আনাস ইব্নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
তিনি বলেনঃ আবূ যার (রাঃ) রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ আমি মক্কায় থাকা অবস্থায় আমার গৃহের ছাদ উন্মুক্ত করা হ’ল। অতঃপর জিব্রীল (‘আঃ) অবতীর্ণ হয়ে আমার বক্ষ বিদীর্ণ করলেন। আর তা যমযমের পানি দ্বারা ধৌত করলেন। অতঃপর হিকমাত ও ঈমানে ভর্তি একটি সোনার পাত্র নিয়ে আসলেন এবং তা আমার বুকের মধ্যে ঢেলে দিয়ে বন্ধ করে দিলেন। অতঃপর হাত ধরে আমাকে দুনিয়ার আকাশের দিকে নিয়ে চললেন। পরে যখন দুনিয়ার আকাশে আসলাম জিব্রীল (‘আঃ) আসমানের রক্ষককে বললেনঃ দরজা খোল। আসমানের রক্ষক বললেনঃ কে আপনি? জিব্রীল (‘আঃ) বললেনঃ আমি জিব্রীল (‘আঃ)। (আকাশের রক্ষক) বললেনঃ আপনার সঙ্গে কেউ রয়েছেন কি? জিব্রীল বললেনঃ হাঁ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রয়েছেন। অতঃপর রক্ষক বললেনঃ তাকে কি ডাকা হয়েছে? জিব্রীল বললেনঃ হাঁ। অতঃপর যখন আমাদের জন্য দুনিয়ার আসমানকে খুলে দেয়া হল আর আমরা দুনিয়ার আসমানে প্রবেশ করলাম তখন দেখি সেখানে এমন এক ব্যক্তি উপবিষ্ট রয়েছেন যার ডান পাশে অনেকগুলো মানুষের আকৃতি রয়েছে আর বাম পাশে রয়েছে অনেকগুলো মানুষের আকৃতি। যখন তিনি ডান দিকে তাকাচ্ছেন হেসে উঠছেন আর যখন বাম দিকে তাকাচ্ছেন কাঁদছেন। অতঃপর তিনি বললেনঃ স্বাগতম ওহে সৎ নবী ও সৎ সন্তান। আমি (রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)) জিব্রীল (‘আঃ)-কে বললামঃ কে এই ব্যক্তি? তিনি জবাব দিলেনঃ ইনি হচ্ছেন আদম (‘আঃ)। আর তাঁর ডানে বামে রয়েছে তাঁর সন্তানদের রূহ। তার মধ্যে ডান দিকের লোকেরা জান্নাতী আর বাম দিকের লোকেরা জাহান্নামী। ফলে তিনি যখন ডান দিকে তাকান তখন হাসেন আর যখন বাম দিকে তাকান তখন কাঁদেন। অতঃপর জিব্রীল (‘আঃ) আমাকে নিয়ে দ্বিতীয় আসমানে উঠলেন। অতঃপর তার রক্ষককে বললেনঃ দরজা খোল। তখন এর রক্ষক প্রথম রক্ষকের মতই প্রশ্ন করলেন। পরে দরজা খুলে দেয়া হল। আনাস (রাঃ) বলেনঃ আবূ যার (রাঃ) উল্লেখ করেন যে, তিনি [রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)] আসমানসমূহে আদম, ইদরীস, মূসা, ‘ঈসা এবং ইব্রাহীম (‘আলাইহিমুস সালাম)-কে পান। কিন্তু আবূ যার (রাঃ) তাদের স্থানসমূহ নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেননি। তবে এতটুকু উল্লেখ করেছেন যে, তিনি আদম (‘আঃ)-কে দুনিয়ার আকাশে এবং ইব্রাহীম (‘আঃ)-কে ষষ্ঠ আসমানে পান। আনাস (রাঃ) বলেনঃ জিব্রীল (‘আঃ) যখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে নিয়ে ইদরীস (‘আঃ) নিকট দিয়ে অতিক্রম করেন তখন ইদরীস (‘আঃ) বলেনঃ মারহাবা ওহে সৎ ভাই ও পুণ্যবান নবী। আমি (রসূলুল্লাহ্) বললামঃ ইনি কে? জিব্রীল বললেনঃ ইনি হচ্ছেন ইদরীস (‘আঃ)। অতঃপর আমি মূসা (‘আঃ)-এর নিকট দিয়ে অতিক্রম করাকালে তিনি বলেনঃ মারহাবা হে সৎ নবী ও পুণ্যবান ভাই। আমি বললামঃ ইনি কে? জিব্রীল বললেনঃ ইনি মূসা (‘আঃ)। অতঃপর আমি ‘ঈসা (‘আঃ)-এর নিকট দিয়ে অতিক্রম করাকালে তিনি বলেনঃ মারহাবা হে সৎ নবী ও পুণ্যবান ভাই। আমি বললামঃ ইনি কে? জিব্রীল বললেনঃ ইনি হচ্ছেন ‘ঈসা (‘আঃ)। অতঃপর আমি ইব্রাহীম (‘আঃ)-এর নিকট দিয়ে অতিক্রম করলে তিনি বলেনঃ মারহাবা হে পুণ্যবান নবী ও নেক সন্তান। আমি বললামঃ ইনি কে? জিব্রীল (‘আঃ) বললেনঃ ইনি হচ্ছেন ইব্রাহীম (‘আঃ)। ইব্নু শিহাব বলেনঃ ইব্নু হায্ম (রহঃ) আমাকে সংবাদ দিয়েছেন যে, ইব্নু ‘আব্বাস ও আবূ হাব্বা আল-আনসারী উভয়ে বলতেনঃ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ অতঃপর আমাকে আরো উপরে উঠানো হল অতঃপর এমন এক সমতল স্থানে এসে আমি উপনীত হই যেখানে আমি লেখার শব্দ শুনতে পাই। ইব্নু হায্ম ও আনাস ইব্নু মালিক (রাঃ) বলেনঃ রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ অতঃপর আল্লাহ আমার উম্মাতের উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করে দেন। অতঃপর তা নিয়ে আমি ফিরে আসি। অবশেষে যখন মূসা (‘আঃ)-এর নিকট দিয়ে অতিক্রম করি তখন তিনি বললেনঃ আল্লাহ তা’আলা আপনার উম্মাতের উপর কি ফরয করেছেন? আমি বললামঃ পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করেছেন। তিনি বললেনঃ আপনি আপনার পালনকর্তার নিকট ফিরে যান, কেননা আপনার উম্মাত তা পালন করতে পারবে না। আমি ফিরে গেলাম। আল্লাহ তা’আলা কিছু অংশ কমিয়ে দিলেন। আমি মূসা (‘আঃ)-এর নিকট পুনরায় গেলাম আর বললামঃ কিছু অংশ কমিয়ে দিয়েছেন। তিনি বললেনঃ আপনি পুনরায় আপনার রবের নিকট ফিরে যান। কারণ আপনার উম্মাত এটিও আদায় করতে পারবে না। আমি ফিরে গেলাম। তখন আরো কিছু অংশ কমিয়ে দেয়া হল। আবারো মূসা (‘আঃ)-এর নিকট গেলাম, এবারো তিনি বললেনঃ আপনি পুনরায় আপনার প্রতিপালকের নিকট যান। কারণ আপনার উম্মত এটিও আদায় করতে সক্ষম হবে না। তখন আমি পুনরায় গেলাম, তখন আল্লাহ বললেনঃ এই পাঁচই (নেকির দিক দিয়ে) পঞ্চাশ (বলে গণ্য হবে)। আমার কথার কোন রদবদল হয় না। আমি পুনরায় মূসা (‘আঃ)-এর নিকট আসলে তিনি আমাকে আবারও বললেনঃ আপনার প্রতিপালকের নিকট পুনরায় যান। আমি বললামঃ পুনরায় আমার প্রতিপালকের নিকট যেতে আমি লজ্জাবোধ করছি। অতঃপর জিব্রীল (‘আঃ) আমাকে সিদরাতুল মুনতাহা [১] পর্যন্ত নিয়ে গেলেন। আর তখন তা বিভিন্ন রঙে আবৃত ছিল, যার তাৎপর্য আমি অবগত ছিলাম না। অতঃপর আমাকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হলে আমি দেখতে পেলাম যে, তাতে রয়েছে মুক্তোমালা আর তার মাটি হচ্ছে কস্তুরী। (১৬৩৬, ৩৩৪২; মুসলিম ১/৭৪, হাঃ ১৬৩, আহমাদ ২১১৯৩) (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৩৬, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ৩৪২)
