব জাতির আদি পিতা। আল্লাহ্ তা’আলা আপনাকে তাঁর নিজ হাতে বানিয়েছেন এবং আপনার মধ্যে তাঁর সৃষ্ট রূহ্ ফুঁকে দিয়েছেন। তারপর ফেরেশতাদের নির্দেশ দিলে তারা আপনাকে সাজদাহ করেছেন। আপনি আমাদের জন্য আপনার প্রভুর নিকট সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না আমরা কি অবস্থার মধ্যে পতিত আছি? আপনি কি লক্ষ্য করছেন না আমরা দুঃখ-দুর্দশার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি! আদম (আ:) তাদেরকে বলবেন, আমার প্রভু তো আজ এতই ক্রোধান্বিত হয়েছেন যেরূপ ইতিপূর্বে আর কখনো হননি এবং পরেও কখনো হবেন না। তিনি আমাকে একটি গাছের ব্যাপারে (তার ফল খেতে) নিষেধ করেছিলেন। আমি সেটা অমান্য করেছি। নাফসী, নাফসী, নাফসী (অর্থাৎ- আমারই তো কোন উপায় দেখছি না)। তোমরা অন্য কারো নিকটে যাও। তোমরা বরং নূহ্ (আ:)-এর নিকট যাও। তারা তখন নূহ্ (আ:)-এর নিকট গিয়ে বলবে, হে নূহ! আপনি তো দুনিয়াবাসীদের জন্য প্রথম রাসূল। আল্লাহ্ তা’আলা আপনাকে ‘আব্দ শাকূর’ (কৃতজ্ঞ বান্দাহ) উপাধি দিয়েছেন, আপনি আমাদের জন্য আপনার প্রভুর নিকট সুপারিশ করুন। আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না যে, আমরা কি অবস্থায় পতিত আছি, আপনি কি লক্ষ্য করছেন না আমরা দু:খ-দুর্দশার শেষ সীমায় পৌঁছে গেছি! নূহ্ (আ:) তাদেরকে বলবেন, আজ আমার প্রতিপালক এতই রাগান্বিত হয়েছেন যেমনটি এরপূর্বে আর কখনো হননি এবং পরেও হবেন না। আমাকে একটি দু’আ করার অধিকার দেয়া হয়েছিল (যে উদ্দেশ্যেই দু’আ করব আল্লাহ্ তা’আলা তা ক্ববূল করবেন বলে অঙ্গীকার ছিল)। কিন্তু আমি আমর উম্মাতের বিরুদ্ধে সেই দু’আ করেছি। নাফসী, নাফসী, নাফসী। তোমরা অন্য কারো কাছে যাও। তোমরা বরং ইবরাহীম (আ:)-এর নিকট যাও। তারা ইবরাহীম (আ:)-এর নিকট গিয়ে বলবে, হে ইবরাহীম ! আপনি আল্লাহ্র নবী এবং দুনিয়াবাসীদের মধ্যে তাঁর অন্তরঙ্গ বন্ধু। আমরা কি অবস্থার মধ্যে পতিত আছি আপনি দেখতে পাচ্ছেন না? আপনি আমাদের জন্য আপনার প্রভুর নিকট সুপারিশ করুন। তিনি বলবেন, আমার পরোয়ারদিগার আজ এতই রাগান্বিত হয়েছেন, যেমনটি এরপূর্বে তিনি আর কখনো হননি এবং পরেও কখনো হবেন না। আমি তিনটি মিথ্যা কথা বলেছি। আবূ হাইয়্যান তাঁর বর্ণিত হাদীসে সেগুলো উল্লেখ করেছেন। নাফসী, নাফসী, নাফসী (আমি আজ আমার নিজের চিন্তায় অস্থির)। তোমরা বরং অন্য কারো নিকট যাও, তোমরা মূসা (আ:)-এর নিকট যাও। তখন তারা মূসা (আ:)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলবে, হে মূসা ! আপনি তো আল্লাহ্র রাসূল, আল্লাহ্ তাঁর রিসালাত ও বাক্যালাপ দ্বারা আপনাকে মানুষের উপর মর্যাদা প্রদান করেছেন। আপনি কি আমাদের প্রাণান্তকর এ করুণ অবস্থা দেখছেন না? আপনি আমাদের জন্য আপনার প্রভুর নিকট সুপারিশ করুন। তিনি বলবেন, আল্লাহ্ তা’আলা তো আজ এতই ক্রোধান্বিত হয়েছেন, যেমনটি এরপূর্বে তিনি আর কখনো হননি আর পরেও হবেন না। আমি তো এক লোককে হত্যা করেছি। অথচ তাকে হত্যার নির্দেশ আমাকে প্রদান করা হয়নি। নাফসী, নাফসী, নাফসী। তোমরা