নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রী ‘আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
মিথ্যা অপবাদকারীরা যখন তাঁর সম্পর্কে অপবাদ রটনা করল এবং আল্লাহ তা হতে তাঁর পবিত্রতা ঘোষনা করলেন। রাবীগণ বলেন, ‘আয়িশা (রাঃ) বলেছেন, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সফরে বের হবার ইচ্ছা করলে স্বীয় স্ত্রীদের মধ্যে কুর‘আ ঢালার মাধ্যমে সফর সঙ্গিনী নির্বাচন করতেন। তাঁদের মধ্যে যার নাম বেরিয়ে আসত তাকেই তিনি নিজের সঙ্গে নিয়ে যেতেন। এক যুদ্ধে যাবার সময় তিনি আমাদের মধ্যে কুর‘আ ডাললেন, তাতে আমার নাম বেরিয়ে এলো। তাই আমি তাঁর সঙ্গে (সফরে) বের হলাম। এটা পর্দার নির্দেশ নাযিল হবার পরের ঘটনা। আমাকে হাওদার ভিতরে সওয়ারীতে উঠানো হত, আবার হাওদায় থাকা অবস্থায় নামানো হত। এভাবেই আমরা সফর করতে থাকলাম। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঐ যুদ্ধ শেষ করে যখন প্রত্যাবর্তন করলেন এবং আমরা মদীনার নিকট পৌছে গেলাম তখন এক রাতে তিনি মনযিল ত্যাগ করার ঘোষনা দিলেন। উক্ত ঘোষনা দেয়ার সময় আমি উঠে সেনাদলকে অতিক্রম করে গেলাম এবং নিজের প্রয়োজন সেরে হাওদায় ফিরে এলাম। তখন বুকে হাত দিয়ে দেখি আযফার দেশীয় সাদা কালো পাথরের তৈরী আমার একটা মালা ছিঁড়ে পড়ে গেছে। তখন আমি আমার মালার সন্ধানে ফিরে গেলাম এবং সন্ধান কার্য আমাকে বিলম্বিত করে দিল। ওদিকে যারা আমার হাওদা উঠিয়ে দিত তারা তা উঠিয়ে যে উটে আমি সওয়ার হতাম, তার পিঠে রেখে দিল। তাদের ধারনা ছিল যে, আমি হাওদাতেই আছি। তখনকার মেয়েরা দুবলা পাতলা হত, মোটা সোটা হত না। কেননা খুব সামান্য খাবার তারা খেতে পেত। তাই হাওদা উঠাতে গিয়ে তার ভার তাদের নিকট অস্বাভাবিক বলে মনে হল না। তদুপরি সে সময় আমি অল্প বয়স্কা কিশোরী ছিলাম এবং তখন তারা হাওদা উঠিয়ে উট হাঁকিয়ে রওনা হয়ে গেল। এদিকে সেনাদল চলে যাবার পর আমি আমার মালা পেয়ে গেলাম। কিন্তু তাদের জায়গায় ফিরে এসে দেখি, সেখানে কেউ নেই। তখন আমি আমার জায়গায় এসে বসে থাকাই স্থির করলাম। আমার ধারনা ছিল যে, আমাকে না পেয়ে আবার এখানে তারা ফিরে আসবে। বসে থাকা অবস্থায় আমার দু’ চোখে ঘুম এলে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। সাফওয়ান ইবনু মুআত্তাল, যিনি প্রথমে সুলামী এবং পরে যাকওয়ানী হিসাবে পরিচিত ছিলেন, সেনা দলের পিছনে (পরিদর্শক হিসাবে) রয়ে গিয়েছিলেন। সকালের দিকে আমার অবস্থান স্থলের কাছাকাছি এসে পৌছলেন এবং একজন ঘুমন্ত মানুষের শরীর দেখতে পেয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। পর্দার বিধান নাযিলের আগে তিনি আমাকে দেখেছিলেন। যে সময় তিনি উট বসাচ্ছিলেন সে সময় তার ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ শব্দে আমি জেগে গেলাম। তিনি উটের সামনে পা চেপে ধরলে আমি তাতে সওয়ার হলাম। আর তিনি আমাকে নিয়ে সাওয়ারী হাঁকিয়ে চললেন। সেনাদল ঠিক দুপুরে যখন বিশ্রাম করছিল, তখন আমরা সেনাদলে পৌছলাম। সে সময় যারা ধ্বংস হবার, তারা ধ্বংস হল। অপবাদ রটনায় যে নেতৃত্ব দিয়েছিল, সে হলো ‘আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সালুল। আমরা মদীনায় উপস্থিত হলাম এবং আমি এসেই একমাস অসুস্থতায় ভুগলাম। এদিকে কতিপয় ব্যক্তি অপবাদ রটনাকারীদের রটনা নিয়ে চর্চা করতে থাকল। আমার অসুস্থতার সময় এ বিষয়টি আমাকে সন্দিহান করে তুলল যে, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পক্ষ হতে সেই স্নেহ আমি অনুভব করছিলাম না, যা আমার অসুস্থার সময় সচরাচর আমি অনুভব করতাম। তিনি শুধু ঘরে প্রবেশ করে সালাম দিয়ে বলতেন কেমন আছ? আমি সে বিষয়ের কিছুই জানতাম না। শেষ পর্যন্ত খুব দুর্বল হয়ে পড়লাম। (একরাতে) আমি ও উম্মু মিসতাহ প্রয়োজন সারার উদ্দেশে ময়দানে বের হলাম। আমরা রাতেই শুধু সেদিকে যেতাম। এ আমাদের ঘরগুলোর নিকটবর্তী স্থানে পায়খানা বানানোর আগের নিয়ম। জঙ্গলে কিংবা দুরবর্তী স্থানে প্রয়োজন সারার ব্যাপারে আমারদের অবস্থাটা প্রথম যুগের আবরদের মতোই ছিল। যাই হোক, আমি এবং উম্মু মিসতাহ বিনতে আবূ রূহম হেঁটে চলছিলাম। ইত্যবসরে সে তার চাদরে পা জড়িয়ে হোঁচট খেল এবং বলল, মিসতাহ এর জন্য দুর্ভোগ। আমি তাকে বললাম, তুমি খুব খারাপ কথা বলেছ। বদর যুদ্ধে শরীক হয়েছে, এমন এক ব্যক্তিকে তুমি অভিশাপ দিচ্ছ! সে বলল, হে সরলমনা! যে সব কথা তারা উঠিয়েছে, তা কি তুমি শুনোনি? অতঃপর অপবাদ রটনাকারীদের সব রটনা সম্পর্কে সে আমাকে অবহিত করল। তখন আমার রোগের উপর তীব্রতা বৃদ্ধি পেল। আমি ঘরে ফিরে আসার পর রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার নিকট এসে জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছ? আমি বললাম, আমাকে আমার পিতা-মাতার নিকট যাবার অনুমতি দিন। তিনি [‘আয়িশা (রাঃ)] বলেন, আমি তখন তাদের (পিতা-মাতার) নিকট হতে এ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলাম। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে অনুমতি দিলেন। আমি আমার পিতা-মাতার নিকট গেলাম। অতঃপর আমি মাকে বললাম, লোকেরা কী বলাবলি করে? তিনি বললেন, বেটি! ব্যাপারটাকে নিজের জন্য হালকাভাবেই গ্রহন কর। আল্লাহর শপথ! এমন সুন্দরী রমণী খুব কমই আছে যাকে তার স্বামী ভালোবাসে আর তার একাধিক সতীনও আছে; অথচ ওরা তাকে উত্যক্ত করে না। আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ! লোকেরা সত্যি তবে এসব কথা রটিয়েছে? তিনি [‘আয়িশা (রাঃ)] বলেন, ভোর পর্যন্ত সে রাত আমার এমনভাবে কেটে গেল যে, চোখের পানি আমার বন্ধ হল না এবং ঘুমের একটু পরশও পেলাম না। এভাবে ভোর হল। পরে রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওয়াহীর বিলম্ব দেখে আপন স্ত্রীকে পরিত্যাগের ব্যাপারে ইবনু আবূ তালিব ও উসামাহ ইবনু যায়দকে ডেকে পাঠালেন। যাই হোক, উসামাহ পরিবারের জন্য তাঁর [নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) –এর] ভালোবাসার প্রতি লক্ষ্য করে পরামর্শ দিতে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রসুল! আল্লাহর কসম (তারঁ সম্পর্কে) ভালো ব্যতীত অন্য কিছু আমরা জানিনা, আর ‘আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রসুল! কিছুতেই আল্লাহ আপনার পথ সংকীর্ণ করেননি। তাঁকে ব্যতীত আরো অনেক নারী আছে। আপনি না হয় বাঁদীকে জিজ্ঞেস করুন সে আপনাকে সত্য কথা বলবে। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন (বাঁদী) বারীরাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, হে বারীরা! তুমি কি তার মধ্যে সন্দেহজনক কিছু দেখতে পেয়েছ? বারীরা বলল, আপনাকে যিনি সত্যসহ পাঠিয়েছেন, তাঁর কসম করে বলছি, না, তেমন কিছুই দেখিনি, এই একটি অবস্থায়ই দেখেছি যে, তিনি অল্পবয়স্কা কিশোরী। আর তাই আটা খামির করতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। সেই ফাঁকে বকরী এসে তা খেয়ে ফেলে। সে দিনই রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভাষন দিতে দাঁড়িয়ে ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উবাই ইবনু সালুলের ষড়যন্ত্র হতে বাঁচার উপায় জিজ্ঞেস করলেন। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আমার পরিবারকে কেন্দ্র করে যে ব্যক্তি আমাকে জ্বালাতন করেছে, তার মুকাবিলায় কে প্রতিকার করবে? আল্লাহর কসম, আমি তো আমার স্ত্রী সম্পর্কে ভালো ব্যতীত অন্য কিছু জানি না। আর এমন ব্যক্তিকে জড়িয়ে তারা কথা তুলেছে, যার সম্পর্কে ভালো ব্যতীত অন্য কিছু জানি না আর সে তো আমার সঙ্গে ব্যতীত আমার ঘরে কখনও প্রবেশ করত না। তখন সা‘দ [ইবনু মু‘আয (রাঃ)] দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহর কসম, আমি তার প্রতিকার করব। যদি সে আউস গোত্রের কেউ হয়ে থাকে, তাহলে তার গর্দান উড়িয়ে দিব; আর যদি সে আমাদের খায্রাজ গোত্রীয় ভাইদের কেউ হয়, তাহলে আপনি তার ব্যাপারে আমাদের নির্দেশ দিবেন, আমরা আপনার নির্দেশ পালন করব। খায্রাজ গোত্রপতি সা‘দ ইবনু ‘উবাদাহ (রাঃ) তখন দাঁড়িয়ে গেলেন। এর পূর্বে তিনি উত্তম ব্যক্তিই ছিলেন। আসলে গোত্রপ্রীতি তাকে পেয়ে বসেছিল। তিনি বললেন, তুমি মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কসম! তুমি তাকে হত্যা করতে পারবে না, সে শক্তি তোমার নেই। তখনি উসায়িদ ইবনুল হুযাইর (রাঃ) দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, তুমিই মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কসম! আমরা অবশ্যই তাকে হত্যা করে ছাড়ব। আসলে তুমি একজন মুনাফিক। তাই মুনাফিকদের পক্ষ হয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়েছ। অতঃপর আউস ও খায্রাজ উভয় গোত্রই উত্তেজিত হয়ে উঠল। এমনকি রসলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিম্বারে থাকা অবস্থায়ই তারা (লড়াইয়ে) উদ্যত হল। তখন তিনি নেমে তাদের চুপ করালেন। সবাই শান্ত হল আর তিনিও নীরবতা অবলম্বন করলেন। