নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রী ‘আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
মিথ্যা অপবাদকারীরা যখন তাঁর সম্পর্কে অপবাদ রটনা করল এবং আল্লাহ তা হতে তাঁর পবিত্রতা ঘোষনা করলেন। রাবীগণ বলেন, ‘আয়িশা (রাঃ) বলেছেন, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সফরে বের হবার ইচ্ছা করলে স্বীয় স্ত্রীদের মধ্যে কুর‘আ ঢালার মাধ্যমে সফর সঙ্গিনী নির্বাচন করতেন। তাঁদের মধ্যে যার নাম বেরিয়ে আসত তাকেই তিনি নিজের সঙ্গে নিয়ে যেতেন। এক যুদ্ধে যাবার সময় তিনি আমাদের মধ্যে কুর‘আ ডাললেন, তাতে আমার নাম বেরিয়ে এলো। তাই আমি তাঁর সঙ্গে (সফরে) বের হলাম। এটা পর্দার নির্দেশ নাযিল হবার পরের ঘটনা। আমাকে হাওদার ভিতরে সওয়ারীতে উঠানো হত, আবার হাওদায় থাকা অবস্থায় নামানো হত। এভাবেই আমরা সফর করতে থাকলাম। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঐ যুদ্ধ শেষ করে যখন প্রত্যাবর্তন করলেন এবং আমরা মদীনার নিকট পৌছে গেলাম তখন এক রাতে তিনি মনযিল ত্যাগ করার ঘোষনা দিলেন। উক্ত ঘোষনা দেয়ার সময় আমি উঠে সেনাদলকে অতিক্রম করে গেলাম এবং নিজের প্রয়োজন সেরে হাওদায় ফিরে এলাম। তখন বুকে হাত দিয়ে দেখি আযফার দেশীয় সাদা কালো পাথরের তৈরী আমার একটা মালা ছিঁড়ে পড়ে গেছে। তখন আমি আমার মালার সন্ধানে ফিরে গেলাম এবং সন্ধান কার্য আমাকে বিলম্বিত করে দিল। ওদিকে যারা আমার হাওদা উঠিয়ে দিত তারা তা উঠিয়ে যে উটে আমি সওয়ার হতাম, তার পিঠে রেখে দিল। তাদের ধারনা ছিল যে, আমি হাওদাতেই আছি। তখনকার মেয়েরা দুবলা পাতলা হত, মোটা সোটা হত না। কেননা খুব সামান্য খাবার তারা খেতে পেত। তাই হাওদা উঠাতে গিয়ে তার ভার তাদের নিকট অস্বাভাবিক বলে মনে হল না। তদুপরি সে সময় আমি অল্প বয়স্কা কিশোরী ছিলাম এবং তখন তারা হাওদা উঠিয়ে উট হাঁকিয়ে রওনা হয়ে গেল। এদিকে সেনাদল চলে যাবার পর আমি আমার মালা পেয়ে গেলাম। কিন্তু তাদের জায়গায় ফিরে এসে দেখি, সেখানে কেউ নেই। তখন আমি আমার জায়গায় এসে বসে থাকাই স্থির করলাম। আমার ধারনা ছিল যে, আমাকে না পেয়ে আবার এখানে তারা ফিরে আসবে। বসে থাকা অবস্থায় আমার দু’ চোখে ঘুম এলে আমি ঘুমিয়ে পড়লাম। সাফওয়ান ইবনু মুআত্তাল, যিনি প্রথমে সুলামী এবং পরে যাকওয়ানী হিসাবে পরিচিত ছিলেন, সেনা দলের পিছনে (পরিদর্শক হিসাবে) রয়ে গিয়েছিলেন। সকালের দিকে আমার অবস্থান স্থলের কাছাকাছি এসে পৌছলেন এবং একজন ঘুমন্ত মানুষের শরীর দেখতে পেয়ে আমার দিকে এগিয়ে এলেন। পর্দার বিধান নাযিলের আগে তিনি আমাকে দেখেছিলেন। যে সময় তিনি উট বসাচ্ছিলেন সে সময় তার ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ শব্দে আমি জেগে গেলাম। তিনি উটের সামনে পা চেপে ধরলে আমি তাতে সওয়ার হলাম। আর তিনি আমাকে নিয়ে সাওয়ারী হাঁকিয়ে চললেন। সেনাদল ঠিক দুপুরে যখন বিশ্রাম করছিল, তখন আমরা সেনাদলে পৌছলাম। সে সময় যারা ধ্বংস হবার, তারা ধ্বংস হল। অপবাদ রটনায় যে নেতৃত্ব দিয়েছিল, সে হলো ‘আবদুল্লাহ ইবনু উবাই ইবনু সালুল। আমরা মদীনায় উপস্থিত হলাম এবং আমি এসেই একমাস অসুস্থতায় ভুগলাম। এদিকে কতিপয় ব্যক্তি অপবাদ রটনাকারীদের রটনা নিয়ে চর্চা করতে থাকল। আমার অসুস্থতার সময় এ বিষয়টি আমাকে সন্দিহান করে তুলল যে, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পক্ষ হতে সেই স্নেহ আমি অনুভব করছিলাম না, যা আমার অসুস্থার সময় সচরাচর আমি অনুভব করতাম। তিনি শুধু ঘরে প্রবেশ করে সালাম দিয়ে বলতেন কেমন আছ? আমি সে বিষয়ের কিছুই জানতাম না। শেষ পর্যন্ত খুব দুর্বল হয়ে পড়লাম। (একরাতে) আমি ও উম্মু মিসতাহ প্রয়োজন সারার উদ্দেশে ময়দানে বের হলাম। আমরা রাতেই শুধু সেদিকে যেতাম। এ আমাদের ঘরগুলোর নিকটবর্তী স্থানে পায়খানা বানানোর আগের নিয়ম। জঙ্গলে কিংবা দুরবর্তী স্থানে প্রয়োজন সারার ব্যাপারে আমারদের অবস্থাটা প্রথম যুগের আবরদের মতোই ছিল। যাই হোক, আমি এবং উম্মু মিসতাহ বিনতে আবূ রূহম হেঁটে চলছিলাম। ইত্যবসরে সে তার চাদরে পা জড়িয়ে হোঁচট খেল এবং বলল, মিসতাহ এর জন্য দুর্ভোগ। আমি তাকে বললাম, তুমি খুব খারাপ কথা বলেছ। বদর যুদ্ধে শরীক হয়েছে, এমন এক ব্যক্তিকে তুমি অভিশাপ দিচ্ছ! সে বলল, হে সরলমনা! যে সব কথা তারা উঠিয়েছে, তা কি তুমি শুনোনি? অতঃপর অপবাদ রটনাকারীদের সব রটনা সম্পর্কে সে আমাকে অবহিত করল। তখন আমার রোগের উপর তীব্রতা বৃদ্ধি পেল। আমি ঘরে ফিরে আসার পর রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার নিকট এসে জিজ্ঞেস করলেন, কেমন আছ? আমি বললাম, আমাকে আমার পিতা-মাতার নিকট যাবার অনুমতি দিন। তিনি [‘আয়িশা (রাঃ)] বলেন, আমি তখন তাদের (পিতা-মাতার) নিকট হতে এ সম্পর্কে নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলাম। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাকে অনুমতি দিলেন। আমি আমার পিতা-মাতার নিকট গেলাম। অতঃপর আমি মাকে বললাম, লোকেরা কী বলাবলি করে? তিনি বললেন, বেটি! ব্যাপারটাকে নিজের জন্য হালকাভাবেই গ্রহন কর। আল্লাহর শপথ! এমন সুন্দরী রমণী খুব কমই আছে যাকে তার স্বামী ভালোবাসে আর তার একাধিক সতীনও আছে; অথচ ওরা তাকে উত্যক্ত করে না। আমি বললাম, সুবহানাল্লাহ! লোকেরা সত্যি তবে এসব কথা রটিয়েছে? তিনি [‘আয়িশা (রাঃ)] বলেন, ভোর পর্যন্ত সে রাত আমার এমনভাবে কেটে গেল যে, চোখের পানি আমার বন্ধ হল না এবং ঘুমের একটু পরশও পেলাম না। এভাবে ভোর হল। পরে রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওয়াহীর বিলম্ব দেখে আপন স্ত্রীকে পরিত্যাগের ব্যাপারে ইবনু আবূ তালিব ও উসামাহ ইবনু যায়দকে ডেকে পাঠালেন। যাই হোক, উসামাহ পরিবারের জন্য তাঁর [নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) –এর] ভালোবাসার প্রতি লক্ষ্য করে পরামর্শ দিতে গিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রসুল! আল্লাহর কসম (তারঁ সম্পর্কে) ভালো ব্যতীত অন্য কিছু আমরা জানিনা, আর ‘আলী ইবনু আবূ তালিব (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রসুল! কিছুতেই আল্লাহ আপনার পথ সংকীর্ণ করেননি। তাঁকে ব্যতীত আরো অনেক নারী আছে। আপনি না হয় বাঁদীকে জিজ্ঞেস করুন সে আপনাকে সত্য কথা বলবে। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তখন (বাঁদী) বারীরাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, হে বারীরা! তুমি কি তার মধ্যে সন্দেহজনক কিছু দেখতে পেয়েছ? বারীরা বলল, আপনাকে যিনি সত্যসহ পাঠিয়েছেন, তাঁর কসম করে বলছি, না, তেমন কিছুই দেখিনি, এই একটি অবস্থায়ই দেখেছি যে, তিনি অল্পবয়স্কা কিশোরী। আর তাই আটা খামির করতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। সেই ফাঁকে বকরী এসে তা খেয়ে ফেলে। সে দিনই রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভাষন দিতে দাঁড়িয়ে ‘আবদুল্লাহ ইবনু ‘উবাই ইবনু সালুলের ষড়যন্ত্র হতে বাঁচার উপায় জিজ্ঞেস করলেন। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আমার পরিবারকে কেন্দ্র করে যে ব্যক্তি আমাকে জ্বালাতন করেছে, তার মুকাবিলায় কে প্রতিকার করবে? আল্লাহর কসম, আমি তো আমার স্ত্রী সম্পর্কে ভালো ব্যতীত অন্য কিছু জানি না। আর এমন ব্যক্তিকে জড়িয়ে তারা কথা তুলেছে, যার সম্পর্কে ভালো ব্যতীত অন্য কিছু জানি না আর সে তো আমার সঙ্গে ব্যতীত আমার ঘরে কখনও প্রবেশ করত না। তখন সা‘দ [ইবনু মু‘আয (রাঃ)] দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহর কসম, আমি তার প্রতিকার করব। যদি সে আউস গোত্রের কেউ হয়ে থাকে, তাহলে তার গর্দান উড়িয়ে দিব; আর যদি সে আমাদের খায্রাজ গোত্রীয় ভাইদের কেউ হয়, তাহলে আপনি তার ব্যাপারে আমাদের নির্দেশ দিবেন, আমরা আপনার নির্দেশ পালন করব। খায্রাজ গোত্রপতি সা‘দ ইবনু ‘উবাদাহ (রাঃ) তখন দাঁড়িয়ে গেলেন। এর পূর্বে তিনি উত্তম ব্যক্তিই ছিলেন। আসলে গোত্রপ্রীতি তাকে পেয়ে বসেছিল। তিনি বললেন, তুমি মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কসম! তুমি তাকে হত্যা করতে পারবে না, সে শক্তি তোমার নেই। তখনি উসায়িদ ইবনুল হুযাইর (রাঃ) দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন, তুমিই মিথ্যা বলছ। আল্লাহর কসম! আমরা অবশ্যই তাকে হত্যা করে ছাড়ব। আসলে তুমি একজন মুনাফিক। তাই মুনাফিকদের পক্ষ হয়ে ঝগড়ায় লিপ্ত হয়েছ। অতঃপর আউস ও খায্রাজ উভয় গোত্রই উত্তেজিত হয়ে উঠল। এমনকি রসলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিম্বারে থাকা অবস্থায়ই তারা (লড়াইয়ে) উদ্যত হল। তখন তিনি নেমে তাদের চুপ করালেন। সবাই শান্ত হল আর তিনিও নীরবতা অবলম্বন করলেন। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, সেদিন সারাক্ষন আমি কাঁদলাম, চোখের পানি আমার শুকাল না এবং ঘুমের সামান্য পরশও পেলাম না। আমার পিতা-মাতা আমার পাশে পাশেই থাকলেন। পুরো রাত দিন আমি কেঁদেই কাটালাম। আমার মনে হল, কান্না বুঝি আমার কলিজা বিদীর্ণ করে দিবে। তিনি [‘আয়িশা (রাঃ)] বলেন, তারা (পিতা-মাতা) উভয়ে আমার কাছেই উপবিষ্ট ছিলেন, আর আমি কাঁদছিলাম। ইতিমধ্যে এক আনসারী মহিলা ভিতরে আসার অনুমতি চাইল। আমি তাকে অনুমতি দিলাম। সেও আমার সঙ্গে বসে কাঁদতে শুরু করল। আমরা এ অবস্থায় থাকতেই রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রবেশ করে বসলেন, অথচ যেদিন হতে আমার সম্পর্কে অপবাদ রটানো হয়েছে সেদিন হতে তিনি আমার নিকট বসেননি। এর মধ্যে এক মাস কেটে গিয়েছিল। অথচ আমার সম্পর্কে তাঁর নিকট কোন ওয়াহী নাযিল হল না। তিনি [‘আয়িশা (রাঃ)] বলেন, অতঃপর হাম্দ ও সানা পাঠ করে তিনি বললেন, হে ‘আয়িশা! তোমার সম্পর্কে এ ধরনের কথা আমার নিকট পৌছেছে। তুমি নির্দোষ হলে আল্লাহ অবশ্যই তোমার নির্দোষিতা ঘোষনা করবেন। আর যদি তুমি কোন গুনাহে জড়িয়ে গিয়ে থাক, তাহলে আল্লাহর নিকট তাওবা ও ইসতিগফার কর। কেননা, বান্দা নিজের পাপ স্বীকার করে তাওবা করলে আল্লাহ তাওবা কবুল করেন। তিনি যখন তাঁর বক্তব্য শেষ করলেন, তখন আমার অশ্রু বন্ধ হয়ে গেল। এমনকি এক বিন্দু অশ্রুও আমি অনুভব করলাম না। আমার পিতাকে বললাম, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে আমার পক্ষ হতে জবাব দিন। তিনি বললেন, আল্লাহর কসম! আমি বুঝে উঠতে পারি না, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -কে কি বলব? অতঃপর আমার মা-কে বললাম, আমার পক্ষ হতে রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) –এর কথার জবাব দিন। তিনিও বললেন, আল্লাহর কসম! আমি বুঝে উঠতে পারি না, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) –কে কি বলব? আমি তখন অল্প বয়স্কা কিশোরী। কুরআনও খুব অধিক পড়িনি। তবুও আমি বললাম, আল্লাহর কসম! আমার জানতে বাকী নেই যে, লোকেরা যা রটাচ্ছে, তা আপনারা শুনতে পেয়েছেন এবং আপনাদের মনে তা বসে গেছে, ফলে আপনারা তা বিশ্বাস করে নিয়েছেন। এখন যদি আমি আপনাদের বলি যে, আমি নিষ্পাপ আর আল্লাহ জানেন, আমি অবশ্যই নিষ্পাপ, তবু আপনারা আমার সে কথা বিশ্বাস করবেন না। আর যদি আপনাদের নিকট কোন বিষয় আমি স্বীকার করি, অথচ আল্লাহ জানেন আমি নিষ্পাপ তাহলে অবশ্যই আপনারা আমাকে বিশ্বাস করে নিবেন। আল্লাহর কসম! ইউসুফ (আঃ)-এর পিতার ঘটনা ব্যতীত আমি আপনাদের জন্য কোন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাচ্ছি না। যখন তিনি বলেছিলেন, পূর্ণ ধৈর্যধারণই আমার জন্য শ্রেয়। আর তোমরা যা বলছ সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যকারী। অতঃপর আমি আমার বিছানায় পার্শ্ব পরিবর্তন করে নিলাম। এটা আমি অবশ্যই আশা করছিলাম যে, আল্লাহ আমাকে নির্দোষ ঘোষনা করবেন। কিন্তু আল্লাহর কসম! এ আমি ভাবিনি যে, আমার ব্যাপারে কোন ওয়াহী নাযিল হবে। কুরআনে আমার ব্যাপারে কোন কথা বলা হবে, এ বিষয়ে আমি নিজেকে উপযুক্ত মনে করি না। তবে আশা করছিলাম যে, নিদ্রায় আল্লাহর রসূল এমন কোন স্বপ্ন দেখবেন, যা আমাকে নির্দোষ প্রমান করবে। কিন্তু আল্লাহর কসম! তিনি তাঁর আসন ছেড়ে তখনও উঠে যাননি এবং ঘরের কেউ বেরিয়েও যায়নি, এরই মধ্যে তাঁর উপর ওয়াহী নাযিল হওয়া শুরু হয়ে গেল এবং (ওয়াহী নাযিলের সময়) তিনি যে রকম কঠিন অবস্থার সম্মুখীন হতেন, সে রকম অবস্থার সম্মুখীন হন। এমনকি সে মুহূর্তে শীতের দিনেও তার শরীর হতে মুক্তার মত ফোঁটা ফোঁটা ঘাম ঝরে পড়ত। যখন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে ওয়াহীর সে অবস্থা কেটে গেল, তখন তিনি হাসছিলেন। আর প্রথম যে বাক্যটি তিনি উচ্চারন করলেন তা ছিল এই যে, আমাকে বললেন, হে ‘আয়িশা! আল্লাহর প্রশংসা কর। কেননা, তিনি তোমাকে নির্দোষ ঘোষনা করেছেন। আমার মাতা তখন আমাকে বললেন, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট যাও। (কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর) আমি বললাম, না, আল্লাহর কসম! আমি তাঁর নিকট যাব না এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কারো প্রশংসাও করব না। আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত নাযিল করেন, ---- যখন আমার সাফাই সম্পর্কে নাযিল হল তখন আবূ বাকর সিদ্দীক (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! নিকটত্মীয়তার কারণে মিসতাহ্ ইবনু উসাসার জন্য তিনি যা খরচ করতেন, ‘আয়িশা সম্পর্কে এ ধরনের কথা বলার পর মিসতার জন্য আমি আর কখনও খরচ করব না। তখন আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াত নাযিল করলেন। ---- “তোমাদের মধ্যে যারা নিয়ামতপ্রাপ্ত ও সচ্ছল, তারা যেন দান না করার কসম না করে ---- আল্লাহ ক্ষমাশীল ও মেহেরবান।” তখন আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই চাই আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন। অতঃপর তিনি মিসতাহ-কে যা দিতেন, তা পুনরায় দিতে লাগলেন। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যায়নাব বিনতে জাহাশকে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তিনি বললেন, হে যায়্নাব! তুমি কী জান? তুমি কী দেখেছ? তিনি বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আমি আমার কান, আমি আমার চোখের হিফাজত করতে চাই। আল্লাহর কসম! তার সম্পর্কে ভালো ব্যতীত অন্য কিছু আমি জানি না। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, অথচ তিনিই আমার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতেন। কিন্তু পরহেযগারীর কারণে আল্লাহ তাঁর হিফাযত করেছেন। আবূ রাবী‘ (রহঃ) ...... ‘আয়িশা (রাঃ) ও ‘আবদুল্লাহ ইবনু যুবায়র (রাঃ) হতে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। ফুলাইহ্ (রহঃ) কাসিম ইবনু মুহাম্মদ ইবনু আবূ বকর (রাঃ) হতে অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেন।
মিস্ওয়ার ইব্নু মাখরামাহ (রাঃ) ও মারওয়ান (রহঃ) থেকে বর্নিতঃ
তাদের উভয়ের একজনের বর্ণনা অপরজনের বর্ণনার সমর্থন করে তাঁরা বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হুদাইবিয়ার সময় বের হলেন। যখন সাহাবীগণ রাস্তার এক জায়গায় এসে পৌঁছলেন, তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘খালিদ ইব্নু ওয়ালিদ কুরাইশদের অশ্বারোহী অগ্রবর্তী বাহিনী নিয়ে গোমায়ম নামক স্থানে অবস্থান করছে। তোমরা ডান দিকের রাস্তা ধর।’ আল্লাহ্র কসম! খালিদ মুসলিমদের উপস্থিতি টেরও পেলো না, এমনকি যখন তারা মুসলিম সেনাবাহিনীর পশ্চাতে ধূলিরাশি দেখতে পেল, তখন সে কুরাইশদের সাবধান করার জন্য ঘোড়া দৌঁড়িয়ে চলে গেল। এদিকে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অগ্রসর হয়ে যখন সেই গিরিপথে উপস্থিত হলেন, যেখান থেকে মক্কার সোজা পথ চলে গিয়েছে, তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উটনী বসে পড়ল। লোকজন (তাকে উঠাবার জন্য) ‘হাল-হাল’ বলল, কাস্ওয়া ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, কাসওয়া ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘কাসওয়া ক্লান্ত হয়নি এবং তা তার স্বভাবও নয় বরং তাকে তিনিই আটকিয়েছেন যিনি হস্তি বাহিনীকে আটকিয়ে ছিলেন।’ অতঃপর তিনি বললেন, ‘সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! কুরাইশরা আল্লাহ্র সম্মানিত বিষয় সমূহের মধ্যে যে কোন বিষয়ের সম্মান দেখানোর জন্য কিছু চাইলে আমি তা পূরণ করব।’ অতঃপর তিনি তাঁর উষ্ট্রীকে ধমক দিলে সে উঠে দাঁড়াল। রাবী বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের পথ ত্যাগ করে হুদায়বিয়ার শেষ সীমায় অল্প পানি বিশিষ্ট কুপের নিকট অবতরণ করেন। লোকজন সেখান থেকে অল্প অল্প করে পানি নিচ্ছিল। এভাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকজন পানি শেষ করে ফেলল এবং আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট পিপাসার অভিযোগ পেশ করা হলো। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কোষ থেকে একটি তীর বের করলেন এবং সে তীরটি সেই কূপে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন। আল্লাহ্র কসম, তখন পানি উথলে উঠতে লাগল, এমনকি সকলেই তৃপ্তি সহকারে তা থেকে পানি পান করলেন। এমন সময় বুদায়ল ইব্নু ওয়ারাকা খুযাঈ তার খুযাআ গোত্রের কতিপয় ব্যক্তিদের নিয়ে আসল। তারা তিহামাবাসীদের মধ্যে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রকৃত হিতাকাঙ্খী ছিল। বুদাইল বলল, আমি কা‘ব ইব্নু লুওয়াই ও আমির ইব্নু লুওয়াইকে রেখে এসেছি। তারা হুদাইবিয়ার প্রচুর পানির নিকট অবস্থান করছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে বাচ্চাসহ দুগ্ধবতী অনেক উষ্ট্রী। তারা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ও বাইতুল্লাহ্ যিয়ারতে বাধা দেয়ার জন্য প্রস্তুত। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘আমি তো কারো সাঙ্গে যুদ্ধ করতে আসিনি; বরং ‘উমরাহ করতে এসেছি। যুদ্ধ অবশ্যই কুরাইশদের দুর্বল করে দিয়েছে, কাজেই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা চাইলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের সঙ্গে সন্ধি করতে পারি আর তারা আমার ও কাফিরদের মধ্যকার বাধা তুলে নিবে। যদি আমি তাদের উপর বিজয় লাভ করি তাহলে অন্যান্য ব্যক্তি ইসলামে যেভাবে প্রবেশ করেছে, তারাও ইচ্ছা করলে তা করতে পারবে। আর না হয়, তারা এ সময়ে শান্তিতে থাকবে। কিন্তু তারা যদি আমার প্রস্তাব অস্বীকার করে, তাহলে সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আমার গর্দান আলাদা না হওয়া পর্যন্ত আমরা এ ব্যাপারে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাব। আর অবশ্যই আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করবেন।’ বুদায়ল বলল, ‘আমি আপনার কথা তাদের নিকট পৌঁছিয়ে দিব।’ অতঃপর বুদায়ল কুরাইশদের নিকট এসে বলল, ‘আমি সেই ব্যক্তিটির কাছ থেকে এসেছি এবং তাঁর নিকট কিছু কথা শুনে এসেছি। তোমরা যদি চাও, তাহলে তোমাদের তা শোনাতে পারি।’ তাদের মধ্যে নির্বোধ লোকেরা বলল, ‘তাঁর পক্ষ থেকে আমাদের নিকট তোমার কিছু বলার দরকার নাই।’ কিন্তু তাদের জ্ঞানসম্পন্ন লোকেরা বলল, ‘তুমি তাঁকে যা বলতে শুনেছ, তা বল।’ তারপর আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা যা বলেছিলেন, বুদায়ল সব তাদের শুনাল। অতঃপর ‘উরওয়াহ ইব্নু মাস‘উদ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘হে লোকেরা! আমি কি তোমাদের পিতৃতুল্য নই?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ নিশ্চয়ই।’ ‘উরওয়াহ বলল, ‘তোমরা কি আমার সন্তান তুল্য নও?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ অবশ্যই।’ ‘উরওয়াহ বলল, ‘আমার ব্যাপারে তোমাদের কি কোন অভিযোগ আছে?’ তারা বলল, না। ‘উরওয়াহ বলল, ‘তোমারা কি জান না যে, আমি তোমাদের সাহায্যের জন্য উকাযবাসীদের নিকট আবেদন করেছিলাম এবং তারা আমাদের ডাকে সাড়া দিতে অস্বীকার করলে আমি আমার আত্মীয়-স্বজন, সন্তান-সন্ততি ও আমার অনুগত লোকদের নিয়ে তোমাদের নিকট এসেছিলাম? তারা বলল, হ্যাঁ, জানি। ‘উরওয়াহ বলল, এই ব্যক্তিটি তোমাদের নিকট একটি ভাল প্রস্তাব পেশ করেছেন। তোমরা তা গ্রহণ কর এবং আমাকে তার নিকট যেতে দাও। তারা বলল, আপনি তাঁর নিকট যান। অতঃপর ‘উরওয়াহ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এল এবং তাঁর সঙ্গে কথা শুরু করল। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার সঙ্গে কথা বললেন, যেমনিভাবে বুদায়লের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। ‘উরওয়াহ তখন বলল, হে মুহাম্মদ, আপনি কি চান যে, আপনার কওমকে নিশ্চিহ্ন করে দিবেন, আপনি কি আপনার পূর্বে আরববাসীদের এমন কারো কথা শুনেছেন যে, সে নিজ কওমের মূলোৎপাটন করতে উদ্যত হয়েছিল? আর যদি অন্য রকম হয়, (তখন আপনার কি অবস্থা হবে?) আল্লাহর কসম! আমি কিছু চেহারা দেখছি এবং বিভিন্ন ধরনের লোক দেখতে পাচ্ছি যাঁরা পালিয়ে যাবে এবং আপনাকে পরিত্যাগ করবে। তখন আবূ বকর (রাঃ) তাকে বললেন, তুমি লাত দেবীর লজ্জাস্থান চেটে খাও। আমরা কি তাঁকে ছেড়ে পালিয়ে যাব। ‘উরওয়াহ বলল, সে কে? লোকজন বললেন, আবূ বক্র। ‘উরওয়াহ বলল, যার হাতে আমার প্রাণ, আমি তাঁর কসম করে বলছি, আমার উপর যদি আপনার ইহসান না থাকত, যার প্রতিদান আমি দিতে পারিনি, তাহলে নিশ্চয়ই আপনার কথার জবাব দিতাম। রাবী বলেন, ‘উরওয়াহ পুনরায় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে সে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দাড়িতে হাত দিত। তখন মুগীরাহ ইব্নু শুবা (রাঃ) আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শিয়রে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে ছিল একটি তরবারী ও মাথায় ছিল লৌহ শিরস্ত্রাণ। ‘উরওয়াহ যখনই আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দাড়ির দিকে হাত বাড়াতো মুগীরাহ (রাঃ) তাঁর তরবারীর হাতল দিয়ে তার হাতে আঘাত করতেন এবং বলতেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দাঁড়ি থেকে হাত হটাও। ‘উরওয়াহ মাথা তুলে বলল, এ কে? লোকজন বললেন, মুগীরাহ ইব্নু শুবাহ। ‘উরওয়াহ বলল, হে গাদ্দার! আমি কি তোমার গাদ্দারীর পরিণতি থেকে তোমাকে উদ্ধারের চেষ্টা করিনি? মুগীরাহ (রাঃ) জাহেলী যুগে কিছু লোকদের সঙ্গে ছিলেন। একদা তাদের হত্যা করে তাদের সহায় সম্পদ ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আমি তোমার ইসলাম মেনে নিলাম, কিন্তু যে মাল তুমি নিয়েছ, তার সঙ্গে আমার কোন সর্ম্পক নেই। অতঃপর ‘উরওয়াহ চোখের কোণ দিয়ে সাহাবীদের দিকে তাকাতে লাগল। সে বলল, আল্লাহর কসম! আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কখনো থুথু ফেললে তা সাহাবীদের হাতে পড়তো এবং তা তারা গায়ে মুখে মেখে ফেলতেন। তিনি তাঁদের কোন আদেশ দিলে তা তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে পালন করতেন। তিনি ওযু করলে তাঁর ওযুর পানির জন্য তাঁর সাহাবীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হত। তিনি যখন কথা বলতেন, তখন তাঁরা নীরবে তা শুনতেন এবং তাঁর সম্মানার্থে সাহাবীগণ তাঁর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাতেন না। অতঃপর ‘উরওয়াহ তার সঙ্গীদের নিকট ফিরে গেল এবং বলল, হে আমার কওম, আল্লাহর কসম! আমি অনেক রাজা-বাদশাহর দরবারে প্রতিনিধিত্ব করেছি। কায়সার, কিসরা ও নাজাশী সম্রাটের দরবারে দূত হিসেবে গিয়েছি; কিন্তু আল্লাহর কসম করে বলতে পারি যে, কোন রাজা বাদশাহকেই তার অনুসারীদের মত এত সম্মান করতে দেখিনি, যেমন মুহাম্মাদের অনুসারীরা তাঁকে করে থাকে। আল্লাহর কসম! আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যদি থুথু ফেলেন, তখন তা কোন সাহাবীর হাতে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে তারা তা তাদের গায়ে মুখে মেখে ফেলেন। তিনি কোন আদেশ দিলে তারা তা সঙ্গে সঙ্গে পালন করেন; তিনি ওযু করলে তাঁর ওযুর পানি নিয়ে সাহাবীগণের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়; তিনি কথা বললে, সাহাবীগণ নিশ্চুপ হয়ে শুনেন। এমনকি তাঁর সম্মানার্থে তারা তাঁর চেহারার দিকেও তাকান না। তিনি তোমাদের নিকট একটি ভালো প্রস্তাব পাঠিয়েছেন, তোমরা তা মেনে নাও। তা শুনে কিনানা গোত্রের এক ব্যক্তি বলল, আমাকে তাঁর নিকট যেতে দাও। লোকেরা বলল, যাও। সে যখন আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবীগণের নিকট এল তখন আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এ হলো অমুক ব্যক্তি এবং এমন গোত্রের লোক, যারা করবানীর পশুকে সম্মান করে থাকে। তোমরা তার নিকট কুরবানীর পশু নিয়ে আস। অতঃপর তার নিকট তা নিয়ে আসা হলো এবং লোকজন তালবিয়া পাঠ করতে করতে তার সামনে এলেন। তা দেখে ব্যক্তিটি বলল, সুবহানাল্লাহ্। এমন সব লোকদেরকে কা‘বা যিয়ারত থেকে বাধা দেয়া সঙ্গত নয়। অতঃপর সে তার সঙ্গীদের নিকট ফিরে গিয়ে বলল, আমি কুরবানীর পশু দেখে এসেছি, সেগুলোকে কিলাদা পরানো হয়েছে ও চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই তাদের কা‘বা যিয়ারতে বাধা প্রদান সঙ্গত মনে করি না। তখন তাদের মধ্য থেকে মিকরায ইব্নু হাফ্স নামক এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, আমাকে তাঁর নিকট যেতে দাও। তারা বলল, তাঁর নিকট যাও। অতঃপর সে যখন মুসলিমদের নিকটবর্তী হল, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এ হল মিকরায আর সে দুষ্ট ব্যক্তি। সে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে কথা বলছিল, এমন সময় সুহায়ল ইব্নু আম্র এল। মা‘মার বলেন, ‘ইকরিমাহ (রহঃ) সূত্রে আইয়ুর (রহঃ) আমাকে বলেছেন যে, যখন সুহায়ল এল তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘তোমাদের জন্য তোমাদের কাজ সহজ হয়ে গেল।’ মা‘মার (রহঃ) বলেন, যুহরী (রহঃ) তাঁর বর্ণিত হাদীসে বলেছেন যে, সুহায়ল ইব্নু আম্র এসে বলল, আসুন আমাদের ও আপনাদের মধ্যে একটি চুক্তিপত্র লিখি। অতঃপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন লেখককে ডাকলেন। অতঃপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, (লিখ) (আরবী) এতে সুহায়ল বলল, আল্লাহর কসম! রাহমান কে-? আমরা তা জানি না, বরং পূর্বে আপনি যেমন লিখতেন, লিখুন (আরবী) মুসলিমগণ বললেন, আল্লাহর কসম! আমরা (আরবী) ব্যতীত আর কিছু লিখব না। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, লিখ, (আরবী) অতঃপর বললেন, এটা যার উপর চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন আল্লাহর রসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তখন সুহায়ল বলল, আল্লাহর কসম! আমরা যদি আপনাকে আল্লাহর রসূল বলেই বিশ্বাস করতাম, তাহলে আপনাকে কা‘বা যিয়ারত থেকে বাধা দিতাম না এবং আপনাদের সাথে যুদ্ধ করতে উদ্যত হতাম না। বরং আপনি লিখুন, ‘আবদুল্লাহ্র পুত্র মুহাম্মাদ (এর তরফ থেকে)। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর রসূল; যদিও তোমরা আমাকে মিথ্যাবাদী মনে কর। (হে ফাতির!) লিখ, ‘আবদুল্লাহ্র পুত্র মুহাম্মদ।’ যুহরী (রহঃ) বলেন, এটি এজন্য যে, তিনি বলেছিলেন, তারা যদি আল্লাহ্র পবিত্র বস্তুগুলোর সম্মান করার কোন কথা দাবী করে তাহলে আমি তাদের সে দাবী মেনে নিব। অতঃপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এ চুক্তি কর যে, তারা আমাদের ও কা‘বা শরীফের মধ্যে কোন প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে না, যাতে আমরা (নির্বিঘ্নে) তাওয়াফ করতে পারি। সুহায়ল বলল, আল্লাহর কসম! আরববাসীরা যেন একথা বলার সুযোগ না পায় যে, এ প্রস্তাব গ্রহণে আমাদেরকে বাধ্য করা হয়েছে। বরং আগামী বছর তা হতে পারে। অতঃপর লেখা হলো। সুহায়ল বলল, এও লিখা হউক যে, আমাদের কোন ব্যক্তি যদি আপনার নিকট চলে আসে এবং সে যদিও আপনার দ্বীন গ্রহণ করে থাকে, তবুও তাকে আমাদের নিকট ফিরিয়ে দিবেন। মুসলিমগণ বললেন, সুবহানাল্লাহ্! যে ইসলাম গ্রহণ করে আমাদের নিকট এসেছে, তাকে কেমন করে মুশরিকদের নিকট ফেরত দেয়া হতে পারে? এমন সময় আবূ জানদাল ইব্নু সুহায়ল ইব্নু আম্র সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি বেড়ী পরিহিত অবস্থায় ধীরে ধীরে চলছিলেন। তিনি মক্কার নিম্নাঞ্চল থেকে বের হয়ে এসে মুসলিমদের সামনে নিজেকে পেশ করলেন। সুহায়ল বলল, হে মুহাম্মদ! আপনার সঙ্গে আমার চুক্তি হয়েছে, সে অনুযায়ী প্রথম কাজ হলো তাকে আমার নিকট ফিরিয়ে দিবেন। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এখনো তো চুক্তি সম্পাদিত হয়নি। সুহায়ল বলল, আল্লাহর কসম! তাহলে আমি আপনাদের সঙ্গে আর কখনো সন্ধি করব না। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, কেবল এ ব্যক্তিটিকে আমার নিকট থাকার অনুমতি দাও। সে বলল, না, এ অনুমতি আমি দেব না। আল্লাহর রসূল বললেন, হ্যাঁ, তুমি এটা কর। সে বলল, আমি তা করব না। মিকরায বলল, আমরা তাকে আপনার নিকট থাকবার অনুমতি দিলাম। আবূ জানদাল (রাঃ) বলেন, হে মুসলিম সমাজ, আমাকে মুশরিকদের নিকট ফিরিয়ে দেয়া হবে, অথচ আমি মুসলিম হয়ে এসেছি। আপনারা কি দেখছেন না আমি কত কষ্ট পাচ্ছি। আল্লাহর পথে তাকে অনেক নির্যাতিত করা হয়েছে। ‘উমর ইব্নুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন, আমি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এলাম এবং বললাম, আপনি কি আল্লাহ্র সত্য নবী নন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, তা হলে দ্বীনের ব্যাপারে কেন আমরা এত হেয় হবো? আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘আমি অবশ্যই রাসূল; অতএব আমি তাঁর অবাধ্য হতে পারি না, অথচ তিনিই আমার সাহায্যকারী।’ আমি বললাম, আপনি কি আমাদের বলেন নাই যে, আমরা শীঘ্রই বায়তুল্লাহ্ যাব এবং তাওয়াফ করব। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি কি এ বছরই আসার কথা বলেছি? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তুমি অবশ্যই কা‘বা গৃহে যাবে এবং তাওয়াফ করবে। ‘উমর (রাঃ) বলেন, অতঃপর আমি আবূ বকর (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে বললাম, ‘হে আবূ বক্র। তিনি কি আল্লাহর সত্য নবী নন?’ আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ‘অবশ্যই।’ আমি বললাম, আমরা কি সত্যের উপর নই এবং আমাদের দুশমনরা কি বাতিলের উপর নয়? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, নিশ্চয়ই। আমি বললাম, তবে কেন এখন আমরা আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে এত হীনতা স্বীকার করব? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ‘ওহে! নিশ্চয়ই তিনি আল্লাহর রসূল এবং তিনি তাঁর রবের নাফরমানী করতে পারেন না। তিনিই তাঁর সাহায্যকারী। তুমি তাঁর অনুসরণকে আঁকড়ে ধরো। আল্লাহর কসম! তিনি সত্যের উপর আছেন।’ আমি বললাম, তিনি কি বলেননি যে, আমরা অচিরেই বায়তুল্লাহ্ যাব এবং তাওয়াফ করব? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, অবশ্যই। কিন্তু তুমি এবারই যে যাবে একথা কি তিনি বলেছিলেন? আমি বললাম, না। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ‘তবে নিশ্চয়ই তুমি সেখানে যাবে এবং তার তাওয়াফ করবে।’ যুহরী (রহঃ) বলেন যে, ‘উমর (রাঃ) বলেছেন, আমি এর জন্য (অর্থাৎ ধৈর্যহীনতার কাফ্ফারা হিসেবে) অনেক নেক আমল করেছি। বর্ণনাকারী বলেন, সন্ধিপত্র লেখা শেষ হলে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবাদেরকে বললেন, ‘তোমরা উঠ এবং কুরবানী কর ও মাথা কামিয়ে ফেল।’ রাবী বলেন, ‘আল্লাহ্র কসম! আল্লাহর রসূল তিনবার তা বলার পরও কেউ উঠলেন না।’ তাদের কাউকে উঠতে না দেখে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উম্মু সালামা (রাঃ)-এর নিকট এসে লোকদের এই আচরণের কথা বলেন। উম্মু সালামা (রাঃ) বললেন, ‘হে আল্লাহ্র নবী, আপনি যদি তাই চান, তাহলে আপনি বাইরে যান ও তাদের সঙ্গে কোন কথা না বলে আপনার উট আপনি কুরবানী করুন এবং ক্ষুরকার ডেকে মাথা মুড়িয়ে নিন।’ সেই অনুযায়ী আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেরিয়ে গেলেন এবং কারো সঙ্গে কোন কথা না বলে নিজের পশু কুরবানী দিলেন এবং ক্ষুরকার ডেকে মাথা মুড়ালেন। তা দেখে সাহাবীগণ উঠে দাঁড়ালেন ও নিজ নিজ পশু কুরবানী দিলেন এবং একে অপরের মাথা কামিয়ে দিলেন। অবস্থা এমন হল যে, ভীড়ের কারণে একে অপরের উপর পড়তে লাগলেন। অতঃপর আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট কয়েকজন মুসলিম মহিলা এলেন। তখন আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেনঃ “হে মুমিনগণ! মুমিন মহিলারা তোমাদের নিকট হিজরত করে আসলে, ……. কাফির নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখো না।” (আল মুমতাহিনাহ : ১০)। সেদিন ‘উমর (রাঃ) দু’জন স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিলেন, তারা ছিল মুশরিক থাকাকালে তাঁর স্ত্রী। তাদের একজনকে মু‘আবিয়াহ ইব্নু আবূ সুফ্ইয়ান এবং অপরজনকে সাফওয়ান ইব্নু উমাইয়া বিয়ে করেন। অতঃপর আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় ফিরে আসলেন। তখন আবূ বাসীর (রাঃ) নামক কুরাইশ গোত্রের এক ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এলেন। মক্কার কুরাইশরা তাঁর তালাশে দু’জন লোক পাঠাল। তারা [রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে] বলল, আপনি আমাদের সঙ্গে যে চুক্তি করেছেন (তা পূর্ণ করুন)। তিনি তাঁকে ঐ দুই ব্যক্তির হাওয়ালা করে দিলেন। তাঁরা তাঁকে নিয়ে বেরিয়ে গেল এবং যুল-হুলায়ফায় পৌঁছে অবতরণ করল আর তাদের সঙ্গে যে খেজুর ছিল তা খেতে লাগল। আবূ বাসীর (রাঃ) তাকে তাদের একজনকে বললেন, আল্লাহর কসম! হে অমুক, তোমার তরবারিটি খুবই চমৎকার দেখছি। সে ব্যক্তিটি তরবারীটি বের করে বলল, হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! এটি একটি উৎকৃষ্ট তরবারী। আমি একাধিক বার তার পরীক্ষা করেছি। আবূ বাসীর (রাঃ) বললেন, তলোয়ারটি আমি দেখতে চাই আমাকে তা দেখাও। অতঃপর ব্যক্তিটি আবূ বাসীরকে তলোয়ারটি দিল। আবূ বাসীর (রাঃ) সেটি দ্বারা তাকে এমন আঘাত করলেন যে, তাতে সে মরে গেল। অতঃপর অপর সঙ্গী পালিয়ে মদীনায় এসে পৌঁছল এবং দৌড়িয়ে মাসজিদে প্রবেশ করল। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে দেখে বললেন, এই ব্যক্তিটি ভীতিজনক কিছু দেখে এসেছে। ইতোমধ্যে ব্যক্তিটি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট পৌছে বলল, আল্লাহর কসম! আমার সঙ্গীকে হত্যা করা হয়েছে, আমিও নিহত হতাম। এমন সময় আবূ বাসীর (রাঃ) -ও সেখানে উপস্থিত হলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহর কসম! আল্লাহ আপনার দায়িত্ব সম্পূর্ণ করে দিয়েছেন। আমাকে তার নিকট ফেরত দিয়েছেন; এ ব্যাপারে আল্লাহ আমাকে তাদের কবল থেকে নাজাত দিয়েছেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, সর্বনাশ! এতো যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিতকারী, কেউ যদি তাকে বিরত রাখত। আবূ বাসীর (রাঃ) যখন এ কথা শুনলেন, তখন বুঝতে পারলেন যে, তাকে আবার তিনি কাফিরদের নিকট ফেরত পাঠাবেন। তাই তিনি বেরিয়ে নদীর তীরে এসে পড়লেন। রাবী বলেন, এ দিকে আবূ জানদাল ইব্নু সুহায়ল কাফিরদের কবল থেকে পালিয়ে এসে আবূ বাসীরের সঙ্গে মিলিত হলেন। অতঃপর থেকে কুরাইশ গোত্রের যে-ই ইসলাম গ্রহণ করতো, সে-ই আবূ বাসীরের সঙ্গে এসে মিলিত হতো। এভাবে তাদের একটি দল হয়ে গেল। আল্লাহর কসম! তাঁরা যখনই শুনত যে, কুরাইশদের কোন বাণিজ্য কাফিলা সিরিয়া যাবে, তখনই তাঁরা তাদের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতেন এবং তাদের হত্যা করতেন ও তাদের মাল সামান কেড়ে নিতেন। তখন কুরাইশরা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট লোক পাঠাল। আল্লাহ ও আত্মীয়তার ওয়াসীলাহ দিয়ে আবেদন করল যে, আপনি আবূ বাসীরের নিকট এত্থেকে বিরত থাকার জন্য নির্দেশ পাঠান। এখন থেকে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট কেউ এলে সে নিরাপদ থাকবে (কুরাইশদের নিকট ফেরত পাঠাতে হবে না)। অতঃপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের নিকট নির্দেশ পাঠালেন। এ সময় আল্লাহ্ তা‘আলা নাযিল করেনঃ (আরবী) থেকে (আরবী) পর্যন্ত। “তিনি তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে বিরত রেখেছেন ..... জাহিলী যুগের অহমিকা পর্যন্ত” (আল-ফাত্হ : ২৬)। তাদের অহমিকা এই ছিল যে, তারা মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নবী বলে স্বীকার করেনি এবং (আরবী) মেনে নেয়নি; বরং বায়তুল্লাহ্ ও মুসলিমদের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল।
মিস্ওয়ার ইব্নু মাখরামাহ (রাঃ) ও মারওয়ান (রহঃ) থেকে বর্নিতঃ
তাদের উভয়ের একজনের বর্ণনা অপরজনের বর্ণনার সমর্থন করে তাঁরা বলেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হুদাইবিয়ার সময় বের হলেন। যখন সাহাবীগণ রাস্তার এক জায়গায় এসে পৌঁছলেন, তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘খালিদ ইব্নু ওয়ালিদ কুরাইশদের অশ্বারোহী অগ্রবর্তী বাহিনী নিয়ে গোমায়ম নামক স্থানে অবস্থান করছে। তোমরা ডান দিকের রাস্তা ধর।’ আল্লাহ্র কসম! খালিদ মুসলিমদের উপস্থিতি টেরও পেলো না, এমনকি যখন তারা মুসলিম সেনাবাহিনীর পশ্চাতে ধূলিরাশি দেখতে পেল, তখন সে কুরাইশদের সাবধান করার জন্য ঘোড়া দৌঁড়িয়ে চলে গেল। এদিকে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অগ্রসর হয়ে যখন সেই গিরিপথে উপস্থিত হলেন, যেখান থেকে মক্কার সোজা পথ চলে গিয়েছে, তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উটনী বসে পড়ল। লোকজন (তাকে উঠাবার জন্য) ‘হাল-হাল’ বলল, কাস্ওয়া ক্লান্ত হয়ে পড়েছে, কাসওয়া ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘কাসওয়া ক্লান্ত হয়নি এবং তা তার স্বভাবও নয় বরং তাকে তিনিই আটকিয়েছেন যিনি হস্তি বাহিনীকে আটকিয়ে ছিলেন।’ অতঃপর তিনি বললেন, ‘সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ! কুরাইশরা আল্লাহ্র সম্মানিত বিষয় সমূহের মধ্যে যে কোন বিষয়ের সম্মান দেখানোর জন্য কিছু চাইলে আমি তা পূরণ করব।’ অতঃপর তিনি তাঁর উষ্ট্রীকে ধমক দিলে সে উঠে দাঁড়াল। রাবী বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের পথ ত্যাগ করে হুদায়বিয়ার শেষ সীমায় অল্প পানি বিশিষ্ট কুপের নিকট অবতরণ করেন। লোকজন সেখান থেকে অল্প অল্প করে পানি নিচ্ছিল। এভাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই লোকজন পানি শেষ করে ফেলল এবং আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট পিপাসার অভিযোগ পেশ করা হলো। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর কোষ থেকে একটি তীর বের করলেন এবং সে তীরটি সেই কূপে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন। আল্লাহ্র কসম, তখন পানি উথলে উঠতে লাগল, এমনকি সকলেই তৃপ্তি সহকারে তা থেকে পানি পান করলেন। এমন সময় বুদায়ল ইব্নু ওয়ারাকা খুযাঈ তার খুযাআ গোত্রের কতিপয় ব্যক্তিদের নিয়ে আসল। তারা তিহামাবাসীদের মধ্যে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রকৃত হিতাকাঙ্খী ছিল। বুদাইল বলল, আমি কা‘ব ইব্নু লুওয়াই ও আমির ইব্নু লুওয়াইকে রেখে এসেছি। তারা হুদাইবিয়ার প্রচুর পানির নিকট অবস্থান করছে। তাদের সঙ্গে রয়েছে বাচ্চাসহ দুগ্ধবতী অনেক উষ্ট্রী। তারা আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ও বাইতুল্লাহ্ যিয়ারতে বাধা দেয়ার জন্য প্রস্তুত। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘আমি তো কারো সাঙ্গে যুদ্ধ করতে আসিনি; বরং ‘উমরাহ করতে এসেছি। যুদ্ধ অবশ্যই কুরাইশদের দুর্বল করে দিয়েছে, কাজেই তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা চাইলে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের সঙ্গে সন্ধি করতে পারি আর তারা আমার ও কাফিরদের মধ্যকার বাধা তুলে নিবে। যদি আমি তাদের উপর বিজয় লাভ করি তাহলে অন্যান্য ব্যক্তি ইসলামে যেভাবে প্রবেশ করেছে, তারাও ইচ্ছা করলে তা করতে পারবে। আর না হয়, তারা এ সময়ে শান্তিতে থাকবে। কিন্তু তারা যদি আমার প্রস্তাব অস্বীকার করে, তাহলে সেই সত্তার কসম, যাঁর হাতে আমার প্রাণ, আমার গর্দান আলাদা না হওয়া পর্যন্ত আমরা এ ব্যাপারে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাব। আর অবশ্যই আল্লাহ্ তা‘আলা তাঁর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করবেন।’ বুদায়ল বলল, ‘আমি আপনার কথা তাদের নিকট পৌঁছিয়ে দিব।’ অতঃপর বুদায়ল কুরাইশদের নিকট এসে বলল, ‘আমি সেই ব্যক্তিটির কাছ থেকে এসেছি এবং তাঁর নিকট কিছু কথা শুনে এসেছি। তোমরা যদি চাও, তাহলে তোমাদের তা শোনাতে পারি।’ তাদের মধ্যে নির্বোধ লোকেরা বলল, ‘তাঁর পক্ষ থেকে আমাদের নিকট তোমার কিছু বলার দরকার নাই।’ কিন্তু তাদের জ্ঞানসম্পন্ন লোকেরা বলল, ‘তুমি তাঁকে যা বলতে শুনেছ, তা বল।’ তারপর আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যা যা বলেছিলেন, বুদায়ল সব তাদের শুনাল। অতঃপর ‘উরওয়াহ ইব্নু মাস‘উদ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘হে লোকেরা! আমি কি তোমাদের পিতৃতুল্য নই?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ নিশ্চয়ই।’ ‘উরওয়াহ বলল, ‘তোমরা কি আমার সন্তান তুল্য নও?’ তারা বলল, ‘হ্যাঁ অবশ্যই।’ ‘উরওয়াহ বলল, ‘আমার ব্যাপারে তোমাদের কি কোন অভিযোগ আছে?’ তারা বলল, না। ‘উরওয়াহ বলল, ‘তোমারা কি জান না যে, আমি তোমাদের সাহায্যের জন্য উকাযবাসীদের নিকট আবেদন করেছিলাম এবং তারা আমাদের ডাকে সাড়া দিতে অস্বীকার করলে আমি আমার আত্মীয়-স্বজন, সন্তান-সন্ততি ও আমার অনুগত লোকদের নিয়ে তোমাদের নিকট এসেছিলাম? তারা বলল, হ্যাঁ, জানি। ‘উরওয়াহ বলল, এই ব্যক্তিটি তোমাদের নিকট একটি ভাল প্রস্তাব পেশ করেছেন। তোমরা তা গ্রহণ কর এবং আমাকে তার নিকট যেতে দাও। তারা বলল, আপনি তাঁর নিকট যান। অতঃপর ‘উরওয়াহ নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এল এবং তাঁর সঙ্গে কথা শুরু করল। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার সঙ্গে কথা বললেন, যেমনিভাবে বুদায়লের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। ‘উরওয়াহ তখন বলল, হে মুহাম্মদ, আপনি কি চান যে, আপনার কওমকে নিশ্চিহ্ন করে দিবেন, আপনি কি আপনার পূর্বে আরববাসীদের এমন কারো কথা শুনেছেন যে, সে নিজ কওমের মূলোৎপাটন করতে উদ্যত হয়েছিল? আর যদি অন্য রকম হয়, (তখন আপনার কি অবস্থা হবে?) আল্লাহর কসম! আমি কিছু চেহারা দেখছি এবং বিভিন্ন ধরনের লোক দেখতে পাচ্ছি যাঁরা পালিয়ে যাবে এবং আপনাকে পরিত্যাগ করবে। তখন আবূ বকর (রাঃ) তাকে বললেন, তুমি লাত দেবীর লজ্জাস্থান চেটে খাও। আমরা কি তাঁকে ছেড়ে পালিয়ে যাব। ‘উরওয়াহ বলল, সে কে? লোকজন বললেন, আবূ বক্র। ‘উরওয়াহ বলল, যার হাতে আমার প্রাণ, আমি তাঁর কসম করে বলছি, আমার উপর যদি আপনার ইহসান না থাকত, যার প্রতিদান আমি দিতে পারিনি, তাহলে নিশ্চয়ই আপনার কথার জবাব দিতাম। রাবী বলেন, ‘উরওয়াহ পুনরায় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে সে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দাড়িতে হাত দিত। তখন মুগীরাহ ইব্নু শুবা (রাঃ) আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শিয়রে দাঁড়িয়ে ছিলেন এবং তাঁর সঙ্গে ছিল একটি তরবারী ও মাথায় ছিল লৌহ শিরস্ত্রাণ। ‘উরওয়াহ যখনই আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দাড়ির দিকে হাত বাড়াতো মুগীরাহ (রাঃ) তাঁর তরবারীর হাতল দিয়ে তার হাতে আঘাত করতেন এবং বলতেন, আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দাঁড়ি থেকে হাত হটাও। ‘উরওয়াহ মাথা তুলে বলল, এ কে? লোকজন বললেন, মুগীরাহ ইব্নু শুবাহ। ‘উরওয়াহ বলল, হে গাদ্দার! আমি কি তোমার গাদ্দারীর পরিণতি থেকে তোমাকে উদ্ধারের চেষ্টা করিনি? মুগীরাহ (রাঃ) জাহেলী যুগে কিছু লোকদের সঙ্গে ছিলেন। একদা তাদের হত্যা করে তাদের সহায় সম্পদ ছিনিয়ে নিয়েছিলেন। অতঃপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, আমি তোমার ইসলাম মেনে নিলাম, কিন্তু যে মাল তুমি নিয়েছ, তার সঙ্গে আমার কোন সর্ম্পক নেই। অতঃপর ‘উরওয়াহ চোখের কোণ দিয়ে সাহাবীদের দিকে তাকাতে লাগল। সে বলল, আল্লাহর কসম! আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কখনো থুথু ফেললে তা সাহাবীদের হাতে পড়তো এবং তা তারা গায়ে মুখে মেখে ফেলতেন। তিনি তাঁদের কোন আদেশ দিলে তা তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে পালন করতেন। তিনি ওযু করলে তাঁর ওযুর পানির জন্য তাঁর সাহাবীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হত। তিনি যখন কথা বলতেন, তখন তাঁরা নীরবে তা শুনতেন এবং তাঁর সম্মানার্থে সাহাবীগণ তাঁর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাতেন না। অতঃপর ‘উরওয়াহ তার সঙ্গীদের নিকট ফিরে গেল এবং বলল, হে আমার কওম, আল্লাহর কসম! আমি অনেক রাজা-বাদশাহর দরবারে প্রতিনিধিত্ব করেছি। কায়সার, কিসরা ও নাজাশী সম্রাটের দরবারে দূত হিসেবে গিয়েছি; কিন্তু আল্লাহর কসম করে বলতে পারি যে, কোন রাজা বাদশাহকেই তার অনুসারীদের মত এত সম্মান করতে দেখিনি, যেমন মুহাম্মাদের অনুসারীরা তাঁকে করে থাকে। আল্লাহর কসম! আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যদি থুথু ফেলেন, তখন তা কোন সাহাবীর হাতে পড়ে এবং সঙ্গে সঙ্গে তারা তা তাদের গায়ে মুখে মেখে ফেলেন। তিনি কোন আদেশ দিলে তারা তা সঙ্গে সঙ্গে পালন করেন; তিনি ওযু করলে তাঁর ওযুর পানি নিয়ে সাহাবীগণের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়; তিনি কথা বললে, সাহাবীগণ নিশ্চুপ হয়ে শুনেন। এমনকি তাঁর সম্মানার্থে তারা তাঁর চেহারার দিকেও তাকান না। তিনি তোমাদের নিকট একটি ভালো প্রস্তাব পাঠিয়েছেন, তোমরা তা মেনে নাও। তা শুনে কিনানা গোত্রের এক ব্যক্তি বলল, আমাকে তাঁর নিকট যেতে দাও। লোকেরা বলল, যাও। সে যখন আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও সাহাবীগণের নিকট এল তখন আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এ হলো অমুক ব্যক্তি এবং এমন গোত্রের লোক, যারা করবানীর পশুকে সম্মান করে থাকে। তোমরা তার নিকট কুরবানীর পশু নিয়ে আস। অতঃপর তার নিকট তা নিয়ে আসা হলো এবং লোকজন তালবিয়া পাঠ করতে করতে তার সামনে এলেন। তা দেখে ব্যক্তিটি বলল, সুবহানাল্লাহ্। এমন সব লোকদেরকে কা‘বা যিয়ারত থেকে বাধা দেয়া সঙ্গত নয়। অতঃপর সে তার সঙ্গীদের নিকট ফিরে গিয়ে বলল, আমি কুরবানীর পশু দেখে এসেছি, সেগুলোকে কিলাদা পরানো হয়েছে ও চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই তাদের কা‘বা যিয়ারতে বাধা প্রদান সঙ্গত মনে করি না। তখন তাদের মধ্য থেকে মিকরায ইব্নু হাফ্স নামক এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলল, আমাকে তাঁর নিকট যেতে দাও। তারা বলল, তাঁর নিকট যাও। অতঃপর সে যখন মুসলিমদের নিকটবর্তী হল, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এ হল মিকরায আর সে দুষ্ট ব্যক্তি। সে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে কথা বলছিল, এমন সময় সুহায়ল ইব্নু আম্র এল। মা‘মার বলেন, ‘ইকরিমাহ (রহঃ) সূত্রে আইয়ুর (রহঃ) আমাকে বলেছেন যে, যখন সুহায়ল এল তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘তোমাদের জন্য তোমাদের কাজ সহজ হয়ে গেল।’ মা‘মার (রহঃ) বলেন, যুহরী (রহঃ) তাঁর বর্ণিত হাদীসে বলেছেন যে, সুহায়ল ইব্নু আম্র এসে বলল, আসুন আমাদের ও আপনাদের মধ্যে একটি চুক্তিপত্র লিখি। অতঃপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একজন লেখককে ডাকলেন। অতঃপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, (লিখ) (আরবী) এতে সুহায়ল বলল, আল্লাহর কসম! রাহমান কে-? আমরা তা জানি না, বরং পূর্বে আপনি যেমন লিখতেন, লিখুন (আরবী) মুসলিমগণ বললেন, আল্লাহর কসম! আমরা (আরবী) ব্যতীত আর কিছু লিখব না। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, লিখ, (আরবী) অতঃপর বললেন, এটা যার উপর চুক্তিবদ্ধ হয়েছেন আল্লাহর রসূল মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তখন সুহায়ল বলল, আল্লাহর কসম! আমরা যদি আপনাকে আল্লাহর রসূল বলেই বিশ্বাস করতাম, তাহলে আপনাকে কা‘বা যিয়ারত থেকে বাধা দিতাম না এবং আপনাদের সাথে যুদ্ধ করতে উদ্যত হতাম না। বরং আপনি লিখুন, ‘আবদুল্লাহ্র পুত্র মুহাম্মাদ (এর তরফ থেকে)। তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আল্লাহর রসূল; যদিও তোমরা আমাকে মিথ্যাবাদী মনে কর। (হে ফাতির!) লিখ, ‘আবদুল্লাহ্র পুত্র মুহাম্মদ।’ যুহরী (রহঃ) বলেন, এটি এজন্য যে, তিনি বলেছিলেন, তারা যদি আল্লাহ্র পবিত্র বস্তুগুলোর সম্মান করার কোন কথা দাবী করে তাহলে আমি তাদের সে দাবী মেনে নিব। অতঃপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এ চুক্তি কর যে, তারা আমাদের ও কা‘বা শরীফের মধ্যে কোন প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে না, যাতে আমরা (নির্বিঘ্নে) তাওয়াফ করতে পারি। সুহায়ল বলল, আল্লাহর কসম! আরববাসীরা যেন একথা বলার সুযোগ না পায় যে, এ প্রস্তাব গ্রহণে আমাদেরকে বাধ্য করা হয়েছে। বরং আগামী বছর তা হতে পারে। অতঃপর লেখা হলো। সুহায়ল বলল, এও লিখা হউক যে, আমাদের কোন ব্যক্তি যদি আপনার নিকট চলে আসে এবং সে যদিও আপনার দ্বীন গ্রহণ করে থাকে, তবুও তাকে আমাদের নিকট ফিরিয়ে দিবেন। মুসলিমগণ বললেন, সুবহানাল্লাহ্! যে ইসলাম গ্রহণ করে আমাদের নিকট এসেছে, তাকে কেমন করে মুশরিকদের নিকট ফেরত দেয়া হতে পারে? এমন সময় আবূ জানদাল ইব্নু সুহায়ল ইব্নু আম্র সেখানে এসে উপস্থিত হলেন। তিনি বেড়ী পরিহিত অবস্থায় ধীরে ধীরে চলছিলেন। তিনি মক্কার নিম্নাঞ্চল থেকে বের হয়ে এসে মুসলিমদের সামনে নিজেকে পেশ করলেন। সুহায়ল বলল, হে মুহাম্মদ! আপনার সঙ্গে আমার চুক্তি হয়েছে, সে অনুযায়ী প্রথম কাজ হলো তাকে আমার নিকট ফিরিয়ে দিবেন। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এখনো তো চুক্তি সম্পাদিত হয়নি। সুহায়ল বলল, আল্লাহর কসম! তাহলে আমি আপনাদের সঙ্গে আর কখনো সন্ধি করব না। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, কেবল এ ব্যক্তিটিকে আমার নিকট থাকার অনুমতি দাও। সে বলল, না, এ অনুমতি আমি দেব না। আল্লাহর রসূল বললেন, হ্যাঁ, তুমি এটা কর। সে বলল, আমি তা করব না। মিকরায বলল, আমরা তাকে আপনার নিকট থাকবার অনুমতি দিলাম। আবূ জানদাল (রাঃ) বলেন, হে মুসলিম সমাজ, আমাকে মুশরিকদের নিকট ফিরিয়ে দেয়া হবে, অথচ আমি মুসলিম হয়ে এসেছি। আপনারা কি দেখছেন না আমি কত কষ্ট পাচ্ছি। আল্লাহর পথে তাকে অনেক নির্যাতিত করা হয়েছে। ‘উমর ইব্নুল খাত্তাব (রাঃ) বলেন, আমি আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এলাম এবং বললাম, আপনি কি আল্লাহ্র সত্য নবী নন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, তা হলে দ্বীনের ব্যাপারে কেন আমরা এত হেয় হবো? আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘আমি অবশ্যই রাসূল; অতএব আমি তাঁর অবাধ্য হতে পারি না, অথচ তিনিই আমার সাহায্যকারী।’ আমি বললাম, আপনি কি আমাদের বলেন নাই যে, আমরা শীঘ্রই বায়তুল্লাহ্ যাব এবং তাওয়াফ করব। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আমি কি এ বছরই আসার কথা বলেছি? আমি বললাম, না। তিনি বললেন, তুমি অবশ্যই কা‘বা গৃহে যাবে এবং তাওয়াফ করবে। ‘উমর (রাঃ) বলেন, অতঃপর আমি আবূ বকর (রাঃ)-এর নিকট গিয়ে বললাম, ‘হে আবূ বক্র। তিনি কি আল্লাহর সত্য নবী নন?’ আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ‘অবশ্যই।’ আমি বললাম, আমরা কি সত্যের উপর নই এবং আমাদের দুশমনরা কি বাতিলের উপর নয়? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, নিশ্চয়ই। আমি বললাম, তবে কেন এখন আমরা আমাদের দ্বীনের ব্যাপারে এত হীনতা স্বীকার করব? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ‘ওহে! নিশ্চয়ই তিনি আল্লাহর রসূল এবং তিনি তাঁর রবের নাফরমানী করতে পারেন না। তিনিই তাঁর সাহায্যকারী। তুমি তাঁর অনুসরণকে আঁকড়ে ধরো। আল্লাহর কসম! তিনি সত্যের উপর আছেন।’ আমি বললাম, তিনি কি বলেননি যে, আমরা অচিরেই বায়তুল্লাহ্ যাব এবং তাওয়াফ করব? আবূ বকর (রাঃ) বললেন, অবশ্যই। কিন্তু তুমি এবারই যে যাবে একথা কি তিনি বলেছিলেন? আমি বললাম, না। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, ‘তবে নিশ্চয়ই তুমি সেখানে যাবে এবং তার তাওয়াফ করবে।’ যুহরী (রহঃ) বলেন যে, ‘উমর (রাঃ) বলেছেন, আমি এর জন্য (অর্থাৎ ধৈর্যহীনতার কাফ্ফারা হিসেবে) অনেক নেক আমল করেছি। বর্ণনাকারী বলেন, সন্ধিপত্র লেখা শেষ হলে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবাদেরকে বললেন, ‘তোমরা উঠ এবং কুরবানী কর ও মাথা কামিয়ে ফেল।’ রাবী বলেন, ‘আল্লাহ্র কসম! আল্লাহর রসূল তিনবার তা বলার পরও কেউ উঠলেন না।’ তাদের কাউকে উঠতে না দেখে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উম্মু সালামা (রাঃ)-এর নিকট এসে লোকদের এই আচরণের কথা বলেন। উম্মু সালামা (রাঃ) বললেন, ‘হে আল্লাহ্র নবী, আপনি যদি তাই চান, তাহলে আপনি বাইরে যান ও তাদের সঙ্গে কোন কথা না বলে আপনার উট আপনি কুরবানী করুন এবং ক্ষুরকার ডেকে মাথা মুড়িয়ে নিন।’ সেই অনুযায়ী আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বেরিয়ে গেলেন এবং কারো সঙ্গে কোন কথা না বলে নিজের পশু কুরবানী দিলেন এবং ক্ষুরকার ডেকে মাথা মুড়ালেন। তা দেখে সাহাবীগণ উঠে দাঁড়ালেন ও নিজ নিজ পশু কুরবানী দিলেন এবং একে অপরের মাথা কামিয়ে দিলেন। অবস্থা এমন হল যে, ভীড়ের কারণে একে অপরের উপর পড়তে লাগলেন। অতঃপর আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট কয়েকজন মুসলিম মহিলা এলেন। তখন আল্লাহ তাআলা নাযিল করলেনঃ “হে মুমিনগণ! মুমিন মহিলারা তোমাদের নিকট হিজরত করে আসলে, ……. কাফির নারীদের সাথে দাম্পত্য সম্পর্ক বজায় রেখো না।” (আল মুমতাহিনাহ : ১০)। সেদিন ‘উমর (রাঃ) দু’জন স্ত্রীকে তালাক দিয়ে দিলেন, তারা ছিল মুশরিক থাকাকালে তাঁর স্ত্রী। তাদের একজনকে মু‘আবিয়াহ ইব্নু আবূ সুফ্ইয়ান এবং অপরজনকে সাফওয়ান ইব্নু উমাইয়া বিয়ে করেন। অতঃপর আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় ফিরে আসলেন। তখন আবূ বাসীর (রাঃ) নামক কুরাইশ গোত্রের এক ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এলেন। মক্কার কুরাইশরা তাঁর তালাশে দু’জন লোক পাঠাল। তারা [রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট এসে] বলল, আপনি আমাদের সঙ্গে যে চুক্তি করেছেন (তা পূর্ণ করুন)। তিনি তাঁকে ঐ দুই ব্যক্তির হাওয়ালা করে দিলেন। তাঁরা তাঁকে নিয়ে বেরিয়ে গেল এবং যুল-হুলায়ফায় পৌঁছে অবতরণ করল আর তাদের সঙ্গে যে খেজুর ছিল তা খেতে লাগল। আবূ বাসীর (রাঃ) তাকে তাদের একজনকে বললেন, আল্লাহর কসম! হে অমুক, তোমার তরবারিটি খুবই চমৎকার দেখছি। সে ব্যক্তিটি তরবারীটি বের করে বলল, হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! এটি একটি উৎকৃষ্ট তরবারী। আমি একাধিক বার তার পরীক্ষা করেছি। আবূ বাসীর (রাঃ) বললেন, তলোয়ারটি আমি দেখতে চাই আমাকে তা দেখাও। অতঃপর ব্যক্তিটি আবূ বাসীরকে তলোয়ারটি দিল। আবূ বাসীর (রাঃ) সেটি দ্বারা তাকে এমন আঘাত করলেন যে, তাতে সে মরে গেল। অতঃপর অপর সঙ্গী পালিয়ে মদীনায় এসে পৌঁছল এবং দৌড়িয়ে মাসজিদে প্রবেশ করল। আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাকে দেখে বললেন, এই ব্যক্তিটি ভীতিজনক কিছু দেখে এসেছে। ইতোমধ্যে ব্যক্তিটি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট পৌছে বলল, আল্লাহর কসম! আমার সঙ্গীকে হত্যা করা হয়েছে, আমিও নিহত হতাম। এমন সময় আবূ বাসীর (রাঃ) -ও সেখানে উপস্থিত হলেন এবং বললেন, হে আল্লাহর রসূল! আল্লাহর কসম! আল্লাহ আপনার দায়িত্ব সম্পূর্ণ করে দিয়েছেন। আমাকে তার নিকট ফেরত দিয়েছেন; এ ব্যাপারে আল্লাহ আমাকে তাদের কবল থেকে নাজাত দিয়েছেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, সর্বনাশ! এতো যুদ্ধের আগুন প্রজ্বলিতকারী, কেউ যদি তাকে বিরত রাখত। আবূ বাসীর (রাঃ) যখন এ কথা শুনলেন, তখন বুঝতে পারলেন যে, তাকে আবার তিনি কাফিরদের নিকট ফেরত পাঠাবেন। তাই তিনি বেরিয়ে নদীর তীরে এসে পড়লেন। রাবী বলেন, এ দিকে আবূ জানদাল ইব্নু সুহায়ল কাফিরদের কবল থেকে পালিয়ে এসে আবূ বাসীরের সঙ্গে মিলিত হলেন। অতঃপর থেকে কুরাইশ গোত্রের যে-ই ইসলাম গ্রহণ করতো, সে-ই আবূ বাসীরের সঙ্গে এসে মিলিত হতো। এভাবে তাদের একটি দল হয়ে গেল। আল্লাহর কসম! তাঁরা যখনই শুনত যে, কুরাইশদের কোন বাণিজ্য কাফিলা সিরিয়া যাবে, তখনই তাঁরা তাদের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতেন এবং তাদের হত্যা করতেন ও তাদের মাল সামান কেড়ে নিতেন। তখন কুরাইশরা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট লোক পাঠাল। আল্লাহ ও আত্মীয়তার ওয়াসীলাহ দিয়ে আবেদন করল যে, আপনি আবূ বাসীরের নিকট এত্থেকে বিরত থাকার জন্য নির্দেশ পাঠান। এখন থেকে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট কেউ এলে সে নিরাপদ থাকবে (কুরাইশদের নিকট ফেরত পাঠাতে হবে না)। অতঃপর নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের নিকট নির্দেশ পাঠালেন। এ সময় আল্লাহ্ তা‘আলা নাযিল করেনঃ (আরবী) থেকে (আরবী) পর্যন্ত। “তিনি তাদের হাত তোমাদের থেকে এবং তোমাদের হাত তাদের থেকে বিরত রেখেছেন ..... জাহিলী যুগের অহমিকা পর্যন্ত” (আল-ফাত্হ : ২৬)। তাদের অহমিকা এই ছিল যে, তারা মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে নবী বলে স্বীকার করেনি এবং (আরবী) মেনে নেয়নি; বরং বায়তুল্লাহ্ ও মুসলিমদের মধ্যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল।
‘আম্র ইব্নু মায়মূন (রহঃ) থেকে বর্নিতঃ
তিনি বলেন, আমি ‘উমার ইব্নু খাত্তাব (রাঃ) –কে আহত হবার কিছুদিন পূর্বে মদীনায় দেখেছি যে তিনি হুযায়ফা ইব্নু ইয়ামান (রাঃ) ও ‘উসমান ইব্নু হুনায়ফ (রহঃ) –এর নিকট দাঁড়িয়ে তাঁদেরকে লক্ষ্য করে বলছেন, তোমরা এটা কী করলে? তোমরা এটা কী করলে? তোমরা কি আশঙ্কা করছ যে, তোমরা ইরাক ভূমির উপর যে কর ধার্য করেছ তা বহনে ঐ ভূখন্ড অক্ষম? তারা বললেন, আমরা যে পরিমাণ কর ধার্য করেছি, ঐ ভূখন্ড তা বহনে সক্ষম। এতে বাড়তি কোন বোঝা চাপান হয়নি। তখন ‘উমার (রাঃ) বললেন, তোমরা আবার চিন্তা করে দেখ যে, তোমারা এ ভূখন্ডের উপর যে কর আরোপ করেছ তা বহন সক্ষম নয়? বর্ণনাকারী বলেন, তাঁরা বললেন, না। অতঃপর ‘উমার (রাঃ) বললেন, আল্লাহ্ যদি আমাকে সুস্থ রাখেন তবে ইরাকের বিধবাগণকে এমন অবস্থায় রেখে যাব যে তারা আমার পরে কখনো অন্য কারো মুখাপেক্ষী না হয়। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর চতুর্থ দিন তিনি আহত হলেন। যেদিন ভোরে তিনি আহত হন, আমি তাঁর কাছে দাঁড়িয়েছিলাম এবং তাঁর ও আমার মাঝে ‘আবদুল্লাহ ইব্নু ‘আব্বাস (রাঃ) ছাড়া অন্য কেউ ছিল না। ‘উমার (রাঃ) দু’কাতারের মধ্য দিয়ে চলার সময় বলতেন, কাতার সোজা করে নাও। যখন দেখতেন কাতারে কোন ত্রুটি নেই তখন তাকবীর বলতেন। তিনি অধিকাংশ সময় সূরা ইউসুফ, সূরা নাহ্ল অথবা এ ধরণের সূরা প্রথম রাক’আতে তিলাওয়াত করতেন, যেন অধিক পরিমাণ লোক প্রথম রাক’আতে শরীক হতে পারেন। তাকবীর বলার পরেই আমি তাঁকে বলতে শুনলাম, একটি কুকুর আমাকে আঘাত করেছে অথবা বলেন, আমাকে আক্রমণ করেছে। ঘাতক ‘ইলজ’ দ্রুত পলায়নের সময় দু’ধারী খঞ্জর দিয়ে ডানে বামে আঘাত করে চলছে। এভাবে তের জনকে আহত করল। এদের মধ্যে সাত জন শহীদ হলেন। এ অবস্থা দেখে এক মুসলিম তার লম্বা চাদরটি ঘাতকের উপর ফেলে দিলেন। ঘাতক যখন বুঝতে পারল সে ধরা পড়ে যাবে তখন সে আত্মহত্যা করল। ‘উমার (রাঃ) আব্দুর রাহমান ইব্নু আউফ (রাঃ) –এর হাত ধরে সামনে এগিয়ে দিলেন। ‘উমার (রাঃ) –এর নিকটে যারা ছিল শুধুমাত্র তারাই ব্যাপারটি দেখতে পেল। আর মাসজিদের শেষে যারা ছিল তারা ব্যাপারটি এর অধিক বুঝতে পারল না যে, ‘উমার (রাঃ)-এর কন্ঠস্বর শুনা যাচ্ছে না। তাই তারা “সুবহানাল্লাহ সুবহানাল্লাহ” বলতে লাগলেন। আব্দুর রহমান ইব্নু আউফ (রাঃ) তাঁদেরকে নিয়ে সংক্ষেপে সলাত আদায় করলেন। যখন মুসল্লীগণ চলে গেলেন, তখন ‘উমার (রাঃ) বললেন, হে ইব্নু আব্বাস (রাঃ) দেখ তো কে আমাকে আঘাত করল। তিনি কিছুক্ষণ অনুসন্ধান করে এসে বললেন, মুগীরাহ ইব্নু শু’বাহ (রাঃ) –এর গোলাম (আবূ লুলু)। ‘উমার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, ঐ কারিগর গোলামটি? তিনি বললেন, হাঁ। ‘উমার (রাঃ) বললেন, আল্লাহ্ তার সর্বনাশ করুন। আমি তার সম্পর্কে সঠিক সিদ্ধান্ত দিয়েছিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহ আমার মৃত্যু ইসলামের দাবীদার কোন ব্যক্তির হাতে ঘটাননি। হে ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) তুমি এবং তোমার পিতা মদীনায় কাফির গোলামের সংখ্যা বৃদ্ধি পছন্দ করতেন। ‘আব্বাস (রাঃ) –এর নিকট অনেক অমুসলিম গোলাম ছিল। ইব্নু ‘আব্বাস (রাঃ) বললেন, যদি আপনি চান তবে আমি কাজ করে ফেলি অর্থাৎ আমি তাদেরকে হত্যা করে ফেলি। ‘উমার (রাঃ) বলেন, তুমি ভুল বলছ। কেননা তারা তোমাদের ভাষায় কথা বলে, তোমাদের কিবলামুখী হয়ে সলাত আদায় করে, তোমাদের মত হাজ্জ করে। অতঃপর তাঁকে তাঁর ঘরে নেওয়া হল। আমরা তাঁর সঙ্গে চললাম। মানুষের অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছিল, ইতোপূর্বে তাদের উপর এত বড় মুসীবত আর আসেনি। কেউ কেউ বলছিলেন, ভয়ের কিছু নেই। আবার কেউ বলছিলেন, আমি তাঁর সম্পর্কে আশংকাবোধ করছি। অতঃপর খেজুরের শরবত আনা হল, তিনি তা পান করলেন। কিন্তু তা তার পেট হতে বেরিয়ে পড়ল। অতঃপর দুধ আনা হল, তিনি তা পান করলেন। তাও তার পেট হতে বেরিয়ে পড়ল। তখন সকলেই বুঝতে পারলেন, মৃত্যু তাঁর অবশ্যম্ভাবী। আমরা তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম। অন্যান্য লোকজনও আসতে শুরু করল। সকলেই তার প্রশংসা করতে লাগল। তখন যুবক বয়সী একটি লোক এসে বলল, হে আমীরুল মু’মিনীন। আপনার জন্য আল্লাহ্র সু-সংবাদ রয়েছে; আপনি তা গ্রহণ করুন। আপনি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) –এর সাহচর্য গ্রহণ করেছেন, ইসলামের প্রাথমিক যুগেই আপনি তা গ্রহণ করেছেন, যে সম্পর্কে আপনি নিজেই অবগত আছেন অতঃপর আপনি খলীফা হয়ে ন্যায় বিচার করেছেন। অতঃপর আপনি শাহাদাত লাভ করেছেন। ‘উমার (রাঃ) বললেন, আমি পছন্দ করি যে তা আমার জন্য ক্ষতিকর বা লাভজনক না হয়ে সমান সমান হয়ে থাকে। যখন যুবকটি চলে যেতে উদ্যত হল তখন তার লুঙ্গিটি মাটি ছুঁয়ে যাচ্ছিল। ‘উমার (রাঃ) বললেন, যুবকটিকে আমার নিকট ডেকে আন। তিনি বললেন– হে ভাতিজা! তোমার কাপড়টি উঠিয়ে নাও। এটা তোমার কাপড়ের পরিচ্ছন্নতার জন্য এবং তোমার রবের নিকটও পছন্দনীয়। হে ‘আবদুল্লাহ ইব্নু ‘উমার, তুমি হিসাব করে দেখ আমার ঋণের পরিমাণ কত। তারা হিসাব করে দেখতে পেলেন ছিয়াশি হাজার (দিরহাম) বা এর কাছাকাছি। তিনি বললেন, যদি ‘উমারের পরিবার পরিজনের মাল দ্বারা পরিশোধ হয়ে যায় তবে তা দিয়ে পরিশোধ করে দাও। অন্যথায় আদি ইব্নু কা’ব এর বংশধরদের নিকট হতে সাহায্য গ্রহন কর। তাদের মাল দিয়েও যদি ঋণ পরিশোধ না হয় তবে কুরাইস কবিলা হতে সাহায্য গ্রহণ করবে, এর বাহিরে কারো সাহায্য গ্রহণ করবে না। আমার পক্ষ হতে তাড়াতাড়ি ঋণ আদায় করে দাও। উম্মুল মু’মিনীন ‘আয়িশা (রাঃ) –এর খিদমতে এবং বল ‘উমার আপনাকে সালাম পাঠিয়েছে। ‘আমীরুল মু’মিনীন’ শব্দটি বলবে না। কেননা এখন আমি মু’মিনগণের আমীর নই। তাঁকে বল ‘উমার ইব্ন খাত্তাব তাঁর সাথীদের পাশে দাফন হবার অনুমতি চাচ্ছেন। ইব্ন ‘উমার (রাঃ) ‘আয়িশা (রাঃ) এর খিদমতে গিয়ে সালাম জানিয়ে প্রবেশের অনুমতি চাইলেন। তিনি বললেন, প্রবেশ কর, তিনি দেখলেন, ‘আয়িশা (রাঃ) বসে বসে কাঁদছেন। তিনি গিয়ে বললেন, ‘উমার ইব্নু খাত্তাব (রাঃ) আপনাকে সালাম পাঠিয়েছেন এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়ের পার্শ্বে দাফন হবার জন্য আপনার অনুমতি চেয়েছেন। ‘আয়িশা বললেন, আমার আকাঙ্খা ছিল। কিন্তু আজ আমি এ ব্যাপার আমার উপরে তাঁকে অগ্রগণ্য করছি। ‘আবদুল্লাহ ইব্নু ‘উমার (রাঃ) যখন ফিরে আসছেন তখন বলা হল– এই যে ‘আবদুল্লাহ ফিরে আসছে। তিনি বললেন, আমাকে উঠিয়ে বসাও। তখন এক ব্যক্তি তাকে ঠেস দিয়ে বসিয়ে ধরে রাখলেন। ‘উমার (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন কী সংবাদ? তিনি বললেন, আমীরুল মু’মিনীন, আপনি যা কামনা করেছেন, তাই হয়েছে, তিনি অনুমতি দিয়েছেন। ‘উমার (রাঃ) বললেন, আলহামদুলিল্লাহ। এর চেয়ে বড় কোন বিষয় আমার নিকট ছিল না। যখন আমার মৃত্যু হয়ে যাবে তখন আমাকে উঠিয়ে নিয়ে, তাঁকে আমার সালাম জানিয়ে বলবে, ‘উমার ইব্নু খাত্তাব (রাঃ) আপনার অনুমতি চাচ্ছেন। যদি তিনি অনুমতি দেন, তবে আমাকে প্রবেশ করাবে আর যদি অনুমতি না দেন তবে আমাকে সাধারণ মুসলিমদের গোরস্থানে নিয়ে যাবে। এ সময় উম্মুল মু’মিনীন হাফসা (রাঃ)-কে কতিপয় মহিলাসহ আসতে দেখে আমরা উঠে পড়লাম। হাফসা (রাঃ) তাঁর নিকট গিয়ে কিছুক্ষণ কাঁদলেন। অতঃপর পুরুষরা প্রবেশের অনুমতি চাইলে, তিনি ঘরের ভিতর গেলে ঘরের ভেতর হতে হতেও আমরা তাঁর কান্নার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। তাঁরা বললেন, হে আমীরুল মু’মিনীন! আপনি ওয়াসিয়াত করুন এবং খলীফা মনোনীত করুন। ‘উমার (রাঃ) বললেন, খিলাফতের জন্য এ কয়েকজন ছাড়া অন্য কাউকে আমি যোগ্যতম পাচ্ছি না, যাদের প্রতি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর ইন্তিকালের সময় রাযী ও খুশী ছিলেন। অতঃপর তিনি তাঁদের নাম বললেন, ‘আলী, ‘উসমান, যুবায়র, ত্বলহা, সা’দ ও ‘আবদুর রাহমান ইব্নু আউফ (রাঃ) এবং বললেন, ‘আবদুল্লাহ ইব্নু ‘উমার (রাঃ) তোমাদের সঙ্গে থাকবে। কিন্তু সে খিলাফত লাভ করতে পারবে না। তা ছিল শুধু সান্ত্বনা মাত্র। যদি খিলাফতের দায়িত্ব সা’দের (রাঃ) এর উপর ন্যস্ত করা হয় তবে তিনি এর জন্য যোগ্যতম ব্যক্তি। আর যদি তোমাদের মধ্যে অন্য কেউ খলীফা নির্বাচিত হন তবে তিনি যেন সর্ব বিষয়ে সা’দের সাহায্য ও পরামর্শ গ্রহণ করেন। আমি তাঁকে অযোগ্যতা বা খিয়ানতের কারণে অপসারণ করিনি। আমার পরের খলীফাকে আমি ওয়াসিয়াত করছি, তিনি যেন প্রথম যুগের মুহাজিরগণের হক সম্পর্কে সচেতন থাকেন, তাদের মান সম্মান রক্ষায় সচেষ্ট থাকেন। এবং আমি তাঁকে আনসার সাহাবীগণের যাঁরা মুহাজিরগণৈর আসার আগে এই নগরীতে (মদীনায়) বসবাস করে আসছিলেন এবং ঈমান এনেছেন, তাঁদের প্রতি সদ্ব্যবহার করার ওয়াসিয়াত করছি যে তাঁদের মধ্যে নেককারগণের ওযর আপত্তি যেন গ্রহণ করা হয় এবং তাঁদের