বরং অন্য কারো নিকট যাও। তোমরা ঈসা (আ:)-এর নিকট যাও। তখন ঈসা (আ:)-এর নিকট গিয়ে তারা বলবে, হে ঈসা ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল, তাঁর একটি বাণী যা তিনি মারইয়ামের গর্ভে নিক্ষেপ করেছেন এবং তাঁর সৃষ্ট আত্মা। আপনি দোলনায় থাকাবস্থায় মানুষের সাথে কথা বলেছেন। আপনি কি আমাদের এ করুণ অবস্থা দেখছেন না? আপনি আমাদের জন্য আপনার প্রভুর নিকট সুপারিশ করুন। তখন ঈসা (আ:) বলবেন, আমার পরোয়ারদিগার আজ এতই রাগান্বিত হয়েছেন, যেমনটি এর আগে তিনি আর কখনো হননি এবং পরে কখনো হবেন না। তিনি কোন গুনাহের কথা উল্লেখ করবেন না। তিনি বললেন, নাফসী, নাফসী, নাফসী। তোমরা অন্য কারো নিকট যাও। তোমরা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট যাও। তখন তারা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট হাযির হয়ে বলবে, হে মুহাম্মাদ ! আপনি আল্লাহ্র রাসূল, নাবীগণের মধ্যে সর্বশেষ নাবী, আপনার পূর্বাপর সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হয়েছে। আপনি কি দেখছেন না আমরা কি অবস্থায় পতিত আছি! আপনি আমাদের জন্য আপনার প্রভুর নিকট সুপারিশ করুন। তখন আমি রাওয়ানা হয়ে আরশের নীচে উপস্থিত হবো। তারপর আমার প্রভুর উদ্দেশ্যে সাজদায় লুটিয়ে পড়ব। তারপর আল্লাহ তা’আলা আমার জন্য তাঁর প্রশংসা ও সর্বোত্তম গুণগানের এমন কিছু উন্মুক্ত করে দিবেন যা আমার পূর্বে আর কারো জন্য উন্মুক্ত করা হয়নি। তারপর বলা হবে, হে মুহাম্মাদ! তুমি মাথা উঠাও এবং আবেদন কর, তোমার আবেদন পূরণ করা হবে, সুপারিশ কর তোমার সুপারিশ ক্ববূল করা হবে। তারপর আমি মাথা তুলে বলব, হে পরোয়ারদিগার! আমার উম্মাত, হে পরোয়ারদিগার! আমার উম্মাত (তাদের রক্ষা করুন)। তখন আল্লাহ্ তা’আলা বলবেন, হে মুহাম্মাদ! তোমার উম্মাতের মধ্যে যাদের কোন হিসাব-নিকাশ নেই তাদেরকে তুমি জান্নাতের ডান দরজা দিয়ে প্রবেশ করাও। অধিকন্তু তারা অন্য মানুষের সাথে শরীক হয়ে অন্যান্য দরজা দিয়ে প্রবেশ করার অধিকারও পাবে। তারপর তিনি বললেন, যার হাতে আমার প্রাণ সেই মহান সত্তার শপথ! জান্নাতের দরজার দুটি চৌকাঠের মধ্যকার ব্যবধান মক্কা ও হাজার এবং মক্কা ও বুসরার মধ্যকার ব্যবধানের সমান। সহীহ, তাখরীজ তাহাভীয়া (১৯৮), যিলালুল জান্নাত (৮১১)।
উবাইদুল্লাহ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু আবী সাওর (রহঃ) থেকে বর্নিতঃ
ইবনু আব্বাস (রাঃ)-কে আমি বলতে শুনেছি, আমি উমার (রাঃ)-এর নিকট রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সেই দু’জন সহধর্মিণী প্রসঙ্গে প্রশ্ন করতে চাচ্ছিলাম যাদের প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ “যদি তোমরা দু’জন অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ তায়ালার দিকে রুজু হও তবে তা ভাল, কারণ তোমাদের দু’জনের মন ঝুঁকে পড়েছে”- (সূরা তাহরীম ৪)। অবশেষে উমার (রাঃ) হাজ্জে গেলেন এবং আমিও তার সঙ্গে হাজ্জে গেলাম। পাত্র হতে আমি পানি ঢেলে দিলাম এবং তিনি