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, সেদিন সারাক্ষন আমি কাঁদলাম, চোখের পানি আমার শুকাল না এবং ঘুমের সামান্য পরশও পেলাম না। আমার পিতা-মাতা আমার পাশে পাশেই থাকলেন। পুরো রাত দিন আমি কেঁদেই কাটালাম। আমার মনে হল, কান্না বুঝি আমার কলিজা বিদীর্ণ করে দিবে। তিনি [‘আয়িশা (রাঃ)] বলেন, তারা (পিতা-মাতা) উভয়ে আমার কাছেই উপবিষ্ট ছিলেন, আর আমি কাঁদছিলাম। ইতিমধ্যে এক আনসারী মহিলা ভিতরে আসার অনুমতি চাইল। আমি তাকে অনুমতি দিলাম। সেও আমার সঙ্গে বসে কাঁদতে শুরু করল। আমরা এ অবস্থায় থাকতেই রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রবেশ করে বসলেন, অথচ যেদিন হতে আমার সম্পর্কে অপবাদ রটানো হয়েছে সেদিন হতে তিনি আমার নিকট বসেননি। এর মধ্যে এক মাস কেটে গিয়েছিল। অথচ আমার সম্পর্কে তাঁর নিকট কোন ওয়াহী নাযিল হল না। তিনি [‘আয়িশা (রাঃ)] বলেন, অতঃপর হাম্দ ও সানা পাঠ করে তিনি বললেন, হে ‘আয়িশা! তোমার সম্পর্কে এ ধরনের কথা আমার নিকট পৌছেছে। তুমি নির্দোষ হলে আল্লাহ অবশ্যই তোমার নির্দোষিতা ঘোষনা করবেন। আর যদি তুমি কোন গুনাহে জড়িয়ে গিয়ে থাক, তাহলে আল্লাহর নিকট তাওবা ও ইসতিগফার কর। কেননা, বান্দা নিজের পাপ স্বীকার করে তাওবা করলে আল্লাহ তাওবা কবুল করেন। তিনি যখন তাঁর বক্তব্য শেষ করলেন, তখন আমার অশ্রু বন্ধ হয়ে গেল। এমনকি এক বিন্দু অশ্রুও আমি অনুভব করলাম না। আমার পিতাকে বললাম, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে আমার পক্ষ হতে জবাব দিন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমি বুঝে উঠতে পারি না, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে কি বলব? অতঃপর আমার মা-কে বললাম, আমার পক্ষ হতে রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) –এর কথার জবাব দিন। তিনিও বললেন, আল্লাহর কসম! আমি বুঝে উঠতে পারি না, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) –কে কি বলব? আমি তখন অল্প বয়স্কা কিশোরী। কুরআনও খুব অধিক পড়িনি। তবুও আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমার জানতে বাকী নেই যে, লোকেরা যা রটাচ্ছে, তা আপনারা শুনতে পেয়েছেন এবং আপনাদের মনে তা বসে গেছে, ফলে আপনারা তা বিশ্বাস করে নিয়েছেন। এখন যদি আমি আপনাদের বলি যে, আমি নিষ্পাপ আর আল্লাহ জানেন, আমি অবশ্যই নিষ্পাপ, তবু আপনারা আমার সে কথা বিশ্বাস করবেন না। আর যদি আপনাদের নিকট কোন বিষয় আমি স্বীকার করি, অথচ আল্লাহ জানেন আমি নিষ্পাপ তাহলে অবশ্যই আপনারা আমাকে বিশ্বাস করে নিবেন। আল্লাহর কসম! ইউসুফ (আঃ)-এর পিতার ঘটনা ব্যতীত আমি আপনাদের জন্য কোন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাচ্ছি না। যখন তিনি বলেছিলেন, পূর্ণ ধৈর্যধারণই আমার জন্য শ্রেয়। আর তোমরা যা বলছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যকারী। অতঃপর আমি আমার বিছানায় পার্শ্ব পরিবর্তন করে নিলাম। এটা আমি অবশ্যই আশা করছিলাম যে, আল্লাহ আমাকে নির্দোষ ঘোষনা করবেন। কিন্তু আল্লাহর কসম! এ আমি ভাবিনি যে, আমার ব্যাপারে কোন ওয়াহী নাযিল হবে। কুরআনে আমার ব্যাপারে কোন কথা বলা হবে, এ বিষয়ে আমি নিজেকে উপযুক্ত মনে করি না। তবে আশা করছিলাম যে, নিদ্রায় আল্লাহর রসূল এমন কোন স্বপ্ন দেখবেন, যা আমাকে নির্দোষ প্রমান করবে। কিন্তু আল্লাহর কসম! তিনি তাঁর আসন ছেড়ে তখনও উঠে যাননি এবং ঘরের কেউ বেরিয়েও যায়নি, এরই মধ্যে তাঁর উপর ওয়াহী নাযিল হওয়া শুরু হয়ে গেল এবং (ওয়াহী নাযিলের সময়) তিনি যে রকম কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতেন, সে রকম অবস্থার সম্মুখীন হন। এমনকি সে মুহূর্তে শীতের দিনেও তার শরীর হতে মুক্তার মত ফোঁটা ফোঁটা ঘাম ঝরে পড়ত। যখন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে ওয়াহীর সে অবস্থা কেটে গেল, তখন তিনি হাসছিলেন। আর প্রথম যে বাক্যটি তিনি উচ্চারন করলেন তা ছিল এই যে, আমাকে বললেন, হে ‘আয়িশা! আল্লাহর প্রশংসা কর। কেননা, তিনি তোমাকে নির্দোষ ঘোষনা করেছেন। আমার মাতা তখন আমাকে বললেন, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট যাও। (কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর) আমি বললাম, না, আল্লাহর কসম! আমি তাঁর নিকট যাব না এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো প্রশংসাও করব না। আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত নাযিল করেন, ---- যখন আমার সাফাই সম্পর্কে নাযিল হল তখন আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! নিকটত্মীয়তার কারণে মিসতাহ্ ইবনু উসাসার জন্য তিনি যা খরচ করতেন, ‘আয়িশা সম্পর্কে এ ধরনের কথা বলার পর মিসতার জন্য আমি আর কখনও খরচ করব না। তখন আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত নাযিল করলেন। ---- “তোমাদের মধ্যে যারা নিয়ামতপ্রাপ্ত ও সচ্ছল, তারা যেন দান না করার কসম না করে ---- আল্লাহ ক্ষমাশীল ও মেহেরবান।” তখন আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই চাই আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। অতঃপর তিনি মিসতাহ-কে যা দিতেন, তা পুনরায় দিতে লাগলেন। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যায়নাব বিনতে জাহাশকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি বললেন, হে যায়্নাব! তুমি কী জান? তুমি কী দেখেছ? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি আমার কান, আমি আমার চোখের হিফাজত করতে চাই। আল্লাহর কসম! তার সম্পর্কে ভালো ব্যতীত অন্য কিছু আমি জানি না। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, অথচ তিনিই আমার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন। কিন্তু পরহেযগারীর কারণে আল্লাহ তাঁর হিফাযত করেছেন। আবূ রাবী‘ (রহঃ) ...... ‘আয়িশা (রাঃ) ও ‘আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়র (রাঃ) হতে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। ফুলাইহ্ (রহঃ) কাসিম ইবনু মুহাম্মদ ইবনু আবূ বকর (রাঃ) হতে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেন।
ইব্নু শিহাব (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
তিনি বলেন, আমাকে ‘উরওয়াহ ইব্নু যুবায়র, সা‘ঈদ ইব্নু মুসাইয়্যিব, ‘আলক্বামাহ ইব্নু ওয়াক্কাস, ‘উবাইদুল্লাহ ইব্নু ‘আবদুল্লাহ ইব্নু ‘উত্বাহ ইব্নু মাস‘উদ (রহ.) নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সহধর্মিণী ‘আয়িশাহ (রাঃ)-এর ঘটনা সম্পর্কে বলেন, যখন অপবাদকারীরা তাঁর প্রতি অপবাদ এনেছিল এবং আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে তাদের অভিযোগ থেকে নির্দোষ হওয়ার বর্ণনা দেন। তাদের প্রত্যেকেই ঘটনার অংশ বিশেষ আমাকে জানান। অবশ্য তাদের পরস্পর পরস্পরের বর্ণনা সমর্থন করে, যদিও তাদের মধ্যে কেউ অন্যের তুলনায় এ ঘটনাটি অধিক সংরক্ষণ করেছে। তবে ‘উরওয়াহ ‘আয়িশাহ (রাঃ) থেকে আমাকে এরূপ বলেছিলেন যে, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সহধর্মিণী ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেছেন যে, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যখন কোথাও সফরে বের হতেন, তখন তিনি তাঁর স্ত্রীগণের মধ্যে লটারী দিতেন। এতে যার নাম উঠত, তাঁকে সঙ্গে নিয়ে রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বের হতেন। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, অতএব, কোন এক যুদ্ধে যাওয়ার সময় আমাদের মধ্যে লটারী দিলেন, তাতে আমার নাম উঠল। আমি রসূসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সঙ্গে বের হলাম, পর্দার আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পরে। আমাকে হাওদায় করে উঠানো হতো এবং তাতে করে নামানো হতো। এভাবেই আমরা চললাম। যখন রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যুদ্ধ শেষ করে ফিরলেন এবং ফেরার পথে আমরা মাদীনাহ্র নিকটবর্তী হলাম। একদা রওয়ানা দেয়ার জন্য রাত থাকতেই ঘোষণা দিলেন। এ ঘোষণা হলে আমি উটে চড়ে সৈন্যদের অবস্থান থেকে কিছু দূরে চলে গেলাম। আমার প্রাকৃতিক প্রয়োজন সেরে যখন সওয়ারীর কাছে এলাম, তখন দেখতে পেলাম যে, জাফারের দানা খচিত আমার হারটি ছিঁড়ে কোথাও পড়ে গেছে। আমি তা খোঁজ করতে লাগলাম। খোঁজ করতে আমার একটু দেরী হয়ে গেল। ইতোমধ্যে এ সকল লোক যারা আমাকে সওয়ার করাতো তারা, আমি আমার হাওদার ভেতরে আছি মনে করে, আমার হাওদা উটের পিঠে রেখে দিল। কেননা এ সময় শরীরের গোশত আমাকে ভারী করেনি। আমরা খুব অল্প-খাদ্য খেতাম। আমি ছিলাম অল্পবয়স্কা এক বালিকা। সুতরাং হাওদা উঠাবার সময় তা যে খুব হালকা, তা তারা টের পায়নি এবং তারা উট হাঁকিয়ে রওয়ানা দিল। সেনাদল চলে যাওয়ার পর আমি আমার হার পেয়ে গেলাম এবং যেখানে তারা ছিল সেখানে ফিরে এলাম। তখন সেখানে এমন কেউ ছিল না, যে ডাকবে বা ডাকে সাড়া দিবে। আমি যেখানে ছিলাম সে স্থানেই থেকে গেলাম। এ ধারণায় বসে থাকলাম যে, যখন কিছুদূর গিয়ে আমাকে দেখতে পাবে না, তখন এ স্থানে অবশ্যই খুঁজতে আসবে। সেখানে বসা অবস্থায় আমার চোখে ঘুম এসে গেল, আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। আর সৈন্যবাহিনীর পিছনে সাফওয়ান ইব্নু মু‘আত্তাল সুলামী যাওকয়ানী ছিলেন। তিনি শেষ রাতে রওয়ানা দিয়ে ভোর বেলা আমার এ স্থানে এসে