সহিহ বুখারী অঃ->যাকাত বাব->ইয়াতীমকে সদকা দেয়া। হাঃ-১৪৬৫

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ

তিনি বলেন, একদা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিম্বরে বসলেন এবং আমরা তাঁর আশেপাশে বসলাম। তিনি বললেনঃ আমার পরে তোমাদের ব্যাপারে আমি যা আশঙ্কা করছি তা হলো এই যে দুনিয়ার চাকচিক্য ও সৌন্দর্য (ধন-সম্পদ) তোমাদের সামনে খুলে দেয়া হবে। এক সাহাবী বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! কল্যাণ কি কখনো অকল্যাণ বয়ে আনে? এতে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নীরব হলেন। প্রশ্নকারীকে বলা হলো, তোমার কী হয়েছে? তুমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে কথা বলছ, কিন্তু তিনি তোমাকে জওয়াব দিচ্ছেন না? তখন আমরা অনুভব কলাম যে, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর ওয়াহী নাযিল হচ্ছে। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর তিনি তাঁর ঘাম মুছলেন এবং বললেনঃ প্রশ্নকারী কোথায়? যেন তার প্রশ্নকে প্রশংসা করে বললেন, কল্যাণ কখনো অকল্যাণ বয়ে আনে না। অবশ্য বসন্ত মৌসুম যে ঘাস উৎপন্ন করে তা (সবটুকুই সুস্বাদু ও কল্যাণকর বটে তবে) অনেক সময় হয়ত (ভোজনকারী প্রাণীর) জীবন নাশ করে অথবা তাকে মৃত্যুর কাছাকাছি নিয়ে যায়। তবে ঐ তৃণভোজী জন্তু, যে পেট ভরে খাওয়ার পর সূর্যের তাপ গ্রহণ করে এবং মল ত্যাগ করে, প্রস্রাব করে এবং পুণরায় চলে (সেই মৃত্যু থেকে রক্ষা পায় তেমনি) এই সম্পদ হলো আকর্ষণীয় সুস্বাদু। কাজেই সে-ই ভাগ্যবান মুসলিম, যে এই সম্পদ থেকে মিসকীন, ইয়াতীম ও মুসাফিরকে দান করে অথবা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেরূপ বলেছেন, আর যে ব্যক্তি এই সম্পদ অন্যায়ভাবে উপার্জন করে, সে ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে খেতে থাকে এবং তার পেট ভরে না। ক্বিয়ামত দিবসে ঐ সম্পদ তার বিপক্ষে সাক্ষ্য দিবে।


সহিহ বুখারী অঃ->কোমল হওয়া বাব->দুনিয়ার শোভা ও তার প্রতি আসক্তি থেকে সতর্কতা হাঃ-৬৪২৭