আনাস ইব্নু মালিক (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে এক রাতে কা‘বার মসজিদ থেকে সফর করানো হয়। বিবরণটি হচ্ছে, নবী (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর কাছে এ বিষয়ে ওয়াহী পাঠানোর আগে তাঁর কাছে তিনজন ফেরেশ্তার একটা জামা‘আত আসল। অথচ তখন তিনি মাসজিদুল হারামে ঘুমিয়ে ছিলেন। এদের প্রথম জন বলল, তিনি কে? মধ্যের জন্য বলল, তিনি এদের সব চেয়ে ভাল লোক। সর্বশেষ জন বলল, তা হলে তাদের সবচেয়ে ভাল লোকটিকেই নিয়ে চল। সে রাতের ঘটনা এতটুকুই। এ জন্য তিনি আর তাদেরকে দেখেননি। শেষে তারা অন্য এক রাতে আসলেন, যা তিনি অন্তর দ্বারা দেখছিলেন। তাঁর চোখ ঘুমায়, অন্তর ঘুমায় না। সে রকম অন্য নবীগণের (আঃ) চোখ ঘুমিয়ে থাকে, অন্তর ঘুমায় না। এ রাতে তারা তাঁর সঙ্গে কোন কথা না বলে তাঁকে উঠিয়ে নিয়ে যমযম কুপের কাছে রাখলেন। জিব্রীল (আঃ) তাঁর সাথীদের থেকে নবী (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর দায়িত্ব নিলেন। জিব্রীল (আঃ) তাঁর গলায় নিচ হতে বুক পর্যন্ত বিদীর্ণ করলেন এবং তাঁর বুক ও পেট থেকে সবকিছু নেড়েচেড়ে যমযমের পানি দ্বারা নিজ হাতে ধৌত করেন। সেগুলোকে পরিষ্কার করলেন, তারপর সোনার একটি তশ্তরী আনা হল। এবং তাতে ছিল একটি সোনার পাত্র যা পরিপূর্ণ ছিল ঈমান ও হিক্মাতে। তাঁর বুক ও গলার রগগুলো এর দ্বারা পূর্ণ করলেন। তারপর সেগুলো যথাস্থানে রেখে বন্ধ করে দিলেন। তারপর তাঁকে নিয়ে পৃথিবীর আসমানের দিকে উঠলেন। আসমানের দরজাগুলো হতে একটি দরজাতে নাড়া দিলেন। ফলে আসমানবাসীগণ তাঁকে ডাক দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এ কে? তিনি উত্তরে বললেন, জিব্রীল। তারা আবার জিজ্ঞেস করলেন, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, আমার সঙ্গে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। জিজ্ঞেস করলেন, তাঁর কাছে কি দূত পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তখন তাঁরা বললেন, মারহাবান ওয়া আহলান (আপনাকে ধন্যবাদ, আপনি আপনজনের মধ্যে এসেছেন)। তাঁর আগমনে আসমানবাসীরা খুবই আনন্দিত। আল্লাহ্ যমীনে কী করতে চাচ্ছেন, তা আসমানবাসীদেরকে না জানানো পর্যন্ত তারা জানতে পারে না। দুনিয়ার আসমানে তিনি আদাম (আঃ)-কে পেলেন। জিব্রীল (আঃ) তাঁকে দেখিয়ে বললেন, তিনি আপনার পিতা, তাঁকে সালাম দিন। নবী (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে সালাম দিলেন। আদাম (আঃ) তাঁর সালামের উত্তর দিলেন এবং বললেন, মারহাবান ওয়া আহলান হে আমার পুত্র! তুমি আমার কতইনা উত্তম পুত্র। নবী (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দু‘টি প্রবহমান নদী দুনিয়ার আসমানে দেখলেন। জিজ্ঞেস করলেন, এ নদী দু‘টি কোন নদী হে জিব্রীল! জিব্রীল (আঃ) বললেন, এ দু‘টি হলো নীল ও ফুরাতের মূল। এরপর জিব্রীল (আঃ) নবী (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে সঙ্গে নিয়ে