পৌঁছলেন। তিনি একজন মানুষের আকৃতি নিদ্রিত দেখতে পেলেন। তিনি আমার কাছে এসে আমাকে দেখে চিনতে পারলেন। কেননা, পর্দার হুকুম অবতীর্ণ হবার আগে আমাকে দেখেছিলেন। কাজেই আমাকে চেনার পর উচ্চকন্ঠে “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” পড়লেন। পড়ার শব্দে আমি উঠে গেলাম এবং আমি আমার চাদর পেচিয়ে চেহারা ঢেকে নিলাম। আল্লাহ্র কসম, তিনি আমার সঙ্গে কোন কথাই বলেননি এবং তাঁর মুখ হতে “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন” ব্যতীত আর কোন কথা আমি শুনিনি। এরপর তিনি তাঁর উষ্ট্রী বসালেন এবং সামনের দুই পা নিজ পায়ে দাবিয়ে রাখলেন। আর আমি তাতে উঠে গেলাম। তখন সাফওয়ান উষ্ট্রীর লাগাম ধরে চললেন। শেষ পর্যন্ত আমরা সৈন্যবাহিনীর নিকট এ সময় গিয়ে পৌঁছলাম, যখন তারা দুপুরের প্রচণ্ড উত্তাপের সময় অবতরণ করে। (এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে) যারা ধ্বংস হওয়ার তারা ধ্বংস হল। আর যে ব্যক্তি এ অপবাদের নেতৃত্ব দেয়, সে ছিল (মুনাফিক সরদার) ‘আবদুল্লাহ্ ইব্নু উবাই ইব্নু সুলূল। তারপর আমি মদিনায় এসে পৌঁছলাম এবং পৌঁছার পর আমি দীর্ঘ একমাস পর্যন্ত অসুস্থ ছিলাম। আর অপবাদকারীদের কথা নিয়ে লোকেরা রটনা করছিল। আমি এসব কিছুই বুঝতে পারিনি। তবে এতে আমাকে সন্দেহে ফেলেছিল যে, আমার অসুস্থ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যে রকম øেহ-ভালবাসা দেখাতেন, এবারে তেমনি ভালবাসা দেখাচ্ছেন না। শুধু এতটুকুই ছিল যে, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমার কাছে আসতেন এবং সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করতেন, তোমার অবস্থা কী? তারপর তিনি ফিরে যেতেন। এই আচরণই আমাকে সন্দেহে ফেলেছিল; অথচ আমি এই অপপ্রচার সম্বন্ধে জানতেই পারিনি। অবশেষে একটু সুস্থ হওয়ার পর মিসতাহের মায়ের সঙ্গে মানাসের (শহরের বাইরে খোলা ময়দানের) দিকে বের হলাম। সে জায়গাটিই ছিল আমাদের প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারার স্থান আর আমরা কেবল রাতের পর রাতেই বাইরে যেতাম। এ ছিল এ সময়ের কথা যখন আমাদের ঘরের পাশে পায়খানা নির্মিত হয়নি। আমাদের অবস্থা ছিল, অনেকটা প্রাচীন আরবদের ন্যায় নিচু ময়দানের দিকে বের হয়ে প্রাকৃতিক প্রয়োজন সারা। কেননা, ঘর-সংলগ্ন পায়খানা নির্মাণ আমরা কষ্টকর মনে করতাম। কাজেই আমি ও মিসতাহের মা বাইরে গেলাম। তিনি ছিলেন আবূ রুহ্ম ইব্নু আব্দ মানাফের কন্যা এবং মিসতাহের মায়ের মা ছিলেন সাখর ইব্নু আমিরের কন্যা, যিনি আবূ বাক্র সিদ্দীক (রাঃ)-এর খালা ছিলেন। আর তার পুত্র ছিলেন ‘মিসতাহ্ ইব্নু উসাসাহ’। আমি ও উম্মু মিসতাহ্ আমাদের প্রয়োজন সেরে ঘরের দিকে ফিরলাম। তখন মিসতাহের মা তার চাদরে হোঁচট খেয়ে বললেন, ‘মিসতাহ্’ ধ্বংস হোক। আমি তাকে বললাম, তুমি খুব খারাপ কথা বলছ, তুমি কি এমন এক ব্যক্তিকে মন্দ বলছ, যে বাদ্রের যুদ্ধে হাজির ছিল? তিনি বললেন, হায়রে বেখেয়াল! তুমি কি শোননি সে কী বলেছে? আমি বললাম, সে কী বলেছে? তিনি বললেন, এমন এমন। এ বলে তিনি অপবাদকারীদের মিথ্যা অপবাদ সম্পর্কে আমাকে বিস্তারিত খবর দিলেন। এতে আমার অসুখের মাত্রা বৃদ্ধি পেল। যখন আমি ঘরে ফিরে আসলাম এবং রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমার ঘরে প্রবেশ করে বললেন, তুমি কেমন আছ? তখন আমি বললাম, আপনি কি আমাকে আমার আব্বা-আম্মার নিকট যেতে অনুমতি দিবেন? ‘আয়িশাহ (রাঃ) বললেন, তখন আমার উদ্দেশ্য ছিল যে, আমি তাঁদের কাছে গিয়ে তাঁদের থেকে আমার এ ঘটনা সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জেনে নেই। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে অনুমতি দিলেন। আমি আব্বা-আম্মার কাছে চলে গেলাম এবং আমার আম্মাকে বললাম, ও গো আম্মা! লোকেরা কী বলাবলি করছে? তিনি বললেন, বৎস! তুমি তোমার মন হালকা রাখ। আল্লাহ্র কসম! এমন কমই দেখা যায় যে, কোন পুরুষের কাছে এমন সুন্দরী রূপবতী স্ত্রী আছে, যাকে সে ভালবাসে এবং তার সতীনও আছে; অথচ তার ত্র“টি বের করা হয় না। রাবী বলেন, আমি বললাম, ‘সুবহান আল্লাহ্’! সত্যি কি লোকেরা এ ব্যাপারে বলাবলি করছে? তিনি বলেন, আমি সে রাত কেঁদে কাটালাম, এমন কি ভোর হয়ে গেল, তথাপি আমার কান্না থামল না এবং আমি ঘুমাতেও পারলাম না। আমি কাঁদতে কাঁদতেই ভোর করলাম। যখন ওয়াহী আসতে দেরী হল, তখন রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ‘আলী ইব্নু আবূ ত্বলিব (রাঃ) ও উসামাহ ইব্নু যায়দ (রাঃ)-কে তাঁর স্ত্রীর বিচ্ছেদের ব্যাপারে তাঁদের পরামর্শের জন্য ডাকলেন। তিনি বলেন, উসামাহ ইব্নু যায়দ তাঁর সহধর্মিণী (‘আয়িশাহ (রাঃ)-এর পবিত্রতা এবং তাঁর অন্তরে তাঁদের প্রতি তাঁর ভালবাসা সম্পর্কে যা জানেন তার আলোকে তাঁকে পরামর্শ দিতে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহ্র রসূল! আপনার পরিবার সম্পর্কে আমরা ভাল ধারণাই পোষণ করি। আর ‘আলী ইব্নু আবূ ত্বলিব (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহ্র রসূল! আল্লাহ্ আপনার উপর কোন পথ সংকীর্ণ করে দেননি এবং তিনি ব্যতীত বহু মহিলা রয়েছেন। আর আপনি যদি দাসীকে জিজ্ঞেস করেন, সে আপনার কাছে সত্য ঘটনা বলবে। তিনি [‘আয়িশাহ (রাঃ)] বলেন, তারপর রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বারীরাহ্কে ডাকলেন এবং বললেন, হে বারীরাহ! তুমি কি তার নিকট হতে সন্দেহজনক কিছু দেখেছ? বারীরাহ বললেন, যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, তাঁর কসম! আমি এমন কোন কিছু তাঁর মধ্যে দেখতে পাইনি, যা আমি গোপন করতে পারি। তবে তাঁর মধ্যে সবচাইতে অধিক যা দেখেছি, তা হল, তিনি একজন অল্পবয়স্কা বালিকা। তিনি কখনও তাঁর পরিবারের আটার খামির রেখে ঘুমিয়ে পড়তেন। অর ছাগলের বাচ্চা এসে তা খেয়ে ফেলত। এরপরে রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) (মিম্বরে) দাঁড়ালেন। ‘আবদুল্লাহ্ ইব্নু উবাই ইব্নু সলুলের বিরুদ্ধে তিনি সমর্থন চাইলেন। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মিম্বরের উপর থেকে বললেন, হে মুসলিম সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে, ঐ ব্যক্তির মিথ্যা অপবাদ থেকে আমাকে সাহায্য করতে পারে, যে আমার স্ত্রীর ব্যাপারে আমাকে কষ্ট দিয়েছে। আল্লাহ্র কসম! আমি আমার স্ত্রী সম্পর্কে ভালই জানতে পেরেছি এবং তারা এমন এক পুরুষ সম্পর্কে অভিযোগ এনেছে, যার সম্পর্কে আমি ভাল ব্যতীত কিছুই জানি না। সে কখনও আমাকে ব্যতীত আমার ঘরে আসেনি। এ কথা শুনে সা‘দ ইব্নু মু‘আয আনসারী (রাঃ) দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহ্র রসূল! তার বিরুদ্ধে আমি আপনাকে সাহায্য করব, যদি সে আউস গোত্রের হয়, তবে আমি তার গর্দান মেরে দিব। আর যদি আমাদের ভাই খাযরাজ গোত্রের লোক হয়, তবে আপনি নির্দেশ দিলে আমি আপনার নির্দেশ কার্যকর করব। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, এরপর সা‘দ ইব্নু উবাদা দাঁড়ালেন; তিনি খাযরাজ গোত্রের সর্দার। তিনি পূর্বে একজন নেক্কার লোক ছিলেন। কিন্তু এ সময় স্ব-গোত্রের পক্ষপাতিত্ব তাকে উত্তেজিত করে তোলে। কাজেই তিনি সা‘দকে বললেন, চিরঞ্জীব আল্লাহ্র কসম! তুমি মিথ্যা বলেছ, তুমি তাকে হত্যা করতে পারবে না এবং তাকে হত্যা করার ক্ষমতা তুমি রাখ না। তারপর উসায়দ ইব্নু হুদায়র দাঁড়ালেন, যিনি সা‘দের চাচাতো ভাই। তিনি সা‘দ ইব্নু উবাদাকে বললেন, চিরঞ্জীব আল্লাহ্র কসম! তুমি মিথ্যা বলছ। আমরা অবশ্যই তাকে হত্যা করব। তুমি নিজেও মুনাফিক এবং মুনাফিকের পক্ষে প্রতিবাদ করছ। এতে আউস এবং খাযরাজ উভয় গোত্রের লোকেরা উত্তেজিত হয়ে উঠল, এমনকি তারা পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার উপক্রম হল। তখন রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) মিম্বরে দাঁড়ানো ছিলেন। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাদের থামাতে লাগলেন। অবশেষে তারা থামল। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও নীরব হলেন। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, আমি সেদিন এমনভাবে কাটালাম যে, আমার চোখের অশ্র“ও থামেনি এবং চোখেও ঘুমও আসেনি। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, সকালবেলা আমার আব্বা-আম্মা আমার কাছে আসলেন, আর আমি দু’রাত এবং একদিন (একাধারে) কাঁদছিলাম। এর মধ্যে না আমার ঘুম হয় এবং না আমার চোখের পানি বন্ধ হয়। তাঁরা ধারণা করছিলেন যে, এ ক্রন্দনে আমার কলজে ফেটে যাবে। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, এর পূর্বে তারা যখন আমার কাছে বসা ছিলেন এবং আমি কাঁদছিলাম, ইত্যবসরে জনৈকা আনসারী মহিলা আমার কাছে আসার জন্য অনুমতি চাইলেন। আমি তাকে অনুমতি দিলাম। সে বসে আমার সঙ্গে কাঁদতে লাগল। আমাদের এ অবস্থার মধ্যেই রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের কাছে প্রবেশ করলেন এবং সালাম দিয়ে বসলেন। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন এর পূর্বে যখন থেকে এ কথা রটনা চলেছে, তিনি আমার কাছে বসেননি। এ অবস্থায় তিনি একমাস অপেক্ষা করেছেন, আমার সম্পর্কে ওয়াহী আসেনি। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, এরপর রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাশাহুদ পাঠ করলেন। তারপর বললেন, হে ‘আয়িশাহ! তোমার সম্পর্কে এরূপ এরূপ কথা আমার কাছে পৌঁছেছে, তুমি যদি নির্দোষ হয়ে থাক, তবে অচিরেই আল্লাহ্ তা‘আলা তোমার পবিত্রতা ব্যক্ত করে দিবেন। আর যদি তুমি কোন পাপে লিপ্ত হয়ে থাক, তবে আল্লাহ্র কাছে ক্ষমা চাও এবং তাঁর কাছে তাওবাহ কর। কেননা, বান্দা যখন তার পাপ স্বীকার করে নেয় এবং আল্লাহ্র কাছে তাওবাহ করে, তখন আল্লাহ্ তার তাওবাহ কবূল করেন। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, যখন রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর কথা শেষ করলেন, তখন আমার চোখের পানি এমনভাবে শুকিয়ে গেল যে, এক ফোঁটা পানিও অনুভব করছিলাম না। আমি আমার পিতাকে বললাম, আপনি রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে (তিনি যা কিছু বলেছেন তার) জবাব দিন। তিনি বললেন, আল্লাহ্র কসম! আমি রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে কী জবাব দিব, তা আমার বুঝে আসছে না। তারপর আমার আম্মাকে বললাম, আপনি রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে জবাব দিন। তিনি [‘আয়িশাহ (রাঃ)-এর আম্মা) বললেন ঃ আমি বুঝতে পারছি না, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে কি জবাব দিব। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, তখন আমি নিজেই জবাব দিলাম, অথচ আমি একজন অল্প বয়স্কা বালিকা, কুরআন খুব অধিক পড়িনি। আল্লাহ্র কসম! আমি জানি, আপনারা এ ঘটনা শুনেছেন, এমনকি তা আপনাদের অন্তরে বসে গেছে এবং সত্য বলে বিশ্বাস করে নিয়েছেন। এখন যদি আমি বলি যে, আমি নির্দোষ এবং আল্লাহ্ ভালভাবেই জানেন যে, আমি নির্দোষ; তবে আপনারা তা বিশ্বাস করবেন না। আর আমি যদি আপনাদের কাছে এ বিষয় স্বীকার করে নেই, অথচ আল্লাহ্ জানেন, আমি তা থেকে নির্দোষ; তবে আপনারা আমার এই উক্তি বিশ্বাস করে নিবেন। আল্লাহ্র কসম! এ ক্ষেত্রে আমি আপনাদের জন্য ইউসুফ (‘আ.)-এর পিতার উক্তি ব্যতীত আর কোন দৃষ্টান্ত পাচ্ছি না। তিনি বলেছিলেন, فَصَبْرٌ جَمِيلٌ وَاللهُ الْمُسْتَعَانُ عَلَى مَا تَصِفُونَ “পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়, তোমরা যা বলছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহ্র কাছেই সাহায্য চাওয়া যায়। তিনি বলেন, এরপর আমি আমার চেহারা ঘুরিয়ে নিলাম এবং কাত হয়ে আমার বিছানায় শুয়ে পড়লাম। তিনি বলেন, এ সময় আমার বিশ্বাস ছিল যে আমি নির্দোষ এবং আল্লাহ্ তা‘আলা আমার নির্দোষিতা প্রকাশ করে দিবেন। কিন্তু আল্লাহ্র কসম! আমি তখন এ ধারণা করতে পারিনি যে, আল্লাহ্ আমার সম্পর্কে এমন ওয়াহী অবতীর্ণ করবেন যা তিলাওয়াত করা হবে। আমার দৃষ্টিতে আমার মর্যাদা এর চাইতে অনেক নিচে ছিল। বরং আমি আশা করেছিলাম যে, হয়ত রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিদ্রায় কোন স্বপ্ন দেখবেন, যাতে আল্লাহ্ তা‘আলা আমার নির্দোষিতা জানিয়ে দেবেন। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, আল্লাহ্র কসম! রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দাঁড়াননি এবং ঘরের কেউ বের হননি। এমন সময় রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর প্রতি ওয়াহী অবতীর্ণ হতে লাগল এবং তাঁর শরীর ঘামতে লাগল। এমনকি যদিও শীতের দিন ছিল, তবুও তাঁর উপর যে ওয়াহী অবতীর্ণ হচ্ছিল এর বোঝার ফলে মুক্তার মত তাঁর ঘাম ঝরছিল। যখন ওয়াহী শেষ হল, তখন রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হাসছিলেন। তখন তিনি প্রথম যে বাক্যটি বলেছিলেন, তা হলে ঃ হে ‘আয়িশাহ! আল্লাহ্ তোমার নির্দেষিতা প্রকাশ করেছেন। এ সময় আমার মা আমাকে বললেন, তুমি উঠে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। আমি বললাম, আল্লাহ্র কসম! আমি তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করব না, আল্লাহ্ ব্যতীত আর কারো প্রশংসা করব না। আল্লাহ্ তা‘আলা অবতীর্ণ করলেন পূর্ণ দশ আয়াত পর্যন্ত। إِنَّ الَّذِينَ جَاءُوا بِالإِفْكِ عُصْبَةٌ যারা এ অপবাদ রচনা করেছে, তারা তোমাদেরই একটি দল। যখন আল্লাহ্ তা‘আলা আমার নির্দোষিতার আয়াত অবতীর্ণ করলেন, তখন আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) যিনি মিস্তাহ্ ইব্নু উসাসাকে নিকটবর্তী আত্মীয়তা এবং দারিদ্র্যের কারণে আর্থিক সাহায্য করতেন, তিনি বললেন, আল্লাহ্র কসম! মিস্তাহ্ ‘আয়িশাহ সম্পর্কে যা বলেছে, এরপর আমি তাকে কখনই কিছুই দান করব না। তারপর আল্লাহ্ তা‘আলা আয়াত অবতীর্ণ করলেন, “তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন শপথ গ্রহণ না করে যে, তার আত্মীয়-স্বজন ও অভাবগ্রস্তকে এবং আল্লাহ্র রাস্তায় যারা গৃহত্যাগ করেছে তাদের কিছুই দেবে না। তারা যেন তাদের ক্ষমা করে এবং তাদের দোষত্র“টি উপেক্ষা করে। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ্ তোমাদের ক্ষমা করেন? এবং আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। আবূ বকর (রাঃ) এ সময় বললেন, আল্লাহ্র কসম! আমি অবশ্যই পছন্দ করি যে আল্লাহ্ আমাকে ক্ষমা করেন। তারপর তিনি মিস্তাহ্কে সাহায্য আগের মত দিতে লাগলেন এবং বললেন, আল্লাহ্র কসম! আমি এ সাহায্য কখনও বন্ধ করব না। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জয়নব বিন্ত জাহশকেও আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, হে জয়নব! (‘আয়িশাহ সম্পর্কে) কী জান আর কী দেখেছ? তিনি বললেন, হে আল্লাহ্র রসূল! আমি আমার কান ও চোখকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। আমি তাঁর সম্পর্কে ভাল ব্যতীত অন্য কিছু জানি না। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর সহধর্মিণীদের মধ্যে তিনি আমার প্রতিদ্বন্দি¡তা করতেন। কিন্তু আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁকে পরহেযগারীর কারণে রক্ষা করেন। আর তাঁর বোন হাম্না তাঁর পক্ষ অবলম্বন করে দ্বন্দ্ব করে এবং অপবাদ দানকারী যারা ধ্বংস হয়েছিল তাদের মধ্যে সেও ধ্বংস হল। [২৫৯৩] (আ.প্র. ৪৩৮৯, ই.ফা. ৪৩৯১)
‘আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
তিনি বলেন, যখন আমার সম্পর্কে আলোচনা চলছিল যা রটনা হয়েছে এবং আমি এ সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। তখন আমার ব্যাপারে ভাষণ দিতে রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দাঁড়ালেন। তিনি প্রথমে কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করলেন। তারপর আল্লাহ্র প্রতি যথাযোগ্য হাম্দ ও সানা পাঠ করলেন। এরপরে বললেন, হে মুসলিমগণ! যে সকল লোক আমার স্ত্রী সম্পর্কে অপবাদ দিয়েছে, তাদের ব্যাপারে আমাকে পরামর্শ দাও। আল্লাহ্র কসম! আমি আমার পরিবারের ব্যাপারে মন্দ কিছুই জানি না। তাঁরা এমন এক ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেছে, আল্লাহ্র কসম, তার ব্যাপারেও আমি কখনও খারাপ কিছু জানি না এবং সে কখনও আমার অনুপস্থিতিতে আমার ঘরে প্রবেশ করে না এবং আমি যখন কোন সফরে গিয়েছি সেও আমার সঙ্গে সফরে গিয়েছে। সা‘দ ইব্নু উবাদা দাঁড়িয়ে বললেন, আমাকে তাদের শিরোচ্ছেদ করার অনুমতি দিন। এর মধ্যে বানী খাযরাজ গোত্রের এক ব্যক্তি, যে হাস্সান ইব্নু সাবিতের মাতার আত্মীয় ছিল, সে দাঁড়িয়ে বলল, তুমি মিথ্যা বলেছ, জেনে রাখ, আল্লাহ্র কসম! যদি সে (অপবাদকারী) ব্যক্তিরা আউস্ গোত্রের হত, তাহলে তুমি শিরোচ্ছেদ করতে পছন্দ করতে না। আউস ও খাযরাজের মধ্যে মসজিদেই একটা দুর্ঘটনা ঘটার অবস্থা দেখা দিল। আর আমি এ বিষয় কিছুই জানি না। সেদিন সন্ধ্যায় যখন আমি আমার প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে গেলাম, তখন উম্মু মিসতাহ্ আমার সঙ্গে ছিলেন এবং তিনি হোঁচট খেয়ে বললেন, ‘মিস্তাহ্ ধ্বংস হোক’! আমি বললাম, হে উম্মু মিসতাহ! তুমি তোমার সন্তানকে গালি দিচ্ছ? তিনি নীরব থাকলেন। তারপর দ্বিতীয় হোঁচট খেয়ে বললেন, ‘মিসতাহ্ ধ্বংস হোক’। আমি তাকে বললাম, ‘তুমি তোমার সন্তানকে গালি দিচ্ছ?’ তিনি (উম্মু মিসতাহ্) তৃতীয়বার পড়ে গিয়ে বললেন, ‘মিসতাহ্ ধ্বংস হোক’। আমি এবারে তাঁকে ধমক দিলাম। তিনি বললেন, আল্লাহ্র কসম! আমি তাকে তোমার কারণেই গালি দিচ্ছি। আমি বললাম আমার ব্যাপারে? ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, তখন তিনি আমার কাছে সব ঘটনা বিস্তারিত বললেন। আমি বললাম, তাই হচ্ছে নাকি? তিনি বললেন, হাঁ আল্লাহ্র কসম! এরপর আমি আমার ঘরে ফিরে এলাম এবং যে প্রয়োজনে বাইরে গিয়েছিলাম তা একেবারেই ভুলে গেলাম। এরপর আমি আরও অসুস্থ হয়ে পড়লাম এবং রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে বললাম যে, আমাকে আমার পিতার বাড়িতে পাঠিয়ে দিন। তিনি একটি ছেলেকে আমার সঙ্গে দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন। আমি যখন ঘরে প্রবেশ করলাম, তখন উম্মু রূমানকে নিচে দেখতে পেলাম এবং আবূ বাক্র (রাঃ) ঘরের ওপরে পড়ছিলেন। আমার আম্মা জিজ্ঞেস করলেন, হে বৎস! কিসে তোমাকে নিয়ে এসেছে? আমি তাকে সংবাদ দিলাম এবং তাঁর কাছে ঘটনা বললাম। এ ঘটনা তার ওপর তেমন প্রভাব বিস্তার করেনি, যেমন আমার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে। তিনি বললেন, হে বৎস! এটাকে তুমি হাল্কাভাবে গ্রহণ কর, কেননা, এমন সুন্দরী নারী কমই আছে, যার স্বামী তাঁকে ভালবাসে আর তার সতীনরা তার প্রতি ঈর্ষানি¦ত হয় না এবং তার বিরুদ্ধে কিছু বলে না। বস্তুত তার ওপর ঘটনাটি অতখানি প্রভাব বিস্তার করেনি যতখানি আমার উপর করেছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আমার আব্বা [আবূ বাক্র (রাঃ)] কি এ ঘটনা জেনেছেন? তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আর রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ও কি? তিনি জবাব দিলেন হ্যাঁ। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)ও এ ঘটনা জানেন। তখন আমি অশ্র“ ঝরিয়ে কাঁদতে লাগলাম। আবূ বকর (রাঃ) আমার কান্না শুনতে পেলেন। তখন তিনি ঘরের ওপরে পড়ছিলেন। তিনি নিচে নেমে আসলেন এবং আমার আম্মাকে জিজ্ঞেস করলেন, তার কী হয়েছে? তিনি বললেন, তার সম্পর্কে যা রটেছে তা তার গোচরীভূত হয়েছে। এতে আবূ বাক্রের চোখের পানি ঝরতে লাগল। তিনি বললেন, হে বৎস! আমি তোমাকে কসম দিয়ে বলছি, তুমি তোমার ঘরে ফিরে যাও। আমি আমার ঘরে ফিরে এলাম। তারপর রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমার ঘরে আসলেন। তিনি আমার খাদিমাকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। সে বলল, আল্লাহ্র কসম, আমি এ ব্যতীত তাঁর কোন দোষ জানি না যে, তিনি ঘুমিয়ে পড়তেন এবং ছাগল এসে তাঁর খামির অথবা বললেন, গোলা আটা খেয়ে যেত। তখন কয়েকজন সহাবী তাকে ধমক দিয়ে বললেন, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর কাছে সত্য কথা বল। এমনকি তাঁরা তার নিকট ঘটনা খুলে বললেন। তখন সে বলল, সুবহান আল্লাহ্, আল্লাহ্র কসম! আমি তাঁর ব্যাপারে এর চেয়ে অধিক কিছু জানি না, যা একজন স্বর্ণকার তার এক টুকরা লাল খাঁটি স্বর্ণ সম্পর্কে জানে। এ ঘটনা সে ব্যক্তির কাছেও পৌঁছল যার সম্পর্কে এ অভিযোগ উঠেছে। তখন তিনি বললেন, সুবহান আল্লাহ্! আল্লাহ্র কসম, আমি কখনও কোন মহিলার পর্দা খুলিনি। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, পরবর্তী সময়ে এ (অভিযুক্ত) লোকটি আল্লাহ্র রাস্তায় শহীদ রূপে নিহত হন। তিনি বলেন, ভোর বেলায় আমার আব্বা ও আম্মা আমার কাছে এলেন। তাঁরা এতক্ষণ থাকলেন যে, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আসরের সলাত আদায় করে আমার কাছে এলেন। এ সময় আমার ডানে ও বামে আমার আব্বা আমাকে ঘিরে বসা ছিলেন। তিনি [রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)] আল্লাহ্ তা‘আলার হাম্দ ও সানা পাঠ করে বললেন, হে ‘আয়িশাহ! তুমি যদি কোন গুনাহ্র কাজ বা অন্যায় করে থাক তবে আল্লাহ্র কাছে তাওবা কর, কেননা, আল্লাহ্ তাঁর বান্দার তাওবা কবূল করে থাকেন। তখন জনৈকা আনসারী মহিলা দরজার কাছে বসা ছিল। আমি বললাম, আপনি কি এ মহিলাকেও লজ্জা করছেন না, এসব কিছু বলতে? তবুও রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাকে নাসীহাত করলেন। তখন আমি আমার আব্বার দিকে লক্ষ্য করে বললাম, আপনি রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর জবাব দিন। তিনি বললেন, আমি কী বলব? এরপরে আমি আম্মার দিকে লক্ষ্য করে বললাম, আপনি রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর জবাব দিন। তিনিও বললেন, আমি কী বলব? যখন তাঁরা কেউই রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-কে কোন জবাব দিলেন না, তখন আমি কালিমায়ে শাহাদাত পাঠ করে আল্লাহ্র যথোপযুক্ত হাম্দ ও সানা পাঠ করলাম। এরপর বললাম, আল্লাহ্র কসম! আমি যদি বলি যে, আমি এ কাজ করিনি এবং আমি যে সত্যবাদী এ সম্পর্কে আল্লাহ্ই সাক্ষী, তবে তা আপনাদের নিকট আমার কোন উপকারে আসবে না। কেননা, এ ব্যাপারটি আপনারা পরস্পরে বলাবলি করেছেন এবং তা আপনাদের অন্তরে বদ্ধমূল হয়ে গেছে। আর আমি যদি আপনাদের বলি, আমি তা করেছি অথচ আল্লাহ্ জানেন যে আমি এ কাজ করিনি, তবে আপনারা অবশ্যই বলবেন যে, সে তার নিজের দোষ নিজেই স্বীকার করেছে। আল্লাহ্র কসম! আমি আমার এবং আপনাদের জন্য আর কোন দৃষ্টান্ত পাচ্ছি না। তখন আমি ইয়াকূব (আ.)-এর নাম স্মরণ করার চেষ্টা করলাম কিন্তু পারিনি-তাই বললাম, যখন ইউসুফ (‘আ.)-এর পিতার অবস্থা ব্যতীত, যখন তিনি বলেছিলেন, (তোমরা ইউসুফ সম্পর্কে যা বলছ তার প্রেক্ষিতে) পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়, তোমরা যা বলছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহ্ই আমার সাহায্যকারী। ঠিক এ সময়ই রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর নিকট ওয়াহী অবতীর্ণ হল। আমরা সবাই নীরব রইলাম। ওয়াহী শেষ হলে আমি রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর চেহারায় খুশীর নমুনা দেখতে পেলাম। তিনি তাঁর কপাল থেকে ঘাম মুছতে মুছতে বলছিলেন, হে ‘আয়িশাহ! তোমার জন্য খোশখবর! আল্লাহ্ তোমার পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, এ সময় আমি অত্যন্ত রাগানি¦ত ছিলাম। আমার আব্বা ও আম্মা বললেন, ‘তুমি উঠে তাঁর কাছে যাও’, (এবং তার শুকরিয়া আদায় কর)। আমি বললাম, আল্লাহ্র কসম! আমি তাঁর দিকে যাব না এবং তাঁর শুক্রিয়া আদায় করব না। আর আপনাদেরও শুক্রিয়া আদায় করব না। কিন্তু আমি একমাত্র আল্লাহ্র প্রশংসা করব, যিনি আমার পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন। আপনারা (অপবাদ রটনা) শুনছেন কিন্তু তা অস্বীকার করেননি এবং তার পাল্টা ব্যবস্থাও গ্রহণ করেননি। ‘আয়িশাহ (রাঃ) আরও বলেন, জয়নাব বিন্তে জাহাশকে আল্লাহ্ তাঁর দীনদারীর কারণে তাঁকে রক্ষা করেছেন। তিনি (আমার ব্যাপারে) ভাল ব্যতীত কিছুই বলেননি। কিন্তু তার বোন হামনা ধ্বংসপ্রাপ্তদের সঙ্গে নিজেও ধ্বংস হল। যারা এই ব্যাপারে কটুক্তি করত তাদের মধ্যে ছিল মিস্তাহ্, হাস্সান ইব্নু সাবিত এবং মুনাফিক ‘আবদুল্লাহ্ ইব্নু উবাই। সে-ই এ সংবাদ সংগ্রহ করে ছড়াত। আর পুরুষদের মধ্যে সে এবং হামনাই এ ব্যাপারে বিরাট ভূমিকা পালন করত। রাবী বলেন, তখন আবূ বাক্র (রাঃ) কখনও মিসতাহ্কে কোন প্রকার উপকার করবেন না বলে কসম খেলেন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা‘আলা আয়াত অবতীর্ণ করলেন, “তোমাদের মধ্যে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী অর্থাৎ (আবূ বাক্র) তারা যেন কসম না করে যে তারা আত্মীয়-স্বজন ও অভাবগ্রস্তকে অর্থাৎ মিসতাহ্কে কিছুই দেবে না। তোমরা কি চাও না আল্লাহ্ তোমাদেরকে ক্ষমা করেন? এবং আল্লাহ্ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” আবূ বাক্র (রাঃ) বললেন, হাঁ আল্লাহ্র কসম! হে আমাদের রব! আমরা অবশ্যই এ চাই যে, আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিবেন। তারপর আবূ বাক্র (রাঃ) আবার মিস্তাহকে আগের মত আচরণ করতে লাগলেন। [২৫৯৩]
তাঁরা সকলেই রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রী ‘আয়িশা (রাঃ)-এর ঐ কাহিনীটি বর্ণনা করেছেন, অপবাদ রটনাকারীরা তাঁর সম্পর্কে যে অপবাদ দিয়েছিল। তারপর রটানো অপবাদ হতে আল্লাহ তাঁকে নির্দোষ বর্ণনা করলেন। রাবী যুহরী (রহঃ) বলেন, তাঁরা সবাই আমার কাছে হাদীসের এক এক অংশ বর্ণনা করেছেন। তাঁদের কেউ কেউ অন্যের চেয়ে উক্ত হাদীসের কঠোর সংরক্ষণকারী ছিলেন এবং তা ভালভাবে বর্ণনা করতে সক্ষম ছিলেন। তাঁরা আমার কাছে যা বর্ণনা করেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের বর্ণনা আমি যথাযথভাবে আয়ত্ব করে নিয়েছি। একজনের হাদীস অন্যের হাদীসকে সত্যায়িত করে। তাঁরা সকলেই উল্লেখ করেছেন যে, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রী ‘আয়িশাহ্ সিদ্দীকা (রাঃ) বলেছেন যে, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন সফরে যাওয়ার সংকল্প করতেন তখন তিনি তাঁর স্ত্রীদের মধ্যে লটারী করতেন। যাঁর নাম আসত তাঁকেই তিনি তাঁর সাথে সফরে নিতেন। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, এক যুদ্ধ-সফরে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লটারী করলেন এবং এতে আমার নাম উঠল। আমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে সে যুদ্ধে শারীক হই। পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পর এ যুদ্ধে আমি শারীক হয়েছিলাম। আরোহী অবস্থায় আমাকে ভিতরে রাখা হতো এবং অবতেরণের সময়ও হাওদার ভিতর থাকতাম। পরে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যুদ্ধ হতে অব্যাহতির পর ফিরে এসে মাদীনার কাছাকাছি জায়গায় পৌঁছার পর এক রাতে তিনি রওনা হবার আদেশ দিলেন। লোকজন যখন রওনা হবার ব্যাপারে ঘোষণা দিল, তখন আমি দাঁড়িয়ে চলতে লাগলাম; এমনকি আমি সৈন্যদেরকে ছাড়িয়ে দূরে চলে গেলাম। এরপর আমি প্রাকৃতিক প্রয়োজন (প্রস্রাব পায়খানা) সেরে আরোহীর নিকট এলাম এবং নিজ বক্ষে হাত দিয়ে দেখলাম, যিফারী পুতির প্রস্তুত আমার হারটি হারিয়ে গিয়েছে। তাই আগের স্থানে ফিরে গিয়ে আমি আমার হারটি সন্ধান করলাম। (এতে আমার দেরী হয়ে গেল।) এদিকে হাওদা বহনকারী লোকজন এসে দ্রব্য-সামগ্রী উঠিয়ে আমার বহনকারী উটের উপর রেখে দিল। তারা ধারণা করেছিল, আমি হাওদার ভিতরেই আছি। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, তখনকার মহিলারা হালকা-পাতলা গঠনেরই হতো। না বেশি ভারী, না বেশি মোটা। কেননা তারা কম খানা খেত। তাই উঠানোর সময় হাওদার ওজন তাদের কাছে সাধারণ অবস্থা হতে ব্যতিক্রম মনে হয়নি। অধিকন্তু তখন আমি অল্প বয়সী ছিলাম। পরিশেষে লোকেরা উট দাঁড় করিয়ে পথ চলতে শুরু করে দিল। সৈন্যদের রওনা হয়ে যাবার পর আমি আমার হার খুঁজে পেলাম। এরপর আমি আগের স্থানে ফিরে এসে দেখলাম, তথায় কোন জন-মানুষের শব্দ নেই আর সাড়া দেয়ার মতো কোন লোকও তথায় নেই। তখন আমি সংকল্প করলাম, আমি যেখানে বসা ছিলাম সেখানেই বসে থাকব এবং আমি ভাবলাম, লোকেরা যখন খুঁজে আমাকে পাবে না তখন নিশ্চয়ই তারা আমার খোঁজে আমার নিকট ফিরে আসবে। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি আমার সে স্থানে বসা অবস্থায় ঘুম এলো আর আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। সাফ্ওয়ান ইবনু মুয়াত্তাল আস্ সুলামী আয্ যাক্ওয়ানী নামক এক লোক ছিল। আরামের উদ্দেশ্যে সৈন্যদের পেছনে শেষ রাত্রে সে আগের জায়গায়ই রয়ে গিয়েছিল। পরে সে রওনা হয়ে প্রত্যূষে আমার স্থানে পৌঁছল। দূর থেকে সে একটি মানব দেহ দেখতে পেয়ে আমার কাছে এলো এবং আমাকে দেখে সে চিনে ফেলল। কেননা পর্দার বিধান অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে সে আমাকে দেখেছিল। আমাকে চিনে সে “ইন্না- লিল্লা-হি ওয়া ইন্না- ইলাইহি রাজি‘ঊন” পড়লেন তাঁর “ইন্না- লিল্লা-হ .....” এর শব্দে আমার ঘুম ছুটে গেল। অকস্মাৎ আমি আমার চাদর দিয়ে স্বীয় মুখমণ্ডল আবৃত করে নিলাম। আল্লাহর শপথ! সে আমার সাথে কোন কথা বলেনি এবং “ইন্না- লিল্লা-হ .....” পাঠ ব্যতীত আর তার কোন কথাই আমি শুনিনি। এরপর সে তার উট বসিয়ে নিজ হাত বিছিয়ে দিলেন আমি তার উটের উপরে উঠলাম। আর সে পায়ে হেঁটে আমাকে সহ উট হাঁকিয়ে নিয়ে চলল। যেতে যেতে আমরা সৈন্য দলের কাছে গিয়ে পৌঁছলাম। তখন তারা দ্বিপ্রহরের প্রচণ্ড রোদের মধ্যে সওয়ারী থেকে নেমে ভূমিতে অবস্থান করছিল। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমার (অপবাদের) সম্পর্কে জড়িত হয়ে কতক লোক নিজেদের ধ্বংস ডেকে এনেছে আর এ সম্পর্কে যে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেছিল তার নাম ‘আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সালূল। পরিশেষে আমরা মাদীনায় পৌঁছলাম। মাদীনায় পৌঁছার পর এক মাস যাবৎ আমি অসুস্থ ছিলাম। এদিকে মাদীনার মানুষজন অপবাদ রটনাকারীদের কথা গভীরভাবে পর্যালোচনা করে দেখতে লাগল। এ সম্পর্কে আমি কিছুই বুঝতে পারিনি। তবে এ অসুস্থ অবস্থায় রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তরফ থেকে পূর্বের ন্যায় স্নেহ না পাওয়ার ফলে আমার মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়েছিল। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঘরে ঢুকে কেবল সালাম করে বলতেন, এই তুমি কেমন আছো? এ আচরণ আমাকে সন্দেহে ফেলে দিল। আমি সে (মন্দ) বিষয়টি সম্পর্কে জানতাম না। তারপর কিছুটা সুস্থ হবার পর আমি মানাসি‘ প্রান্তরের দিকে বের হলাম। আমার সাথে মিসতাহ্-এর আম্মাও ছিল। তা আমাদের শৌচাগার ছিল। আমরা রাতে বের হতাম এবং রাতেই চলে আসতাম। এ হলো আমাদের গৃহের নিকট শোচাগার নির্মাণের পূর্ববর্তী সময়ের ঘটনা। তখন আগের দিনের আরব মানুষের মতো মাঠে গিয়ে আমরা শৌচকার্য সারতাম। আর আমরা ঘরের কোণে শৌচাগার তৈরি করা পছন্দ করতাম না। অতএব আমি এবং মিসতাহ্-এর মা যেতে লাগলাম। সে ছিল আবূ রুহম ইবনু মুত্তালিব ইবনু ‘আব্দ মান্নাফ-এর কন্যা এবং তার মা ছিল আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ)-এর খালা সাখ্র ইবুন ‘আমির-এর মেয়ে। তাঁর সন্তানের নাম ছিল মিসতাহ্ ইবনু উসাসাহ্ ইবুন ‘আব্বাদ ইবনু মুত্তালিব। মোটকথা, আমি ও বিনতু আবূ রহ্ম (মিসতাহ্-এর মা) নিজ নিজ শৌচকার্য সেরে ঘরের দিকে রওনা হলাম। তখন মিসতাহ্-এর মা স্বীয় চাদরে পেঁচিয়ে হোঁচট খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়। আর সে বলে উঠে মিস্তাহ ধ্বংস হোক। তখন আমি বললাম, তুমি অন্যায় কথা বলেছো। তুমি কি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী লোককে বকছ? সে বলল, হে অবলা নারী! মিসতাহ্ কি বলেছে, তুমি কি শোননি? আমি বললাম, সে কি বলেছে? “আয়িশাহ্ (রাঃ) বলেন, তারপর সে অপবাদ রটনাকারীরা যা বলেছে, সে সম্পর্কে আমাকে সংবাদ দিল। এতে আমার অসুস্থতা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেল। আমি যখন ঘরে ফিরে আসলাম, তখন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার ঘরে প্রবেশ করে আমাকে সালাম দিলেন এবং বললেন, এই তুমি কেমন আছো? তখন আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, আপনি কি আমাকে আমার বাবা-মায়ের বাড়ীতে যাওয়ার অনুমতি দিবেন? ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, তখন আমি আমার বাবা-মায়ের ঘরে গিয়ে এ বিষয়টির খোঁজ করার সংকল্প করেছিলাম। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে অনুমতি দিলেন। আমি আমার মাতা-পিতার নিকট চলে আসলাম। তারপর আমি আমার মাকে বললাম, আম্মাজান! লোকেরা কী কথা বলছে? তিনি বললেন, মা! এদিকে কান দিয়ো না এবং একে মন্দ মনে করো না। আল্লাহর শপথ! কারো যদি কোন সুন্দরী সহধর্মিণী থাকে ও সে তাকে ভালবাসে আর ঐ মাহিলার কোন সতীনও থাকে তবে সতীনরা তার দোষচর্চা করবে না এমন খুব কমই হয়। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, এ কথা শুনে আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ! লোকেরা এ কথা রটাতে শুরু করেছে? এরপর কেঁদে কেঁদে আমি সারা রাত কাটালাম। এমনকি সকালেও অশ্রু বন্ধ হলো না। আমি ঘুমোতে পারিনি। প্রভাতে আমি কাঁদছিলাম। এদিকে আমাকে তালাক দেয়ার ব্যাপারে পরামর্শ করার জন্য রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ‘আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) এবং উসামাহ্ ইবনু যায়দ (রাঃ)-কে ডাকলেন। তখন ওয়াহী স্থগিত ছিল। তিনি বলেন, উসামাহ্ ইবনু যায়দ (রাঃ) রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর বিবীদের সতীত্ব এবং তাঁদের সাথে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর ভালবাসার ক্ষেত্রে যা জানতেন সে দিকেই তিনি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ইশারা করলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! ‘আয়িশাহ্ আপনার সহধর্মিণী, ভাল ছাড়া তাঁর সম্পর্কে কোন কথাই আমাদের জানা নেই। আর ‘আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) বললেন, আল্লাহ তো আপনার উপর কোন সংকীর্ণতা চাপিয়ে দেননি। ‘আয়িশা (রাঃ) ব্যতীতও অনেক স্ত্রীলোক রয়েছে। আপনি যদি দাসী (বারীরাহ্)-কে প্রশ্ন করেন তবে সে সত্য বলে দিবে। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বারীরাহ্ (রাঃ)-কে ডেকে বললেন, হে বারীরাহ্! সন্দেহমূলক কোন কর্মে ‘আয়িশাকে তুমি কখনো দেখেছ কি? বারীরাহ্ (রাঃ) তাঁকে বললেন, ঐ সত্তার কসম! যিনি আপনাকে সত্য নবী হিসেবে পাঠিয়েছেন, আমি যদি তাঁর মাঝে কোন কিছু দেখতাম তবে নিশ্চয়ই এর ত্রুটি আমি উল্লেখ করতাম। তবে সে একজন অল্প বয়সী কন্যা। পরিবারের জন্যে আটার খামীর রেখেই সে ঘুমিয়ে থাকতো আর বকরী এসে তা খেয়ে ফেলতো। এ ত্রুটি ছাড়া বেশি কোন ত্রুটি ‘আয়িশার মাঝে আছে বলে আমার জানা নেই। তিনি বলেন, অতঃপর রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিম্বারে দাঁড়িয়ে ‘আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবুন সালূল হতে প্রতিশোধ আশা করলেন। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, তিনি মিম্বারে দাঁড়িয়ে বললেন, হে মুসলিম সমাজ! আমার পরিবারের ব্যাপারে যে লোকের পক্ষ হতে কষ্টদায়ক বাক্যের খবর আমার নিকট পৌঁছেছে তার প্রতিশোধ গ্রহণ করার মতো কোন লোক এখানে আছে কি? আমি তো আমার স্ত্রীর ব্যাপারে উত্তম ছাড়া অন্য কোন কথা জানি না এবং যে লোকের ব্যাপারে তারা অপবাদ রটনা করছে তাকেও আমি সৎলোক বলে জানি। সে তো আমাকে ছাড়া আমার ঘরে কখনো প্রবেশ করতো না। এ কথা শুনে সা‘দ ইবনু মু‘আয আল আনসারী (রাঃ) দাঁড়ালেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমি আপনার তরফ হতে প্রতিশোধ নিবো। অপবাদ রটনাকারী লোক যদি আওস গোত্রের হয় তবে আমি তার গর্দান উড়িয়ে দিব। আর যদি সে আমাদের ভ্রাতা খায্রাজ গোত্রের হয় তবে আপনি আমাদেরকে আদেশ দিন। আমরা আপনার আদেশ পালন করব। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, তখন খাযরাজ সর্দার সা‘দ ইবনু ‘উবাদাহ্ (রাঃ) দাঁড়ালেন। তিনি একজন নেক্কার লোক ছিলেন। তবে তখন বংশীয় আত্মমর্যাদা তাঁকে মূর্খ বানিয়ে ফেলেছিল। তাই তিনি সা’দ ইবনু মু‘আযকে বললেন, তুমি মিথ্যা বলছো। আল্লাহ শপথ! তুমি তাকে হত্যা করবে না। তুমি তাকে হত্যা করতে সক্ষম হবে না। এ কথা শুনে সা‘দ ইবনু মু‘আয (রাঃ)-এর চাচাতো ভাই উসায়দ ইবনু হুযায়র (রাঃ) দাঁড়িয়ে সা‘দ ইবনু ‘উবাদাহ্ (রাঃ)-কে বললেন, তুমি মিথ্যা বলছো। আল্লাহর শপথ! নিশ্চয়ই আমরা তাকে হত্যা করব। নিশ্চয়ই তুমি মুনাফিক। তাই মুনাফিকদের পক্ষে কথা বলছো। এ সময় আওস ও খাযরাজ দু’ গোত্রের লোকেরা একে অপরের উপর উত্তেজিত হয়ে উঠল। এমনকি তারা যুদ্ধের ইচ্ছা করে বসলো। অথচ রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখনও তাদের সম্মুখে মিম্বারে দাঁড়ানো অবস্থায় ছিলেন। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁদেরকে থামিয়ে শান্ত করলেন। তারা নীরব থাকলো এবং তিনি নিজেও আর কোন কথা বললেন না। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, সেদিন আমি সারাক্ষণ কান্নাকাটি করলাম। অবিরত ধারায় আমার অশ্রুপাত হচ্ছিল। রাত্রে একটুও আমার ঘুম আসলো না। অতঃপর সামনের রাতেও আমি কেঁদে কাটালাম। এ রাতেও অঝোর ধারায় আমার অশ্রুপাত হলো এবং একটুকুও নিদ্রা যেতে পারলাম না। এ দেখে আমার আব্বা-আম্মা মনে করছিলেন যে, কান্নায় আমার কলিজা টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। আমি কাঁদতে ছিলাম, আমার আব্বা-আম্মা আমার নিকটে বসা ছিলেন। এমন সময় একজন আনসার মহিলা আমার কাছে আসার অনুমতি চাইলে আমি তাকে অনুমতি দিলাম। সে এসে বসে কাঁদতে লাগল। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমাদের যখন এ অবস্থা এমন সময় রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের কাছে প্রবেশ করলেন এবং আমাদেরকে সালাম করে বসলেন। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, অথচ আমার সম্বন্ধে যা বলাবলি হচ্ছে তারপর থেকে তিনি কখনো আমার কাছে বসেননি। এমনিভাবে এক মাস অতিক্রান্ত হলো। আমার সম্পর্কে তাঁর কাছে কোন ওয়াহী আসলো না। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বসে তাশাহুদ পড়লেন। এরপর বললেন, যা হোক হে ‘আয়িশাহ্! তোমার ব্যাপারে আমার কাছে এমন এমন খবর পৌঁছেছে। যদি তুমি এ বিষয়ে নিষ্পাপ এবং পবিত্র হও, তবে শীঘ্রই আল্লাহ তা‘আলা তোমার পবিত্রতার বিষয়ে ঘোষণা করবেন। আর যদি তোমার দ্বারা কোন পাপ হয়েই থাকে তবে তুমি আল্লাহর কাছে মার্জনা প্রার্থনা এবং তাওবাহ্ করো। কেননা বান্দা পাপ স্বীকার করে তাওবাহ্ করলে আল্লাহ তার তাওবাহ্ গ্রহণ করেন। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন তাঁর কথা সমাপ্ত করলেন, তখন আমার অশ্রুধারা বন্ধ হয়ে গেল। এমনকি তারপর আর এক ফোটা অশ্রুও আমি অনুভব করলাম না। তারপর আমি আমার পিতাকে বললাম, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা বললেন, আমার তরফ হতে তার উত্তর দিন। তিনিও বললেন, আল্লাহর শপথ! রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কি উত্তর দিব, আমার তা অজানা। এরপর আমি আমার মাকে বললাম, আমার তরফ হতে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে উত্তর দিন। তিনি বললেন, আল্লাহ্র শপথ! রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে কি উত্তর দিব, আমি তা জানি না। আমি বললাম, তখন আমি ছিলাম কম বয়সী কিশোরী। কুরআন মাজীদও অধিক পাঠ করতে পারতাম না। এ অবস্থা দেখে আমিই তখন বললাম, আল্লাহ শপথ! আমি জানি, আপনারা এ অপবাদের কথা শুনেছেন, মনে তা গেঁথে গেছে এবং আপনারা তা বিশ্বাস করে নিয়েছেন। কাজেই এখন যদি আমি বলি, আমি নিষ্কলুষ তবে এ বিষয়ে আপনারা আমাকে বিশ্বাস করবেন না। আর যদি আমি মেনে নেই, যে সম্পর্কে আল্লাহ জানেন যে, আমি নিষ্পাপ, তবে আপনারা তা বিশ্বাস করবেন। আল্লাহর শপথ! আমার ও আপনাদের জন্য (নাবী) ইউসুফ (‘আঃ)-এর পিতার কথার দৃষ্টান্ত ছাড়া ভিন্ন কোন দৃষ্টান্ত আমার দৃষ্টিতে পড়ে না। তিনি বলেছিলেন, “কাজেই পরিপূর্ণ ধৈর্যই উত্তম, তোমরা যা বলছো সে ব্যাপারে একমাত্র আল্লাহই আমার আশ্রয়স্থল।” তিনি [‘আয়িশাহ (রাঃ)] বলেন, অতঃপর আমি মুখ ফিরিয়ে নিলাম এবং বিছানায় শুয়ে পড়লাম। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তো ঐ সময়েও জানেন যে, নিশ্চয়ই আমি নিষ্পাপ এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ তা‘আলা আমার পবিত্রতা উন্মোচন করে দিবেন। কিন্তু আল্লাহর শপথ! আমি মনে করিনি যে, আল্লাহ তা‘আলা আমার এ ব্যাপারে ওয়াহী অবতীর্ণ করবেন, যা পড়া হবে। কেননা আমার ব্যাপারে পড়ার মতো আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন আয়াত অবতীর্ণ করা হবে আমার অবস্থা তার চেয়ে বেশি নিম্নমানের বলে আমি মনে করতাম। তবে আমি প্রত্যাশা করেছিলাম যে, স্বপ্নের মধ্যে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমন কোন বিষয় দেখবেন যার মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলা আমার পবিত্রতা প্রকাশ করে দিবেন। ‘আয়িশাহ্ সিদ্দীকা (রাঃ) বলেন, আল্লাহ শপথ! রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখনো তাঁর জায়গা ছেড়ে যাননি এবং গৃহের লোকও কেউ বাইরে যায়নি। এমতাবস্থায় আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নাবীর উপর ওয়াহী অবতীর্ণ করেন। ওয়াহী অবতীর্ণের প্রাক্কালে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর যে যন্ত্রণাদায়ক অবস্থা দেখা দিত তার অনুরূপ অবস্থা দেখা দিলো। এমনকি তাঁর প্রতি অবতীর্ণকৃত বাণীর ওযনের কারণে প্রচণ্ড শৈত্যপ্রবাহের দিনেও তাঁর শরীর হতে মুক্তার মতো বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরে পড়তো। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে এ যন্ত্রণাদায়ক অবস্থা চলে গেলে তিনি হাসতে লাগলেন এবং প্রথমে যে কথাটি বললেন তা হলো : হে ‘আয়িশাহ্! সুসংবাদ গ্রহণ করো। আল্লাহ তোমার পবিত্রতা ঘোষণা করেছেন। এ কথা শুনে আমার মা আমাকে বললেন, তুমি উঠে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-সে সম্মান প্রদর্শন করো। আমি বললাম, আমি তাঁর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করবো না এবং আল্লাহ ব্যতীত আর কারো প্রশংসা করবো না। তিনিই আমার পবিত্রতার ব্যাপারে আয়াত নাযিল করেছেন। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, আল্লাহ তা‘আলা আমার পবিত্রতার ব্যাপারে দশটি আয়াত (সূরাহ্ আন্ নূর ২৪ : ১১-২১) অবতীর্ণ করেছেন। “যারা অপবাদ রটনা করেছে তারা তো তোমাদেরই একটি দল, একে তোমরা তোমাদের জন্যে ক্ষতিকর মনে করো না; বরং এ তো তোমাদের জন্য কল্যাণকর।” ..... ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, আত্মীয়তার বন্ধন ও দারিদ্রের কারণে আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) মিসতাহ্কে আর্থিক সাহায্য করতেন। কিন্তু ‘আয়িশাহ্ সম্বন্ধে সে যা বলেছিল সে কারণে আবূ বকর (রাঃ) শপথ করে বসলেন, আল্লাহ্র শপথ! আমি আর কোন সময় মিসতাহ্কে আর্থিক সহযোগিতা দিব না। তখন আল্লাহ তা‘আলা নাযিল করলেন : “তোমাদের মাঝে যারা ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন কসম না করে যে, তারা দান করবে না আত্মীয়-স্বজনকে .....। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের মাফ করেন”..... পর্যন্ত। হাব্বান ইবনু মূসা (রহঃ) বলেন, ‘আবদুল্লাহ ইবনু মুবারক (রহঃ) বলেছেন, আল-কুরআনের মধ্যে এ আয়াতটিই অধিক আশাব্যঞ্জক। তারপর আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) বললেন, আল্লাহ শপথ! আমি অবশ্যই ভালোবাসি যে, আল্লাহ আমাকে মাফ করে দিন। এরপর মিসতাহ্ (রাঃ)-এর জন্যে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতেন তা পুনরায় খরচ করতে শুরু করলেন। আর বললেন, তাকে আমি এ অর্থ দেয়া কোন সময় বন্ধ করবো না। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর স্ত্রী যাইনাব বিন্ত জাহ্শ (রহঃ)-কে আমার সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি যাইনাবকে বলেছিলেন, তুমি ‘আয়িশাহ্ সম্বন্ধে কি জানো বা দেখেছো? জবাবে তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি আমার কান ও চোখকে হিফাযাত করেছি। আল্লাহর শপথ! তাঁর ব্যাপারে আমি উত্তম ব্যতীত কিছুই জানি না। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রীদের মাঝে তিনিই আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন। কিন্তু আল্লাহ ভীতির মাধ্যমে আল্লাহ তাঁকে হিফাযাত করেছেন। অথচ তাঁর বোন হামানাহ্ বিন্ত জাহ্শ তাঁর পক্ষাবলম্বন করে ঝগড়া করে, আর এভাবে সে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। রাবী যুহরী (রহঃ) বলেন, ঐ লোকদের নিকট থেকে আমাদের কাছে যা পৌঁছেছে তা এ হাদীস। তবে রাবী ইউনুসের হাদীসের মধ্যে রয়েছে, ‘গোত্রীয় আত্মম্ভরিতা তাকে উত্তেজিত করে।’ (ই.ফা. ৬৭৬৩, ই.সে. ৬৮১৮)
আয়িশাহ (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