আবূ সা‘ঈদ (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ

তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ আমি তোমাদের জন্য এ ব্যাপারেই সর্বাধিক আশংকা করছি যে, আল্লাহ্‌ তোমাদের জন্য যমীনের বারাকাতসমূহ প্রকাশিত করে দেবেন। জিজ্ঞেস করা হলো, যমীনের বারাকাতসমূহ কী? তিনি বললেনঃ দুনিয়ার চাকচিক্য। তখন এক ব্যক্তি তাঁর কাছে বললেন, কল্যাণ কি অকল্যাণ নিয়ে আসবে? তখন নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিছুক্ষণ নীরব থাকলেন, যাতে আমরা ধারণা করলাম যে, তাঁর উপর ওয়াহী নাযিল হচ্ছে। এরপর তিনি তাঁর কপাল থেকে ঘাম মুছে জিজ্ঞেস করলেন, প্রশ্নকারী কোথায়? সে বলল, আমি। আবূ সা‘ঈদ (রাঃ) বলেন, যখন এটি প্রকাশ পেল, তখন আমরা প্রশ্নকারীর প্রশংসা করলাম। রসূলুল্লাহ্‌ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেনঃ কল্যাণ কেবল কল্যাণই বয়ে আনে। নিশ্চয়ই এ ধনদৌলত সবুজ সুমিষ্ট। অবশ্য বসন্ত যে সবজি উৎপাদন করে, তা ভক্ষণকারী পশুকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় অথবা মৃত্যুর নিকটবর্তী করে, তবে যে প্রাণী পেট ভরে খেয়ে সূর্যের দিকে তাকিয়ে জাবর কাটে, মল-মূত্র ত্যাগ করে এবং আবার খায় (এর অবস্থা ভিন্ন)। এ পৃথিবীর ধনদৌলত তেমন সুমিষ্ট। যে ব্যক্তি তা সৎভাবে গ্রহণ করবে এবং সৎভাবে ব্যয় করবে, তা তার খুবই উপকারী হবে। আর যে তা অন্যায়ভাবে গ্রহণ করবে, সে ঐ ব্যক্তির মত যে খেতে থাকে কিন্তু পরিতৃপ্ত হয় না। [৭] [৯২১; মুসলিম ১২/৪১, হাঃ ১০৫২, আহমাদ ১১১৫৭] (আধুনিক প্রকাশনী- ৫৯৭৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন- ৫৯৮৪)


সহিহ মুসলিম অঃ->যাকাত বাব->দুনিয়ার যে চাকচিক্য প্রকাশ পাবে তা থেকে বেঁচে থাকা প্রসঙ্গে হাঃ-২৩১২

আবূ সা’ইদ আল খুদরী (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ

রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ আমি তোমাদের ব্যাপারে যেসব জিনিসের আশঙ্কা করছি এর মধ্যে অনন্য হল পার্থিব চাকচিক্য ও শোভা সৌন্দর্য যা আল্লাহ্‌ তা’আলা তোমাদের জন্য উন্মুক্ত করবেন। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! পার্থিব চাকচিক্য ও শোভা বলতে কি বুঝায়? তিনি বললেন, পার্থিব চাকচিক্য ও শোভা হলো দুনিয়ার সম্পদের প্রাচুর্য। তারা পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ্‌র রাসূল! “কল্যাণ কি অকল্যাণ বয়ে আনবে। তিনি বললেন, কল্যাণ তো অকল্যাণ বয়ে আনে না, কল্যাণ তো কল্যাণই বয়ে আনে, তবে কথা হল বসন্তকালে যে সব গাছপালা, তরুলতা ও সবুজ ঘাস জন্মায় কোন পশু তা অতিরিক্ত খেয়ে কলেরা হয়ে মারা যায় বা মরার নিকটবর্তী হয়। এসব তৃণভোজী পশু অতিরিক্ত খেয়ে পেট ফুলিয়ে ফেলে। অতঃপর রোদে দাঁড়িয়ে জাবর কাটে ও পেশাব করে মলমূত্র ত্যাগ করে। এরপর আবার চারণভূমিতে গিয়ে অতিরিক্ত খেয়ে থাকে। (এ অতি ভোজের কারণে কোন সময় পেট খারাপ হয়ে মারা যায়)। এ দুনিয়ার ধন-সম্পদ তিক্ত ও সুমিষ্ট। যে ব্যক্তি তা সৎ পন্থায় উপার্জন করল, সে সে পথেই থাকল। সে কতই না সাহায্য সহযোগিতার সুযোগ লাভ করে। আর যে ব্যক্তি তা অসৎ পন্থায় উপার্জন করল তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে - এক ব্যক্তি খাচ্ছে অথচ পরিতৃপ্ত হতে পারছে না।” (ই. ফা. ২২৯০, ই.ফা. ২২৯১)


সহিহ মুসলিম অঃ->যাকাত বাব->দুনিয়ার যে চাকচিক্য প্রকাশ পাবে তা থেকে বেঁচে থাকা প্রসঙ্গে হাঃ-২৩১৩