এ আসমানে ঘুরে বেড়ালেন। তিনি আরো একটি নদী দেখলেন। এর ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল মোতি ও জাবারজাদের তৈরী একটি প্রাসাদ। নবী (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নদীতে হাত মারলেন। সেটা ছিল অতি উন্নতমানের মিস্ক। তিনি বললেন, হে জিব্রীল! এটি কী? জিব্রীল (আঃ) বললেন, হাউযে কাউসার। যা আপনার রব আপনার জন্য সংরক্ষিত রেখেছেন। তারপর তিনি নবী (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে সঙ্গে করে দ্বিতীয় আসমানে গেলেন। প্রথম আসমানের ফেরেশ্তাগণ তাঁকে যা বলেছিলেন এখানেও তা বললেন। তারা জানতে চাইল, তিনি কে? তিনি বললেন, জিব্রীল! তাঁরা বললেন, আপনার সঙ্গে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তাঁরা বললেন, তাঁর কাছে কি দূত পাঠানো হয়েছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তাঁরা বললেন, মারহাবান ওয়া আহলান। তারপর নবী (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে সঙ্গে করে তিনি তৃতীয় আসমানের দিকে গেলেন। প্রথম ও দ্বিতীয় আসমানের ফেরেশতারা যা বলেছিলেন, তৃতীয় আসমানের ফেরেশ্তারাও তাই বললেন। তারপর তাঁকে সঙ্গে করে তিনি চতুর্থ আসমানের দিকে গেলেন। তাঁরাও তাঁকে আগের মতই বললেন। তারপর তাঁকে নিয়ে তিনি পঞ্চম আসমানে গমন করলেন। তাঁরাও পূর্বের মতো বললেন। এরপর তিনি তাঁকে নিয়ে ষষ্ঠ আসমানের দিকে গেলেন। সেখানেও ফেরেশ্তারা আগের মতই বললেন। সর্বশেষে তিনি নবী (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে নিয়ে সপ্তম আসমানে গেলে সেখানেও ফেরেশ্তারা তাঁকে আগের ফেরেশ্তাদের মতো বললেন। প্রত্যেক আসমানেই নবীগণ রয়েছেন। নবী (সাল্লাল্লাহ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নাম উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে আমি সংরক্ষিত করেছি যে, দ্বিতীয় আসমানে উদ্রীস (আঃ), চতুর্থ আসমানে হারুন (আঃ), পঞ্চম আসমানে অন্য একজন নবী যার নাম আমি স্মরণ রাখতে পারিনি। ষষ্ঠ আসমানে রয়েছে ইব্রাহীম (আঃ) এবং আল্লাহ্র সঙ্গে কথা বলার মর্যাদার কারণে মূসা (আঃ) আছেন সপ্তম আসমানে। সে সময় মূসা বললেন, হে আমার রব্ব। আমি তো ধারণা করিনি আমার ওপর কাউকে উচ্চমর্যাদা দান করা হবে। তারপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে এত উপরে উঠানো হলো, যে ব্যাপারে আল্লাহ্ ব্যতীত আর কেউই জানে না। শেষে তিনি ‘সিদ্রাতুল মুনতাহায়’ পৌঁছলেন। এখানে প্রবল পরাক্রমশালী আল্লাহ্ তাঁর নিকটবর্তী হলেন। অতি নিকটবর্তীর ফলে তাঁদের মাঝে দু‘ধনুকের ফারাক রইল অথবা তারও কম। তখন আল্লাহ্ তাঁর প্রতি ওয়াহী পাঠালেন। অর্থাৎ তাঁর উম্মাতের উপর রাত ও দিনে পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত আদায়ের কথা ওয়াহীযোগে পাঠানো হলো। তারপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নামলেন। আর