তিনি বলেন, যখন আমার বিষয়ে চর্চা হচ্ছিল যে বিষয়ে আমি কিছুই জানতাম না, তখন রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার প্রসঙ্গে বক্তব্য দিতে দাঁড়ালেন। তিনি তাশাহহূদ পড়ে আল্লাহ্ তা'আলার যথোপযুক্ত সুনাম ও গুনাগুন করার পর বলেনঃ তারপর তোমরা আমাকে ওইসব ব্যক্তির বিষয়ে বুদ্ধি দাও, যারা আমার সহধর্মিণীর ব্যাপারে অপবাদ দিয়েছে। আল্লাহ্র কসম! আমি আমার পরিবারের (স্ত্রীর) মধ্যে কখনো কোন দোষ দেখিনি। এসব ব্যাক্তি যার ব্যাপারে বদনাম রটিয়ে বেড়াচ্ছে, আল্লাহ্র কসম আমি এ ধরনের দুষ্কর্ম তার মধ্যে কখনও দেখিনি। সে (সাফওয়ান) আমার অনুপস্থিতিতে কখনও আমার ঘরে ঢুকেনি, আমি যখন উপস্থিত থাকতাম তখনই সে আমার ঘরে ঢুকত। আমি যখন সফরের কারনে ঘরে অনুপস্থিত থাকতাম তখন সেও আমার সঙ্গেই থাকতো। সা'দ ইবনু মু'আয (রাঃ) উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহ্র রাসুল! আমাকে অনুমতি দিন, আমি এদের ঘাড় উড়িয়ে দেই। তখন খাযরাজ বংশের এক লোক উঠে দাঁড়ালো। হাসসান ইবনু সাবিতের মা এই বংশের সন্তান। লোকটি বলল তুমি মিথ্যাবাদী। আল্লাহ্র কসম, এরা যদি আওস গোত্রের লোক হত, তাহলে তুমি তাদের ঘাড় উড়িয়ে দেওয়া কখনও পছন্দ করতে না। তর্ক-বিতর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছে গেলো যে, আওস ও খাজরায বংশদ্বয়ের মধ্যে মসজিদের ভেতরেই মারামারি লেগে যাওয়ার উপক্রম হল। অথচ এ (অপবাদ) বিষয়ে আমি কিছুই জানতাম না। ওইদিন সন্ধারাতে আমি প্রাকৃতিক প্রয়োজনে বাইরে গেলাম। আমার সাথে মিসতাহর মাও ছিল। সে হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে বলল, মিসতাহ শেষ হোক। আমি বললাম, হে! তুমি মা হয়ে ছেলের অমঙ্গল কামনা করছো? সে চুপ হয়ে গেলো। সে আবার হোঁচট খেলো এবং বলল, মিসতাহ শেষ হোক। আমি তাকে তিরস্কার করে বললাম, হে! তুমি কেমন মা, নিজের ছেলের অমঙ্গল ডাকছ? সে চুপ হয়ে গেলো। সে তৃতীয় বার হোঁচট খেলো এবং বলল, মিসতাহর সর্বনাশ হোক। আমি তাকে কঠোরভাবে বললাম, তুমি কেমন মা, নিজের ছেলের অমঙ্গল চাচ্ছ? সে বলল, আল্লাহ্র কসম আমি তোমার জন্যই তাকে গালমন্দ করছি। আমি প্রশ্ন করলাম আমার জন্য কিভাবে? ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, সে আমার নিকট সমস্ত ব্যাপার বর্ণনা করলো। আমি (তা শুনে) বললাম, এইসব কথা রটেছে নাকি? সে বলল হ্যাঁ। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, আমি বাড়ি ফিরে আসলাম। আল্লাহর কসম! আমার এমন অবস্থা হল যে, যে জন্য এসেছিলাম সে প্রয়োজনের কথা ভুলেই গেলাম। আমার গায়ে জ্বর এসে গেলো। আমি রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে বললাম, আমাকে আমার বাপের বাড়ী পাঠিয়ে দিন। তিনি আমার সাথে একটি বালককে দিয়ে আমাকে পাঠিয়ে দিলেন। আমি ঘরে ঢুকে উম্মু রুমানকে (মাকে) ঘরের নিচের অংশে দেখতে পেলাম। আর আবূ বকর (রাঃ) ঘরের উপরি তলে কুরআন পড়ছিলেন। মা প্রশ্ন করলেন, কন্যা তুমি কেন এসেছো? ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, আমি মাকে সম্পূর্ণ বিষয়টি খুলে বললাম। কিন্তু আমি যেভাবে ভেঙ্গে পড়েছি তিনি ততটা ভারাক্রান্ত নন। তিনি বললেন, “কন্যা! ব্যাপারটাকে হাল্কা ভাবে নাও। আল্লাহর কসম! কোন পুরুষের সুন্দরী স্ত্রী থাকলে, সে তাঁর প্রিয়পাত্রী হলে এবং তাঁর সতীন থাকলে তারা তাঁর সাথে হিংসা করবে না, তার বিষয়ে কিছু রটাবে না এরুপ কমই হয়ে থাকে। মোটকথা আমি যতটা দুঃখ পেলাম মা ততটা পেলেন না। আমি মাকে প্রশ্ন করলাম, আব্বাও কি ব্যাপারটা জানেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি আবার প্রশ্ন করলাম, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি ভারাক্রান্ত হয়ে কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। আবু বকর (রাঃ) আমার কান্নার শব্দ শুনতে পেলেন। তিনি ঘরের উপরিতলে কুরআন পাঠ করছিলেন। তিনি নেমে এসে মাকে বললেন, ওর কি হয়েছে? মা বললেন, ওর বিষয়ে যে সব মিথ্যা বলা হচ্ছে, এ সংবাদ সে শুনে ফেলেছে। এ কথা শুনে বাবার দু চোখে পানি এলো। তিনি বললেন, কন্যা! তোমাকে আল্লাহ তা’আলার নামে কসম করে বলছি, তুমি তোমার ঘরে ফিরে যাও। আমি ঘরে ফিরে এলাম। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার ঘরে এসে আমার কাজের মেয়েকে আমার বিষয়ে প্রশ্ন করলেন। সে বলল, আল্লাহর কসম! আমি তার মধ্যে কোন দোষ দেখিনি। তবে এতটুকু যে, সে ঘুমিয়ে পড়ত, আর বকরি এসে তার পেষা আটা খেয়ে যেত। তাঁর কিছু সাহাবী মেয়েটিকে ধমক দিয়ে বললেন, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট সত্য কথা বল। তারা তাকে অনেক দাবালেন ও ধমকালেন। সে বলল, সুবহানআল্লাহ! আল্লাহর কসম! আমি তাঁর ব্যাপারে তাই জানি স্বর্ণকার খাঁটি রঙ্গিন সোনা প্রসঙ্গে যা জানে। যে ব্যক্তিকে এই অপবাদের সাথে জড়ান হয়েছিল তাঁর কানেও এ খবর পৌঁছল। সে বলল, সুবহানআল্লাহ! আল্লাহ্র কসম! আমি কখনও কোন নারীর সতর খুলিনি। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, সে আল্লাহ্ তা'আলার রাস্তায় শহীদ হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করে। তিনি বলেন, আমার পিতা মাতা খুব ভোরে আমার নিকট এলেন। তারা আমার নিকট থাকতেই রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আসরের নামাজ আদায় করে আমার ঘরে এলেন। আমার পিতা মাতা আমার ডান দিক বাঁ দিক হতে আমাকে ঘিরে বসেছিলেন। রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কালিমা শাহাদাত পাঠ করলেন, আল্লাহ্ তা'আলার যথোপযুক্ত সম্মান ও গুনাগুন করলেন, তারপর বললেনঃ হে ‘আয়িশাহ, তুমি যদি কোন মন্দ কাজ করে থাকো অথবা নিজের উপর জুলুম করে থাকো, তবে আল্লাহ্র নিকট ক্ষমা চাও। কেননা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, এ সময় আনসার বংশের একজন স্ত্রীলোক আসে। সে দরজার নিকট বসে ছিল। আমি বললাম, আপনি কি এ মহিলাটির সামনে এ কথা বলতে লজ্জা বোধ করছেন না? মোটকথা রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওয়াজ-নসীহত করলেন। আমি আমার পিতার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললাম, আপনি তাঁর কথার উত্তর দিন। তিনি বললেন, আমি তাঁকে কি উত্তর দিবো? আমি আমার মা এর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললাম, আপনি তাঁকে এর উত্তর দিন। তিনিও বললেন, আমি তাঁকে কি বলবো? তাদের কেউই যখন উত্তর দেননি, তখন আমি কালেমা শাহাদাত তিলাওয়াত করলাম, আল্লাহ্ তা'আলার যথোপযুক্ত সুনাম ও প্রশংসা করলাম, তারপর বললাম, আল্লাহ্র কসম! আমি যদি আপনাদের বলি, আমি কখনও তা করিনি এবং আল্লাহ্ তা'আলা সাক্ষী আছেন, আমি সত্যবাদিনী, তা আপনাদের নিকট আমার কোন উপকারে আসবেনা। কেননা আপনারা তা আলোচনা করেছেন এবং তাতে আপনাদের মন রঞ্জিত হয়েছে। আর আমি যদি বলি, আমি করেছি এবং আল্লাহ্ তা'আলা জানেন আমি তা করিনি, তখন আপনারা বলবেন, সে নিজেই নিজের অপরাধ স্বীকার করেছে। আল্লাহ্র কসম! আমি আপনাদের এবং আমার জন্য কোন উদাহরন খুঁজে পাচ্ছি না। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, আমি ইয়াকুব (আঃ) এর নাম স্মরণ করতে চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না। শুধু “ইউসুফ এর বাবা” স্মরনে আসছিলো। তিনি যখন বলেছিলেনঃ "পূর্ণ ধৈর্যই শ্রেয়, তোমরা যা বলছ সে প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা আমার সাহায্যস্থল"- (সুরা-ইউসুফ ১৮)। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, ঠিক সে সময় রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নিকট ওয়াহি অবতীর্ণ হতে লাগলো। আমরা চুপ থাকলাম। তাঁর উপর হতে ওয়াহীর অবস্থা দূর হলে আমি তাঁর মুখমন্ডলে আনন্দের ছাপ দেখতে পেলাম। তিনি তাঁর মুখমণ্ডলের ঘাম মুছছেন আর বলছেনঃ হে ‘আয়িশাহ, তোমার জন্য সুসংবাদ। আল্লাহ্ তা'আলা তোমাকে নির্দোষ ঘোষণা করেছেন। আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি তখন উত্তেজিত অবস্থায় ছিলাম। আমার পিতা মাতা আমাকে বললেনঃ উঠে তাঁর নিকট যাও। আমি বললাম, আল্লাহ্র কসম! আমি তাঁর নিকট উঠে যাব না, তাঁর সুনাম ও করব না এবং আপনাদের প্রশংসাও করব না। বরং আমি সে আল্লাহ্ তা’আলার সুনাম করবো যিনি আমার নির্দোষিতার ওয়াহী অবতীর্ণ করেছেন। আপনারা এ অপবাদ শুনেছেন, কিন্তু প্রত্যাখ্যান বা প্রতিহত করেন নি। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, জাহাশ-কন্যা যাইনাবের দীনদারীর জন্য আল্লাহ্ তা'আলা তাকে হিফাজাত করেছেন। সে ভালো ব্যতিত কখনও অন্য কিছু বলেনি। কিন্তু তাঁর বোন হামনা ক্ষতিগ্রস্থদের সাথে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। যারা এ অপবাদ রটায় তাদের মধ্যে ছিলঃ মিসতাহ, হাসান ইবনু সাবিত ও মুনাফিক সরদার আবদুল্লাহ ইবনু উবাই। সে অপবাদ রটাত এবং তা ছড়িয়ে বেড়াত। সে ও হামনা ছিল এই আপত্তিকর অপবাদ ছড়ানোর বড় হোতা। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, আবু বকর (রাঃ) কসম করেন যে, তিনি আর কখনও মিসতাহর কোনভাবে উপকার করবেন না (ভরন পোষণ বহন করবেন না)। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা আয়াত অবতীর্ণ করেনঃ "তোমাদের মধ্যে যারা (আবু বকর কে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে) ঐশ্বর্য ও প্রাচুর্যের অধিকারী তারা যেন কসম না করে যে, তারা আত্মীয়, গরীব ও আল্লাহ্ তা'আলার পথে মুহাজিরদের (মিসতাহ কে লক্ষ করে বলা হচ্ছে) কিছুই দেবে না ... তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ্ তা'আলা তোমাদের কে মাফ করুন?" আল্লাহ্ তালা বড়ই ক্ষমাশীল, পরম করুনাময়" -(সূরা আন-নূর ২২)। আবু বকর (রাঃ) বলেন, হে আমাদের প্রতিপালক! হ্যাঁ, আমরা অবশ্যই আপনার ক্ষমাপ্রার্থী। তিনি আগের মত মিসতাহর ভরণপোষণের ভার বহন করেন। সহীহঃ বুখারী (৪৭৫৭), মুসলিম।