আবূ সা’ইদ আল খুদরী (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ

তিনি বলেন, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিম্বারের উপরে বসলেন এবং আমরা তাঁর চারদিকে বসে পড়লাম। অতঃপর তিনি (আমাদেরকে উদ্দেশ্য করে) বললেনঃ “আমার পরে তোমাদের ব্যাপারে আমি যে সব জিনিসের আশঙ্কা করছি তার মধ্যে অন্যতম হলো - পার্থিব চাকচিক্য ও শোভা সৌন্দর্য যা আল্লাহ্‌ তা’আলা তোমাদের জন্য বের করবেন। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, হে আল্লাহ্‌র রসূল! কল্যাণ কি অকল্যাণ নিয়ে আসবে?” বর্ণনাকারী বলেন, (লোকটির প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে) নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) চুপ থাকলেন। এতে (উপস্থিত লোকদের মধ্যে) কেউ কেউ তাকে বলল, কী দুর্ভাগা তুমি! তুমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাথে কথা বলছ অথচ তিনি তোমার সাথে কথা বলছেন না। রাবী আরও বলেন, আমাদের মনে হলো তাঁর উপর ওয়াহী অবতীর্ণ হচ্ছে। অতঃপর তিনি তাঁর (মুখমণ্ডল থেকে) ঘাম মুছে জিজ্ঞেস করলেন, প্রশ্নকারী কোথায়? তিনি মনে হলো তার প্রশংসাই করলেন। তিনি বললেন, কল্যাণ মূলত অকল্যাণ বয়ে আনে না। তবে কথা হলো, বসন্তকালে যে সবুজ লতাপাতা ও তৃণরাজির আবির্ভাব ঘটে এগুলো অতি ভোজনে মৃত্যু ঘটায় বা মৃত্যুর নিকটবর্তী করে দেয়। কতিপয় তৃণভোজী পশু তা খেয়ে পেট ফুলিয়ে ফেলে, অতঃপর রোদের দিকে তাকিয়ে মল মূত্র ত্যাগ করে ও পেশাব করে এবং জাবর কাটতে থাকে। অতঃপর তা চারণভূমিতে ছুটে চলে এবং বেশি করে খায় (এ ভাবে অতিভোজের কারণে বদহজম হয়ে মারা যায়)। এ দুনিয়ায় ধন সম্পদ সবুজ এবং সুমিষ্ট। এ ধন কোন মুসলিমের কতই উত্তম বন্ধু যা থেকে সে নিঃস্ব, অনাথ, ইয়াতীম ও অসহায় এবং পথিককে দান করে। কিন্তু যে ব্যক্তি না - হাক্বভাবে ধন সম্পদ উপার্জন করে তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে কোন ব্যক্তি আহার করে অথচ তৃপ্ত হয় না। আর ঐ সম্পদ কিয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে। (ই. ফা. ২২৯১, ই. ফা. ২২৯২)