উযূ করলেন। আমি বললাম, হে আমীরুল মু’মিনীন! রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সেই দু’জন স্ত্রী কে যাদের প্রসঙ্গে আল্লাহ তা’য়ালা বলেছেনঃ “যদি তোমরা দু’জন অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ তা’য়ালার দিকে রুজু হও তবে ভাল, কেননা তোমাদের দু’জনের মন ঝুঁকে পড়েছে”- (সূরা তাহরীম ৪)। উমার (রাঃ) বলেন, হে ইবনু আব্বাস! আশ্চর্য (তুমি এটুকুও জান না)! যুহরী (রহঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! এ কথায় প্রশ্ন করা তার নিকট মন্দ লেগেছে, কিন্তু তিনি তা লুকিয়ে রাখেননি। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, তিনি আমাকে বললেন, তারা দু’জন ‘আয়িশাহ ও হাফসাহ। তারপর তিনি ঘটনাটির ব্যাখ্যা দিতে আরম্ভ করেন। তিনি বলেন, আমরা কুরাইশগণ মহিলাদের উপর প্রভাবশালী ছিলাম। কিন্তু মাদীনায় পৌঁছে আমরা দেখলাম, এখানকার পুরুষদের উপর মহিলাদের প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। সুতরাং আমাদের মহিলারা এখানকার মহিলাদের অভ্যাস আয়ত্ত করে। একদিন আমি আমার সহধর্মিণীর উপর রাগ করলে সে আমার কথার প্রত্যুত্তর করে। কিন্তু তার প্রত্যুত্তর করাটাকে আমি অপছন্দ করলাম। সে বলল, এতে আপনার মন্দ লাগার কি আছে। আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সহধর্মিণীগণও তাঁর কথার প্রত্যুত্তর করেন এবং সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাদের কেউ কেউ তো তাঁর সংস্পর্শ থেকে চলে যান। উমার (রাঃ) বলেন, আমি মনে মনে বললাম, যে তাদের মাঝে তা করে সে তো বঞ্চিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হল। উমার (রাঃ) বলেন, আমার বসতি ছিল মাদীনার উচ্চভূমিতে বনূ উমাইয়ার এলাকায়। আমার এক আনসারী প্রতিবেশী ছিল। পর্যায়ক্রমে আমরা দু’জনে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাজলিসে আসা-যাওয়া করতাম। তদনুযায়ী একদিন সে তাঁর মাজলিসে গিয়ে ওয়াহী ও অন্যান্য বিষয়ের খবর নিয়ে এসে তা আমাকে জানাত এবং একদিন আমি তথায় গিয়ে (ফিরে এসে) তাকে একই রকম খবর দিতাম। উমার (রাঃ) বলেন, আমাদের মাঝে আলোচনা হচ্ছিল যে, আমাদের বিপক্ষে গাসসানীরা যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার জন্য তাদের ঘোড়াগুলো তৈরী করছে। একদা রাতের বেলা সে আমার দরজায় এসে করাঘাত করলে আমি তার নিকটে বেরিয়ে এলাম। সে বলল, একটি মারাত্মক ঘটনা ঘটেছে। আমি বললাম, গাসসানীরা কি এসে গেছে? সে বলল, তার তুলনায়ও আরো মারাত্মক ঘটনা ঘটেছে। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন। উমার (রাঃ) বলেন, আমি মনে মনে বললাম, হাফসা হতভাগিনী ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমি পূর্বেই ভাবছিলাম এমন একটা কিছু ঘটবে। তিনি বলেন, আমি ফজরের নামাজ আদায় করে কাপড়-চোপড় পরিধান করে রওয়ানা হলাম এবং হাফসার কক্ষে দিয়ে প্রত্যক্ষ করলাম যে, সে কাঁদছে। আমি বললাম, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তোমাদেরকে