মধ্যে কারোর ভুলত্রুটি হলে তা যেন ক্ষমা করে দেয়া হয়। আমি তাঁকে এ ওয়াসিওয়াত ও করছি যে, তিনি যেন রাজ্যের বিভিন্ন শহরের আধিবাসীদের সদ্ব্যবহার করন। কেননা তাঁরাও ইসলামের হিফাযতকারী। এবং তারাই ধনসম্পদের যোগানদাতা। তারাই শত্রুদের চোখের কাঁটা। তাদের হতে তাদের সন্তুষ্টির ভিত্তিতে কেবলমাত্র তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ যেন যাকাত আদায় করা হয়। আমি তাঁকে পল্লীবাসীদের প্রতি সদ্ব্যবহার করারও ওয়াসিয়াত করছি। কেননা তারাই আরবের ভিত্তি এবং ইসলামের মূল শক্তি। তাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ এনে তাদের দরিদ্রদের মধ্যে যেন বিলিয়ে দেয়া হয়। আমি তাঁকে আল্লাহ ও তাঁর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) –এর জিম্মীদের (অর্থাৎ সংখ্যা লঘু সম্প্রদায়) বিষয়ে ওয়াসিয়াত করছি যে, তাদের সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার যেন পুরা করা হয়। তাদের পক্ষাবলম্বনে যেন যুদ্ধ করা হয়, তাদের শক্তি সামর্থ্যের অধিক জিযিয়া যেন চাপানো না হয়। ‘উমার (রাঃ) এর ইন্তিকাল হয়ে গেলে আমরা তাঁর লাশ নিয়ে পায়ে হেঁটে চললাম। ‘আবদুল্লাহ্ ইব্নু ‘উমার (রাঃ) ‘আয়িশা (রাঃ) –কে সালাম করলেন এবং বললেন, ‘উমার ইব্নু খাত্তাব (রাঃ) অনুমতি চাচ্ছেন। ‘আয়িশা (রাঃ) বললেন, তাকে প্রবেশ করাও। অতঃপর তাঁকে প্রবেশ করান হল এবং তাঁর সঙ্গীদ্বয়ের পার্শ্বে দাফন করা হল। যখন তাঁর দাফনকাজ শেষ হল, তখন ঐ ব্যক্তিবর্গ একত্রিত হলেন। তখন ‘আবদুর রাহমান (রাঃ) বললেন, তোমারা তোমাদের বিষয়টি তোমাদের মধ্য হতে তিনজনের উপর ছেড়ে দাও। তখন যুবায়র (রাঃ) বললেন, আমি আমার বিষয়টি ‘আলী (রাঃ) –এর উপর অর্পণ করলাম। ত্বলহা (রাঃ) বললেন, আমার বিষয়টি ‘উসমান (রাঃ) –এর উপর ন্যস্ত করলাম। সা’দ (রাঃ) বললেন, আমার বিষয়টি ‘আবদুর রহমান ইব্নু আউফ (রাঃ) উপর ন্যস্ত করলাম। অতঃপর ‘আবদুর রহমান (রাঃ) ‘উসমান ও ‘আলী (রাঃ)-কে বললেন, আপনাদের দু’জনের মধ্য হতে কে এই দায়িত্ব হতে অব্যাহতি পেতে ইচ্ছা করেন? এ দায়িত্ব অপর জনের উপর অর্পন করব। আল্লাহ্ ও ইসলামের হক আদায় করা তাঁর অন্যতম দায়িত্ব হবে। কে অধিকতর যোগ্য সে সম্পর্কে দুজনেরই চিন্তা করা উচিত। ব্যক্তিদ্বয় চুপ থাকলেন। তখন ‘আবদুর রাহমান (রাঃ) নিজেই বললেন আপনারা এ দায়িত্ব আমার উপর ন্যস্ত করতে পারেন কি? আল্লাহ্কে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি আপনাদের মধ্যকার ষোগ্যতম ব্যক্তিকে নির্বাচিত করতে একটুও ত্রুটি করব না। তাঁরা উভয়ে বললেন, হাঁ। তাদের একজনের হাত ধরে বললেন, রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) –এর সঙ্গে আপনার যে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা এবং ইসলাম গ্রহণে অগ্রগামিতা আছে তা আপনিও ভালভাবে জানেন। আল্লাহর ওয়াস্তে এটা আপনার জন্য জরুরী হবে যে, যদি আপনাকে খলীফা মনোনীত করি তাহলে আপনি ইন্সাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। আর যদি ‘উসমান (রাঃ) –কে মনোনীত করি তবে আপনি তাঁর কথা শুনবেন এবং তাঁর প্রতি অনুগত থাকবেন। অতঃপর তিনি অপর জনের সঙ্গে একান্তে অনুরূপ কথা বললেন। এভাবে অঙ্গীকার গ্রহণ করে তিনি বললেন, হে ‘উসমান (রাঃ) আপনার হাত বাড়িয়ে দিন। তিনি [আবদুর রাহমান (রাঃ)], তাঁর হাতে বায়’আত করলেন। অতঃপর ‘আলী (রাঃ) তাঁর ‘উসমান (রাঃ)-এর বায়’আত করলেন। অতঃপর মদীনাবাসীগণ এগিয়ে এস সকলেই বায়’আত করলেন। (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৪২৫, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ৩৪৩২)
আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
তিনি বলেন, আমি আমার মাতা পিতাকে কখনো ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন পালন করতে দেখিনি এবং এমন কোন দিন কাটেনি যেদিন সকালে কিংবা সন্ধ্যায় রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের বাড়িতে আসেননি। যখন মুসলমানগণ অতিষ্ঠ হয়ে পড়লেন, তখন আবূ বাকর (রাঃ) হিজরাত করে আবিসিনিয়ায় যাওয়ার উদ্দেশে বের হলেন। শেষে বারকুল গিমাদ পৌঁছলে ইবনু দাগিনার সাথে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। সে ছিল তার গোত্রের নেতা। সে বলল, হে আবূ বাকর! কোথায় যাচ্ছেন? উত্তর আবূ বাকর (রাঃ) বললেন, আমার স্ব-জাতি আমাকে বের করে দিয়েছে। তাই আমি মনে করছি, পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াব এবং আমার প্রতিপালকের ইবাদত করব। ইবনু দাগিনা বলল, হে আবূ বাকর (রাঃ)! আপনার মত ব্যক্তি বের হতে পারে না এবং বের করাও হতে পারে না। আপনি তো নিঃস্বদের জন্য উপার্জন করে দেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, অক্ষমদের বোঝা নিজে বহন করেন, মেহমানের মেহমানদারী করে থাকেন এবং সত্য পথের পথিকদের বিপদ আপদে সাহায্য করেন। সুতরাং আমি আপনাকে আশ্রয় দিচ্ছি, আপনাকে যাবতীয় সহযোগিতার ওয়াদা করছি। আপনি ফিরে যান এবং নিজ শহরে আপনার রবের ইবাদত করুন। আবূ বাকর (রাঃ) ফিরে এলেন। তাঁর সঙ্গে ইবনু দাগিনাও এল। ইবনু দাগিনা বিকেল বেলা কুরাইশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের কাছে গেল এবং তাদেরকে বলল, আবূ বাকরের মত লোক দেশ হতে বের হতে পারে না এবং তাকে বের করে দেয়া যায় না। আপনারা কি এমন ব্যক্তিকে বের করবেন, যে নিঃস্বদের জন্য উপার্জন করেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, অক্ষমের বোঝা নিজে বহন করেন, মেহমানের মেহমানদারী করেন এবং ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার কারণে বিপদ এলে সাহায্য করেন। ইবনু দাগিনার আশ্রয়দান কুরাইশগণ মেনে নিল এবং তারা ইবনু দাগিনাকে বলল, তুমি আবূ বকরকে বলে দাও, তিনি যেন তাঁর রবের ইবাদত তাঁর ঘরে করেন। সালাত সেখানেই আদায় করেন, ইচ্ছা মাফিক কুরআন তিলাওয়াত করবেন। কিন্তু এর দ্বারা আমাদের যেন কষ্ট না দেন। আর এসব ব্যাপারে যেন প্রকাশ্যে না করেন। কেননা, আমরা আমাদের মেয়েদের ও ছেলেদের ফিত্নায় পড়ে যাওয়ার ভয় করি। ইবনু দাগিনা এসব কথা আবূ বাকর (রাঃ)-কে বলে দিলেন। সে মতে কিছুকাল আবূ বাকর (রাঃ) নিজের ঘরে তাঁর রবের ইবাদত করতে লাগলেন। সালাত প্রকাশ্যে আদায় করতেন না এবং ঘরেই কুরআন তিলওয়াত করতেন। এরপর আবূ বাকরের মনে খেয়াল জাগল। তাই তিনি তাঁর ঘরের পার্শ্বেই একটি মসজিদ তৈরি করে নিলেন। এতে তিনি সালাত আদায় করতে ও কুরআন পড়তে লাগলেন। এতে তাঁর কাছে মুশরিকা মহিলা ও যুবকরা ভীড় জমাতে লাগল। তারা আবূ বাকর (রাঃ)-এর একাজে বিস্ময়বোধ করত এবং তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকত। আবূ বাকর (রাঃ) ছিলেন একজন ক্রন্দনকারী ব্যক্তি, তিনি যখন কুরআন পড়তেন তখন তাঁর অশ্রু সামলিয়ে রাখতে পারতেন না। এ ব্যাপারটি মুশরিকদের নেতৃস্থানীয় কুরাইশদের ভীত করে তুলল এবং তারা ইবনু দাগিনাকে ডেকে পাঠান। সে এল। তারা তাকে বলল, তোমার আশ্রয় প্রদানের কারণে আমরাও আবূ বাকরকে আশ্রয় দিয়েছিলাম এই শর্তে যে, তিনি তাঁর রবের ইবাদত তাঁর ঘরে করবেন কিন্তু সে শর্ত তিনি ভঙ্গ করেছেন এবং নিজ গৃহের পাশে এটি মসজিদ তৈরি করে প্রকাশ্যে সালাত ও তিলওয়াত শুরু করেছেন। আমাদের ভয় হচ্ছে, আমাদের মহিলা ও সন্তানরা ফিতনায় পড়ে যাবে। কাজেই তুমি তাঁকে নিষেধ করে দাও। তিনি তাঁর রবের ইবাদত তাঁর গৃহের ভিতর সীমাবদ্ধ রাখতে চাইলে, তিনি তা করতে পারেন। আর যদি তিনি তা অমান্য করে প্রকাশ্যে তা করতে চান তবে তাঁকে তোমার আশ্রয় প্রদান ও দায় দায়িত্ব ফিরিয়ে দিতে বল। আমরা তোমার আশ্রয় দানের ব্যাপারে বিশ্বাসঘাতকতা করা অত্যন্ত অপছন্দ করি, আবার আবূ বাকরকেও এভাবে প্রকাশ্যে ‘ইবাদাত করার জন্য ছেড়ে দিতে পারি না। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, ইবনু দাগিনা এসে আবূ বাকর (রাঃ)-কে বলল, আপনি অবশ্যই জানেন যে, কী শর্তে আমি আপনার জন্য ওয়াদাবদ্ধ হয়েছিলাম। আপনি হয়ত তাতে সীমিত থাকবেন অন্যথায় আমার জিম্মাদারী আমাকে ফিরত দিবেন। আমি এ কথা মোটেই পছন্দ করি না যে আমার সাথে চুক্তিবদ্ধ এবং আমার আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তির প্রতি আমার বিশ্বাসঘাতকতার অপবাদ আরববাসীর নিকট প্রকাশিত হোক। আবূ বাকর (রাঃ) তাকে বললেন, আমি তোমার আশ্রয় তোমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি। আমি আমার আল্লাহর আশ্রয়ের উপর সন্তুষ্ট আছি। এ সময় নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা্য় ছিলেন। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুসলিমদের বললেন, আমাকে তোমাদের হিজরাতের স্থান (স্বপ্নে) দেখান হয়েছে। সে স্থানে খেজুর বাগান রয়েছে এবং তা দুইটি পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত। এরপর যাঁরা হিজরাত করতে চাইলেন, তাঁরা মদিনার দিকে হিজরাত করলেন। আর যাঁরা হিজরাত করে আবিসিনিয়ায় চলে গিয়েছিলেন, তাঁদেরও অধিকাংশ সেখান হতে ফিরে মদিনায় চলে আসলেন। আবূ বাকর (রাঃ)ও মদিনায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন, তুমি অপেক্ষা কর। আশা করছি আমাকেও অনুমতি দেয়া হবে। আবূ বাকর (রাঃ) বললেন, আমার পিতা আপনার জন্য কুরবান১! আপনিও কি হিজরাতের আশা করছেন? তিনি বললেন, হাঁ। তখন আবূ বাকর (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গ পাওয়ার জন্য নিজেকে হিজরাত হতে বিরত রাখলেন এবং তাঁর নিকট যে দু’টি উট ছিল এ দুটি চার মাস পর্যন্ত বাবলা গাছের পাতা খাওয়াতে থাকেন। ইবনু শিহাব ‘উরওয়াহ (রাঃ) সূত্রে ‘আয়িশাহ (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, ইতিমধ্যে একদিন আমরা ঠিক দুপুর বেলায় আবূ বাকর (রাঃ) এর ঘরে উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে আবূ বাকরকে খবর দিল যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মস্তক আবৃত অবস্থায় আসছেন। তা এমন সময় ছিল যে সময় তিনি পূর্বে কখনো আমাদের এখানে আসেনি। আবূ বাকর (রাঃ) তাঁর আসার কথা শুনে বললেন, আমার মাতাপিতা তাঁর প্রতি কুরবান। আল্লাহর কসম, তিনি এ সময় নিশ্চয় কোন গুরুত্বপূর্ণ কারণেই আসছেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পৌঁছে অনুমতি চাইলেন। তাঁকে অনুমতি দেয়া হল। প্রবেশ করে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বাকরকে বললেন, এখানে অন্য যারা আছে তাদের বের করে দাও। আবূ বাকর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতামাতা আপনার প্রতি কুরবান! এখানে তো আপনারই পরিবার। তখন তিনি বললেন, আমাকেও হিজরাতের অনুমতি দেয়া হয়েছে। আবূ বাকর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান! আমি আপনার সফর সঙ্গী হতে ইচ্ছুক। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ঠিক আছে। আবূ বাকর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার পিতামাতা কুরবান! আমার এ দু’টি উট হতে আপনি যে কোন একটি নিন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তবে মূল্যের বিনিময়ে। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, আমরা তাঁদের জন্য যাবতীয় ব্যবস্থা অতি শীঘ্র সম্পন্ন করলাম এবং একটি থলের মধ্যে, তাঁদের খাদ্যসামগ্রী গুছিয়ে দিলাম। আমার বোন আসমা বিনতে আবূ বাকর (রাঃ) তার কোমর বন্ধের কিছু অংশ কেটে সে থলের মুখ বেঁধে দিলেন। এ কারণেই তাঁকে ‘জাতুন নেতাক’ (কোমর বন্ধ ওয়ালী) বলা হত। ‘আয়িশাহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবূ বাকর (রাঃ) সাওর পর্বতের একটি গুহায় আশ্রয় নিলেন। তাঁরা সেখানে তিনটি রাত অবস্থান করলেন। ‘আবদুল্লাহ ইবনু আবূ বাকর (রাঃ) তাঁদের পাশেই রাত্রি যাপন করতেন। তিনি ছিলেন একজন তীক্ষ্ণ বুদ্ধিসম্পন্ন তরুণ। তিনি শেষ রাত্রে ওখান হতে বেরিয়ে মক্কা্য় রাত্রি যাপনকারী কুরাইশদের সঙ্গে মিলিত হতেন এবং তাঁদের দু’জনের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র করা হত তা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন, ও স্মরণ রাখতেন। যখন অাঁধার ঘনিয়ে আসত তখন তিনি সংবাদ নিয়ে তাঁদের উভয়ের কাছে যেতেন। আবূ বাকর (রাঃ)-এর গোলাম আমির ইবনু যুহাইরাহ তাঁদের কাছেই দুধালো বকরীর পাল চরিয়ে বেড়াত। রাতের কিছু সময় চলে গেলে পর সে বকরীর পাল নিয়ে তাঁদের নিকটে যেত এবং তাঁরা দু’জন দুধ পান করে আরামে রাত্রিযাপন করতেন। তাঁরা বকরীর দুধ দোহন করে সাথে সাথেই পান করতেন। তারপর শেষ রাতে আমির ইবনু ফুহাইরাহ বকরীগুলি হাঁকিয়ে নিয়ে যেত। এ তিন রাতের প্রতি রাতে সে এমনই করল। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবূ বাকর (রাঃ) বনী আবদ ইবনু আদি গোত্রের এক ব্যক্তিকে মজুরির বিনিময়ে ‘খির্রীত’ (পথ প্রদর্শক) নিযুক্ত করেছিলেন। দক্ষ পথপ্রদর্শককে ‘খির্রীত’ বলা হয়। আদী গোত্রের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল। সে ছিল কাফির কুরাইশের ধর্মাবলম্বী। তাঁরা উভয়ে তাকে বিশ্বস্ত মনে করে তাঁদের উট দু’টি তার হাতে দিয়ে দিলেন এবং তৃতীয় রাত্রের পরে সকালে উট দু’টি সাওর গুহার নিকট নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করলেন। আর সে যথা সময়ে তা পৌঁছিয়ে দিল। আর আমির ইবনু ফুহাইরাহ ও পথপ্রদর্শক তাঁদের উভয়ের সঙ্গে চলল। প্রদর্শক তাঁদের নিয়ে উপকূলের পথ ধরে চলতে লাগল। (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৬১৮ প্রথমাংশ, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ৩৬২২ প্রথমাংশ) আবদুর রহমান ইবনু মালিক মুদলেজী আমাকে বলেছেন, তিনি সুরাকাহ ইবনু মালিকের ভ্রাতুষ্পুত্র। তার পিতা তাকে বলেছেন, তিনি সুরাকাহ ইবনু জু‘শুমকে বলতে শুনেছেন যে, আমাদের নিকট কুরাইশী কাফিরদের দূত আসল এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবূ বাকর (রাঃ) এ দু’জনের যে কোন একজনকে যে হত্যা করবে অথবা বন্দী করতে পারবে তাকে পুরস্কার দেয়ার ঘোষণা দিল। আমি আমার কওম বনী মুদলীজের এক মজলিসে উপবিষ্ট ছিলাম। তখন তাদের নিকট হতে এক ব্যক্তি এসে আমাদের নিকটে দাঁড়াল। আমরা বসাই ছিলাম। সে বলল, হে সুরাকাহ! আমি এই মাত্র উপকূলের পথে কয়েকজন মানুষকে যেতে দেখলাম। আমার ধারণা, এরা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সহযাত্রীরা হবেন। সুরাকাহ বলেন, আমি বুঝতে পারলাম যে এঁরা তাঁরাই হবেন। কিন্তু তাকে বললাম, এরা তাঁরা নয়, বরং তুমি অমুক অমুককে দেখছ। এরা এই মাত্র আমাদের সম্মুখ দিয়ে চলে গেল। তারপর আমি কিছুক্ষণ মজলিসে অবস্থান করে চলে এলাম এবং আমার দাসীকে আদেশ করলাম, তুমি আমার ঘোড়াটি বের করে নিয়ে যাও এবং অমুক টিলার আড়ালে ঘোড়াটি ধরে দাঁড়িয়ে থাক। আমি আমার বর্শা হাতে নিলাম এবং বাড়ির পিছন দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বর্শাটির এক প্রান্ত হাতে ধরে অপর প্রান্ত মাটি হেচড়ানো অবস্থায় আমি টেনে নিয়ে চলছিলাম ঐ অবস্থায় বর্শার মাটি হেচড়ানো অংশ দ্বারা মাটির উপর রেখাপাত করতে করতে আমার ঘোড়ার নিকট গিয়ে পৌঁছলাম এবং ঘোড়ায় আরোহণ করে তাকে খুব দ্রুত ছুটালাম। সে আমাকে নিয়ে ছুটে চলল। আমি প্রায় তাদের নিকট পৌঁছে গেলাম, এমন সময় আমার ঘোড়াটি হোঁচট খেয়ে আমাকে নিয়ে পড়ে গেল। আমিও তার পিঠ হতে ছিটকে পড়লাম। তারপর আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং তুণের দিকেহাত বাড়ালাম এবং তা হতে তীরগুলি বের করলাম ও তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে ভাগ্য পরীক্ষা করে নিলাম যে আমি তাদের কোন ক্ষতি করতে পারবো কি-না। তখন তীরগুলি দুর্ভাগ্যবশতঃ এমনভাবে বেরিয়ে এল যে, ভাগ্য নির্ধারণের বেলায় এমন হওয়া পছন্দ করি না। আমি আবার ভাগ্য পরীক্ষার ফলাফল অমান্য করে অশ্বারোহণ করে সম্মুখ পানে এগুতে লাগলাম। আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এত নিকটবর্তী হয়ে গেলাম যে তাঁর তিলাওয়াতের আওয়ায শুনতে পাচ্ছিলাম। তিনি ফিরে তাকাচ্ছিলেন না কিন্তু আবূ বাকর (রাঃ) বারবার তাকিয়ে দেখছিলেন। এমন সময় হঠাৎ আমার ঘোড়ার সামনের পা দু’টি হাঁটু পর্যন্ত মাটিতে গেড়ে গেল এবং আমি তার উপর হতে পড়ে গেলাম। তখন ঘোড়াটিকে ধমক দিলাম, সে দাঁড়াতে ইচ্ছা করল, কিন্তু পা দু’টি বের করতে পারছিল না। শেষে যখন ঘোড়াটি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উঠল, তখন হঠাৎ তার সামনের পা দু’টি বের করতে পারছিল না। অবশেষে যখন ঘোড়াটি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উঠল, তখন হঠাৎ তার সামনের পা দুটি যেখানে গেড়ে ছিল সেখান হতে ধুঁয়ার মত ধূলি আকাশের দিকে উঠতে লাগল। তখন আমি তীর দিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা করলাম। এবারও যা আমার অপছন্দনীয় তা-ই প্রকাশ পেল। তখন উচ্চস্বরে তাঁদের নিরাপত্তা চাইলাম। এতে তাঁরা থেমে গেলেন এবং আমি আমার ঘোড়ায় আরোহণ করে এলাম। আমি যখন এমন অবস্থায় বার বার বাধাপ্রাপ্ত ও বিপদে পড়ছিলাম তখনই আমার অন্তরে এ বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছিল যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ মিশনটি অচিরেই প্রভাব বিস্তার করবে। তখন আমি তাঁকে বললাম আপনার কওম আপনাকে ধরে দিতে পারলে একশ উট পুরস্কার ঘোষণা করেছে। মক্কায় কাফিরগণ তাঁর সম্পর্কে যে ইচ্ছা করেছে তা তাঁকে জানালাম এবং আমি তাদের জন্য কিছু খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী পেশ করলাম। তাঁরা তা হতে কিছুই নিলেন না। আর আমার কাছে এ কথা ছাড়া কিছুই চাইলেন নাঃ ‘‘আমাদের খবরটি গোপন রেখ’’। এরপর আমি আমাকে একটি নিরাপত্তা লিপি লিখে দেয়ার জন্য তাঁকে অনুরোধ করলাম। তখন তিনি ‘আমির ইবনু ফুহাইরাহকে আদেশ দিলেন। তিনি এক টুকরো চামড়ায় তা লিখে দিলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রওয়ানা দিলেন। ইবনু শিহাব (রহ.) বলেন, ‘উরওয়াহ ইবনু যুবায়র (রাঃ) আমাকে বলেছেন, পথিমধ্যে যুবায়রের সাথে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাক্ষাত হয়। তিনি মুসলমানদের একটি বণিক কাফেলার সাথে সিরিয়া হতে ফিরছিলেন। তখন যুবায়র (রাঃ) রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবূ বাকর (রাঃ)-কে সাদা রঙ্গের পোশাক দান করলেন। এদিকে মদিনায় মুসলিমগণ শুনলেন যে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা হতে মদিনার পথে রওয়ানা হয়েছেন। তাই তাঁরা প্রতিদিন সকালে মদিনার হার্রা পর্যন্ত গিয়ে অপেক্ষা করতেন থাকেন, দুপুরে রোদ প্রখর হলে তারা ঘরে ফিরে আসতেন। একদিন তারা পূর্বাপেক্ষা বেশি সময় প্রতীক্ষা করার পর নিজ নিজ গৃহে ফিরে গেলেন। এমন সময় এক ইয়াহূদী একটি টিলায় আরোহণ করে এদিক ওদিক কি যেন দেখছিল। তখন সে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাথীসঙ্গীদেরকে সাদা পোশাক পরা অবস্থায় মরীচিকাময় মরুভূমির উপর দিয়ে আগমন করতে দেখতে পেল। ইয়াহূদী তখন নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে উচ্চৈঃস্বরে চীৎকার করে বলে উঠল, হে আরব সম্প্রদায়! এইতো সে ভাগ্যবান ব্যক্তি- যার জন্য তোমরা অপেক্ষা করছ। মুসলিমগণ তাড়াতাড়ি হাতিয়ার তুলে নিয়ে মদিনার হাররার উপকন্ঠে নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সঙ্গে মিলিত হলেন। তিনি সকলকে নিয়ে ডানদিকে মোড় নিয়ে বনু ‘আমর ইবনু ‘আউফ গোত্রে অবতরণ করলেন। এদিনটি ছিল রবি‘উল আউয়াল মাসের সোমবার। আবূ বাকর (রাঃ) দাঁড়িয়ে লোকদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। আর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নীরব রইলেন। আনসারদের মধ্য হতে যাঁরা এ পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখেননি তাঁরা আবূ বাকর (রাঃ)-কে সালাম করতে লাগলেন, তারপর যখন রৌদ্রের উত্তাপ নাবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর পড়তে লাগল এবং আবূ বাকর (রাঃ) অগ্রসর হয়ে তাঁর চাদর দিয়ে নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উপর ছায়া করে দিলেন তখন লোকেরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে চিনতে পারল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু ‘আমার ইবনু ‘আউফ গোত্রে দশদিনের চেয়ে কিছু বেশি সময় কাটালেন এবং সে মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন, যা তাক্ওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত! রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতে সালাত আদায় করেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর উঁনীতে আরোহণ করে রওয়ানা হলেন। লোকেরাও তাঁর সঙ্গে চলতে লাগলেন। মদিনায় মসজিদে নাবাবীর স্থানে পৌঁছে উটনীটি বসে পড়ল। সে সময় ঐ স্থানে কতিপয় মুসলিম সালাত আদায় করতেন। এ জায়গাটি ছিল আসআদ ইবনু যুরারাহ এর আশ্রয়ে পালিত সাহল ও সুহায়েল নামক দু’জন ইয়াতীম বালকের খেজুর শুকাবার স্থান। রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে নিয়ে উটনীটি যখন এ স্থানে বসে পড়ল, তখন তিনি বললেন, ইনশাআল্লাহ্, এ স্থানটিই হবে আবাসস্থল। তারপর রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেই বালক দু’টিকে ডেকে পাঠালেন এবং মাসজিদ তৈরির জন্য তাদের কাছে জায়গাটি মূল্যের বিনিময়ে বিক্রয়ের আলোচনা করলেন। তারা বলল, হে আল্লাহর রাসূল! বরং এটি আমরা আপনার জন্য বিনামূল্যে দিচ্ছি। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের কাছ হতে বিনামূল্যে গ্রহণে অসম্মতি জানালেন এবং অবশেষে স্থানটি তাদের হতে খরীদ করে নিলেন। তারপর সেই স্থানে তিনি মাসজিদ তৈরি করলেন। রাসূলূল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাসজিদ নির্মাণকালে সহাবা কেরামের সঙ্গে ইট বহন করছিলেন এবং ইট বহনের সময় তিনি আবৃত্তি করছিলেনঃ এ বোঝা খায়বারের বোঝা বহন নয়। ইয়া রব, এর ভোঝা অত্যন্ত পুণ্যময় ও অতি পবিত্র। তিনি আরো বলছিলেন, হে আল্লাহ্! পরকালের প্রতিদানই প্রকৃত প্রতিদান। সুতরাং আনসার ও মুহাজিরদের প্রতি অনুগ্রহ করুন। এক মুসলিম কবির কবিতা আবৃত্তি করেন, যার নাম আমাকে বলা হয়নি। ইবনু শিহাব (রহ.) বলেন, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এছাড়া অপর কোন পূর্ণ কবিতা পাঠ করছেন বলে, কোন কথা আমার কাছে পৌঁছেনি। (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৬১৮ শেষাংশ, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ৩৬২২ শেষাংশ)
আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - এর স্ত্রী ‘আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আমার মাতা পিতাকে কখনো ইসলাম ছাড়া অন্য কোন দ্বীন পালন করতে দেখিনি এবং এমন কোন দিন কাটেনি যেদিন সকালে কিংবা সন্ধ্যায় রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের বাড়িতে আসেননি। যখন মুসলামানগণ অতিষ্ঠ হয়ে পড়লেন, তখন আবূ বকর (রাঃ) হিজরত করে আবিসিনিয়ায় যাওয়ার উদ্দেশে বের হলেন। শেষ বারকুল গিমাদ পৌঁছলে ইব্নু দাগিনার সাথ তাঁর সাক্ষাৎ হয়। সে ছিল তার গোত্রের নেতা। সে বলল, হে আবূ বক্র! কোথায় যাচ্ছেন? উত্তর আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আমার স্ব-জাতি আমাকে বের করে দিয়েছে তাই আমি মনে করছি, পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াব এবং আমার প্রতিপালকের ইবাদত করব। ইব্নু দাগিনা বলল, হে আবূ বকর (রাঃ)! আপনার মত ব্যক্তি বের হতে পারে না এবং বের করাও হতে পারে না। আপনি তো নিঃস্বদের জন্য উপার্জন করে দেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, অক্ষমদের বোঝা নিজে বহন করেন, মেহমানের মেহমানদারী করে থাকেন এবং সত্য পথের পথিকদের বিপদ আপদে সাহায্য করেন। সুতরাং আমি আপনাকে আশ্রয় দিচ্ছি, আপনাকে যাবতীয় সহযোগিতার ওয়াদা করছি। আপনি ফিরে যান এবং নিজ শহরে আপনার রবের ইবাদত করুন। আবূ বকর (রাঃ) ফিরে এলেন। তাঁর সঙ্গে ইব্নু দাগিনাও এল। ইব্নু দাগিনা বিকেল বেলা কুরাইশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের কাছে গেল এবং তাদেরকে বলল, আবূ বাক্রের মত লোক দেশ হতে বের হতে পারে না এবং তাকে বের করে দেয়া যায় না। আপনারার কি এমন ব্যাক্তিকে বের করবেন, যে নিঃস্বদের জন্য উপার্জন করেন, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন, অক্ষমের বোঝা নিজে বহন করেন, মেহমানের মেহমানদারী করেন এবং ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকার কারণে বিপদ এলে সাহায্য করেন। ইব্নু দাগিনার আশ্রয়দান কুরাইশগণ মেনে নিল এবং তারা ইব্নু দাগিনাকে বলল, তুমি আবূ বকরকে বলে দাও, তিনি যেন তাঁর রবের ইবাদত তাঁর ঘরে করেন। সলাত সেখানেই আদায় করেন, ইচ্ছা মাফিক কুরআন তিলাওয়াত করবেন। কিন্তু এর দ্বারা আমাদের যেন কষ্ট না দেন। আর এসব ব্যাপারে যেন প্রকাশ্যে না করেন। কেননা, আমরা আমাদের মেয়েদের ও ছেলেদের ফিত্নায় পড়ে যাওয়ার ভয় করি। ইব্নু দাগিনা এসব কথা আবূ বকর (রাঃ) কে বলে দিলেন। সে মতে কিছুকাল আবূ বকর (রাঃ) নিজের ঘরে তাঁর রবের ইবাদত করতে লাগলেন। সলাত প্রকাশ্যে আদায় করতেন না এবং ঘরেই কুরআন তিলওয়াত করতেন। এরপর আবূ বাকরের মনে খেয়াল জাগল। তাই তিনি তাঁর ঘরের পার্শ্বেই একটি মসজিদ তৈরি করে নিলেন। এতে তিনি সলাত আদায় করতে ও কুরআন পড়তে লাগলেন। এতে তাঁর কাছে মুশরিকা মহিলা ও যুবকরা ভীড় জমাতে লাগল। তারা আবূ বকর (রাঃ) - এর একাজে বিস্ময়বোধ করত এবং তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকত। আবূ বকর (রাঃ) ছিলেন একজন ক্রন্দনকারী ব্যক্তি, তিনি যখন কুরআন পড়তেন তখন তাঁর অশ্রু সামলিয়ে রাখতে পারতেন না। এ ব্যাপারটি মুশরিকদের নেতৃস্থানীয় কুরাইশদের ভীত করে তুলল এবং তারা ইব্নু দাগিনাকে ডেকে পাঠান। সে এল। তারা তাকে বলল, তোমার আশ্রয় প্রদানের কারণে আমরাও আবূ বক্রকে আশ্রয় দিয়েছিলাম এই শর্তে যে, তিনি তাঁর রবের ইবাদত তাঁর ঘরে করবেন কিন্তু সে শর্ত তিনি ভঙ্গ করেছেন এবং নিজ গৃহের পাশে একটি মসজিদ তৈরি করে প্রকাশ্যে সলাত ও তিলওয়াত শুরু করেছেন। আমাদের ভয় হচ্ছে, আমাদের মহিলা ও সন্তানরা ফিতনায় পড়ে যাবে। কাজেই তুমি তাঁকে নিষেধ করে দাও। তিনি তাঁর রবের ইবাদত তাঁর গৃহের ভিতর সীমাবদ্ধ রাখতে চাইলে তিনি তা করতে পারেন। আর যদি তিনি তা অমান্য করে প্রকাশ্যে তা করতে চান তবে তাঁকে তোমার আশ্রয় প্রদান ও দায় দায়িত্ব ফিরিয়ে দিতে বল। আমরা তোমার আশ্রয় দানের ব্যাপারে বিশ্বাসঘাতকতা করা অত্যন্ত অপছন্দ করি, আবার আবূ বক্রকেও এভাবে প্রকাশ্যে ‘ইবাদাত করার জন্য ছেড়ে দিতে পারি না। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, ইব্নু দাগিনা এসে আবূ বকর (রাঃ) - কে বলল, আপনি অবশ্যই জানেন যে, কী শর্তে আমি আপনার জন্য ওয়াদাবদ্ধ হয়েছিলাম। আপনি হয়ত তাতে সীমিত থাকবেন অন্যথায় আমার জিম্মাদারী আমাকে ফিরত দিবেন। আমি এ কথা মোটেই পছন্দ করি না যে আমার সাথে চুক্তিবদ্ধ এবং আমার আশ্রয়প্রাপ্ত ব্যক্তির প্রতি আমার বিশ্বসঘাতকতার অপবাদ আরববাসীর নিকট প্রকাশিত হোক। আবু বক্র (রাঃ) তাকে বললেন, আমি তোমার আশ্রয় তোমাকে ফিরিয়ে দিচ্ছি। আমি আল্লাহ্র আশ্রয়ের উপর সন্তুষ্ট আছি। এ সময় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কায় ছিলেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুসলিমদের বললেন, আমাকে তোমাদের হিজরতের স্থান (স্বপ্নে) দেখান হয়েছে। সে স্থানে খেজুর বাগান রয়েছে এবং তা দুইটি পাহাড়ের মাঝে অবস্থিত। এরপর যাঁরা হিজরত করতে চাইলেন, তাঁরা মদীনার দিকে হিজরত করলেন। আর যাঁরা হিজরত করে আবিসিনিয়ায় চলে গিয়েছিলেন, তাঁদেরও অধিকাংশ সেখান হতে ফিরে মাদীনহয় চলে আসলেন। আবূ বকর (রাঃ) ও মদীনায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। তখন রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁকে বললেন, তুমি অপেক্ষা কর। আশা করছি আমাকেও অনুমতি দেয়া হবে। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, আমার পিতা আপনার জন্য কুরবান [১]! আপনিও কি হিজরতের আশা করছেন? তিনি বললেন, হাঁ। তখন আবূ বকর (রাঃ) রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - এর সঙ্গ পাওয়ার জন্য নিজেকে হিজরত হতে বিরত রাখলেন এবং তাঁর নিকট যে দু’টি উট ছিল এ দুটি চার মাস পর্যন্ত বাবলা গাছের পাতা খাওয়াতে থাকেন। ইব্নু শিহাব ‘উরওয়াহ (রাঃ) সূত্রে ‘আয়িশা (রাঃ) হতে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, ইতিমধ্যে একদিন আমরা ঠিক দুপুর বেলায় আবূ বকর (রাঃ) এর ঘরে উপবিষ্ট ছিলাম। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে আবূ বক্রকে খবর দিল যে, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মস্তক আবৃত অবস্থায় আসছেন। তা এমন সময় ছিল যে সময় তিনি পূর্বে কথনো আমাদের এখানে আসেননি। আবূ বকর (রাঃ) তাঁর আসার কথা শুনে বললেন, আমার মাতাপিতা তাঁর প্রতি কুরবান। আল্লাহ্র কসম, তিনি এ সময় নিশ্চয় কোন গুরুত্বপূর্ণ কারণেই আসছেন। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পৌঁছে অনুমতি চাইলেন। তাঁকে অনুমতি দেয়া হল। প্রবেশ করে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবূ বক্রকে বললেন, এখানে অন্য যারা আছে তাদের বের করে দাও। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহ্র রসূল! আমার পিতামাতা আপনার প্রতি কুরবান! এখানে তো আপনারই পরিবার। তখন তিনি বললেন, আমাকেও হিজরতের অনুমতি দেয়া হয়েছ। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহ্র রসূল! আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান! আমি আপনার সফর সঙ্গী হতে ইচ্ছুক। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ঠিক আছে। আবূ বকর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহ্র রসূল! আমার পিতামাতা কুরবান! আমার এ দু’টি উট হতে আপনি যে কোন একটি নিন। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তবে মূল্যের বিনিময়ে। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমরা তাঁদের জন্য যাবতয়ি ব্যবস্থা অতি শীঘ্র সম্পন্ন করলাম এবং একটি থলের মধ্যে, তাঁদের খাদ্রসামগ্রী গুছিয়ে দিলাম। আমার বোন আসমা বিনতে আবূ বকর (রাঃ) তার কোমর বন্ধের কিছু অংশ কেটে সে থলের মুখ বেঁধে দিলেন। এ কারণেই তাঁকে ‘জাতুন নেতাক’ (কোমর বন্ধ ওয়ালী) বলা হত। ‘আয়িশা (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও আবূ বকর (রাঃ) সাওর পর্বতের একটি গুহায় আশ্রয় নিলেন। তাঁরা সেখানে তিনটি রাত অবস্থান করলেন। ‘আবদুল্লাহ ইব্নু আবূ বকর (রাঃ) তাঁদের পাশেই রাত্রি যাপন করতেন। তিনি ছিলেন একজন তীক্ষ্ম বুদ্ধিসম্পন্ন তরুণ। তিনি শেষ রাত্রে ওখান হতে বেরিয়ে মক্কায় রাত্রি যাপনকারী কুরাইশদের সঙ্গে মিলিত হতেন এবং তাঁদের দু’জনের বিরুদ্ধে যে ষড়যন্ত্র করা হত তা মনোযোগ দিয়ে শুনতের, ও স্মরণ রাখতেন। যখন আঁধার ঘনিয়ে আসত তখন তিনি সংবাদ নিয়ে তাঁদের উভয়ের কাছে যেতেন। আবূ বকর (রাঃ) - এর গোলাম আমির ইব্নু যুহাইরাহ তাঁদের কাছেই দুধালো বকরীর পাল চরিয়ে বেড়াত। রাতের কিছু সময় চলে গেলে পরে সে বকরীর পাল নিয়ে তাদেঁর নিকটে যেত এবং তাঁরা দু’জন দুধ পান করে আরামে রাত্রিযাপন করতেন। তাঁরা বকরীর দুধ দোহন করে সাথে সাথেই পান করতেন। তারপর শেষ রাতে আমির ইব্নু ফুহাইরাহ বকরীগুলি হাঁকিয়ে নিয়ে যেত। এ তিন রাতের প্রতি রাতে সে এমনই করল। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও আবূ বকর (রাঃ) বানী আবদ ইব্নু আদি গোত্রের এক ব্যক্তিকে মজুরির বিনিময়ে ‘খির্রীত’ (পথ প্রদর্শক) নিযুক্ত করেছিলেন। দক্ষ পথপ্রদর্শককে ‘খির্রীত’ বলা হয়। আদী গোত্রের সাথে তার বন্ধুত্ব ছিল। সে ছিল কাফির কুরাইশের ধর্মাবলম্বী। তাঁরা উভয়ে তাকে বিশ্বস্ত মনে করে তাঁদের উট দু’টি তার হাতে দিয়ে দিলেন এবং তৃতীয় রাত্রের পরে সকালে উট দু’টি সাওর গুহার নিকট নিয়ে আসার প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করলেন। আর সে যথা সময়ে তা পৌঁছিয়ে দিল। আর আমির ইব্নু ফুহাইরাহ ও পথপ্রদর্শক তাঁদের উভয়ের সঙ্গে চলল। প্রদর্শক তাদেঁর নিয়ে উপকূলের পথ ধরে চলতে লাগল। আবদুর রহমান ইব্নু মালিক মুদলেজী আমাকে বলেছেন, তিনি সুরাকাহ ইব্নু মালিকের ভ্রাতুষ্পুত্র। তার পিতা তাকে বলেছেন, তিনি সুরাকাহ ইব্নু জু’শুমকে বলতে শুনেছেন যে, আমাদের নিকট কুরাইশী কাফেরদের দূত আসল এবং রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও আবূ বকর (রাঃ) এর দু’জনের যে কোন একজনকে যে হত্যা করবে অথবা বন্দী করতে পারবে তাকে পুরষ্কার দেয়ার ঘোষণা দিল। আমি আমার কওম বনী মুদলীজের এক মজলিসে উপবিষ্ট ছিলাম। তখন তাদের নিকট হতে এক ব্যক্তি এসে আমাদের নিকটে দাঁড়াল। আমরা বসাই ছিলাম। সে বলল, হে সুরাকাহ! আমি এই মাত্র উপকূলের পথে কয়েকজন মানুষকে যেতে দেখলাম। আমার ধারণা, এরা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সহযাত্রীরা হবেন। সুরাকাহ বলেন, আমি বুঝতে পারলাম যে এঁরা তাঁরাই হবেন। কিন্তু তাকে বললাম, এরা তাঁরা নয়, বরং তুমি অমুক অমুককে দেখছ। এরা এই মাত্র আমাদের সম্মুখ দিয়ে চলে গেল। তারপর আমি কিছুক্ষণ মজলিসে অবস্থান করে চলে এলাম এবং আমার দাসীকে আদেশ করলাম, তুমি আমার ঘোড়াটি বের করে নিয়ে যাও এবং অমুক টিলার আড়ালে ঘোড়াটি ধরে দাঁড়িয়ে থাক। আমি আমার বর্শা হাতে নিলাম এবং বাড়ির পিছন দিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বর্শাটির এক প্রান্ত হাতে ধরে অপর প্রান্ত মাটি হেচড়ানো অবস্থায় আমি টেনে নিয়ে চলছিলাম ঐ অবস্থায় বর্শার মাটি হেচড়ানো অংশ দ্বারা মাটির উপর রেখাপাত করতে করতে আমার ঘোড়ার নিকট পৌঁছলাম এবং ঘোড়ায় আরোহণ করে তাকে খুব দ্রুত ছুটালাম। সে আমাকে নিয়ে ছুটে চলল। আমি প্রায় তাদের নিকট পৌঁছে গেলাম, এমন সময় আমার ঘোড়াটি হোঁচট খেয়ে আমাকে নিয়ে পড়ে গেল। আমিও তার পিঠ হতে ছিটকে পড়লাম। তারপর আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং তূণের দিকে হাত বাড়ালাম এবং তা হতে তীরগুলি বের করলাম ও তীর নিক্ষেপের মাধ্যমে ভাগ্য পরীক্ষা করে নিলাম যে আমি তাদের কোন ক্ষতি করতে পারনো কি-না। তখন তীরগুলি দুর্ভাগ্যবশতঃ এমনভাবে বেরিয়ে এল যে, ভাগ্য নির্ধারণের বেলায় এমন হওয়া পছন্দ করি না। আমি আবার ভাগ্য পরীক্ষার ফলাফল অমান্য করে অশ্বারোহণ করে সম্মুখ পারে এগুতে লাগলাম। আমি রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - এর এত নিকটবর্তী হয়ে গেলাম যে তাঁর তিলাওয়াতের আওয়ায শুনতে পাচ্ছিলাম। তিনি ফিরে তাকাচ্ছিলেন না কিন্তু আবূ বকর (রাঃ) বারবার তাকিয়ে দেখছিলেন। এমন সময় হঠাৎ আমার ঘোড়ার সামনের পা দু’টি হাঁটু পর্যন্ত মাটিতে গেড়ে গেলে এবং আমি তার উপর হতে পড়ে গেলাম। তখন ঘোড়াটিকে ধমক দিলাম, সে দাঁড়াতে ইচ্ছা করল, কিন্তু পা দু’টি বের করতে পারছিল না। শেষে যখন ঘোড়াটি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উঠল, তখন হঠাৎ তার সামনের পা দু’টি বের করতে পারছিল না। অবশেষে যখন ঘোড়াটি সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে উঠল, তখন হঠাৎ তার সামনের পা দু’টি যেখানে গেড়ে ছিল সেখান হতে ধুঁয়ার মত ধূলি আকাশের দিকে উঠতে লাগল। তখন আমি তীর দিয়ে ভাগ্য পরীক্ষা করলাম। এবারও যা আমার অপছন্দনীয় তা-ই প্রকাশ পেল। তখন উচ্চস্বরে তাঁদের নিরাপত্তা চাইলাম। এতে তাঁরা থেমে গেলেন এবং আমি আমার ঘোড়ায় আরোহণ করে এলাম। আমি যখন এমন অবস্থায় বার বার বাধাপ্রাপ্ত ও বিপদে পড়ছিলাম তখনই আমার অন্তরে এ বিশ্বাস দৃঢ় হয়েছিল যে, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর এ মিশনটি অচিরেই প্রভাব বিস্তার করবে। তখন আমি তাঁকে বললাম আপনার কওম আপনাকে ধরে দিতে পারলে একশ উট পুরষ্কার ঘোষণা করেছে। মক্কায় কাফিরগণ তাঁর সম্পর্কে যে ইচ্ছা করেছে তা তাঁকে জানালাম এবং আমি তাদের জন্য কিছু খাবার ও অন্যান্য সামগ্রী পেশ করলাম। তাঁরা তা হতে কিছুই নিলেন না। আর আমার কাছে এ কথা ছাড়া কিছুই চাইলেন নাঃ “আমাদের খবরটি গোপন রেখ”। এরপর আমি আমাকে একটি নিরাপত্তা লিপি লিখে দেয়ার জন্য তাঁকে অনুরোধ করলাম। তখন তিনি ‘আমির ইব্নু ফুহাইরাহকে আদেশ দিলেন। তিনি এক টুকরো চামড়ায় তা লিখে দিলেন। তারপর রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রওয়ানা দিলেন। ইব্নু শিহাব (রহঃ) বলেন, ‘উরওয়াহ ইব্নু যুবায়র (রাঃ) আমাকে বলেছেন, পথিমধ্যে যুবায়রের সাথে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাক্ষাত হয়। তিনি মুসলমানদের একটি বণিক কাফেলার সাথে সিরিয়া হতে ফিরছিলেন। তখন যুবায়র (রাঃ) রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও আবূ বকর (রাঃ) - কে সাদা রঙ্গের পোশাক দান করলেন। এদিকে মদীনায় মুসলিমগণ শুলেন যে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মক্কা হতে মদীনার পথে রওয়ানা হয়েছেন। তাই তাঁরা প্রতিদিন সকালে মদীনার হার্রা পর্যন্ত গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন, দুপুরে রোদ প্রখর হলে তারা ঘরে ফিরে আসতেন। একদিন তারা পূর্বাপেক্ষা বেশি সময় প্রতীক্ষা করার পর নিজ নিজ গৃহে ফিরে গেলেন। এমন সময় এক ইয়াহূদী একটি টিলায় আরোহণ করে এদিক ওদিক কি যেন দেখছিল। তখন সে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর সাথীসঙ্গীদেরকে সাদা পোশাক পর অবস্থায় মরীচিকাময় মরুভূমিরউপর দিয়ে আগমন করতে দেখতে পেল। ইয়াহূদী তখন নিজেকে সংবরণ করতে না পেরে উচ্চ:স্বরে চীৎকার করে বলে উঠল, হে আরব সম্প্রদায়! এইতো সে ভাগ্যবান ব্যক্তি - যার জন্য তোমরা অপেক্ষা করছে। মুসলিমগণ তাড়াতাড়ি হাতিয়ার তুলে নিয়ে মদীনার হার্রার উপকণ্ঠে নিয়ে রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - এর সঙ্গে মিলিত হলেন। তিনি সকলকে নিয়ে ডানদিকে মোড় নিয়ে বনু ‘আমর ইব্নু ‘আউফ গোত্রে অবতরণ করলেন। এদিনটি ছিল রবি’উল আ্উয়াল মাসের সোমবার। আবূ বকর (রাঃ) দাঁড়িয়ে লোকদের সঙ্গে কথা বলতে লাগলেন। আর রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নীরব রইলেন। আনসারদের মধ্য হতে যাঁরা এ পর্যন্ত রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - কে দেখেননি তাঁরা আবূ বকর (রাঃ) - কে সালাম করতে লাগলেন, তারপর যখন রৌদ্রের উত্তাপ নবীজী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর উপর পড়তে লাগল এবং আবূ বকর (রাঃ) অগ্রসর হয়ে তাঁর চাদর দিয়ে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উপর ছায়া করে দিলেন তখন লোকেরা রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - কে চিনতে পারল। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বনু ‘আমার ইব্নু ‘আউফ গোত্রে দশদিনের চেয়ে কিছু বেশি সময় কাটালেন এবং সে মসজিদের ভিত্তি স্থাপর করেন, যা তাক্ওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত! রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এতে সলাত আদায় করেন। তারপর রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর উঁটনীতে আরোহন করে রওয়ানা হলেন। লোকেরাও তাঁর সঙ্গে চলতে লাগলেন। মদীনায় মসজিদে নাবাবীর স্থানে পৌঁছে উটনীটি বসে পড়ল। সে সময় ঐ স্থানে কতিপয় মুসলিম সলাত আদায় করতেন। এ জায়গাটি ছিল আসআদ ইব্নু যুরারাহ এর আশ্রয়ে পালিত সাহল ও সুহায়েল নামক দু’জন ইয়াতীম বালকের খেজুর শুকাবার স্থান। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কে নিয়ে উটনীটি যখন এ স্থানে বসে পড়ল, তখন তিনি বললে, ইন্ শা আল্লাহ্, এ স্থানটিই হবে আবাসস্থল। তারপর রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেই বালক দু’টিকে ডেকে পাঠালেন এবং মসজিদ তৈরির জন্য তাদের কাছে জায়গাটি মূল্যের বিনিময়ে বিক্রয়ের আলোচনা করলেন। তারা বলল, হে আল্লাহ্র রসূল! বরং এটি আমরা আপনার জন্য বিনুমূল্যে দিচ্ছি। কিন্তু রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের কাছ হতে বিনামূল্যে গ্রহণে অসম্মতি জানালেন এবং অবশেষে স্থানটি তাদের হতে খরীদ করে নিলেন। তারপর সেই স্থানে তিনি মসজিদ তৈরি করলেন। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মসজিদে নির্মাণকালে সহাবা কেরামের সঙ্গে ইট বহন করছিলেন এবং ইট বহনের সময় তিনি আবৃত্তি করছিলেনঃ এ বোঝা খায়বারের বোঝা বহন নয়। ইয়া রব, এর বোঝা অত্যন্ত পূণ্যময় ও অতি পবিত্র। তিনি আরো বলছিলেন, হে আল্লাহ! পরকালের প্রতিদানই প্রকৃত প্রতিদান। সুতরাং আনসার ও মুহাজিরদের প্রতি অনুগ্রহ করুন। এক মুসলিম কবির কবিতা আবৃত্তি করেন, যার নাম আমাকে বলা হয়নি। ইব্নু শিহাব (রহঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এছাড়া অপর কোন পূর্ণ কবিতা পাঠ করছেন বলে, কোন কথা আমার কাছে পৌঁছেনি। (আধুনিক প্রকাশনীঃ ৩৬১৮ শেষাংশ, ইসলামী ফাউন্ডেশনঃ ৩৬২২ শেষাংশ)
আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইব্নু ‘উমার ইব্নু খাত্তাবের নাতি আসিম ইব্নু সাবিত আনসারীর পরিচালনায় দশজন সাহাবীর একটি দল গোয়েন্দা কাজের জন্য পাঠালেন। তাঁরা উসফান ও মক্কার মধ্যবর্তী স্থান হান্দায় পৌঁছলে হুযাইল গোত্রের একটি শাখা বানু লিহয়ানকে তাদের আগমনের কারণ সম্পর্কে জানানো হয়। (এ সংবাদ শুনে) তারা প্রায় একশ’ জন তীরন্দাজ প্রস্তুত হয়ে মুসলিমদের বিপক্ষে যুদ্ধ করার জন্য রওয়ানা হয়ে তাদের পদচিহ্ন ধরে পথ চলতে আরম্ভ করে। যেতে যেতে তারা এমন জায়গায় পৌঁছে যায় যেখানে অবস্থান করে সাহাবীগণ খেজুর খেয়েছিলেন। তা দেখে বানু লিহ্য়ানের লোকেরা ইয়াসরিবের খেজুর বলে তাদের পদচিহ্ন অনুসরণ করে তাদেরকে খুঁজতে লাগল। আসিম ও তাঁর সঙ্গীগণ তাদের আগমন সম্পর্কে বুঝতে পেরে একটি স্থানে গিয়ে আশ্রয় নেন। লিহয়ান কাওমের লোকেরা তাদেরকে ঘিরে ফেলে। তারপর তারা মুসলিমদেরকে নিচে নেমে আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়ে বলল, তোমাদেরকে ওয়াদা দিচ্ছি, আমরা তোমাদের কাউকে হত্যা করব না। তখন আসিম ইব্নু সাবিত (রাঃ) বললেন, হে আমার সাথী ভ্রাতৃবৃন্দ! কাফিরের নিরাপত্তায় আশ্বস্ত হয়ে আমি কখনো নিচে নামবো না। তারপর তিনি বললেন, হে আল্লাহ্! আমাদের খবর আপনার নাবীকে জানিয়ে দিন। এরপর তারা মুসলিমদের প্রতি তীর ছুঁড়তে শুরু করল এবং ‘আসিমকে (ছয়জন সহ) শহীদ করে ফেলল। বাকী তিনজন, খুবায়ব, যায়দ ইব্নু দাসিনা এবং অপর একজন তাদের ওয়াদা ও প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে তাদের নিকট নেমে আসলেন। শত্রুগণ তাঁদেরকে পরাস্ত করে নিজেদের ধনুকের রশি খুলে তা দিয়ে তাদেরকে বেঁধে ফেলল। এ দেখে তৃতীয়জন বললেন, এটাই প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা। আল্লাহ্র কসম, আমি তোমাদের সঙ্গে যাব না, আমার জন্য শহীদ সঙ্গীদের আদর্শই অনুসরণীয়। অর্থাৎ আমিও শহীদ হয়ে যাব। তারা তাকে বহু টানা হেচড়া করল। কিন্তু তিনি তাদের সঙ্গে যেতে অস্বীকার করলেন। (তারা তাঁকে শহীদ করে দিল) এরপর খুবায়ব এবং যায়িদ ইব্নু দাসিনাকে নিয়ে গিয়ে তাদেরকে বিক্রি করে দিল। এটা ছিল বদর যুদ্ধের পরের ঘটনা। বদর যুদ্ধে খুবায়ব যেহেতু হারিস ইব্নু আমিরকে হত্যা করেছিলেন। তাই (বদলা নেয়ার জন্য) হারিস ইব্নু আমির ইব্নু নাওফিলের পুত্রগণ তাঁকে ক্রয় করে নিল। খুবায়ব তাদের নিকট বন্দী অবস্থায় কাটাতে লাগলেন। এরপর তারা সবাই তাকে হত্যা করার দৃঢ় সংকল্প করল। তিনি হারিসের কোন এক কন্যার নিকট থেকে ক্ষৌরকর্মের জন্য একটি ক্ষুর চেয়ে নিলেন। হারিসের কন্যার অসতর্ক অবস্থায় তার একটি ছোট বাচ্চা খুবাইবের কাছে গিয়ে পৌঁছল। হারিসের কন্যা দেখতে পেল খুবায়র তার বাচ্চাকে কোলে নিয়ে রানের উপর বসিয়ে ক্ষুরখানা হাতে ধরে আছেন। হারিসের কন্যা বর্ণনা করেছে, আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম, খুবায়ব তা বুঝতে পারলেন, তিনি বললেন, আমি শিশুটিকে মেরে ফেলব বলে তুমি কি ভয় পেয়েছ? আমি কখনো এমন কাজ করব না। সে আরো বলেছে, আল্লাহ্র কসম! আমি খুবায়বের মত উত্তম বন্দী আর কখনো দেখিনি। আল্লাহ্র কসম একদিন আমি তাকে আঙ্গুরের গুচ্ছ হাতে নিয়ে আঙ্গুর খেতে দেখেছি। অথচ সে লোহার শিকলে বাঁধা ছিল এবং সে সময় মক্কায় কোন ফলই ছিল না। হারিসের কন্যা বলত, ঐ আঙ্গুরগুলো আল্লাহ্ তা‘আলা খুবায়বকে রিয্কস্বরূপ দান করেছিলেন। অবশেষে একদিন তারা খুবায়বকে হত্যা করার জন্য যখন হারামের সীমানার বাইরে নিয়ে গেল তখন খুবায়ব (রাঃ) তাদেরকে বললেন, আমাকে দু’ রাক’আত সালাত আদায় করার সুযোগ দাও, তারা সুযোগ দিলে তিনি দু’ রাক‘আত সালাত আদায় করে বললেন, আল্লাহ্র কসম। আমি মৃত্যু ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছি, তোমরা এ কথা না ভাবলে আমি সালাত আরো দীর্ঘায়িত করতাম। এরপর তিনি এ বলে দু’আ করলেন, হে আল্লাহ্! তাদেরকে এক এক করে গুণে রাখ, তাদেরকে বিক্ষিপ্তভাবে হত্যা কর এবং তাদের একজনকেও বাকী রেখ না। এরপর তিনি আবৃত্তি করলেনঃ “আমি যখন মুসলিম হয়ে মৃত্যুর সৌভাগ্য লাভ করেছি, তাই আমার কোনই ভয় নেই। আল্লাহ্র সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যে কোন অবস্থাতেই আমার মৃত্যু হোক। তা যেহেতু একমাত্র আল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্যই, তাই তিনি ইচ্ছে করলে আমার প্রতিটি কর্তিত অঙ্গে বারাকাত প্রদান করতে পারেন।” এরপর হারিসের পুত্র আবূ সারুআ ‘উকবাহ তাঁর দিকে দাঁড়াল এবং তাঁকে শহীদ করে দিল। এভাবেই খুবায়ব (রাঃ) সে সব মুসলিমের জন্য দু’ রাক’আত সলাতের সুন্নত চালু করে গেলেন যারা ধৈর্যের সঙ্গে শাহাদাত বরণ করেন। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঐদিনই সাহাবীদেরকে জানিয়েছিলেন যে দিন তাঁরা শত্রু বেষ্টিত হয়ে শাহাদাত বরণ করেছিলেন। কুরাইশদের নিকট আসিম (রাঃ)-এর নিহত হওয়ার খবর পৌছলে তারা নিশ্চিত হওয়ার জন্য আসিমের শরীরের কোন অঙ্গ কেটে আনার জন্য কতক কুরাইশ কাফিরকে প্রেরণ করল। যেহেতু (বাদ্রের দিন) আসিম ইব্নু সাবিত তাদের একজন বড় নেতাকে হত্যা করেছিলেন। এদিকে আল্লাহ্ ‘আসিমের লাশকে হিফাযাত করার জন্য মেঘের মত এক ঝাঁক মৌমাছি পাঠিয়ে দিলেন। মৌমাছিগুলো আসিম (রাঃ)-এর লাশকে শত্রু সেনাদের হাত থেকে রক্ষা করল। ফলে তারা তাঁর দেহের কোন অঙ্গ কেটে নিতে পারল না। কা‘ব ইব্নু মালিক (রাঃ) বলেন, মুরারাহ ইব্নু রাবী‘ আল ‘উমারী এবং হিলাল ইব্নু ‘উমাইয়াহ আল ওয়াকিফী [১০] সম্পর্কে লোকেরা বলেছেন যে, তাঁরা দু’জনই আল্লাহ্র নেক বান্দা ছিলেন এবং দু’জনই বদর যুদ্ধে যোগদান করেছিলেন। [৩০৪৫] (আ.প্র. ৩৬৯৪, ই.ফা. ৩৬৯৭)