মূসার কাছে আসলে মূসা (আঃ) তাঁকে আটকিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আপনার রব্ব আপনাকে কী নির্দেশ দিলেন? নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, রাত ও দিনে পঞ্চাশ বার সালাত আদায়ের। তখন মূসা (আঃ) বললেন, আপনার উম্মাত তা আদায় করতে পারবে না। কাজেই আপনি ফিরে যান, তাহলে আপনার রব্ব আপনার এবং আপনার উম্মাত হতে এ আদেশটি সহজ করে দেবেন। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিবরাঈলের (আঃ) দিকে এমনভাবে তাকালেন যেন তিনি এ ব্যাপারে তাঁর থেকে পরামর্শ চাচ্ছিলেন। জিবরাঈল (আঃ) তাঁকে ইশারায় বললেন হ্যাঁ, আপনি ইচ্ছে করলে তা হতে পারে। তাই তিনি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে নিয়ে প্রথমে আল্লাহ্র কাছে গেলেন। তারপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যথাস্থানে থেকে বললেন, হে আমার রব্ব! আমার উম্মাত এটি আদায় করতে পারবে না। তখন আল্লাহ্ দশ ওয়াক্ত ,লাত কমিয়ে দিলেন। এরপর মূসা (আঃ) -এর কাছে ফিরে আসলে তিনি তাঁকে থামালেন। এভাবেই মূসা তাঁকে তাঁর রব্বের কাছে পাঠাতে থাকলেন। শেষে পাঁচ ওয়াক্ত বাকী থাকল। পাঁচ সংখ্যায়ও মূসা (আঃ) তাঁকে থামিয়ে বললেন, হে মুহাম্মাদ! আমি আমার বানী ইসরাঈল কাওমের কাছে এটা হতেও সামান্য কিছু পেতে চেয়েছি। তবু তারা দুর্বল হয়েছে এবং পরিত্যাগ করেছে। অথচ আপনার উম্মাত শারীরিক, মানসিক, দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তি সব দিক দিয়ে আরো দুর্বল। কাজেই আপনি আবার যান এবং আপনার রব্ব থেকে আদেশটি আরো সহজ করে আনুন। প্রতিবারই নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরামর্শের জন্য জিব্রাঈলের দিকে তাকাতেন। পঞ্চমবারেও জিব্রীল তাঁকে নিয়ে যাত্রা করলেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ হে আমার রব্ব! আমার উম্মাতের শরীর, মন, শ্রবণশক্তি ও দেহ খুবই দুর্বল। তাই আদেশটি আমাদের থেকে আরো সহজ করে দিন। এরপর পরাক্রমশালী আল্লাহ্ বলেলেনঃ মুহাম্মাদ! নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আমি আপনার নিকট উপস্থিত, বারবার উপস্থিত। আল্লাহ্ বললেন, আমার কথার কোন পরিবর্তন পরিবর্ধন হয় না। আমি তোমাদের উপর যা ফরয করেছি তা ‘উম্মুল কিতাব’ তথা লাওহে মাহ্ফুযে সংরক্ষিত আছে। প্রতিটি নেক আমলের দশটি নেকী রয়েছে। উম্মুল কিতাবে সালাত পঞ্চাশ ওয়াক্তই লেখা আছে। তবে আপনার ও আপনার উম্মাতের জন্য তা পাঁচ ওয়াক্ত করা হলো। এরপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মূসার কাছে ফিরে আসলে মূসা (আঃ) তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কী ব্যবস্থা নিয়ে এসেছেন? নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আল্লাহ্ আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন। তিনি