তালাক দিয়েছেন কি? হাফসা (রাঃ) বলেন, আমি জানি না, তবে তিনি ঐ উপরের কুঠরিতে নির্জনতা অবলম্বন করেছেন। তিনি বলেন, তারপর ওখান হতে আমি বের হয়ে এক কৃষ্ণাঙ্গ গোলামের কাছে এসে বললাম, ‘উমারের জন্য ঢোকার অনুমতি চাও। ‘উমার (রাঃ) বলেন, তখন সে ভিতরে ঢুকল, তারপর আমার কাছে ফিরে এসে বলল, তাঁর নিকট আমি আপনার কথা বলেছি কিন্তু তিনি নিশ্চুপ ছিলেন। উমার (রাঃ) বলেন, অতঃপর আমি মাসজিদে চলে এলাম। সেখানে আমি মিম্বারের আশেপাশে কিছু সংখ্যক লোককে কান্নারত দেখলাম। তাদের নিকট আমিও বসলাম, কিন্তু আমার অস্থিরতা বেড়ে গেল। তাই আমি পুনরায় ঐ দাসের নিকট এসে বললাম, তুমি ‘উমারের জন্য ঢোকার অনুমতি চাও। অতঃপর সে ভিতর বাড়িতে প্রবেশ করে আবার ফিরে এসে বলল, আপনার কথা আমি তাঁকে বলেছি কিন্তু তিনি কিছুই বলেননি। আমি পুনরায় মসজিদে ফিরে এলাম এবং বসে পড়লাম, কিন্তু আমাকে একই চিন্তা চিন্তান্বিত করে তুলল। তাই আমি সেই গোলামের নিকট গিয়ে বললাম, উমারের জন্য ঢোকার অনুমতি চাও। সে ভিতরে ঢুকে ফিরে এসে বলল, আপনার কথা আমি তাকে বলেছি কিন্তু তিনি কিছুই বলেননি। ‘উমার (রাঃ) বলেন, আমি ফিরে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ দাসটি আমাকে ডেকে বলল, ভিতরে প্রবেশ করুন। তিনি আপনাকে ঢোকার অনুমতি দিয়েছেন। তারপর ভিতরে প্রবেশ করে আমি প্রত্যক্ষ করলাম, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চাটাইয়ের উপর হেলাম দিয়ে শুয়ে আছেন এবং তাঁর প্রত্যেক বাহুতে চাটাইয়ের দাগ পড়ে আছে। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আপনার স্ত্রীদের তালাক দিয়েছেন কি? তিনি বললেনঃ না। আমি বললাম, আল্লাহু আকবার (আল্লাহ মহান)। হে আল্লাহর রাসূল! আপনি দেখুন, আমরা কুরাইশগণ মহিলাদের উপরে প্রভাব বিস্তার করে রাখতাম। কিন্তু মদীনায় পৌঁছে আমরা দেখলাম যে, একদল ব্যক্তিদের উপর তাদের নারীরাই প্রভাব বিস্তার করে রেখেছে। আমাদের মহিলারা তাদের নারীগণের এ অভ্যাস আয়ত্ত করে নিয়েছে। একদিন আমি আমার স্ত্রীর উপর রাগান্বিত হলাম, কিন্তু সে আমার প্রতিটি কথার প্রত্যুত্তর করল। আমি তার এমন আচরণকে অতীব মন্দ মনে করলাম। সে বলল, কেন এটা আপনি পছন্দ করছেন না। আল্লাহর শপথ! রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রীগণও তো তাঁর কথার প্রত্যুত্তর করেন, এমনকি তাদের কেউ কেউ সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করে কাটান। ‘উমার (রাঃ) বলেন, আমি হাফসাকে প্রশ্ন করলাম, তুমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) –এর সাথে কি কথা কাটাকাটি কর? সে বলল, হ্যাঁ, আর আমাদের কেউ কেউ তো সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত তাঁর সঙ্গ ত্যাগ করে কাটিয়ে দেয়। আমি বললাম, তোমাদের মাঝে যে এমন করেছে সে তো হতভাগিনী ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ সম্পর্কে তোমাদের কেউ কি নিরাপদ হয়ে গেছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের কারো প্রতি নাখোশ হওয়ার কারণে আল্লাহ তা’য়ালাও তার উপর নাখোশ হবেন এবং ফলে সে ধ্বংস হবে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অল্প হাসলেন। উমার (রাঃ) বলেন, অতঃপর আমি হাফসাকে বললাম, তুমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে ঝগড়া করবেন না এবং তাঁর নিকট কোন কিছুর বায়না ধরবে না। যা কিছুর তোমার দরকার হয় আমার কাছে চাইবে। আর তুমি ধোঁকা খেও না, তোমার সতীন তোমার তুলনায় সুন্দরী এবং রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর খুব বেশী প্রিয়। উমার (রাঃ) বলেন, (এ কথা শুনে) তিনি আবার মুচকি হাসি দিলেন। অতঃপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনার সঙ্গে আরো কিছু সময় কাটাই? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ। উমার (রাঃ) বলেন, মাথা তুলে ঘরের মাঝে তাকিয়ে আমি কেবল তিনটি চামড়া ব্যতীত আর কিছুই দেখিন। তাই আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আপনি আপনার উম্মাতের আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য আল্লাহ তা’আলার নিকট দু’আ করুন। তিনি তো পারস্য ও রোমের বসবাসকারীদেরকে প্রাচুর্য দান করেছেন, অথচ তারা আল্লাহ তাআলার ইবাদাত করে না। (এ কথায়) রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উঠে সোজা হয়ে বসলেন এবং বললেনঃ হে খাত্তাবের ছেলে! তুমি এখনো সন্দেহের মাঝে আছ কি? এরা তো এরূপ লোক যাদেরকে নিজস্ব সৎকর্মের প্রতিদান পার্থিব জীবনেই দেয়া হয়েছে। উমার (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একমাস তাঁর সহধর্মিণীদের সঙ্গে মেলামেশা না করার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। এজন্য আল্লাহ তা’আলা তাঁর উপর অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন এবং প্রতিজ্ঞা ভঙ্গের কাফফারার (ক্ষতিপূরণ) বন্দোবস্ত করেন। যুহরী (রহঃ) বলেন, উরওয়াহ (রহঃ) আমার নিকট ‘আয়িশাহ (রাঃ)-এর সূত্রে রিওয়ায়াত করেছেন যে, তিনি বলেছেন, ঊনত্রিশ দিন পার হলে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বপ্রথমে আমার নিকট আসেন। তিনি বলেনঃ হে ‘আয়িশাহ! আমি তোমার নিকট একটি বিষয় উল্লেখ করছি, তোমার পিতা-মাতার সঙ্গে তুমি এ প্রসঙ্গে আলোচনা না করেই তাড়াহুড়া করে জবাব দিবে না। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, অতঃপর এ আয়াতটি তিনি পাঠ করেন (অনুবাদ)ঃ “হে নাবী! আপনি আপনার স্ত্রীগণকে বলুন, যদি তোমরা পার্থিব জীবন ও তার সৌন্দর্য কামনা কর...” (সূরা আহযাব ২৮)। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! তিনি অবগত যে, আমার পিতা-মাতা আমাকে তাঁর হতে আলাদা হওয়ার অনুমতি দিবেন না। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, এ প্রসঙ্গে আমার পিতা-মাতার কি পরামর্শ চাইব? আমি তো আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এবং আখিরাতের বাসস্থান প্রত্যাশা করি। সহীহঃ বুখারী ও মুসলিম।