সুনানে ইবনে মাজাহ অঃ->কলহ-বিপর্যয় বাব->ধন-সম্পদ সৃষ্ট বিপর্যয় হাঃ-৩৯৯৫

আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ

তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) দাঁড়িয়ে লোকেদের উদ্দেশে ভাষণ দিলেন। তিনি বলেনঃ না, আল্লাহর শপথ, হে জনগণ! আল্লাহ তোমাদের জন্য যে মোহনীয় পার্থিব ধন-সম্পদ নির্গত করবেন, তার অনিষ্ট ছাড়া তোমাদের ব্যাপারে আমি অন্য কিছুর আশংকা করি না। এক ব্যক্তি তাঁকে জিজ্ঞেস ‌করলো, হে আল্লাহর রাসূল! সম্পদের প্রাচূর্য কি বিপর্যয় ডেকে আনবে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ক্ষণিক নীরব খাকলেন, অতঃপর বলেনঃ তুমি কী বলেছিলে? সে বললো, আমি বলেছিলাম যে, সম্পদের প্রাচূর্য কি বিপর্যয় ডেকে আনবে? রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ কল্যাণ তো কল্যাণই বয়ে আনে। কল্যাণ (মাল) কি সম্পূর্ণই কল্যাণকর? নিশ্চয় বসন্ত ঋতু যা কিছু (ঘাসপাতা) উৎপন্ন করে তা (অপরিমিত ভোজে) মৃত্যু ঘটায় বা মৃতপ্রায় করে দেয়। কিন্তু যে তৃণভোজী পশু তা ভক্ষণ করে এবং উদর পূর্ণ হলে সূর্যের দিকে মুখ করে (জাবর কাটে), মলমূত্র তাগ করে এবং পুনরায় চরতে শুরু করে (তার ক্ষতি করে না)। যে ব্যক্তি সঙ্গত পন্থায় সম্পদ অর্জন করে তাকে বরকত দান করা হয়। আর যে ব্যক্তি অসঙ্গত পন্থায় সম্পদ অর্জন করে সে এমন ব্যক্তির ন্যয় যে আহার করে কিন্তু তৃপ্ত হয় না। [৩৩২৭]


সুনান নাসাঈ অঃ->যাকাত বাব->ইয়াতীমকে দান-সাদাকা করা হাঃ-২৫৮১

আবূ সাঈদ খুদরী (রাঃ) থেকে বর্নিতঃ

তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মিম্বারের উপর বসলেন। আমরাও তাঁর চারপাশে বসে গেলাম। তিনি বললেন, আমার পরবর্তীকালে তোমাদের বিজিত পার্থিব ধন-দৌলতের আধিক্যে আমি আশংকিত। (এ প্রসংগে) তিনি দুনিয়া ও তার চাকচিক্যের কথা আলোচনা করলেন। এক ব্যক্তি বলল, ভাল কি মন্দ (পরিনতি) নিয়ে আসে? তিনি (রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তাকে (প্রশ্নকারীকে) বলা হল যে, তোমার কি হল, তুমি রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাথে কথা বলছ অথচ তিনি তোমার সাথে কথা বলছেন না?(রাবী বলেন) আমরা দেখলাম যে, তখন তাঁর উপর ওহী অবতীর্ণ হচ্ছে। যখন চেতনা ফিরে গেলেন (ওহী অবতীর্ণ হয়ে গেল) তিনি ঘাম মুছতে মুছতে বললেন, প্রশ্নকারী কি উপস্থিত আছে? নিশ্চয়ই ভাল মন্দ নিয়ে আসবে না। তবে দেখ, বসস্ত ঋতু যা জন্মায় তা মেরে ফেলে অথবা মেরে ফেলার উপক্রম করে (অথচ সবুজ ঘাসপাতা একটি উত্তম বস্তু কিন্তু কোন চতুষ্পদ জন্তু যখন তা তা অপরিমিত ভক্ষণ করে তখন বদহজমীর দরুন মৃত্যুমুখে পতিত হওয়ার উপক্রম হয় বা মরেই যায়।) কিন্তু কোন তৃণভোজি জন্তু যখন তা ভক্ষণ করে তখন তার পেট ভরে যায় আর সে সূর্যের আলোর মুখোমুখী হয়ে পায়খানা করে ও পেশাব করে। এরপর চড়ে বেড়ায়। অনুরূপভাবে এ সমস্ত মাল মুসলমানদের জন্য কত উৎকৃষ্ট ও সুস্বাদু এবং উপকারী সাথী, যদি তার থেকে ইয়াতীম মিসকীন এবং মুসাফিরকে দান করা হয়। আর যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে ধন-সম্পদ সঞ্চয় করে সে যেন আহার করল কিন্তু পরিতৃপ্ত হতে পারল না আর এ ধন-সম্পদ কিয়ামতের দিন তার বিরুদ্ধে সাক্ষী হিসেবে দাঁড়াবে।