আমাদেরকে প্রতিটি নেক আমলে বদলে দশটি সাওয়াব নির্ধারিত করেছেন। তখন মূসা (আঃ) বললেন, আল্লাহ্র শপথ! আমি বানী ইসরাঈলের নিকট হতে এর চেয়েও অল্প জিনিসের আশা করেছি। কিন্তু তারা তাও আদায় করেনি। আপনার রব্বের কাছে আপনি আবার ফিরে যান, যেন তিনি আরো একটু কমিয়ে দেন। এবার নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, হে মূসা, আল্লাহর শপথ! আমি আমার রব্বের কাছে বারবার গেছি। আবার যেতে লজ্জাবোধ করছি, যেন তাঁর সঙ্গে মতভেদ করছি। এরপর মূসা (আঃ) বললেন, নামতে পারেন আল্লাহ্র নামে। এ সময় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জাগ্রত হলেন, দেখলেন, তিনি মাসজিদে হারামে আছেন। [৩৫৭০; মুসলিম ১/৭৪, হাঃ ১৬২, আহমাদ ১২৫০৭] (আধুনিক প্রকাশনী- ৬৯৯৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৭০০৯)
আবূ হুরায়রাহ (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ ধ্বংসকারী সাতটি কাজ থেকে তোমরা বেঁচে থেকো। প্রশ্ন করা হলো-হে আল্লাহর রসূল সে গুলো কি? তিনি বললেনঃ (১) আল্লাহর সাথে শারীক করা; (২) যাদু করা; (৩) আল্লাহ যার হত্যা নিষেধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা; (৪) ইয়াতীমের মাল অন্যায়ভাবে আত্নসাৎ করা; (৫) সুদ খাওয়া; (৬) যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে পলায়ন করা এবং (৭) সাধ্বী, সরলমনা ও ইমানদার নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করা। (ই.ফা. ১৬৪; ই.সে. ১৭০)
আনাস ইবনু মালিক (রাযিঃ) থেকে বর্নিতঃ
রাবী বলেন, আনাস (রাঃ) সম্ভবত তাঁর সম্প্রদায়ের জনৈক মালিক ইবনু সা’সা’আহ্ (রাঃ) বলেন যে, ‘নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, একদিন আমি কা’বা শরীফের নিকটে নিদ্রা ও জাগরণের মাঝামাঝি ছিলাম। তখন তিন ব্যক্তির মধ্যবর্তী একজনকে কথা বলতে শুনতে পেলাম। যা হোক তিনি আমার নিকট এসে আমাকে নিয়ে গেলেন। তারপর আমার নিকট একটি স্বর্ণের পাত্র আনা হলো, তাতে যমযমের পানি ছিল। এরপর তিনি আমার বক্ষদেশ এখান থেকে ওখান পর্যন্ত বিদীর্ণ করলেন। বর্ণনাকারী কাতাদাহ্ (রহঃ) বলেন, আমি আমার পার্শ্বস্থ একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এখান থেকে ওখান পর্যন্ত’ বলে কি বুঝাতে চেয়েছেন? তিনি জবাব দিলেন, “বুক থেকে পেটের নীচ পর্যন্ত।” রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, এরপর আমার হৃদপিণ্ডটি বের করা হলো এবং যমযমের পানি দিয়ে তা ধুয়ে পুনরায় যথাস্থানে স্থাপন করে দেয়া হলো। ঈমান ও হিকমাতে আমার হৃদয় পূর্ণ করে দেয়া হলো। এরপর আমার নিকট বুরাক নামের একটি সাদা জন্তু উপস্থিত করা হয়। এটি গাধা থেকে কিছু বড় এবং খচ্চর থেকে ছোট। যতদূর দৃষ্টি যায় একেক পদক্ষেপে সে ততদূর চলে। এর উপর আমাকে আরোহণ করানো হলো। আমরা চললাম এবং