আবূ হুরাইরাহ্ (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আসিম ইবনু ‘উমার ইবনু খাত্তাব (রাঃ)এর নানা আসিম ইবনু সাবিত আনসারী (রাঃ) এর নেতৃত্বে একটি গোয়েন্দা দল প্রেরণ করলেন। যেতে যেতে তারা ‘উসফান ও মাক্কাহ্য় মধ্যবর্তী স্থানে পৌছলে হুযায়ল গোত্রের একটি শাখা বানী লিহ্ইয়ানের নিকট তাঁদের আগমনের কথা জানিয়ে দেয়া হল। এ সংবাদ পাওয়ার পর বানী লিহ্ইয়ানের প্রায় একশ’ তীরন্দাজ তাদের ধাওয়া করল। দলটি তাদের (মুসলিম গোয়েন্দা দলের) পদচিহ্ন অনুসরণ করে এমন এক স্থানে গিয়ে পৌছল, যে স্থানে অবতরণ করে সাহাবীগন খেজুর খেয়েছিলেন। তারা সেখানে খেজুরের আঁটি দেখতে পেল যা সাহাবীগন মাদীনাহ থেকে পাথেয়রূপে এনেছিলেন। তখন তারা বলল, এগুলো তো ইয়াসরিবের খেজুর (এর আঁটি)। এর পর তারা পদচিহ্ন ধরে খুঁজতে খুঁজতে শেষ পর্যন্ত তাঁদেরকে ধরে ফেলল। আসিম ও তাঁর সাথীগণ বুঝতে পেরে ফাদফাদ নামক টিলায় উঠে আশ্রয় নিলেন। এবার শত্র“দল এসে তাঁদেরকে ঘিরে ফেলল এবং বলল, আমরা তোমাদেরকে প্রতিশ্র“তি দিচ্ছি, যদি তোমরা নেমে আস তাহলে আমরা তোমাদের একজনকেও হত্যা করব না। আসিম (রাঃ) বললেন, আমি কোন কাফেরের প্রতিশ্র“তিতে আশ্বস্ত হয়ে এখান থেকে অবতরণ করব না। হে আল্লাহ! আমাদের এ সংবাদ আপনার রসূলের নিকট পৌছিয়ে দিন। এর পর তারা মুসলিম গোয়েন্দা দলের প্রতি আক্রমন করল এবং তীর বর্ষন করতে শুরু করল। এভাবে তারা আসিম (রাঃ) সহ সাতজনকে তীর নিক্ষেপ করে শহীদ করে দিল। এখন শুধু বাকী থাকলেন খুবায়ব (রাঃ), যায়দ (রাঃ) এবং অপর একজন (‘আবদুল্লাাহ ইবনু তারিক) সাহাবী (রাঃ)। পুনরায় তারা তাদেরকে ওয়াদা দিল। এই ওয়াদায় আশ্বস্ত হয়ে তাঁরা তাদের কাছে নেমে এলেন। এবার তারা তাঁদেরকে কাবু করে ফেলার পর নিজেদের ধনুকের তার খুলে এর দ্বারা তাঁদেরকে বেঁধে ফেলল। এ দেখে তাঁদের সাথী তৃতীয় সাহাবী (‘আবদুল্লাহ ইবনু তারিক) (রাঃ) বললেন, এটাই প্রথম বিশ্বাসঘাতকতা। তাই তিনি সঙ্গে যেতে অস্বীকার করলেন। তারা তাঁকে তাদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য বহু টানা-হেঁচড়া করল এবং বহু চেষ্টা করল। কিন্তু তিনি তাতে রাযী হলেন না। অবশেষে কাফিররা তাঁকে শহীদ করে দিল এবং খুবায়ব ও যায়দ (রাঃ) কে মক্কার বাজারে নিয়ে বিক্রি করে দিল। বানী হারিস ইবনু আমির ইবনু নাওফল গোত্রের লোকেরা খুবায়ব (রাঃ) কে কিনে নিল। কেননা বদর যুদ্ধের দিন খুবায়ব (রাঃ) হারিসকে হত্যা করেছিলেন। তাই তিনি তাদের নিকট বেশ কিছু দিন বন্দী অবস্থায় কাটান। অবশেষে তারা তাকে তাঁকে হত্যা করার দৃঢ় সংকল্প করলে তিনি নাভির নিচের পশম পরিষ্কার করার জন্য হারিসের কোন এক কন্যার নিকট থেকে একখানা ক্ষুর চাইলেন। সে তাঁকে তা দিল। (পরবর্তীকালে মুসলিম হওয়ার পর) হারিসের উক্ত কন্যা বর্ণনা করেছেন যে, আমি আমার একটি শিশু বাচ্চা সম্পর্কে অসাবধান থাকায় সে পায়ে হেঁটে তাঁর কাছে চলে যায় এবং তিনি তাকে স্বীয় উরুর উপর বসিয়ে রাখেন। এ সময় তাঁর হাতে ছিল সেই ক্ষুর। এ দেখে আমি অত্যন্ত ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ি। খুবায়ব (রাঃ) তা বুঝতে পেরে বললেন, তাকে মেরে ফেলব বলে তুমি কি ভয় পাচ্ছ? ইনশাআল্লাহ আমি তা করার নই। সে (হারিসের কন্যা) বলত, আমি খুবায়ব (রাঃ) থেকে উত্তম বন্দী আর কখনও দেখেনি। আমি তাকে আঙ্গুরের থোকা থেকে আঙ্গুর খেতে দেখেছি। অথচ তখন মাক্কাহ্য় কোন ফলই ছিল না। অধিকন্তু তিনি তখন লোহার শিকলে আবদ্ধ ছিলেন। এ আঙ্গুর তার জন্য আল্লাহর তরফ থেকে প্রদত্ত রিযিক ব্যতীত আর কিছুই নয়। এরপর তারা তাঁকে হত্যা করার জন্য হারামের বাইরে নিয়ে গেল। তিনি তাদেরকে বললেন, আমাকে দু’রাকাত সালাত আদায় করার সুযোগ দাও। (সালাত আদায় করে) তিনি তাদের কাছে ফিরে এসে বললেন, আমি মৃত্যুর ভয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছি, তোমরা যদি এ কথা মনে না করতে তাহলে আমি (সালাতকে) আরো দীর্ঘায়িত করতাম। হত্যার পূর্বে দু‘রাকআত সালাত আদায়ের সুন্নাত প্রবর্তন করেছেন তিনিই। এরপর তিনি বললেন, হে আল্লাহ! তাদেরকে এক এক করে গুনে রাখুন। এরপর তিনি দুটি পংক্তি আবৃত্তি করলেন- “যেহেতু আমি মুসলিম হিসেবে মৃত্যুবরণ করছি তাই আমার শঙ্কা নেই, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশে যে কোন পার্শ্বে আমি ঢলে পড়ি। আমি যেহেতু আল্লাহর পথেই মৃত্যুবরণ করছি তাই ইচ্ছা করলে, আল্লাহ ছিন্নভিন্ন প্রতিটি অঙ্গে বারাকাত দান করতে পারেন।” এরপর ‘উকবাহ ইবনু হারিস তাঁর দিকে এগিয়ে গেল এবং তাঁকে শহীদ করে দিল। কুরায়শ গোত্রের লোকেরা আসিম (রাঃ)-এ শাহাদাতের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাঁর মৃতদেহ থেকে কিছু অংশ নিয়ে আসার জন্য লোক পাঠিয়েছিল। কারণ আসিম (রাঃ) বদর যুদ্ধের দিন তাদের একজন বড় নেতাকে হত্যা করেছিলেন। তখন আল্লাহ মেঘের মতো এক ঝাঁক মৌমাছি পাঠিয়ে দিলেন, যা তাদের প্রেরিত লোকদের হাত থেকে আসিম (রাঃ)-কে রক্ষা করল। ফলে তাঁরা তাঁর দেহ থেকে কোন অংশ নিতে সক্ষম হল না। [৩০৪৫] (আ.প্র. ৩৭৮০, ই.ফা. ৩৭৮৩)
‘আবদুল্লাহ্ ইব্নু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
তিনি বলেন, আমি বহুদিন ধরে উৎসুক ছিলাম যে, আমি ‘উমার ইব্নু খাত্তাব (রাঃ) - এর নিকট জিজ্ঞেস করব, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - এর স্ত্রীগণের মধ্যে কোন্ দু’জনের ব্যাপারে আল্লাহ্ তা’আলা এ আয়াত অবতীর্ণ করেছেনঃ “তোমরা দু’জন যদি অনুশোচনারভরে আল্লাহ্র দিকে ফিরে আস (তবে তা তোমাদের জন্য উত্তম), তোমাদের অন্তর (অন্যায়ের দিকে) ঝুঁকে পড়েছে।” (সূরাহ আত-তাহরীম ৬৬: ৪) এরপর একবার তিনি [‘উমার(রাঃ)] হাজ্জের জন্য রওয়ানা হলেন এবং আমিও তাঁর সঙ্গে হাজ্জে গেলাম। (ফিরে আসার পথে) তিনি ইস্তিনজার জন্য রাস্তা থেকে সরে গেলেন। আমি পানি পূর্ণ পাত্র হাতে তাঁর সঙ্গে গেলাম। তিনি ইস্তিনজা করে ফিরে এলে আমি ওযূর পানি তাঁর হাতে ঢেলে দিতে লাগলাম। তিনি যখন ওযূ করছিলেন, তখন আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করলাম, হে আমীরুল মু’মুনীন! নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - এর সহধর্মিণীগণের মধ্যে কোন্ দু’জন, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেনঃ “তোমরা দু’জন যদি আল্লাহ্র কাছে তাওবাহ কর (তবে তোমাদের জন্য উত্তম), কেননা তোমাদের মন সঠিক পথ থেকে সরে গেছে।” জবাবে তিনি বলেন, হে ইব্নু ‘আব্বাস! আমি তোমরা প্রশ্ন শুনে অবাক হচ্ছি। তাঁরা দু’জন তো ‘আয়িশাহ্ (রাঃ) ও হাফসা (রাঃ)। এরপর ‘উমার (রাঃ) এ ঘটনাটি বর্ণনা করলেন, “আমি এবং আমার একজন আনসারী প্রতিবেশী যিনি উমাইয়াহ ইব্নু যায়দ গোত্রের লোক এবং তাঁর মদীনার উপকন্ঠে বসবাস করত। আমরা রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সঙ্গে পালাক্রমে সাক্ষাৎ করতাম। সে একদিন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - এর দরবারে যেত, আমি আর একদিন যেতাম। যখন আমি দরবারে যেতাম, ঐ দিন দরবারে ওয়াহী অবতীর্ণসহ যা ঘটত সবকিছুর খবর আমি তাকে দিতাম এবং সেও তেমনি খবর আমাকে দিত। আমরা কুরাইশরা নিজেদের স্ত্রীগণের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে রেখেছিলাম। কিন্তু আমরা যখন আনসারদের মধ্যে এলাম, তখন দেখতে পেলাম, তাদের স্ত্রীগণ তাদের ওপর প্রভাব বিস্তার করে আছে এবং তাদের ওপর কর্তৃত্ব করে চলেছে। সুতরাং আমাদের স্ত্রীরাও তাদের দেখাদেখি সেরূপ ব্যবহার করতে লাগল। একদিন আমি আমার স্ত্রীর প্রতি নারাজ হলাম এবং তাকে উচ্চৈঃস্বরে কিছু বললাম, সেও প্রতি-উত্তর দিল। আমার কাছে এ রকম প্রতি-উত্তর দেয়াটা অপছন্দ হল। সে বলল, আমি আপনার কথার পাল্টা উত্তর দিচ্ছি এতে অবাক হচ্ছেন কেন? আল্লাহ্র কসম, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - এর স্ত্রীগণ তাঁর কথার মুখে মুখে পাল্টা উত্তর দিয়ে থাকেন এবং তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ আবার একদিন এক রাত পর্যন্ত কথা না বলে কাটান। [‘উমার (রাঃ) বলেন], এ কথা শুনে আমি ঘাবড়ে গেলাম এবং আমি বললাম, তাদের মধ্যে যারা এরূপ করেছে, তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এরপর আমি আমার কাপড় পরলাম এবং আমার কন্যা হাফসার ঘরে প্রবেশ করলাম এবং বললামঃ হাফ্সা! তোমাদের মধ্য থেকে কারো প্রতি রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি সারা দিন রাত পর্যন্ত অসন্তুষ্ট থাকেননি? সে উত্তর করল, হ্যাঁ। আমি বললাম, তুমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তোমরা কি এ ব্যাপারে ভীতি হচ্ছো না যে, রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - এর অসন্তুষ্টির কারণে আল্লাহ্ অসন্তুষ্ট হয়ে যাবেন? পরিণামে তোমরা ধবংসের মধ্যে পড়ে যাবে। সুতারাং তুমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - এর কাছে অতিরিক্ত কোন জিনিস দাবি করবে না এবং তাঁর কথার প্রতি-উত্তর করবে না এবং তাঁর সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করবে না। তোমার যদি কোন কিছুর প্রয়োজন হয়, তবে আমার কাছে চেয়ে নেবে। আর তোমার সতীন তোমার চেয়ে অধিক রূপবতী এবং রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - এর অধিক প্রিয় - তা যেন তোমাকে বিভ্রান্ত না করে। এখানে সতীন বলতে ‘আয়িশা (রাঃ) - কে বোঝানো হয়েছে। ‘উমার (রাঃ) আরো বলেন, এ সময় আমাদের মধ্যে এ কথা ছড়িয়ে পড়েছিল যে, গাস্সানের শাসনকর্তা আমাদের ওপর আক্রমণ চালাবার উদ্দেশে তাদের ঘোড়াগুলোকে প্রস্তুত করছে। আমার প্রতিবেশী আনসার তার পালার দিন রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - এর খিদমাত থেকে রাতে ফিরে এসে আমার দরজায় খুব জোরে করঘাত করল এবং জিজ্ঞেস করল, আমি ঘরে আছি কিনা? আমি শংকিত অবস্থায় বেরিয়ে এলাম। সে বলল, আজ এক বিরাট ঘটনা ঘটে গেছে। আমি বললাম, সেটা কী? গ্যাস্সানিরা কি এসে গেছে? সে বলল, না তাঁর চেয়েও বড় ঘটনা এবং তা ভয়ংকর। রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সহধর্মিণীগণকে ত্বলাক্ব দিয়েছেন। আমি বললাম, হাফ্সা তো ধ্বংস হয়ে গেল, ব্যর্থ হলো। আমি আগেই ধারণা করেছিলাম, খুব শিগগিরই এ রকম কিছু ঘটবে। এরপর আমি পোশাক পরলাম এবং ফাজ্রের সলাত নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - এর সঙ্গে আদায় করলাম। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ওপরের কামরায় (মাশরুবা) একাকী আরোহন করলেন, আমি তখন হাফ্সার কাছে গেলাম এবং তাকে কাঁদতে দেখলাম। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কাঁদছ কেন? আমি কি তোমাকে এ ব্যাপারে আগেই সতর্ক করে দেইনি? নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি তোমাদের সকলকে ত্বলাক্ব দিয়েছেন? সে বলল আমি জানি না। তিনি ওখানে ওপরের কামরায় একাকী রয়েছেন। আমি সেখান থেকে বেরিয়ে মিম্বারের কাছে বসলাম। সেখানে কিছু সংখ্যক লোক বসা ছিল এবং তাদের মধ্যে অনেকেই কাঁদছিল। আমি তাদের কাছে কিছুক্ষণ বসলাম, কিন্তু আমার প্রাণ এ অবস্থা সহ্য করতে পারছিল না। সুতরাং যে ওপরের কামরায় নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) অবস্থান করছিলেন আমি সেই ওপরের কামরায় গেলাম এবং তাঁর হাবশী কালো খাদিমকে বললাম, তুমি কি ‘উমারের জন্য নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - এর কাছে যাবার অনুমতি এনে দেবে? খাদিমটি গেল এবং নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - এর সঙ্গে কথা বলল। ফিরে এসে উত্তর করল, আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - এর কাছে আপনার কথা বলেছি, কিন্তু তিনি নিরুত্তর আছেন। তখন আমি ফিরে এলাম এবং যেখানে লোকজন বসা ছিল সেখানে বসলাম। কিন্তু এ অবস্থা আমার কাছে অসহ্য লাগছিল। তাই আবার এসে খাদেমকে বললাম, তুমি কি ‘উমারের জন্য অনুমতি এনে দিবে? সে গেল এবং ফিরে এসে বলল, আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - এর কাছে আপনার কথা বলেছি কিন্তু তিনি নিরুত্তর ছিলেন। তখন আমি আবার ফিরে এসে মিম্বরের কাছে ঐ লোকজনের সঙ্গে বসলাম। কিন্তু এ অবস্থা আমার আকছে অসহ্য লাগছিল। পুনরায় আমি খাদেমের কাছে গেলাম এবং বললাম, তুমি কি ‘উমারের জন্য অনুমতি এনে দিবে? সে গেল এবং আমাকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগল, আমি আপনার কথা উল্লেখ করলাম; কিন্তু তিনি নিরুত্তর আছেন। যখন আমি ফিরে যাবার উদ্যোগ নিয়েছি, এমন সময় খাদিমটি আমাকে ডেকে বলল, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনাকে অনুমতি দিয়েছেন। এরপর আমি রসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - এর নিকট প্রবেশ করে দেখলাম, তিনি খেজুরের চাটাইর ওপর চাদরবিহীন অবস্থায় খেজুরের পাতা ভর্তি একটি বালিশে ভর দিয়ে শুয়ে আছেন। তাঁর শরীরে পরিস্কার চাটাইয়ের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। আমি তাঁকে সালাম করলাম এবং দাঁড়ানো অবস্থাতেই জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহ্র রসূল! আপনি কি আপনার স্ত্রীগণকে ত্বলাক দিয়েছেন? তিনি আমার দিকে চোখ ফিরিয়ে বললেন, না (অর্থাৎ ত্বলাক দেইনি)। আমি বললাম, আল্লাহু আকবার। এরপর কথাবার্তা হালকা করার উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে থেকেই বললাম, হে আল্লাহ্র রসূল! আপনি যদি শোনেন তাহলে বলিঃ আমরা কুরাইশগণ, মহিলাদের উপর আমাদের প্রতিপত্তি খাটাতাম; কিন্তু আমরা মদীনায় এসে দেখলাম, এখানকার পুরুষদের উপর নারীদের প্রভাব-প্রতিপত্তি বিদ্যমান। এ কথা শুনে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মুচকি হাসলেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রসূল! যদি আপনি আমার কথার দিকে একটু নজর দেন। আমি হাফ্সার কাছে গেলাম এবং আমি তাকে বললাম, তোমার সতীনের রূপবতী হওয়া ও রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) - এর প্রিয় পাত্রী হওয়া তোমাকে যেন ধোঁকায় না ফেলে। এর দ্বারা ‘আয়িশা (রাঃ) - এর প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আবার মুচকি হাসলেন। আমি তাঁকে হাসতে দেখে বসে পড়লাম। এরপর আমি তাঁর ঘরের চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম। আল্লাহ্র কসম! কেবল তিনটি চামড়া ব্যতীত আর আমি তাঁর ঘরে উল্লেখ করার মত কিছুই দেখতে পেলাম না। তারপর আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রসূল! দু’আ করুন, আল্লাহ্ তা’আলা যাতে আপনার উম্মাতদের সচ্ছলতা দান করেন। কেননা, পারসিক ও রোমানদের প্রাচুর্য দান করা হয়েছে এবং তাদের দুনিয়ার আরাম প্রচুর পরিমাণে দান করা হয়েছে; অথচ তারা আল্লাহ্র ‘ইবাদাত করে না। এ কথা শুনে হেলান দেয়া অবস্থা থেকে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সোজা হয়ে বসে বললেন, হে খাত্তাবের পুত্র! তুমি কি এখনো এ ধারণা পোষণ করছ? ওরা ঐ লোক, যারা উত্তম কাজের প্রতিদান এ দুনিয়ায় পাচ্ছে! আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রসূল, আমার ক্ষমার জন্য আল্লাহ্র কাছে দোয়া করুন। হাফ্সা (রাঃ) কর্তৃক ‘আয়িশা (রাঃ) - এর কাছে কথা ফাঁস করে দেয়ার কারণে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ঊনত্রিশ দিন তাঁর স্ত্রীগণ থেকে আলাদা থাকেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছিলেন, আমি এক মাসের মধ্যে তাদের কাছে যাব না তাদের প্রতি গোস্বার কারণে। তখন আল্লাহ্ তা’আলা তাঁকে মৃদু ভর্ৎসনা করেন। সুতরাং যখন ঊনত্রিশ দিন হয়ে গেল, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সর্বপ্রথম ‘আয়িশা (রাঃ)-এর কাছে গেলেন এবং তাঁকে দিয়েই শুরু করলেন। ‘আয়িশা (রাঃ) তাঁকে বললেন, হে আল্লাহ্র রসূল! আপনি কসম করেছেন যে, একমাসের মধ্যে আমাদের কাছে আসবেন না; কিন্তু এখন তো ঊনত্রিশ দিনেই এসে গেলেন। আমি প্রতিটি দিন এক এক করে হিসাব করে রেখেছি। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ঊনত্রিশ দিনেও একমাস হয়। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, এ মাস ২৯ দিনের। ‘আয়িশা (রাঃ) আরও বলেন, ঐ সময় আল্লাহ্ তা’আলা ইখতিয়ারের আয়াত অবতীর্ণ করেন [১৮] এবং তিনি তাঁর স্ত্রীগণের মধ্যে আমাদে দিয়েই শুরু করেন এবং আমি তাঁকেই গ্রহণ করি। এরপর তিনি অন্য স্ত্রীগণের অভিমত চাইলেন। সকলেই তাই বলল, যা ‘আয়িশা (রাঃ) বলেছিলেন।(আধুনিক প্রকাশনী- ৪৮০৯, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৪৮১২)
ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
তিনি বলেন, আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর স্ত্রীগণের মধ্যে থেকে যে দু’জন মহিলা সম্পর্কে ‘উমার (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করার জন্য বহুদিন যাবৎ আগ্রহ প্রকাশ করে আসছিলাম যাদের সম্পর্কে আল্লাহ বলেছেনঃ “তোমাদের দু’জনের হৃদয় অন্যায় প্রবণ হয়েছে মনে করে তোমরা যদি অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহ্র দিকে ফিরে আসো তাহলে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করবেন”। (সূরাহ্ আত্ তাহরীম ৬৬ : ৪) পরিশেষে ‘উমার (রাঃ) হাজ্জ পালনের জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন এবং আমিও হাজ্জ পালনের জন্য তাঁর সফরসঙ্গী হলাম। এরপর (হাজ্জ সমাপন করে ফেরার পথে) আমরা কোন এক রাস্তা দিয়ে চলার সময় ‘উমার (রাঃ) এক পার্শ্বে মোড় নিলেন। আমিও পানির বদনাসহ তাঁর সঙ্গে রাস্তার পাশে গেলাম। তিনি তাঁর হাজত পূরণ করলেন এবং আমার কাছে এলেন। আমি তাঁর উভয় হাতে পানি ঢাললাম, তিনি ওযু করে নিলেন। তখন আমি বললাম, হে আমীরুল মুমিনীন! নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রীগণের সে দুজন মহিলা কারা ছিলো যাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেনঃ ‘উমার (রাঃ)বললেন, হে ইবনু ‘আব্বাস! এতো তোমার জন্য আশ্চর্যের বিষয় বলে মনে হচ্ছে (তুমি এত বিলম্বে এই বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে কেন?) যুহরী (রহঃ) বলেন, আল্লাহর কসম! তিনি [‘উমার (রাঃ)] জিজ্ঞাসিত বিষয়টি (ইবনু ‘আব্বাসের এ বিষয়ে বিলম্বে প্রশ্ন করাকে) অপছন্দ করলেও তা বর্ণনা করতে কিছুই গোপন করলেন না। তিনি বললেন, তাঁরা দুজন ছিল হাফ্সাহ্ ও ‘আয়িশা (রাঃ)। এরপর তিনি ঘটনার বিবরণ দিতে লাগলেন। তিনি বললেন, আমরা কুরায়শ বংশের লোকেরা (জাহিলিয়্যাত যুগে) আমাদের স্ত্রীদের উপর প্রভুত্ব করে চলতাম। যখন আমরা মাদীনায় এলাম তখন এমন লোকদের দেখতে পেলাম যাদের উপর তাদের স্ত্রীরা প্রভাব বিস্তার করছিল। এমনি পরিবেশে আমাদের নারীরা তাদের (মাদীনাহ্বাসীদের) নারীদের অভ্যাস রপ্ত করতে শুরু করে দেয়। তিনি বলেন, সে সময় মাদীনার উচ্চভূমির অধিবাসী বানূ উমাইয়্যাহ্ ইবনু যায়দের বংশধরদের মধ্যে আমার বসতবাটি ছিল। এরপর একদিন আমি আমার স্ত্রীর উপর রাগান্বিত হলাম। সে আমার কথার প্রত্যুত্তর করতে লাগল। আমি আমার সঙ্গে তার প্রত্যুত্তর করাকে খুবই অপ্রিয় মনে করলাম। সে বলল, আপনার সঙ্গে আমার কথার প্রত্যুত্তর করাকে অপছন্দ করছেন কেন? আল্লাহর কসম! নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রীগণও তো তাঁর সঙ্গে কথার প্রত্যুত্তর করে থাকে। এমনকি তিনি তাঁদের কেউ কেউ তাঁকে সারা দিন রাত বিচ্ছিন্ন করে রাখে। তখন আমি রওনা করে (আমার মেয়ে) হাফ্সার কাছে চলে এলাম। এরপর আমি তাকে বললাম, তুমি কি রসূলুল্লাহ (সাঃ,-এর সঙ্গে প্রত্যুত্তর কর? সে বলল, হাঁ। আমি বললাম, তোমাদের মধ্যে কি কেউ তাঁকে সারা দিন রাত বিচ্ছিন্ন করে রাখে? সে বলল, হাঁ। আমি বললাম, তোমাদের যে কেউ এরূপ আচরণ করে সে আসলেই দুর্ভাগা ও ক্ষতিগ্রস্ত। তোমাদের মধ্যে কি কেউ বিপদমুক্ত ও নিরাপদ হতে পারে যদি আল্লাহ তাঁর রসূলের ক্রোধের কারণে ক্রুদ্ধ হন। এরূপ হলে তো তার ধ্বংস অনিবার্য। তুমি কখনো রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে তাঁর কথার প্রত্যুত্তরে লিপ্ত হয়ো না এবং তাঁর কাছে কোন কিছু দাবী করবে না, তোমার মনে যা চায় তা আমার কাছে চাইবে। তোমার সতীন তোমার চাইতে অধিকতর সুন্দরী এবং রসূলুল্লাহ-(সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নিকট তোমার তুলনায় অধিকতর প্রিয়পাত্রী। সে যেন তোমাকে ধোঁকায় পতিত না করে ফেলে। এর দ্বারা তিনি [‘উমার (রাঃ)] ‘আয়িশা (রাঃ)-কে বুঝাতে চাইছেন। তিনি বলেন, আমার একজন আনসারী প্রতিবেশী ছিলেন। আমরা দুই বন্ধু পালাক্রমে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে (তাঁর মজলিসে) যেতাম। একদিন তিনি উপস্হিত থাকতেন, অপরদিন আমি উপস্হিত হতাম। এভাবে তিনি আমাকে ওয়াহী ইত্যাদির খবর দিতেন, আমিও অনুরূপ খবর তাকে পৌছাতাম। সে সময় আমরা বেশ করে আলোচনা করতে ছিলাম যে, গাস্সানী বাদশাহ নাকি আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করা জন্য ঘোড়ার ক্ষুরে নাল লাগাচ্ছে। একদিন আমার বন্ধু রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে গেলেন এবং ‘ইশার সময় (রাত্রিকালে) আমার কাছে (ফিরে) এলেন। তিনি এসে আমার ঘরের দরজা খটখটালেন এবং আমাকে ডাকলেন। আমি তাঁর ডাক শুনে তাঁর কাছে ছুটে এলাম। তিনি বললেন, একটি বিরাট কাণ্ড ঘটে গেছে। আমি বললাম, সে কী? গাস্সানীরা তাহলে এসে গেছে নাকি? তিনি বললেনঃ না, তারা আসেনি বরং ব্যাপার তার চাইতেও সাংঘাতিক ও দীর্ঘতর। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর সহধর্মিনীদের ত্বলাক্ব দিয়েছেন। তখন আমি বললাম, হাফ্সাহ্ হতাশ ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমি পূর্ব থেকেই ধারণা পোষণ করে আসছিলাম যে, এমন একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। এরপর আমি ফাজরের সলাত আদায় করে প্রয়োজনীয় কাপড়-চোপড় পরিধান করলাম। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে সরাসরি হাফসার কাছে উপস্থিত হলাম। তখন সে কাঁদছিল। আমি বললাম, রসূলল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি তোমাদেরকে ত্বলাক্ব দিয়েছেন। সে (শ্বাসরুদ্ধ করে) বলল, আমি জানি না। তবে তিনি তাঁর ঐ বালাখানায় নির্জনবাস করছেন। আমি তাঁর কৃষ্ণাঙ্গ খাদিমের কাছে বললাম ‘উমারের (প্রবেশের) জন্য অনুমতি প্রার্থনা করো। এরপর সে ভিতরে প্রবেশ করল এবং পরক্ষনেই বেরিয়ে এসে আমার দিকে তাকাল। এরপর সে বলল, আমি তাঁর (রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর) কাছে আপনার কথা উত্থাপন করেছি কিন্তু তিনি নীরব আছেন (কিছুই বলছেন না)। অতঃপর আমি চলে এলাম এবং মিম্বারের কাছে এসে বসে পড়লাম। তখন আমি দেখতে পেলাম সেখানে একদল লোক বসা আছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ডুকরে ডুকরে কাঁদছে। আমি খানিকটা বসলাম। এরপর আমার মনের প্রবল আকাঙ্ক্ষা আমার উপর প্রভাব বিস্তার করল। তখন আমি সেই কৃষ্ণাঙ্গ যুবকটির কাছে চলে এলাম এবং তাকে বললাম, ‘উমারের জন্য ভিতরে প্রবেশের অনুমতি নিয়ে এসো। সে ভেতরে প্রবেশ করল এবং বেরিয়ে এসে আমাকে বলল, আমি আপনার বিষয়টি তাঁর সামনে উত্তাপন করেছি কিন্তু তিনি নীরব আছেন। আমি যখন পিছনে ফিরে চললাম অমনি সে কৃষ্ণাঙ্গ যুবকটি আমাকে ডাক দিয়ে বলল, আপনি প্রবেশ করুন; তিনি আপনাকে অনুমতি দিয়েছেন। আমি ভিতরে প্রবেশ করে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সালাম দিলাম। আমি দেখতে পেলাম, তিনি খেজুর পাতার তৈরি একটি চাটাই এর উপর হেলান দিয়ে আরাম করছেন যা তাঁর পাঁজরে চাটাইয়ের দাগ বসিয়ে দিয়েছে। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রসূল! আপনি কি আপনার সহধর্মিনীগণকে ত্বলাক্ব দিয়েছেন? তিনি তাঁর মাথা উঁচিয়ে আমার প্রতি দৃষ্টিপাত করলেন এবং বললেন, না। আমি বললাম, আল্লাহ আকবার। আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। হে আল্লাহ্র রসূল! আপনি বিষয়টি ভেবে দেখূনঃ আমরা যখন মাদীনায় এলাম তখন দেখতে পেলাম, এখানকার পুরুষ লোকদের উপর তাদের স্ত্রীরা প্রভুত্ব বিস্তার করে আসছে। এতে তাদের দেখাদেখি আমাদের স্ত্রীরাও তাদের অভ্যাস রপ্ত করতে শুর করে দিয়েছে। একদিন আমি আমার স্ত্রীর প্রতি রাগান্বিত হলাম। অমনি সে আমার কথার প্রত্যুত্তর শুরু করে দিল। আমি তার প্রত্যুত্তর করাকে খুবই খারাপ মনে করলাম। সে বলে ফেলল, আপনার সঙ্গে প্রত্যুত্তর করাকে আপনি এত খারাপ মনে করছেন কেন? আল্লাহ্র কসম! নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রীগণও তো তাঁর কথার প্রত্যুত্তর করে থাকে, এমনকি তাঁদের কেউ কেউ তাঁকে সারা দিন রাত বিচ্ছিন্ন করে রাখে। আমি বললাম, তাঁদের মধ্যে কেউ এমন আচরন করলে সে হতভাগ্য ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে থেকে কারো উপর রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) রাগান্বিত হওয়ার কারণে যদি আল্লাহ ক্রদ্ধ হয়ে যান তাহলে তার পতন ও ধ্বংস অনিবার্য। তখন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মৃদু স্বরে হেসে উঠলেন। আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রসূল! আমি হাফসার কাছে গিয়ে তাকে বলে দিয়েছি যে, তোমার সতীন সৌন্দর্যে তোমার তুলনায় অগ্রগামিনী এবং রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে তোমার চাইতে অধিকতর আদরিনী- তা যেন তোমাকে ধোঁকার জালে আবদ্ধ করতে না পারে। এতে আবার তিনি মুচকি হাসি দিলেন। তখন আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রসূল! আমি আপনার সঙ্গে একান্তে আলাপ করতে চাই। তিনি বললেনঃ হাঁ, করতে পার। অতঃপর আমি বললাম এবং মাথা উঠিয়ে তাঁর কোঠার (এদিক ওদিক) তাকিয়ে দেখলাম। আল্লাহ্র কসম! আমি সেখানে তিনখানি চামড়া ব্যতীত নয়ন জুড়ানো তেমন কিছু দেখতে পাইনি। আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রসূল! আপনি আল্লাহ্র কাছে দু’আ করুন যেন তিনি আপনার উম্মাতকে প্রাচুর্য দান করেন। পারসিক ও রোমাকদের তো বৈষয়িক সুখ সমৃদ্ধি দান করা হয়েছে অথচ তারা আল্লাহ্র ‘ইবাদাত (আনুগত্য) করে না। তখন তিনি সোজা হয়ে বসলেন এবং বললেন, হে খাত্ত্বাবের পুত্র! তুমি কি সন্দেহের জালে আচ্ছন্ন আছো। আসলে তারা তো এমন সম্প্রদায় যাদের পার্থিব জীবনে ক্ষণিকের তরে সুখ সমৃদ্ধি দান করা হয়েছে। আমি বললাম, হে আল্লাহ্র রসূল! আপনি আমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তিনি তাঁর সহধর্মিনীগণের আচরণে ক্ষুদ্ধ হয়ে কসম করেছিলেন যে, দীর্ঘ একমাস তাদের সঙ্গে একত্রে অতিবাহিত করবেন না। শেষাবধি আল্লাহ তাঁকে এ আচরণের জন্য তিরষ্কার করেন। (ই.ফা. ৩৫৫৮, ই.সে. ৩৫৫৮)
উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ
আমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে বলতে শুনেছি, মূসা (‘আঃ) একদা তাঁর গোষ্ঠীর সম্মুখে আল্লাহ তা‘আলার নি‘আমাত এবং বালা-মুসীবাত মনে করিয়ে উপদেশ দিচ্ছিলেন। কথা প্রসঙ্গে তিনি বলে ফেললেন, দুনিয়াতে আমার তুলনায় উত্তম এবং অধিক জ্ঞানী কোন লোক আছে বলে আমার জানা নেই। আল্লাহ মূসা (‘আঃ)-এর প্রতি ওয়াহী পাঠালেনঃ আমি জানি মূসা‘র চাইতে উত্তম কে বা কার নিকট কল্যাণ রয়েছে। পৃথিবীতে অবশ্যই এক লোক রয়েছে যে, তোমার তুলনায় অধিক জ্ঞানী। মূসা (‘আঃ) বললেন, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে তাঁর পথ জানিয়ে দিন। তাঁকে বলা হলো, লবণাক্ত একটি মাছ সাথে নিয়ে যাও। এ মাছ যেখানে হারিয়ে যাবে সেখানেই সে ব্যক্তি আছে। মূসা (‘আঃ) এবং তাঁর খাদিম রওনা হলেন, পরিশেষে তাঁরা একটি বড় পাথরের নিকট পৌঁছালেন। সে সময় মূসা (‘আঃ) তাঁর সঙ্গীকে রেখে গোপনে চলে গেলেন। তারপর মাছটি ছটফট করে পানিতে নেমে গেল এবং পানিও ছিদ্রের মতো রয়ে গেল, মাছের রাস্তায় সংমিশ্রন হলো না। মূসা (‘আঃ)-এর খাদিম বললেন, হ্যাঁ, আমি আল্লাহর নবীর সঙ্গে মিলিত হয়ে তাঁকে এ বিবরণ দিব। তারপরে তিনি ভুলে গেলেন। তাঁরা যখন আরো সম্মুখে চলে গেলেন। তখন মূসা (‘আঃ) বললেন, আমার নাশ্তা দাও, এ সফরে তো আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, যতক্ষণ তাঁরা এ জায়গাটি ত্যাগ করার পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁদের ক্লান্তি আসেনি। তাঁর সাথীর যখন স্মরণে আসলো তখন বলল, আপনি কি জানেন যখন আমরা পাথরের নিকট আশ্রয় নিয়েছিলাম, তখন আমি মাছের কথা ভুলে গেছি। আর শাইতানই আমাকে আপনার নিকট বলার কথা ভুলিয়ে দিয়েছে এবং অবাক করার মতো মাছটি সমুদ্রে তার রাস্তা করে নিয়েছে। মূসা (‘আঃ) বললেন, এ-ই তো ছিল আমাদের উদ্দেশ্য। সুতরাং তাঁরা পথ অনুসরণ করে প্রত্যাবর্তন করলেন। তখন তাঁর খাদিম মাছের জায়গাটি তাঁকে দেখালো। মূসা (‘আঃ) বললেন, এ জায়গার বর্ণনাই আমাকে দেয়া হয়েছিল। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ তারপর মূসা (‘আঃ) সন্ধান করছিলেন, এমতাবস্থায় তিনি কাপড়ে ঢাকা খাযির (‘আঃ)-কে গলদেশের উপড় চীৎ হয়ে ঘুমানো দেখতে পেলেন। কিংবা অন্য বর্ণনায়, গলদেশের উপর সোজাসজি। মূসা (‘আঃ) বললেন, আস্সালামু ‘আলাইকুম। খাযির (‘আঃ) মুখ থেকে কাপড় সরিয়ে বললেন, ওয়া ‘আলাইকুমুস্ সালাম, তুমি কে? মূসা (‘আঃ) বললেন, আমি মূসা। তিনি বললেন, কোন্ মূসা? মূসা (‘আঃ) উত্তর দিলেন, বনী ইসরাঈলের মূসা। খাযির (‘আঃ) বললেন, তোমার এ মহান আগমন কিসের জন্য? মূসা (‘আঃ) বললেন, আমি এসেছি যেন আপনাকে যে জ্ঞান দান করা হয়েছে তা হতে আপনি আমায় কিছু শিক্ষা দেন। খাযির (‘আঃ) বললেন, আমার সাথে তুমি ধৈর্য ধরতে পারবে না। আর এমন ব্যাপারে কেমন করে তুমি ধৈর্য ধরবে, যার ‘ইল্ম তোমাকে দেয়া হয়নি। এরূপ বিষয় হতে পারে যা করতে আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, তুমি যখন তা দেখবে তখন তুমি ধৈর্য ধারণ করবে না। মূসা (‘আঃ) বললেন, ইনশাআল্লাহ্ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যেই পাবেন। আর আমি আপনার কোন আদেশ অমান্য করব না। খাযির (‘আঃ) বললেন, তুমি আমার অনুগামী হও তবে আমাকে কোন ব্যাপারে জিজ্ঞেস করো না, যতক্ষণ না আমি নিজেই এ ব্যাপারে বর্ণনা করি। তারপর উভয়ই চললেন, পরিশেষে একটি নৌকায় চড়লেন। তখন খাযির (‘আঃ) নৌকার একাংশ ভেঙ্গে ফেললেন। মূসা (‘আঃ) তাঁকে বললেন, আপনি কি নৌকাটি ভেঙ্গে ফেললেন, নৌকারোহীদের ডুবিয়ে ফেলার জন্যে? আপনি তো বড় মারাত্মক কাজ করলেন। খাযির (‘আঃ) বললেন আমি কি তোমাকে বলিনি যে, তুমি আমার সাথে ধৈর্য ধরতে পারবে না? মূসা (‘আঃ) বললেন, আমি ভুলে গিয়েছি, আপনি আমাকে দোষী সাব্যস্ত করবেন না। আমার ব্যাপারটিকে আপনি কঠিন করবেন না। পুনরায় উভয়ে চলতে লাগলেন। এক স্থানে দেখতে পেলেন বালকরা খেলায় লিপ্ত। খাযির (‘আঃ) অবলীলাক্রমে একটি শিশুর নিকট গিয়ে তাকে হত্যা করলেন। এতে মূসা (‘আঃ) খুব ঘাবড়ে গিয়ে বললেন, আপনি প্রাণ বিনিময় ছাড়াই একটি নিষ্পাপ প্রাণকে হত্যা করলেন? আপনি বড়ই নৃশংস কাজ করেছেন। এমতাবস্থায় রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ আল্লাহ রহ্মাত বর্ষণ করুন আমাদের ও মূসা (‘আঃ)-এর উপর তিনি যদি জলদি না করতেন তাহলে অবাক হওয়ার আরো মতো অনেক ঘটনা দেখতে পেতেন। তবে তিনি খাযির (‘আঃ)-এর সম্মুখে লজ্জিত হয়ে বললেন, তারপর যদি আমি আপনাকে আর কোন কিছু জিজ্ঞেস করি তবে আপনি আমায় সাথে রাখবেন না। সত্যিই আমার ব্যাপার খুবই আপত্তিকর হয়েছে। যদি মূসা (‘আঃ) ধৈর্য ধরতেন তাহলে আরো বিস্ময়কর ব্যাপার দেখতে পেতেন। যখন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কোন নবীর বর্ণনা করতেন, প্রথমে নিজেকে দিয়ে আরম্ভ করতেন আর বলতেন, আল্লাহ আমাদের উপর রহম করুন এবং আমার অমুক ভাইয়ের উপরও। এভাবে নিজেদের উপর আল্লাহর রহ্মাত কামনা করতেন। অতঃপর দু‘জনে চললেন এবং মন্দ লোকদের একটি লোকালয়ে গিয়ে উঠলেন। তারা লোকদের অসংখ্য জায়গায় ঘুরে তাদের নিকট খাবার চাইলেন। তারা তাদের মেহমানদারী করতে অস্বীকার করল। তারপর তাঁরা ধ্বসে পড়ার উপক্রম একটা দেয়াল দেখতে পেলেন। খাযির (‘আঃ) সেটি মেরামত করে দিলেন। মূসা (‘আঃ) বললেন, আপনি চাইলে এর বিনিময়ে মজুরি নিতে পারতেন। খাযির (‘আঃ) বললেন, এখানেই আমার আর তোমার মাঝে সম্পর্কছেদ। খাযির (‘আঃ) মূসা (‘আঃ)-এর বস্ত্র ধরে বললেন, তুমি যেসব বিষয়ের উপর ধৈর্যহারা হয়ে পড়েছিলে সে সবের ঘটনা বলে দিচ্ছি। ‘নৌকাটি ছিল কিছু গরীব লোকের যারা সমুদ্রে কাজ করত’ – আয়াতের শেষ পর্যন্ত পড়লেন। তারপর যখন এটাকে দখল করতে লোক আসলো, তখন ছিদ্রযুক্ত (অচলাবস্থা) দেখে ছেড়ে দিল। অতঃপর নৌকাওয়ালারা একটা কাঠ দ্বারা নৌকাটি মেরামত করে নিলো। আর বালকটি সূচনালগ্নেই ছিল কাফির। তার মা-বাবা তাকে বড়ই আদর করত। সে বড় হলে ওদের দু‘জনকেই অবাধ্যতা ও কুফরির দিকে নিয়ে যেত। অতএব আমি আকাঙ্ক্ষা করলাম, আল্লাহ যেন তাদেরকে এর বিনিময়ে আরো উত্তম পবিত্র স্বভাবের ও অধিক স্নেহভাজন ছেলে দান করেন। ‘আর দেয়ালটি ছিল শহরের দু‘টো ইয়াতীম বালকের’- আয়াতের শেষ পর্যন্ত। (ই.ফা. ৫৯৪৯, ই.সে. ৫৯৮৯)
ইবনু শিহাব (রহঃ) থেকে বর্নিতঃ
তিনি বলেন, অতঃপর রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাবূকের যুদ্ধে শারীক হন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, সিরিয়ার আরব খ্রিস্টান ও রোমকরা। ইবনু শিহাব বলেন, আমাকে ‘আবদুর রহ্মান ইবনু ‘আবদুল্লাহ ইবনু কা‘ব ইবনু মালিক (রহঃ) অবিহিত করেছেন যে, প্রকৃতপক্ষে ‘আবদুল্লাহ ইবনু কা‘ব বলেছেন, কা‘ব ইবনু মালিক (রাঃ) অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তার সন্তানদের মাঝে তিনি ছিলেন তাঁর চালক। তিনি বলেন, আমি কা‘ব ইবনু মালিক (রাঃ)-কে তাবূক যুদ্ধে রসূলের সাথে অংশগ্রহণ না করার ইতিবৃত্ত স্বীয় মুখে বর্ণনা করতে শুনেছি। কা‘ব ইবনু মালিক (রাঃ) বলেছেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যত যুদ্ধ করেছেন তাবূক যুদ্ধ ছাড়া এর সব ক’টির মাঝেই আমি তাঁর সাথে অংশগ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু বদর যুদ্ধে আমি তাঁর সাথে অংশগ্রহণ করতে পারিনি। তবে যারা তাদের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি তাদের কাউকেও দোষারোপ করেননি। তখন তো রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও মুসলিমগণ কেবলমাত্র কুরায়শ কাফিলার উদ্দেশে বের হয়েছিলেন। পরিশেষে আল্লাহ তা‘আলা মুসলিম ও কাফিরদের অনির্ধারিত সময়ে একত্রিত করে দিলেন। ‘আকাবার রাত্রে যখন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে আমরা ইসলামের উপর অঙ্গীকার নিচ্ছিলাম, সে রাত্রে আমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। যদিও বদর যুদ্ধ মানুষের কাছে সবচেয়ে বেশী প্রসিদ্ধ, তথাপি ‘আকাবাহ্ রাত্রির পরিবর্তে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা আমার নিকট বেশি প্রিয় নয়। তাবূক যুদ্ধে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে অংশগ্রহণ না করার খবর হচ্ছে এই যে, (যখন এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল) তখন আমি যেমন শক্তিশালী ও স্বচ্ছল ছিলাম, তেমন আর কখনো ছিলাম না। আল্লাহর শপথ! এর পূর্বে দু’টি সওয়ারী কখনো একত্রে জমা করতে পারিনি। কিন্তু এ যুদ্ধের সময় দু’টি সওয়ারী একত্রিত করেছিলাম। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এ অভিযানে যান প্রচণ্ড গরমের মধ্যে। মরুভূমিতে দীর্ঘসফরে যাত্রা করলেন। বহু সংখ্যক শত্রুর সম্মুখীন হতে যাচ্ছিলেন। তাই তিনি বিষয়টি মুসলিমদের সামনে স্পষ্ট করে তুললেন, যাতে তারা যুদ্ধের জন্যে সম্পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করে নিতে পারে। তাদের উদ্দেশ্য সম্পর্কেও রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদেরকে অবহিত করেছেন। তখন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে মুসলিমের সংখ্যা ছিল বেশি এবং তাদের নাম একত্র করেনি কোন সংরক্ষণকারী কিতাবে অর্থাৎ-রেজিস্ট্রারে। কা‘ব বলেন, সুতরাং যে লোক অনুপস্থিত থাকতে সংকল্প করে সে কমপক্ষে এ চিন্তা করতে পারত যে, তার অনুপস্থিতির বিষয়টি গোপন থাকবে, যতক্ষন না আল্লাহর তরফ থেকে তার ব্যাপারে ওয়াহী অবতীর্ণ হয়। এ যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, যখন গাছের ফল পাকছিল এবং বৃক্ষের ছায়া ছিল আনন্দদায়ক। আর আমিও ছিলাম এসবের প্রতি আকৃষ্ট। পরিশেষে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও মসুলমগণ যুদ্ধের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন। আমিও তাঁদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের উদ্দেশে বাড়ী হতে সকালে বের হতাম, কিন্তু কোন কিছু সিদ্ধান্ত না করেই ফিরে আসতাম এবং মনে মনে বলতাম, আমি তো যুদ্ধে যেতে সক্ষম, যখনই সংকল্প করি। আমার ব্যাপারটি এভাবেই চলতে থাকল। এদিকে লোকজন সত্যিই প্রস্তুতি চালিয়ে যেতে লাগল। পরিশেষে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ভোরে রওনা হলেন এবং তাঁর সাথে মুসলিমগণও রওনা হয়ে গেল। কিন্তু আমি কোন প্রস্তুতি গ্রহণ করিনি। পরদিন ভোরে আমি বের হলাম। তবে কোন প্রস্তুতি না নিয়েই ফিরে আসলাম। এভাবে আমার সময় দীর্ঘায়িত হতে লাগল। এদিকে লোকজন দ্রুতগতিতে অগ্রসর হয় আর মুজাহিদ্বীনের দল বহু দূরে চলে যায়। তখন আমি চিন্তা করলাম যে, আমিও রওনা হয়ে তাদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে যাই। হায় আফসোস! আমি যদি তা করতাম। তবে আমার ভাগ্যে তা নির্ধারিত হয়নি। অতএব রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুদ্ধে চলে যাওয়ার পর আমি যখন লোকালয়ে বের হতাম তখন এ সম্পর্কে আমাকে দুঃখ দিত যে, আমি অনুসরণীয় নমুনা দেখতে পেতাম না, কেবলমাত্র এমন এক লোক যাদের উপর নিফাকের অভিযোগ রয়েছে অথবা সে সকল অক্ষম লোক যাদের আল্লাহ তা‘আলা মাযূর হিসেবে অবকাশ দিয়েছেন। এদিকে তাবূক পৌঁছার পূর্বে রাস্তায় রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার কথা মোটেই আলোচনা করেননি। কিন্তু তাবূক পৌঁছার পর লোকেদের মধ্যে বসা অবস্থায় রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলেন, কা‘ব ইবনু মালিক কি করছে? তখন বানূ সালামাহ্ গোত্রের এক লোক বলল, হে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! তার লালজোড়া চাদর এবং তার অহঙ্কার তাকে দূরে রেখেছে। তখন মু‘আয ইবনু জাবাল (রাঃ) বললেন, তুমি অনেক খারাপ কথা বলল। আল্লাহ শপথ, হে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমরা তো তাকে ভালই জানি। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নীরব থাকলেন। ইতিমধ্যে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শুভ্র পেশাক পরিহিত এক লোককে ধূলা উড়িয়ে আসতে দেখে বললেন, আবূ খাইসামাই হবে। দেখা গেল, তিনি আনসারী সহাবা আবূ খাইসামাহ্ (রাঃ) আর তিনি সে লোক যিনি এক সা‘ খেজুর সদাকাহ্ করেছিলেন যার জন্য মুনাফিকরা তার দূর্নাম রটনা করেছিল। কা‘ব ইবনু মালিক (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাবূক হতে ফিরে (মাদীনাহ্ অভিমুখে) রওনা হওয়ার সংবাদ আমার নিকট পৌঁছার পর আমার উপর চিন্তার ছাপ পড়ে গেল। আমি মনে মনে মিথ্যা ওযর কল্পনা করতে লাগলাম এবং এমন কথা ভাবতে লাগলাম যা বলে সকালে আমি তাঁর রাগ হতে বাঁচতে পারি। আর এ বিষয়ে আমি বুদ্ধিমান আপনজনেরও সহযোগিতা নিতে লাগলাম। পরিশেষে যখন আমাকে বলা হলো যে, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পৌঁছেই যাচ্ছেন, তখন আমার অন্তর হতে সকল বাতিল কল্পনা দূরে সরে গেল। এমনকি আমি বুঝতে পারলাম যে, কোন কিছুতেই আমি তাঁর কাছ থেকে মুক্তি পাব না। তাই আমি তাঁর নিকট সত্য বলারই ইচ্ছা করলাম। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সকাল বেলা সফর থেকে আগমন করলেন। তাঁর রীতি ছিল, সফর থেকে ফিরে প্রথমে তিনি মাসজিদে আসতেন এবং সেখানে দু’রাক‘আত (সলাত) আদায় করে মানুষের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্যে বসতেন। এবারও যখন তিনি বসলেন, তখন যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি তারা এসে অজুহাত দেয়া শুরু করল এবং এর উপর কসম খেতে লাগল। এ সমস্ত লোক সংখ্যায় আশির বেশি ছিল। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাদের প্রকাশ্য অজুহাত গ্রহণ করলেন এবং তাদের হতে বাই‘আত নিয়ে তাদের জন্য আল্লাহর কাছে মাফ চাইলেন। আর তাদের অন্তর্নিহিত অবস্থা আল্লাহর উপর ছেড়ে দিলেন। পরিশেষে আমি উপস্থিত হয়ে সালাম করলাম। তখন তিনি ক্রুদ্ধ লোকের হাসির মতো মুচকি হাসলেন। তারপর তিনি বললেন, এসো। আমি এসে তাঁর সম্মুখে বসলাম। তখন তিনি আমাকে প্রশ্ন করলেন, কিসে তোমাকে পিছনে ফেলে দিয়েছিল? তুমি কি সওয়ারী কিনে ছিলে না? তিনি বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আল্লাহর শপথ, আমি যদি আপনি ছাড়া কোন দুনিয়াদারী মানুষের নিকট বসতাম তবে আপনি দেখতেন যে, অবশ্যই আমি কোন অজুহাত পেশ করে তার গোস্বা হতে বের হতাম। কারণ আমাকে বাকশক্তির ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু আল্লাহর শপথ! আমার দৃঢ় ধারণা, আজ যদি আমি মিথ্যা কথা বলি যাতে আপনি আমার প্রতি সন্তুষ্ট হন, তবে শীঘ্রই আল্লাহ তা‘আলা আপনাকে আমার প্রতি অসন্তুষ্ট করবেন না। আর যদি আমি সত্য কথা বলি এবং এতে আপনি আমার প্রতি অসন্তুষ্ট হন, তবে এতে আল্লাহর তরফ হতে আমি কল্যাণজনক পরিণামের প্রত্যাশা রাখি। আল্লাহর শপথ! আমার কোন ওযর-আপত্তি ছিল না। আল্লাহর শপথ! আপনার (অভিযান) হতে পিছনে থাকার সময়ের চেয়ে কোন সময় আমি অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন ও অধিক ধন-সম্পদের অধিকারী ছিলাম না। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বরলেন, নিশ্চয়ই এ লোক সত্য কথা বলেছে। এরপর তিনি বললেন, তুমি চলে যাও, যতক্ষণ না আল্লাহ তা‘আলা তোমার সম্বন্ধে কোন সিদ্ধান্ত দেন। তারপর আমি চলে গেলাম। তখন বানূ সালামাহ্ গোত্রের কিছু লোক দৌড়িয়ে আমার নিকটে এসে বলল, আল্লাহর কসম! আমরা তো ইতিপূর্বে তোমাকে আর কোন অন্যায় করতে দেখিনি। যারা পশ্চাতে রয়ে গিয়েছিল, তারা যেমন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে ওযর পেশ করেছে সেভাবে ওযর পেশ করতে কি তুমি অক্ষম ছিলে? অতএব রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইস্তিগফারই তোমার পাপের জন্য যথেষ্ট হত। তিনি বলেন, আল্লাহর কসম। এভাবে তারা আমাকে এত ভর্ৎসনা করতে লাগল যে, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট আবার গিয়ে আমার স্বীয় উক্তি মিথ্যা প্রতিপন্ন করার ইচ্ছা হতে লাগল। আমি লোকদের বললাম, আমার মতো আর কারো এমন অবস্থা হয়েছে কি? তারা বলল, হ্যাঁ, আরো দু’ জন তোমার মতো করেছেন। তুমি যা বলেছ তারাও অবিকল বলেছেন এবং তোমাকে যা বলা হয়েছে তাদেরও তাই বলা হয়েছে। আমি বললাম, তারা কারা? তারা বলল, তাঁরা হলেন, মুরারাহ্ ইবনু রাবী‘আহ্ ‘আমিরী এবং হিলাল ইবনু উমাইয়্যাহ্ আল ওয়াকিফী (রাঃ)। কা‘ব বলেন, তাঁরা আমার কাছে এমন দু’ লোকের কথা বর্ণনা করল, যাঁরা ছিলেন নেক্কার, বদর যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী। এঁরা দু’জনই ছিলেন নমুনা স্বরূপ। কা‘ব (রাঃ) বলেন, যখন তারা ঐ দু’ লোকের কথা বর্ণনা করল, তখন আমি স্বীয় অবস্থার উপর থেকে গেলাম। এদিকে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যারা যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি তাদের মধ্য থেকে শুধু আমাদের তিন জনের সাথে মুসলিমদের কথা বলতে নিষেধ করে দিলেন। এরপর লোকেরা আমাদের পরিহার করল অথবা বলেছেন, আমাদের সাথে তাদের ব্যবহার বদলে গেল। এমনকি পৃথিবীও যেন অপছন্দ করতে লাগল, (মনে হলো) যে ভূমি আমি চিনতাম, এ যেন তা নেই। এমনি করে পঞ্চাশ রাত কাটালাম। আর আমার দু’ সাথী ছিলেন হীনবল, তাই তাঁরা নিজ নিজ গৃহে নীরবে বসে রইলেন এবং কাঁদতে লাগলেন। আর আমি তাদের মাঝে কম বয়স্ক ও সবল ছিলাম। আমি রাস্তায় বের হতাম, সলাতে শারীক হতাম এবং বাজারেও হাঁটাহাঁটি করতাম। কিন্তু কেউ আমার সাথে কোন কথা বলত না। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সলাত আদায়ের পর স্বীয় স্থানে বসাবস্থায় আমি তাঁর নিকট আসতাম, তাকে সালাম করতাম এবং মনে মনে ভাবতাম, তিনি সালামের জওয়াব প্রদান করে তাঁর ওষ্ঠযুগল নাড়িয়েছেন কি-না? তারপর আমি তাঁর কাছে দাঁড়িয়ে সলাত আদায় করতাম এবং গোপন চাহনির মাধ্যমে আমি তাঁর দিকে লক্ষ্য করতাম। যখন আমি সলাতে নিমগ্ন হতাম তখন তিনি আমার প্রতি দৃষ্টি দিতেন। কিন্তু আমি যখন তাঁর দিকে তাকাতাম তখন তিনি আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতেন। আমার প্রতি মুসলিমের এ রূঢ় আচরণ যখন দীর্ঘায়িত হয়ে গেল তখন আমি গিয়ে আবূ কাতাদাহ্ (রাঃ)-এর বাগানের দেয়াল টপকিয়ে তার কাছে গেলাম। তিনি ছিলেন আমার চাচাতো ভাই এবং আমার খুবই প্রিয় ব্যক্তি। উপরে উঠেই আমি তাঁকে সালাম করলাম। কিন্তু আল্লাহর কসম! তিনি আমার সালামের কোন জবাব দিলেন না। আমি তাঁকে বললাম, হে আবূ কাতাদাহ্! আমি তোমাকে আল্লাহর শপথ করে জিজ্ঞেস করছি, তুমি কি জান না যে, আমি আল্লাহ ও তাঁর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে ভালবাসি? তিনি কোন জবাব দিলেন না। আমি আবার তাঁকে শপথ করে জিজ্ঞেস করলাম। এবারও তিনি কোন জবাব দিলেন না। তারপর পুনরায় আমি তাঁকে শপথ করে জিজ্ঞেস করলাম। উত্তরে তিনি বললেন, আল্লাহ ও তাঁর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-ই ভাল জানেন। এ কথা শুনে আমার দু’চোখ দিয়ে পানি ঝড়তে লাগল। পরিশেষে পিছন ফিরে আমি আবার প্রাচীর টপকিয়ে ফিরে এলাম। তারপর আমি কোন একদিন মাদীনার বাজার দিয়ে হাঁটতেছিলাম, তখন মাদীনার বাজারে শাক-সবজি বিক্রির উদ্দেশে আগত সিরিয়ার কৃষকদের মাঝখান থেকে একজন বলতে লাগল, এমন কোন লোক আছে কি, যে আমাকে কা‘ব ইবনু মালিকের ঠিকানা বলতে পারে? লোকেরা ইঙ্গিতে আমাকে দেখিয়ে দিলে সে আমার কাছে আসলো এবং গাস্সান সম্রাটের তরফ হতে আমাকে একটি চিঠি দিল। আমি লেখাপড়া জানতাম। তাই আমি তা পড়লাম। এতে লেখা ছিল, “আমি জানতে পারলাম যে, তোমার সাথী মুহাম্মাদ তোমার প্রতি অন্যায় আচরণ করছে। অথচ আল্লাহ তা‘আলা তোমাকে নীচু গৃহে জন্ম দেননি এবং ধ্বংসাত্মক স্থানেও নয়। সুতরাং তুমি আমাদের কাছে চলে এসো। আমরা তোমার সাথে ভাল আচরণ করব।” এ চিঠি পড়া মাত্র আমি বললাম, এটাও এক রকমের পরীক্ষা। তখন এ চিঠিটি নিয়ে আমি চুলার কাছে গেলাম এবং আগুনে তা পুড়িয়ে দিলাম। চল্লিশ দিন অতিক্রান্ত হলো। এখনও এদিকে কোন ওয়াহী আসছে না। এমতাবস্থায় রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এক বার্তাবাহক আমার কাছে এসে বললেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আপনাকে আপনার সহধর্মিণী থেকে দূরে থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি তাকে প্রশ্ন করলাম, আমি কি তাকে তালাক্ দিব, না অন্য কিছু করব? তিনি বললেন, না তালাক্ দিতে হবে না। বরং তুমি তার হতে আলাদা হয়ে যাও এবং তার সঙ্গে মিলন করো না। তিনি বলেন, আমার অপর সাথীদের কাছেও এমন খবর পাঠানো হলো। কা‘ব (রাঃ) বলেন, তারপর আমি আমার সহধর্মিণীকে বললাম, তুমি তোমার পিতার বাড়ী চলে যাও এবং যে পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা এ ব্যাপারে কোন সিদ্ধান্ত না দেন ততদিন সেখানেই অবস্থান করবে। কা‘ব (রাঃ) বলেন, এরপর হিলাল ইবনু উমাইয়্যাহ্ (রাঃ)-এর সহধর্মিণী রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহ্র রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! হিলাল ইবনু উমাইয়্যাহ্ একজন বয়োঃবৃদ্ধ লোক। তাঁর কোন সেবক নেই। আমি যদি তাঁর সেবা করি, আপনি কি তাতে আপত্তি করেন? তিনি বললেন, না। কিন্তু সে তোমার সঙ্গে সহবাস করতে পারবে না। এ কথা শুনে হিলাল (রাঃ)-এর সহধর্মিণী বললেন, আল্লাহ শপথ! কোন কাজের ব্যাপারেই তার মনে কোন স্পন্দন নেই এবং আল্লাহর কসম! ঐ ঘটনার পর হতে অদ্যাবধি সে প্রতিদিন কেঁদে চলছে। তিনি বলেন, আমার পরিবারের কেউ বললেন, আচ্ছা তুমিও যদি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হতে তোমার সহধর্মিণীর ব্যাপারে অনুমতি নিয়ে নিতে। তিনি তো হিলাল ইবনু উমাইয়্যার স্ত্রীকে তাঁর স্বামীর সেবার অনুমতি দিয়েছেন। আমি বললাম, না, আমি স্ত্রীর ব্যাপারে অনুমতি প্রার্থনা করব না। কারণ আমি যুবক মানুষ। আমি আমার স্ত্রীর ব্যাপারে অনুমতি চাইলে না জানি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কি বলেন। এ অবস্থায় আরো দশ রাত কাটালাম। এভাবে রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন থেকে আমাদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতে বারণ করেছিলেন, তখন থেকে আমাদের পঞ্চাশ রাত পূর্ণ হয়। কা‘ব বলেন, পঞ্চাশতম রাত্রের ফাজ্রের সলাত আমি আমার ঘরের ছাদের উপর আদায় করলাম। এরপর যখন আমি ঐ অবস্থায় বসা ছিলাম, যা আল্লাহ আমাদের ব্যাপারে আলোচনা করেছেন, “অর্থাৎ- আমার মন সংকীর্ণ হয়ে গেছে এবং প্রশস্ত পৃথিবী আমার নিকট সংকুচিত হয়ে পড়েছে”, তখন আমি একজন ঘোষণাকারীর শব্দ শুনলাম, যিনি সালা পর্বতের চূড়ায় উঠে উচ্চ আওয়াজে বলছেন, হে কা‘ব ইবনু মালিক! তোমার জন্যে সুসংবাদ। কা‘ব বলেন, তখন আমি সাজ্দায় অবনত হলাম এবং আমি বুজতে পারলাম যে, প্রশস্ততা আগমন করেছে। কা‘ব বলেন, এদিকে ফাজ্রের সলাতের পর রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) লোকেদের নিকট ঘোষণা করলেন যে, আল্লাহ তা‘আলা আমাদের তাওবাহ্ গ্রহণ করেছেন। তখনই লোকেরা আমাদের সুখবর দেয়ার জন্যে ছুটে গেলেন এবং আমার সঙ্গীদ্বয়কে সুখবর পৌছানোর জন্যে কিছু লোক তাদের কাছে গেলেন। আর আমার দিকে একজন ঘোড়ার উপর আরোহণ হয়ে রওনা হলেন এবং আসলাম সম্প্রদায়ের আরেক লোকও রওনা হলেন। আর তিনি পাহাড়ের উপর উঠে ঘোষণা দিলেন। আর ঘোড়ার চেয়েও শব্দের গতি অতি দ্রুত ছিল। এরপর যার সুখবরের শব্দ আমি শুনেছিলাম- তিনি আমার কাছে আসলে আমি আমার পরিধেয় কাপড় দু’টো সুখবরের উপঢৌকন স্বরূপ তাকে দিয়ে দিলাম। আল্লাহর শপথ! সেদিন ঐ দু’টো কাপড় ছাড়া আমি আর কোন কাপড়ের মালিক ছিলাম না। অতএব আমি দু’টো কাপড় ধার নিয়ে তা পড়লাম। তারপর রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে দেখা করার জন্যে আমি রওনা দিলাম। আমার তাওবাহ্ গ্রহণের মুবারকবাদ জানানোর জন্য লোকেরা দলে দলে আমার সাথে দেখা করতে লাগল এবং বলতে লাগল, আল্লাহর মার্জনা তোমার জন্য মুবারক হোক। এমতাবস্থায় আমি মাসজিদে ঢুকে দেখলাম, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাসজিদেই উপবিষ্ট আছেন এবং তাঁর পাশে লোকজন রয়েছে। তখন তাল্হাহ্ ইবনু ‘উবাইদুল্লাহ (রাঃ) দণ্ডায়মান হলেন এবং দৌড়ে এসে আমার সঙ্গে মুসাফাহা করলেন এবং তিনি আমাকে মুবারকবাদ জানালেন। আল্লাহর শপথ! মুহাজিরদের মাঝে তখন তিনি ছাড়া আর কেউ (আমাকে দেখে) দাঁড়াননি। রাবী বলেন, কা‘ব তালহার এ সদ্ব্যবহারের কথা ভুলে যাননি। কা’ব ইবনু মালিক (রাঃ) বলেন, এরপর আমি যখন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে সালাম করলাম তখন তাঁর মুখায়ব আনন্দে উচ্ছাসিত ছিল। তিনি বললেন, তোমার মা তোমাকে জন্ম দেয়ার পর থেকে যতদিন অতিবাহিত হয়েছে, তার মধ্যে তোমার জন্যে এ মুবারক দিনটির সুখবর। কা‘ব (রাঃ) বলেন, আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম, তা কি আপনার তরফ থেকে, হে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! না মহান আল্লাহর তরফ থেকে? তিনি বললেন, না, বরং মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে। আর রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন আনন্দিত হতেন, তখন তাঁর মুখায়ব এমন উজ্জ্বল হতো যেন তা এক টুকরো চাঁদ। কা‘ব (রাঃ) বলেন, আমরা তাঁর মুখায়ব দেখেই তা উপলব্ধি করতে পারতাম। তিনি বলেন, আমি যখন তাঁর সম্মুখে বসলাম তখন বললাম, হে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! আমার তাওবার শুকরগুজার হিসেবে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের জন্য সদাকাহ্ করে আমি সকল প্রকার ধন-সম্পদ থেকে মুক্ত হওয়ার মনস্থ করেছি। তখন রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ কিছু সম্পদ তোমার নিজের জন্যে রেখে দাও। এ-ই তোমার জন্য সবচেয়ে ভাল। আমি বললাম, তাহলে আমি খাইবারে প্রাপ্য অংশটুকু রেখে দিব। কা‘ব (রাঃ) বলেন, তারপর আমি বললাম, হে আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)! সত্য কথাই আল্লাহ আমাকে মুক্তি দিয়েছে; তাই যতদিন জীবন থাকে আমি শুধু সত্যই বলব। তিনি বলেন, আল্লাহর শপথ! আর কোন মুসিলম ব্যক্তিকে সত্য বলার জন্য এমন পুরস্কৃত করেছেন বলে আমার জানা নেই। আল্লাহর শপথ! রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সঙ্গে এ আলোচনা করার পর অদ্যাবধি স্বেচ্ছায় আমি কখনো মিথ্যা কথা বলিনি। আমার প্রত্যাশা, অবশিষ্ট জীবনেও আল্লাহ তা‘আলা আমাকে মিথ্যা থেকে রক্ষা করবেন। কা‘ব (রাঃ) বলেন, আমার তাওবাহ্ কবূলযোগ্য হওয়ার ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা তখন নিম্নোক্ত আয়াত অবতীর্ণ করেছিলেনঃ “আল্লাহ দয়াপরবেশ হলেন নাবীর প্রতি এবং মুহাজির ও আনসারদের প্রতি, যারা তার অনুসরণ করেছিল সংকটকালে, এমনটি যখন তাদের এক দলের হৃদয়-বক্রের উপক্রম হয়েছিল। পরে আল্লাহ তাদেরকে মার্জনা করলেন। তিনি তাদের প্রতি দয়াশীল এবং অপর তিন ব্যক্তি যাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ বিলম্বিত করা হয়েছিল, যে পর্যন্ত না পৃথিবী বিশাল হওয়া সত্ত্বেও তাদের জন্যে সংকুচিত হয়েছিল এবং তাদের জীবন তাদের জন্য অতিষ্ঠ হয়েছিল এবং তারা বুঝতে পেরেছিল যে, আল্লাহ ছাড়া কোন আশ্রয়স্থল নেই। পরে তিনি তাদের প্রতি অনুগ্রহপরায়ণ হলেন, যাতে তারা তাওবাহ্ করে। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালূ। হে মু’মিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করে এবং সত্যবাদীদের শামিল হও”- (সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্ ৯ : ১১৭-১১৯) কা‘ব (রাঃ) বলেন, আল্লাহর শপথ! রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে সেদিন সত্য কথা বলার জন্যে আল্লাহ তা‘আলা আমার প্রতি যে নি‘আমাত দান করেছেন, তেমন নি‘আমাত ইসলাম কবূলের পর আল্লাহ তা‘আলা আমার উপর আর কক্ষনো করেননি। রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট সেদিন আমি মিথ্যা বলিনি। যদি বলতাম তবে নিশ্চয়ই আমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যেতাম, যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গিয়েছিল মিথ্যাবাদীগণ। ওয়াহী নাযিলকালে আল্লাহ তা‘আলা মিথ্যাবাদীদের এমন কঠোর সমালোচনা করেছেন, যা আর কাউকে করেননি। তিনি বলেছেন, “তোমরা তাদের কাছে ফিরে এলে তারা আল্লাহর কসম করবে, যেন তোমরা তাদেরকে এড়িয়ে চলো। কাজেই তোমরা তাদেরকে এড়িয়ে চলবে তারা অপবিত্র, তাদের কৃতকর্মের প্রতিদান জাহান্নাম তাদের আবাসস্থল। তারা তোমাদের কাছে হলফ করবে যাতে তোমরা তাদের প্রতি তুষ্ট হও। তোমরা তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হলেও আল্লাহ ফাসিক (সত্যত্যাগী) লোকেদের উপর সন্তুষ্ট হবেন না।” (সূরাহ্ আত্ তাওবাহ্ ৯ : ৯৫-৯৬)। কা‘ব (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিকট কসম করার পর রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যাদের ওযর গ্রহণ করেছিলেন, যাদের বাই‘আত করেছিলেন এবং যাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করেছিলেন তাদের থেকে আমাদের তিনজনের ব্যাপারটিকে দেরী করা হয়েছিল। আল্লাহর পক্ষ থেকে সিদ্ধান্ত আসা পর্যন্ত রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের ব্যাপারটিকে স্থগিত রেখেছিলেন। তাই আল কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা বলেছেনঃ “আর তিনি মাফ করলেন অপর তিনজনকেও যাদের সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল।” (আরবী) শব্দের অর্থ “যুদ্ধ হতে আমাদের পশ্চাতে থাকা” নয়। বরং এর অর্থ হচ্ছে, রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কর্তৃক “আমাদের বিষয়টিকে স্থগিত রাখা।” ঐ সকল লোকেদের চেয়ে যারা রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সামনে কসম করেছিল এবং ওযর উপস্থিত করেছিল; অতঃপর তা গৃহীত হয়েছিল। (ই.ফা. ৬৭৬০, ই.সে. ৬৮১৫)
সা‘ঈদ ইবনু জুবাইর (রহঃ) থেকে বর্নিতঃ
তিনি বলেন, আমি ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)- কে বললাম, নাওফ আল-বিকালী মনে করেন যে, খাযিরের সাথে যে মূসার সাক্ষাৎ হয়েছিল, তিনি বানী ইসরাঈলের নবী মূসা (‘আঃ) নন (এরা দু’জন ভিন্ন ব্যক্তি)। ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেন, আল্লাহর দুশমন মিথ্যা বলছে। উবাই ইবনু কা‘ব (রাঃ)-কে আমি বলতে শুনেছি, তিনি বললেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)- কে বলতে শুনেছি : বানী ইসরাঈলের জনগণের সামনে মূসা (‘আঃ) বক্তৃতা দিতে দাঁড়ান। তাঁকে প্রশ্ন করা হয় যে, কে সবচেয়ে বড় জ্ঞানী? তিনি বলেন, আমি সবচেয়ে বড় জ্ঞানী। এতে আল্লাহ তা‘আলা তাঁর উপর অসন্তুষ্ট হন। কেননা তিনি আল্লাহ তা‘আলার সাথে জ্ঞানকে সম্পৃক্ত করেননি (অর্থাৎ আল্লাহ তা‘আলা সবচাইতে বড় জ্ঞানী এ কথা বলেননি)। আল্লাহ তা‘আলা তাঁর নিকট ওয়াহী পাঠান, আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত এক বান্দা দুই সমুদ্রের সংগমস্থলে আছে। সে তোমার চাইতে বেশি জ্ঞানী। মূসা (‘আঃ) বললেনঃ হে আমার প্রতিপালক! আমি কি উপায়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করব? আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ তুমি থলেতে একটি মাছ লও। মাছটি যেখানে হারিয়ে ফেলবে, সেখানেই সে আছে। অতএব তিনি রওয়ানা হলেন এবং ইউশা ইবনু নূন নামক তাঁর যুবক শাগরিদও তাঁর সফরসঙ্গী হলেন। মূসা (‘আঃ) থলের মধ্যে একটি মাছ ভরে নিলেন। তাঁরা দু’জনে পায়ে হেঁটে চলতে চলতে একটি প্রকান্ড পাথরের নিকট (সমুদ্রের তীরে) এসে পৌঁছেন। এখানে দু’জনই শুয়ে বিশ্রাম নিলেন। থলের মধ্যকার মাছটি নড়াচড়া করতে করতে তা হয়ে সমুদ্রে পতিত হল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আল্লাহ তা‘আলা মাছটি দিয়ে পানির স্রোতধারা বন্ধ করে দিলেন। ফলে তা প্রাচীরবৎ হয়ে গেল এবং মাছটির জন্য এভাবে একটি পথের ব্যবস্থা হল। মূসা (‘আঃ) ও তাঁর যুবক সঙ্গীর নিকট এটা খুবই আশ্চর্যজনক মনে হচ্ছিল। তাঁরা দিনের অবশিষ্ট সময় ও রাতে অগ্রসর হতে থাকলেন। তাঁর সঙ্গী মাছের অবস্থা সম্পর্কে তাঁকে জানাতে ভুলে গেল। ভোর হলে মূসা (‘আঃ) তাঁর সঙ্গীকে বললেন, “আমাদের সকালের নাশতা নাও। আজকের সফরে আমরা অত্যধিক ক্লান্ত হয়ে পড়েছি”-(সূরা কাহফ ৬২)। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ তাদেরকে যে স্থানে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, সেখান পর্যন্ত পৌঁছতে তাঁরা ক্লান্ত হননি। কিন্তু নির্দেশিত স্থান পার হওয়ার পরই তাঁদেরকে ক্লান্তিতে পেয়ে বসে। “যুবক বলল, আমরা যখন সেই প্রস্তরময় প্রান্তরে আশ্রয় নিয়েছিলাম, তখন কি ঘটনা ঘটেছে তা কি আপনি লক্ষ্য করেননি? মাছের প্রতি আমার কোন আমার কোন লক্ষ্য ছিল না। আর শাইতান আমাকে এমনভাবে ভুলিয়ে দিয়েছে যে, আমি আপনার নিকট তা উল্লেখ করতেও ভুলে গেছি। মাছ তো আশ্চর্য রকমভাবে বের হয়ে সমুদ্রে চলে গেছে। মূসা বললেন, আমরা তো এটাই চেয়েছিলাম”- (সূরা কাহাফ ৬৪)। তাঁরা দু’জনেই তাঁদের পদচিহ্ন ধরে ফিরে এলেন। সুফইয়ান সাওরী (রহঃ) বলেন, কিছু লোকের ধারণা যে, এই প্রস্তরময় ময়দানে (বা সমুদ্র তীরেই) আবে হায়াতের ঝর্ণা রয়েছে। এই পানি মৃত ব্যাক্তির উপর ছিটিয়ে দিলে সে জীবিত হয়ে উঠে। এই মাছের কিছু অংশ খাওয়াও হয়েছিল। ঐ ঝর্ণার পানির ফোঁটা মাছের গায়ে পড়লে সাথে সাথে মাছটি জীবিত হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ তাঁরা উভয়ে তাদের পায়ের চিহ্ন ধরে অগ্রসর হতে হতে পূর্বের সেই প্রান্তরে এসে পৌছালেন। তাঁরা দেখতে পেলেন, এক ব্যক্তি চাদর লম্বা করে গায়ে দিয়ে মুখ ঢেকে শুয়ে আছেন। মূসা (‘আঃ) তাঁকে সালাম দিলেন। তিনি সালামের জবাব দিয়ে বললেন, তোমাদের এ জায়গায় তো সালামের প্রচলন নেই (তুমি মনে হয় একজন আগন্তুক)? তিনি বললেন, আমি মূসা (‘আঃ)। তিনি প্রশ্ন করলেন, বানী ইসরাঈলের মূসা? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তিনি বললেন, আপনার নিকট আল্লাহ তা‘আলার দানকৃত এক বিশেষ জ্ঞান আছে। আমি তা জানি না। আর আল্লাহ তা‘আলা আমাকেও এক বিশেষ জ্ঞান দিয়েছেন যা আপনি জানেন না। মূসা (‘আঃ) বললেনঃ “আপনাকে যে জ্ঞান শিক্ষা দেয়া হয়েছে, তা শিখার উদ্দেশে কি আমি আপনার সাথে থাকতে পারি? তিনি বললেনঃ আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরে থাকতে পারবেন না। আর যে বিষয়ে আপনার কিছুই জানা নেই, সে বিষয়ে আপনি কেমন করেই বা ধৈর্য ধারণ করতে পারেন? তিনি বললেন, ইনশা আল্লাহ আপনি আমাকে ধৈর্যশীলই পাবেন। কোন ব্যপারেই আমি আপনার নির্দেশের বিরোধিতা করব না”।– (সূরা কাহফ ৬৬-৬৯)। খাযির (‘আঃ) তাকে বললেন, “ঠিক আছে, আপনি যদি আমার সাথে চলতে থাকেন, তাহলে আপনি আমার নিকট কোন বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারবেন না, যতক্ষণ আমি আপনাকে তা না বলি”- (সূরা কাহফ ৭০)। তিনি (মূসা) বললেন, হ্যাঁ ঠিক আছে। খাযির ও মূসা (‘আঃ) সমুদ্রের তীর ধরে পায়ে হেঁটে চলতে থাকলেন। তাদের সামনে দিয়ে একটি নৌকা অতিক্রম করছিল। তাঁরা উভয়ে তাদের সাথে কথা বললেন এবং তাঁদেরকে নৌকায় তুলে নেয়ার জন্য অনুরোধ করলেন। তারা খাযিরকে চিনে ফেলল এবং কোন ভাড়া ছাড়াই তাদের দু’জনকে নৌকায় তুলে নিল। খাযির নৌকার একটি তক্তা খুলে নিলেন। মূসা (‘আঃ) তাঁকে বললেন, লোকেরা আমাদেরকে ভাড়া ছাড়াই নৌকায় তুলে নিল, আর আপনি নৌকাটির ক্ষতি সাধন করলেন! আপনি কি তাদের ডুবিয়ে দিতে চান? “আপনার এ কাজটি খুবই আপত্তিকর। খাযির বললেন, আমি কি তোমাকে বলিনি যে, তুমি আমার সাথে ধৈর্য ধরে থাকতে পারবে না? মূসা বললেন, আমার ভুলের জন্য আপনি আমাকে পাকড়াও করবেন না। আমার ব্যাপারে আপনি অতটা কড়াকড়ি করবেন না”- (সূরা কাহফ ৭১-৭৩)। তারা নৌকা হতে নেমে সমুদ্রের তীর ধরে এগিয়ে যেতে থাকেন। পথিমধ্যে দেখা গেল, একটি বালক অপর কয়েকটি বালকের সাথে খেলাধূলা করছে। খাযির (‘আঃ) নিজের হাতে ছেলেটির মাথা ধরে তা ঘাড় হতে বিচ্ছিন্ন করে দিলেন এবং এভাবে তাকে হত্যা করেন। মূসা (‘আঃ) তাঁকে বললেন, “একটা নিষ্পাপ বালককে আপনি মেরে ফেললেন! অথচ সে তো কাউকে হত্যা করেনি? আপনি তো একটা বড় অন্যায় করে ফেলেছেন। খাযির বললেন, আমি কি তোমাকে বলিনি, তুমি আমার সাথে ধৈর্য ধরে চলতে পারবে না” – (সূরা কাহফ ৭৪-৭৫)? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ পূর্বের কথার চেয়ে এ কথাটা বেশি শক্ত ছিল। মূসা (‘আঃ) বললেন, “অতঃপর আমি যদি আপনার নিকট কোন প্রশ্ন করি, তাহলে আপনি আমাকে আর সঙ্গে রাখবেন না। আমাকে প্রত্যাখ্যান করার মত ত্রুটি আপনি আমার মধ্যে পেয়েছেন। পুনরায় তাঁরা দু’জনে সামনে এগিয়ে গেলেন এবং যেতে যেতে একটি জনপদে এসে পৌঁছলেন এবং সেখানকার মানুষদের নিকট খাবার চাইলেন। কিন্তু তারা মেহমান হিসেবে তাদের মেনে নিতে রাজী হয়নি। তাঁরা সেখানে একটি দেয়াল দেখতে পেলেন, যা পড়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল”- (সূরা কাহফ ৭৬-৭৭)। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ দেয়ালটি ঝুঁকে পড়েছিল। খাযির তাঁর হাত দিয়ে দেয়ালটি ঠিক করে দিলেন। মূসা (‘আঃ) তাঁকে বললেনঃ আমরা এমন এক সম্প্রদায়ের নিকট আসলাম, যারা আমাদেরকে মেহমান হিসেবেও গ্রহণ করেনি বা আহারও করায়নি। “আপনি ইচ্ছা করলে এই কাজের জন্য মজুরী নিতে পারতেন। খাযির বললেন, বাস! এখানেই তোমার ও আমার একত্রে ভ্রমন শেষ। তুমি যেসব বিষয়ে ধৈর্য ধারণ করতে পারনি, এখন আমি তোমাকে সেসব বিষয়ের তাৎপর্য বলে দিব”- (সূরা কাহফ ৭৭-৭৮)। রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আল্লাহ তা‘আলা মূসা (‘আঃ)- এর উপর রাহমাত অবতীর্ণ করুন। আমাদের আশা ছিল যে, তিনি যদি ধৈর্য ধারণ করতেন তাহলে আমাদেরকে তাদের এসব বিষয়ের তথ্য জানানো হত! রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ মূসা (‘আঃ) শর্তের কথা ভুলে যাওয়ার কারণেই প্রথম প্রশ্নটি করেছেন। তিনি আরো বলেনঃ একটি চড়ুই পাখি এসে তাদের নৌকার কিনারে বসে, তারপর তা সমুদ্রে নিজের ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়। খাযির তাঁকে বললেন, এই চড়ুই পাখি সমুদ্রের পানি যতটুকু কমিয়েছে, আমার ও আপনার জ্ঞান আল্লাহ তা‘আলার জ্ঞানভান্ডার হতে ঠিক ততটুকুই কমিয়েছে। সাঈদ ইবনু জুবাইর (রহঃ) বলেন, ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) পাঠ করতেন : “তাদের সামনে ছিল এক বাদশাহ যে প্রতিটি নিখুঁত নৌকা জোরপূর্বক কেড়ে নিত”। তিনি আরো পাঠ করতেন : “আর বালকটি ছিল কাফির”। সহীহ : বুখারী, মুসলিম।