দুনিয়ার আসমান পর্যন্ত পৌছলাম। জিবরীল (‘আঃ) দরজা খুলতে বললেন। জিজ্ঞেস করা হলো, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। জিজ্ঞস করা হলো, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, আমার সাথে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আছেন। দ্বাররক্ষী বললেন, তাঁর কাছে আপনাকে পাঠানো হয়েছিল কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। এরপর দরজা খুলে দিলেন এবং বললেন, মারহাবা! কত সম্মানিত আগন্তুকের আগমন হয়েছে। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ তারপর আমরা আদাম (‘আঃ)-এর নিকট আসলাম ..... এভাবে বর্ণনাকারী পূর্ণ হাদীসটি বর্ণনা করে যান। তবে এ রিওয়ায়াতে বলা হয়েছে যে, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দ্বিতীয় আসমান ‘ঈসা ও ইয়াহ্ইয়া, তৃতীয় আসমানে ইউসুফ, চতুর্থ আসমানে ইদ্রীস, পঞ্চম আসমানে হারূন (‘আঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, তারপর আমরা ষষ্ঠ আসমানে গিয়ে পৌছি এবং মূসা (‘আঃ)-এর নিকট গিয়ে তাঁকে সালাম দেই। তিনি বললেন, মারহাবা, হে সুযোগ্য ‘নাবী, সুযোগ্য ভ্রাতা! এরপর আমরা তাঁকে অতিক্রম করে চলে গেলে তিনি কাঁদতে শুরু করলেন। আওয়াজ এল, তুমি কেন কাঁদছো? তিনি জবাব দিলেন, প্রভু! এ বালককে আপনি আমার পরে পাঠিয়েছেন, অথচ আমার উম্মাত অপেক্ষা তাঁর উম্মাত অধিক সংখ্যায় জান্নাতে প্রবেশ করবে। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আমরা আবার চললাম এবং সপ্তম আসমানে গিয়ে পৌছলাম ও ইবরাহীম (‘আঃ)-এর নিকট আসলাম। সহাবা তা এ হাদীসে আরো উল্লেখ করেন যে, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আরো বলেছেন, সেখানে তিনি চারটি নহর দেখেছেন। [৭২] তন্মধ্যে দু’টি প্রকাশ্য ও দু’টি অপ্রকাশ্য। সবগুলোই সিদরাতুল মুনতাহার গোড়া হতে প্রবাহিত। ‘নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, আমি বললাম, হে জিবরীল! এ নহরগুলো কি? তিনি বললেন, অপ্রকাশ্য নহরদ্বয় তো জান্নাতের নহর আর প্রকাশ্যগুলো নীল ও ফুরাত। অর্থাৎ এ দু’টি নহরের সাদৃশ্য রয়েছে জান্নাতের ঐ দু’টি নহরের সাথে। এরপর আমাকে বাইতুল মা’মূর-এ উঠানো হলো। বললাম, হে জিবরীল! এ কি? তিনি বললেন, এ হচ্ছে ‘বাইতুল মা’মূর’। প্রত্যহ এতে সত্তর হাজার ফেরেশতা (তাওয়াফের জন্য) প্রবেশ করে। তারা একবার তাওয়াফ সেরে বের হলে কখনো আর ফের তাওয়াফের সুযোগ হয় না তাদের। তারপর আমার সম্মুখে দু’টি পাত্র পেশ করা হলো- একটি শরাবের, অপরটি দুধের। আমি দুধের পাত্রটি গ্রহণ করলাম। তিনি আমাকে বললেন, আপনি ঠিক করেছেন। আল্লাহ আপনার উম্মাতকেও আপনার ওয়াসীলায় ফিত্রাহ-এর উপর কায়িম রাখুন। তারপর আমার উপর পঞ্চাশ ওয়াক্ত সলাত ফারয করা হয় ..... এভাবে বর্ণনাকারী হাদীসের শেষ পর্যন্ত বর্ণনা করেন। (ই.ফা ৩১৩, ই.সে ৩২৪)